ত্রয়োদশ অধ্যায়- মহারাজ নিমির বংশ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইক্ষ্বাকুর পুত্র মহারাজ নিমি যজ্ঞ আরম্ভ করে মহর্ষি বশিষ্ঠকে প্রধান পুরোহিতের পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। তখন বশিষ্ঠ উত্তর দেন, ‘হে মহারাজ নিমি, আমি ইতিমধ্যেই দেবরাজ ইন্দ্রের যজ্ঞে প্রধান পুরোহিতের পদ গ্রহণ করেছি। ইন্দ্রের যজ্ঞ সমাপ্ত করে আমি ফিরে আসব। দয়া করে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার জন্য অপেক্ষা কর।’ মহারাজ নিমি তখন কোন উত্তর না দিয়ে নীরব ছিলেন এবং বশিষ্ঠ ইন্দ্রযজ্ঞ আরম্ভ করেছিলেন। আত্মতত্ত্বজ্ঞ মহারাজ নিমি বিবেচনা করেছিলেন যে, এই জীবন অস্থির। তাই, বশিষ্ঠের ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, তিনি অন্য পুরোহিতদের দ্বারা যজ্ঞ অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের যজ্ঞ সমাপ্ত করে গুরু বশিষ্ঠ ফিরে এসে যখন দেখেছিলেন যে, তাঁর শিষ্য মহারাজ নিমি তাঁর আদেশ অমান্য করেছেন, তখন বশিষ্ঠ তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, ‘পণ্ডিতাভিমানী নিমির জড় দেহের নিপাত হোক।’ মহারাজ নিমি কোন অপরাধ না করলেও অকারণে তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন বলে, তিনিও তাঁর গুরুকে প্রত্যভিশাপ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে দক্ষিণা লাভ করার লোভে আপনার ধর্মজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে। সুতরাং আপনার দেহেরও পতন হোক।’ এই বলে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে পারদর্শী নিমি তাঁর দেহ বিসর্জন দিয়েছিলেন। প্রপিতামহ বশিষ্ঠও দেহত্যাগ করে পুনরায় মিত্র-বরুণের বীর্যে উর্বশীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার সময় মহারাজ নিমি দেহত্যাগ করলে মহর্ষিগণ তাঁর দেহ গন্ধবস্তুর মধ্যে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং সত্রযাগ সমাপনান্তে তাঁরা সেখানে সমাগত দেবতাদের অনুরোধ করে বলেছিলেন।”
‘আপনারা যদি এই যজ্ঞে প্রসন্ন হয়ে থাকেন এবং সত্য সত্যই সমর্থ হন, তা হলে দয়া করে মহারাজ নিমির এই দেহে পুনরায় প্রাণের সঞ্চার করুন।’ ঋষিদের এই অনুরোধে দেবতারা সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু মহারাজ নিমি তখন বলেছিলেন, ‘দয়া করে আমাকে পুনরায় এই জড় দেহের বন্ধনে আবদ্ধ করবেন না।’ ”
মহারাজ নিমি বললেন- “মায়াবাদীরা সাধারণত জড় দেহের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চায়, কারণ তারা পুনরায় দেহ ত্যাগের ভয়ে ভীত। কিন্তু যাঁদের মেধা সর্বদা ভগবানের সেবায় মগ্ন, তাঁরা কখনও ভীত হন না। বস্তুতপক্ষে, তাঁরা ভগবানের প্রেমময়ী সেবা সম্পাদন করার জন্য দেহটির সদ্ব্যবহার করেন। আমি জড় দেহ ধারণ করতে ইচ্ছা করি না, কারণ তা এই জগতের সর্বত্রই দুঃখ শোক এবং ভয়ের কারণ। জলে মৎস্য যেমন সর্বদা মৃত্যুর আশঙ্কা করে, তেমনই দেহধারী জীবদেরও সর্বত্রই মৃত্যুভয় হয়ে থাকে।”
দেবতারা বললেন- “মহারাজ নিমি জড় শরীর ব্যতীতই জীবিত থাকুন। তিনি চিন্ময় শরীরে ভগবানের পার্ষদরূপে বিরাজ করুন এবং তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তিনি জড় দেহধারী সাধারণ মানুষদের কাছে প্রকট ও অপ্রকট থাকুন। তারপর অরাজকতার ভয় থেকে মানুষদের রক্ষা করার জন্য ঋষিগণ মহারাজ নিমির দেহ মন্থন করেছিলেন, তার ফলে তার দেহ থেকে একটি পুত্র উৎপন্ন হয়েছিল। অসাধারণভাবে উৎপন্ন হয়েছিলেন বলে সেই পুত্রের নাম হয়েছিল জনক এবং প্রাণহীন দেহ থেকে জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর নাম বৈদেহ। তাঁর পিতার দেহ মন্থনের ফলে উৎপন্ন হয়েছিল বলে তিনি মিথিল নামেও অভিহিত হয়েছিলেন এবং তিনি যে পুরী নির্মান করেছিলেন তার নাম হয়েছিল মিথিলা।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মিথিলের পুত্রের নাম উদাবসু; উদাবসু থেকে নন্দিবর্ধন, নন্দিবর্ধন থেকে সুকেতু এবং সুকেতুর পুত্র দেবরাত। দেবরাত থেকে বৃহদ্রথ নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং বৃহদ্রথের পুত্র মহাবীর্য, যিনি ছিলেন সুধৃতির পিতা। সুধৃতির পুত্রের নাম ধৃষ্টকেতু এবং ধৃষ্টকেতু থেকে হর্যশ্ব জন্মগ্রহণ করেন। হর্যশ্ব থেকে মরু নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। মরুর পুত্র প্রতীপক এবং প্রতীপকের পুত্র কৃতরথ। কৃতরথ থেকে দেবমীঢ় জন্মগ্রহণ করেন। দেবমীঢ়ের পুত্র বিশ্রুত এবং বিশ্রুতের পুত্র মহাধৃতি। মহাধৃতি থেকে কৃতিরাত নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। কৃতিরাতের পুত্র মহারোমা, মহারোমা থেকে স্বর্ণরোমা নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং স্বর্ণরোমা থেকে হ্রস্বরোমার জন্ম হয়। হ্রস্বরোমার পুত্র শীরধ্বজ (ইনি জনক নামেও পরিচিত)। শীরধ্বজ যখন যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জন্য ভূমি কর্ষণ করেছিলেন, তখন তাঁর লাঙ্গলের অগ্রভাগ থেকে সীতাদেবী নামক এক কন্যা আবির্ভূতা হন, যিনি পরে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পত্নী হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি শীরধ্বজ নামে বিখ্যাত হন। শীরধ্বজের পুত্র কুশধ্বজ এবং কুশধ্বজের পুত্র রাজা ধর্মধ্বজ, যাঁর কৃতধ্বজ ও মিতধ্বজ নামক দুই পুত্র ছিল।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! কৃতধ্বজের পুত্র কেশিধ্বজ এবং মিতধ্বজের পুত্র খাণ্ডিক্য। কৃতধ্বজের পুত্র ছিলেন আত্মতত্ত্ববিদ এবং মিতধ্বজের পুত্র ছিলেন বৈদিক কর্মকাণ্ডীয় অনুষ্ঠানে সুনিপুণ। কেশিধ্বজের ভয়ে খাণ্ডিক্য পলায়ন করেছিলেন। কেশিধ্বজের পুত্র ভানুমান্ এবং ভানুমানের পুত্র ছিলেন শতদ্যুম্ন। শতদ্যুম্নের শুচি নামে এক পুত্র ছিল, তাঁর থেকে সনদ্বাজ নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং সনদ্বাজ থেকে ঊর্জকেতুর জন্ম হয়। ঊর্জকেতুর পুত্র অজ এবং অজের পুত্র পুরুজিৎ। পুরুজিতের পুত্র অরিষ্টনেমি এবং তাঁর পুত্র শ্রুতায়ু। শ্রুতায়ুর সুপার্শ্বক নামক এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন এবং সুপার্শ্বক থেকে চিত্ররথের জন্ম হয়। চিত্ররথের পুত্র ছিলেন ক্ষেমাধি, যিনি মিথিলার রাজা হয়েছিলেন। ক্ষেমাধির পুত্র সমরথ, সমরথের পুত্র সত্যরথ, সত্যরথ থেকে উপগুরু এবং উপগুরু থেকে অগ্নির অংশ উপগুপ্তের জন্ম হয়। উপগুপ্তের পুত্র বস্বনন্ত, তাঁর পুত্র যুযুধ, যুযুধের পুত্র সুভাষণ এবং সুভাষণের পুত্র শ্রুত। শ্রুতের পুত্র জয় এবং জয় থেকে বিজয় জন্মগ্রহণ করেন। এই বিজয়ের পুত্র ঋত। ঋতের পুত্র শুনক, শুনকের পুত্র বীতহব্য, বীতহব্যের পুত্র ধৃতি এবং ধৃতির পুত্র বহুলাশ্ব। বহুলাশ্বের পুত্র কৃতি এবং তাঁর পুত্র মহাবশী।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! মিথিল রাজবংশে সমস্ত রাজারই ছিলেন আত্ম-তত্ত্ববিৎ। তাই গৃহে অবস্থান করলেও তাঁরা জড় জগতের দ্বন্দ্বভাব থেকে মুক্ত ছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits