একাদশ অধ্যায়- শ্রীরামচন্দ্রের পৃথিবী শাসন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আচার্যবান হয়ে শ্রেষ্ঠ উপকরণ সমন্বিত যজ্ঞের দ্বারা নিজেই নিজের আরাধনা করেছিলেন, কারণ তিনি হচ্ছেন সমস্ত দেবতাদের পরম দেবতা। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র হোতাকে সমগ্র পূর্বদিক, ব্রহ্মা পুরোহিতকে সমগ্র দক্ষিণদিক, অধ্বর্যু পুরোহিতকে সমগ্র পশ্চিমদিক এবং সামবেদ গানকারী উদ্‌গাতা পুরোহিতকে সমগ্র উত্তরদিক প্রদান করেছিলেন। এইভাবে তাঁর সমগ্র রাজ্য তিনি প্রদান করেছিলেন। তারপর, ব্রাহ্মণদের যেহেতু কোন জড় বাসনা নেই, তাই তাঁরাই সারা পৃথিবী গ্রহণ করার যোগ্য, এইভাবে বিচার করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণ দিকের মধ্যে যে ভূমি অবশিষ্ট ছিল, তা আচার্যকে দান করেছিলেন। এইভাবে ব্রাহ্মণদের সব কিছু দান করার পর, ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের কেবল পরিহিত বস্ত্র এবং অলঙ্কার মাত্র অবশিষ্ট ছিল। তেমনই রাজমহিষী সীতাদেবীরও কেবল নাসাভরণ মাত্র অবশিষ্ট ছিল। যজ্ঞ অনুষ্ঠানে নানাভাবে নিযুক্ত সমস্ত ব্রাহ্মণেরা ব্রাহ্মণদের প্রতি অত্যন্ত অনুকূল এবং স্নেহপরায়ণ শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। এইভাবে দ্রবীভূত হৃদয়ে তাঁরা তাঁর কাছ থেকে দানরূপে যা কিছু প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তা সব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে ভগবান্! হে জগদীশ্বর! আপনি আমাদের কি না দিয়েছেন? আপনি আমাদের হৃদয় অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আপনার জ্যোতির দ্বারা আমাদের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করেছেন। সেটিই চরম উপহার। জড়জাগতিক কোন দান আর আমাদের প্রয়োজন নেই। হে ভগবান, আপনি ব্রাহ্মণদের আপনার আরাধ্য দেবতা বলে স্বীকার করেছেন। আপনার জ্ঞান এবং স্মৃতি কখনও কুন্ঠার দ্বারা বিচলিত হয় না। আপনি এই জগতের সমস্ত যশস্বী ব্যক্তিদের মধ্যে মুখ্য এবং আপনার শ্রীপাদপদ্ম দণ্ডদানের অযোগ্য মুনি-ঋষিদের দ্বারা পূজিত হয়। হে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র! আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কোন একসময় শ্রীরামচন্দ্র যখন তাঁর সম্বন্ধে মানুষদের মনোভাব জানার জন্য ছদ্মবেশে অন্যের অলক্ষিতভাবে রাত্রে নগরীর মধ্যে বিচরণ করছিলেন, তখন তিনি কোন ব্যক্তিকে তাঁর পত্নী সীতাদেবীর সম্বন্ধে প্রতিকূল মন্তব্য করতে শ্রবণ করেছিলেন। (সেই ব্যক্তি তার অসতী স্ত্রীকে বলেছিল) তুমি পরপুরুষের গৃহে গমন কর এবং তাই তুমি অসতী ও ভ্রষ্টা। আমি আর তোমার ভরণপোষণ করব না। শ্রীরামচন্দ্রের মতো স্ত্রৈণ পরগৃহগতা সীতাকে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আমি তাঁর মতো স্ত্রৈণ নই, তাই আমি আর তোমাকে গ্রহণ করব না।”
“অজ্ঞ এবং দুষ্ট স্বভাবসম্পন্ন মানুষেরা কটুভাষী। সেই সমস্ত দুষ্টদের ভয়ে ভীত হয়ে শ্রীরামচন্দ্র তাঁর গর্ভবর্তী পত্নী সীতাদেবীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। সীতাদেবী তখন বাল্মীকি মুনির আশ্রমে গমন করেছিলেন। যথাসময়ে গর্ভবর্তী সীতাদেবী দুটি যমজ পুত্র প্রসব করেন। তাঁরা লব ও কুশ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বাল্মীকি মুনি তাঁদের জাতকর্ম সম্পাদন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! লক্ষণের অঙ্গদ ও চিত্রকেতু নামক দুই পুত্র এবং ভরতের তক্ষ ও পুষ্কল নামক দুই পুত্র ছিল। শত্রুঘ্নের সুবাহু এবং শ্রুতসেন নামক দুটি পুত্র ছিল। ভরত দিগ্বিজয়ে যাত্রা করে কোটি কোটি গন্ধর্বদের বিনাশ করেছিলেন এবং তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ নিয়ে এসে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে প্রদান করেছিলেন। শত্রুঘ্নও মধুর পুত্র লবণ নামক রাক্ষসকে বিনাশ করে মধুবনে মথুরাপুরী নির্মাণ করেছিলেন। পতি কর্তৃক নির্বাসিত হয়ে সীতাদেবী তাঁর দুই পুত্রকে বাল্মীকি মুনির হস্তে সমর্পণ করেছিলেন। তারপর তাঁর পতি শ্রীরামচন্দ্রের পাদপদ্মযুগল ধ্যান করতে করতে তিনি পাতালে প্রবেশ করেছিলেন। সীতাদেবীর পাতাল প্রবেশের সংবাদ শ্রবণ করে ভগবান অত্যন্ত শোকাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। যদিও তিনি পরমেশ্বর ভগবান, তবুও সীতার গুণসমূহ স্মরণ করে, অপ্রাকৃত প্রেমে তিনি তার শোক সম্বরণ করতে পারেননি। স্ত্রী এবং পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ সর্বত্রই ভয়প্রদ। এই প্রকার অনুভূতি ব্রহ্মা, শিব আদি ঈশ্বরদের মধ্যেও বর্তমান এবং তাঁদের পক্ষেও ভীতিপ্রদ, অতএব এই জড় জগতের গৃহস্থ-জীবনের প্রতি আসক্ত অন্য ব্যক্তিদের আর কি কথা।”
“সীতার পাতাল প্রবেশের পর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেরো হাজার বছর ধরে অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করেছিলেন। সেই যজ্ঞ সমাপন করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, যাঁর শ্রীপাদপদ্ম দণ্ডকারণ্যে বনবাসের সময় কখনও কখনও কন্টকের দ্বারা বিদ্ধ হয়েছিল, সেই শ্রীপাদপদ্ম নিরন্তর তাঁকে স্মরণ করেন যে সমস্ত ভক্তগণ তাঁদের হৃদয়ে স্থাপন করে তিনি ব্রহ্মজ্যোতির অতীত তাঁর স্বীয় ধাম বৈকুন্ঠলোকে গমন করেছিলেন। দেবতাদের প্রার্থনায় বাণ বর্ষণের দ্বারা রাবণ বধ এবং সমুদ্রে সেতুবন্ধন নিত্য লীলাবিগ্রহ ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের প্রকৃত যশ নয়। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অসমোর্ধ্ব প্রভাব সম্পন্ন এবং তাই রাবণ বধের জন্য তাঁর বানরদের সহায়তার কোন প্রয়োজন হয় না। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের নির্মল পাপহারী যশ দিগ্‌গজদের আবরণকারী অলঙ্কারযুক্ত বস্ত্রের মতো সর্বদিক বিখ্যাত। মার্কণ্ডেয় ঋষির মতো মহাত্মাগণ মহারাজ যুধিষ্ঠিরের মতো মহান সম্রাটদের সভায় শ্রীরামচন্দ্রের মহিমা কীর্তন করেন। তেমনই, সমস্ত রাজর্ষিগণ এবং শিব, ব্রহ্মা আদি দেবতাগণ তাঁদের মুকুট সহ মস্তক অবনত করে তাঁর পূজা করেন। তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর ধামে ফিরে গিয়েছিলেন, যেখানে ভক্তিযোগীরা উন্নীত হন। সমগ্র অযোধ্যাবাসীরা শ্রীরামচন্দ্রের প্রকট লীলায় তাঁকে প্রণতি নিবেদন, তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শন, তাঁকে পিতৃতুল্য রাজারূপে দর্শন, সঙ্গী বা সখাভাবে তাঁর সঙ্গে একত্রে উপবেশন, শয়ন অথবা ভৃত্যরূপে তাঁর অনুগমন আদির দ্বারা সর্বতোভাবে তাঁর সেবা করেছিলেন এবং তাঁরা সকলে সেই স্থানে গমন করেছিলেন।” “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! যে ব্যক্তি শ্রবণেন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের চরিত শ্রবণ করবেন, তিনি মাৎসর্য রোগ থেকে মুক্ত হয়ে সকাম কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “ভগবান শ্রীরামচন্দ্র কিভাবে আচরণ করতেন এবং তাঁরই অংশ তাঁর ভ্রাতাদের প্রতি তিনি কিভাবে ব্যবহার করতেন? তাঁর ভায়েরা এবং অযোধ্যাবাসীরাই বা তাঁর প্রতি কিভাবে আচরণ করতেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিয়েছিলেন- “ভরতের ঐকান্তিক অনুরোধে সিংহাসন গ্রহণ করার পর, ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের আদেশ দিয়েছিলেন সারা পৃথিবী জয় করতে এবং তিনি স্বয়ং পুরবাসী ও প্রজাদের দর্শনদান করার জন্য এবং সহকারীদের সঙ্গে রাজকার্য পর্যবেক্ষণ করার জন্য সেখানে ছিলেন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে রাজধানী অযোধ্যার পথগুলি হাতিদের শুঁড়ের দ্বারা নিক্ষিপ্ত সুগন্ধি জল এবং সুরভিত মদের দ্বারা সিঞ্চিত হত। নাগরিকেরা যখন দেখত যে, রাজা স্বয়ং এই প্রকার ঐশ্বর্য সহকারে রাজধানীর তত্ত্বাবধান করছেন, তখন তারা সেই ঐশ্বর্যের মর্ম উপলব্ধি করেছিল। প্রাসাদ, পুরদ্বার, সভাগৃহ, মিলনমঞ্চ, মন্দির প্রভৃতি স্থান সুবর্ণ কলসের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল এবং বিভিন্ন প্রকার পতাকার দ্বারা সজ্জিত ছিল। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যেখানেই যেতেন, সেখানেই তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য ফুল ও ফলের স্তবক সমন্বিত কদলী ও সুপারি বৃক্ষের দ্বারা তোরণ নির্মাণ করা হত। সেই সমস্ত তোরণ নানাবিধ চিত্র-বিচিত্র বস্ত্রের পতাকা, দর্পণ এবং মাল্যের দ্বারা সুন্দরভাবে সাজানো হত। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যেখানেই যেতেন, সেখানকার মানুষেরা পূজার উপকরণ নিয়ে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বলতেন, ‘হে ভগবান! পূর্বে যেমন আপনি বরাহ অবতারে পৃথিবীকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার করেছিলেন, সেইভাবে আপনি আমাদের পালন করুন। আমরা আপনার কাছে এই আশীর্বাদ ভিক্ষা করি।’ তারপর দীর্ঘকাল ভগবানকে দর্শন না করার ফলে, স্ত্রী-পুরুষ সমস্ত প্রজারাই অত্যন্ত উৎসুক হয়ে তাঁদের আবাস ত্যাগ করে প্রাসাদের ছাদে আরোহণ করে অতৃপ্ত নয়নে পদ্মপলাশলোচন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে দর্শন করতে করতে তাঁর উপর পুষ্প বর্ষণ করেছিলেন। তারপর ভগবান রামচন্দ্র তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। সেই প্রাসাদ বিবিধ রত্নকোষে সমৃদ্ধিশালী এবং অমূল্য পরিচ্ছদের দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। গৃহদ্বারের উভয় দিকের বসার স্থানগুলি ছিল প্রবালের দ্বারা নির্মিত, সেখানকার স্তম্ভগুলি বৈদূর্য মণির দ্বারা নির্মিত, গৃহতল অতি স্বচ্ছ মরকত মণির দ্বারা নির্মিত এবং ভিত্তি স্ফটিক নির্মিত। সেই প্রাসাদ বিচিত্র পতাকা, মাল্য, বস্ত্র এবং রত্নসমূহে সজ্জিত হয়ে দিব্য জ্যোতিতে দীপ্যমান ছিল। সেই প্রাসাদ মুক্তার মালা দ্বারা শোভিত এবং ধূপ ও দীপের দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। সেই প্রাসাদে স্ত্রী-পুরুষেরা ছিলেন দেবতাদের মতো সুন্দর এবং বিবিধ অলঙ্কারে সজ্জিত, কিন্তু মনে হচ্ছিল তাঁদের সৌন্দর্য যেন অলঙ্কারেরও অলঙ্কার-স্বরূপ। আত্মারাম পণ্ডিতদের অগ্রগণ্য ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর আনন্দদায়িনী শক্তি সীতাদেবীর সঙ্গে সেই প্রাসাদে বাস করেছিলেন এবং পূর্ণ শান্তি উপভোগ করেছিলেন। ভক্তেরা যাঁর শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা করেন, সেই ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ধর্মের নীতি উল্লঙঘন না করে বহু বর্ষ চিন্ময় উপকরণসমূহ ভোগ করেছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits