দশম অধ্যায়- ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের লীলা

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহারাজ খট্বাঙ্গের পুত্র দীর্ঘবাহু এবং তাঁর পুত্র মহাযশস্বী মহারাজ রঘু। রঘু থেকে অজ এবং অজ থেকে মহারাজ দশরথের জন্ম হয়। দেবতাদের দ্বারা প্রার্থিত হয়ে সাক্ষাৎ ব্রহ্মময় ভগবান শ্রীহরি তাঁর অংশ এবং অংশের অংশসহ আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁদের নাম রাম, লক্ষ্মণ, ভরত এবং শত্রুঘ্ন। এইভাবে ভগবান চার মূর্তিতে মহারাজ দশরথের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের দিব্য কার্যকলাপ তত্ত্বদর্শী ঋষিদের দ্বারা বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু আপনি বার বার সীতাপতি শ্রীরামচন্দ্রের চরিত্র শ্রবণ করেছেন, তাই আমি তা সংক্ষেপে বর্ণনা করব, দয়া করে শ্রবণ করুন। যিনি পিতৃসত্য পালনের জন্য তাঁর রাজ্য পরিত্যাগ করে, প্রিয় পত্নী সীতাদেবীর সুকোমল করস্পর্শ সহনে অসমর্থন চরণকমলের দ্বারা বনে বনে বিচরণ করেছিলেন, বানররাজ হনুমান (অথবা সুগ্রীব) ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষ্মণ যাঁর বনভ্রমণের শ্রান্তি অপনোদন করেছিলেন, যিনি শূর্পনখার নাক ও কান কেটে তাকে বিকৃতরূপ করেছিলেন, সীতাদেবীর বিরহজনিত ক্রোধের দ্বারা যাঁর ভ্রূভঙ্গি দর্শন করে সমুদ্র ভীত হয়ে ভগবানকে সমুদ্রের উপর সেতুবন্ধন করতে দিয়েছিলেন। তারপর রাবণের রাজ্যে প্রবেশ করে, আগুন যেভাবে বনকে গ্রাস করে, ঠিক সেইভাবে রাবণকে সংহার করেছিলেন সেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আমাদের রক্ষা করুন। বিশ্বামিত্র মুনির যজ্ঞে অযোধ্যার রাজা শ্রীরামচন্দ্র মারীচ আদি বহু রাক্ষস এবং নিশাচরদের সংহার করেছিলেন। লক্ষ্মণের সমক্ষে যিনি এই সমস্ত অসুরদের সংহার করেছিলেন, সেই শ্রীরামচন্দ্র আমাদের কৃপাপূর্বক রক্ষা করুন।”
“হে রাজন্, শ্রীরামচন্দ্রের লীলা হস্তীশাবকের মতো অদ্ভুত। তিনি সীতার স্বয়ংবর সভায় পৃথিবীর সমস্ত বীরদের মধ্যে হরধনু ভঙ্গ করেছিলেন। সেই ধনুক এত ভারী ছিল যে, তিন শত মানুষকে তা বহন করতে হত, কিন্তু ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সেই ধনুকে জ্যা আরোপণ করে তা ভঙ্গ করেছিলেন, ঠিক যেভাবে একজন হস্তীশাবক ইক্ষুদ- ভঙ্গ করে। এইভাবে ভগবান সীতাদেবীর পাণিগ্রহণ করেছিলেন, যিনি আকৃতি, সৌন্দর্য, গুণ, বয়স এবং স্বভাবে তাঁরই সমতুল্য ছিলেন। বস্তুতপক্ষে, তিনি ছিলেন তাঁরই বক্ষবিলাসিনী নিত্য সহচরী লক্ষ্মীদেবী। স্বয়ংবর সভায় তাঁকে জয় করে শ্রীরামচন্দ্র যখন গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরশুরামের সাক্ষাৎ হয়। পৃথিবীকে একুশবার ক্ষত্রিয়শূণ্য করার ফলে পরশুরাম অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন, কিন্তু ক্ষত্রিয় রাজকুলে আবির্ভূত হয়ে ভগবান তাঁর দর্পচূর্ণ করেছিলেন। পত্নীর কাছে প্রতিজ্ঞার পাশে আবদ্ধ পিতার আদেশ পালন করে শ্রীরামচন্দ্র তাঁর রাজ্য, ঐশ্বর্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাসস্থান এবং অন্য সব কিছু ত্যাগ করে বনে গমন করেছিলেন, ঠিক যেভাবে একজন মুক্ত পুরুষ সমস্ত আসক্তি পরিত্যাগ করে তাঁর প্রাণ ত্যাগ করেন। অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টময় জীবন স্বীকার করে তিনি বনে বিচরণ করেছিলেন। ধনুর্বাণ হস্তে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র মন্দবুদ্ধি রাবণের ভগ্নী শূর্পনখার নাক এবং কান ছিন্ন করে তার রূপ বিকৃত করেছিলেন। তিনি খর, ত্রিশির, দূষণ প্রমুখ শূর্পণখার চোদ্দ হাজার রাক্ষস বন্ধুদের সংহার করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দশানন রাবণ যখন সীতাদেবীর সৌন্দর্যের কথা শুনেছিল, তখন তার চিত্তে কামানল উদ্দীপ্ত হয়েছিল। সে তখন সীতাদেবীকে হরণ করার বাসনায় শ্রীরামচন্দ্রকে আশ্রম থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি স্বর্ণমৃগের রূপধারী মারীচকে সেখানে পাঠিয়েছিল এবং রামচন্দ্র সেই অদ্ভুত মৃগটিকে দর্শন করে তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তাঁর আশ্রম থেকে দূরে নীত হয়েছিলেন এবং মহাদেব যেভাবে দক্ষকে বধ করেছিলেন, সেইভাবে তিনি শবের দ্বরা সেই হরিণটিকে বধ করেছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র যখন সেই হরিণকে অনুসরণ করতে করতে বনের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন এবং লক্ষ্মণও যখন অনুপস্থিত ছিলেন, তখন রাক্ষসাধম রাবণ বাঘ যেভাবে মেষপালকের অনুপস্থিতিতে মেষ অপহরণ করে, ঠিক সেইভাবে বিদেহ রাজের কন্যা সীতাদেবীকে অপহরণ করেছিল। তখন ভ্রাতা লক্ষ্মণ সহ ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর পত্নীর বিরহে যেন অত্যন্ত কাতর হয়ে বনে বনে বিচরণ করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তের দ্বারা স্ত্রীসঙ্গের দুঃখময় পরিণতি প্রদর্শন করেছিলেন। ব্রহ্মা, শিব, যাঁর শ্রীপাদপদ্মের পূজা করেন, মনুষ্যরূপধারী সেই ভগবান শ্রীরামচন্দ্র রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত জটায়ুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেছিলেন। তারপর ভগবান কবন্ধ নামক অসুরকে হত্যা করেন এবং বানরশ্রেষ্ঠদের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে বালি বিনাশের পর, সীতাদেবীকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে সমুদ্রতীরে গমন করেছিলেন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সমুদ্রের তটে তিন দিন উপবাস করে মূর্তিমান সমুদ্রের আগমনের প্রতীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও সমুদ্র না আসায় ভগবান তাঁর ক্রোধলীলা প্রদর্শন করেছিলেন এবং কেবল সমুদ্রের প্রতি দৃষ্টিপাতের ফলে কুমির, মকর প্রভৃতি সমস্ত জলজন্তু ভয়ে বিচলিত হয়েছিল। তখন মূর্তিমান সমুদ্র ভীত হয়ে পূজার সমস্ত উপকরণ নিয়ে শ্রীরামচন্দ্রের কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়ে এই কথাগুলি বলেছিলেন।”
“হে সর্বব্যাপ্ত পরম পুরুষ! জড়বুদ্ধি-সম্পন্ন আমরা আপনাকে জানতে পারিনি, কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আপনি পরম পুরুষ, সমগ্র জগতের অধিশ্বর, নির্বিকার আদিপুরুষ। সত্ত্বগুণ থেকে দেবতাদের আবির্ভাব হয়েছে, রজোগুণ থেকে প্রজাপতিদের আবির্ভাব হয়েছে এবং তমোগুণ থেকে রুদ্রদের আবির্ভাব হয়েছে, কিন্তু আপনি এই সমস্ত গুণের একমাত্র অধীশ্বর। হে ভগবান, আপনি আপনার ইচ্ছামতো আমার জল ব্যবহার করুন। এই জল অতিক্রম করে আপনি ত্রিভুবনের ক্লেশদায়ক রাবণের পুরী লঙ্কায় গমন করুন। সে বিশ্রবার মূত্রসদৃশ পুত্র। দয়া করে আপনি তাকে বিনাশ করে আপনার পত্নী সীতাদেবীকে পুনঃপ্রাপ্ত হোন। হে মহাবীর, যদিও আমার জল আপনার লঙ্কাগমনে কোন রকম বাধা প্রদান করবে না, তবুও আপনি আপনার কীর্তি বিস্তার করার জন্য একটি সেতু বন্ধন করুন। আপনার এই অসাধারণ কর্ম দর্শন করে ভবিষ্যতের সমস্ত বীর এবং রাজারা আপনার মহিমা কীর্তন করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বানরশ্রেষ্ঠদের হস্তের দ্বারা কম্পিত বৃক্ষলতায় পরিপূর্ণ বিবিধ গিরিশৃঙ্গের দ্বারা সমুদ্রের উপর সেতু নির্মাণ করে, বিভীষণের পরামর্শে শ্রীরামচন্দ্র সুগ্রীব, নীল, হনুমান প্রমুখ সৈন্যগণ সহ রাবণের রাজধানী লঙ্কায় প্রবেশ করেছিলেন, যা পূর্বে হনুমানের দ্বারা দগ্ধ হয়েছিল। লঙ্কায় প্রবেশ করার পর সুগ্রীব, নীল, হনুমান প্রমুখ বানরশ্রেষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে বানর-সৈন্যরা সেখানকার বিলাস ভবন, শস্যাগার, কোষাগার, গৃহদ্বার, পুরদ্বার, সভাগৃহ, প্রাসাদের পুরোভাগ এবং কপোতাবাস পর্যন্ত অবরোধ করেছিল। যখন তারা নগরীর চতুষ্পথ, বেদী, পতাকা, প্রাসাদের চূড়ার স্বর্ণকলস প্রভৃতি ভেঙ্গে ফেলতে লাগল, তখন হস্তীকুলের দ্বারা নদী যেভাবে বিচলিত হয়, লঙ্কার অবস্থাও ঠিক সেই রকম হয়েছিল। রাক্ষসপতি রাবণ বানর-সৈন্যদের উৎপাত দর্শন করে নিকুম্ভ, কুম্ভ, ধূম্রাক্ষ, দুর্মুখ, সুরান্তক, নরান্তক প্রভৃতি রাক্ষসদের এবং তার নিজের পুত্র ইন্দ্রজিৎকেও যুদ্ধে প্রেরণ করেছিল। তারপর সে প্রহস্ত, অতিকায়, বিকম্পন এবং অবশেষে কুম্ভকর্ণকে যুদ্ধ করতে আদেশ দিয়েছিল। তারপর সে তার সমস্ত অনুচরদের শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করেছিল। শ্রীরামচন্দ্র লক্ষণ এবং সুগ্রীব, হনুমান, গন্ধমাদ, নীল, অঙ্গদ, জাম্ববান, পনস আদি বানর-সৈন্যদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অসি, শূল, ধনুক, প্রাস, ঋষ্টি, শক্তি, খড়্গ, তোমর আদি অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত দুর্গম রাক্ষস-সৈন্যদের আক্রমণ করেছিলেন। শ্রীরামচন্দ্রের অঙ্গদ প্রভৃতি সেনাপতিরা সকলেই রাবণের হস্তী, পদাতিক, অশ্ব ও রথের দ্বারা গঠিত সৈন্যদের সম্মুখীন হয়ে বৃক্ষ, পর্বতশৃঙ্গ, গদা এবং বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন। এইভাবে শ্রীরামচন্দ্রের সৈন্যেরা রাবণের সৈন্যদের বিনাশ করতে লাগলেন, যারা তাদের সমস্ত সৌভাগ্য হারিয়েছিল, কারণ সীতাদেবীর ক্রোধজনিত অভিশাপের ফলে রাবণের সমস্ত মঙ্গল বিনষ্ট হয়েছিল। তারপর রাক্ষসরাজ রাবণ তার সৈন্য বিনষ্ট হয়েছে দেখে, অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে পুষ্পক রথে আরোহণ করে শ্রীরামচন্দ্রের অভিমুখে ধাবিত হয়েছিল এবং ইন্দ্রের সারথি মাতলি কর্তৃক আনীত দীপ্তিমান রথে বিরাজমান শ্রীরামচন্দ্রকে তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা আঘাত করেছিল। শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বলেছিলেন, তুমি রাক্ষসদের মধ্যে সব চাইতে নিকৃষ্ট। প্রকৃতপক্ষে তুমি তাদের বিষ্ঠাসদৃশ। কুকুর যেমন গৃহস্বামীর অনুপস্থিতিতে গৃহ থেকে আহার্য অপহরণ করে পলায়ন করে, তুমিও তেমন আমার অনুপস্থিতিতে আমার পত্নী সীতাদেবীকে অপহরণ করেছ। তাই যমরাজ যেভাবে পাপীদের দণ্ডদান করেন, আমিও সেইভাবে তোমাকে দণ্ডদান করব। তুমি অত্যন্ত ঘৃণ্য, পাপী এবং নির্লজ্জ। তাই আজ অলঙঘবীর্য আমি তোমাকে তোমার দুষ্কর্মের ফল প্রদান করব। এইভাবে রাবণকে ভর্ৎসনাপূর্বক শ্রীরামচন্দ্র তাঁর ধনুকে শর যোজন করে রাবণের প্রতি তা নিক্ষেপ করেছিলেন এবং বজ্রের মতো সেই বাণ রাবণের হৃদয় বিদ্ধ করেছিল। তা দেখে রাবণের অনুগামী জনেরা হাহাকার করতে লাগল এবং রাবণ তার দশমুখে রক্তবমন করতে করতে পুণ্যবান ব্যক্তি যেভাবে পুণ্যক্ষয়ে স্বর্গ থেকে অধিঃপতিত হয়, সেইভাবে বিমান থেকে পতিত হয়েছিল। তারপর রাবণের পত্নী মন্দোদরী আদি রাক্ষসীরা, যাদের পতিগণ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছিল, তারা লঙ্কা থেকে নির্গত হয়ে ক্রন্দন করতে করতে রাবণ এবং অন্যান্য রাক্ষসদের মৃতদেহের সমীপে আগমন করেছিল। শোকার্তা রাক্ষসীরা লক্ষ্মণের বাণে নিহত তাদের পতিদের আলিঙ্গন করে, তাদের বক্ষস্থলে আঘাত করতে করতে করুণস্বরে রোদন করেছিল। হে প্রভু, হে নাথ! তুমি জনসমূহের কষ্টের কারণস্বরূপ ছিলে এবং তাই তোমার নাম ছিল রাবণ। কিন্তু এখন তুমি পরাজিত হয়েছ বলে আমরাও পরাজিত হয়েছি, কারণ তোমার লঙ্কাপুরী এখন শত্রুদের দ্বারা বিজিত হয়েছে। এখন তা কার শরণাগত হবে? হে মহাভাগ্যবান! আপনি কামের অধীন হয়ে সীতাদেবীর প্রভাব জানতে সমর্থ হননি। এখন, তাঁর অভিশাপের ফলে আপনি শ্রীরামচন্দ্রের দ্বারা নিহত হয়ে এই অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন। হে রাক্ষসকুলনন্দন! আপনারই কারণে লঙ্কা এবং আমরা পতিহীনা হয়েছি। আপনার কর্মের দ্বারা আপনি আপনার দেহ শকুনদের ভক্ষ্য এবং নিজেকে নরকভোগী করলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কোশলরাজ শ্রীরামচন্দ্রের সম্মতিক্রমে, রাবণের পুণ্যবান ভ্রাতা এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের ভক্ত বিভীষণ তার আত্মীয়দের নরক গমন থেকে রক্ষা করার জন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিধান অনুসারে ঔর্ধ্বদেহিক ক্রিয়া সম্পাদন করেছিলেন। তারপর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অশোক বনে শিংশপা বৃক্ষের মূলে তাঁর বিরহে কাতর এবং অত্যন্ত ক্ষীণা সীতাদেবীকে দর্শন করেছিলেন। তাঁর পত্নীকে সেই অবস্থায় দর্শন করে শ্রীরামচন্দ্র অত্যন্ত দয়ার্দ্রচিত্ত হয়েছিলেন। তাঁর প্রিয়তম শ্রীরামচন্দ্রকে দর্শন করে সীতাদেবীর বদনকমল তখন আনন্দে বিকশিত হয়েছিল। বিভীষণকে কল্পান্তে পর্যন্ত লঙ্কার রাক্ষসদের উপর আধিপত্য প্রদান করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সীতাদেবীকে পুষ্পক রথে স্থাপনপূর্বক স্বয়ং সেই বিমানে আরোহণ করে বনবাস সমাপনান্তে হনুমান, সুগ্রীব ও ভ্রাতা লক্ষ্মণসহ অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।”
“শ্রীরামচন্দ্র যখন তাঁর রাজধানী অযোধ্যায় ফিরে এলেন, তখন পথে লোকপালগণ তাঁর উপর সুগন্ধি পুষ্প বর্ষণ করে তাঁকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন এবং ব্রহ্মা আদি দেবতারা তখন মহা আনন্দে তাঁর চরিত্র কীর্তন করেছিলেন। অযোধ্যায় পৌছে রামচন্দ্র শুনেছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর ভ্রাতা ভরত কেবল গোমূত্রে সিদ্ধ যব আহার করেছিলেন এবং বল্কলের দ্বারা তাঁর দেহ আচ্ছাদন করে, জটাধারী হয়ে কুশাসনে শয়নপূর্বক দিনাতিপাত করছিলেন। সেই কথা শুনে পরম করুণাময় ভগবান অত্যন্ত অনুতাপ করেছিলেন। ভরত যখন জানতে পেরেছিলেন যে, ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর রাজধানী অযোধ্যায় ফিরে আসছেন, তখন তিনি শ্রীরামচন্দ্রের পাদুকা মস্তকে ধারণ করে নন্দিগ্রামে তাঁর শিবির থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ভরতের সঙ্গে তখন তাঁর মন্ত্রীরা, পুরোহিতেরা এবং সম্ভ্রান্ত নাগরিকেরা শ্রীরামচন্দ্রকে সম্বর্ধনা জানাতে গিয়েছিলেন। বন্দীরা তখন মধুর সংগীত সহকারে ভগবানের মহিমা কীর্তন করছিলেন এবং ব্রাহ্মণেরা উচ্চস্বরে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন সুন্দর অশ্ব এবং সুবর্ণ রশ্মি সমন্বিত বহু রথ সেই শোভাযাত্রাকে অনুসরণ করছিল। সেই সমস্ত রথ স্বর্ণপ্রাপ্ত সমন্বিত পতাকা এবং বিভিন্ন প্রকার ধ্বজায় শোভিত ছিল। স্বর্ণকবচধারী সৈন্য, তাম্বুলিক এবং বহু সুন্দরী বারাঙ্গনা সেই শোভাযাত্রার সঙ্গে চলেছিলেন। বহু পদচারী ভৃত্য ছত্র, চামর, নানা প্রকার মূল্যবান মণিরত্ন এবং শোভাযাত্রার উপযুক্ত অন্যান্য সামগ্রী বহন করছিল। এইভাবে ভরত তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীরামচন্দ্রের পদতলে নিপতিত হয়েছিলেন। তাঁর হৃদয় তখন দ্রবীভূত হয়েছিল এবং আনন্দে তাঁর নয়ন অশ্রুপূর্ণ হয়েছিল। ভরত শ্রীরামচন্দ্রের অগ্রে তাঁর পাদুকা দুটি সমর্পণ করে অশ্রুপূর্ণ নয়নে কৃতাঞ্জলি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন শ্রীরামচন্দ্র তাঁর অশ্রুজলে ভরতকে স্নান করিয়ে বহুক্ষণ ধরে আলিঙ্গন করেছিলেন। সীতাদেবী এবং লক্ষ্মণ সহ শ্রীরামচন্দ্র বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ও পূজনীয় কুলবৃদ্ধদের প্রণতি নিবেদন করেনছিলেন এবং অযোধ্যার প্রজাবৃন্দ তখন ভগবানকে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। অযোধ্যার নাগরিকেরা দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর তাঁদের রাজাকে প্রত্যাবর্তন করতে দেখে তাঁকে মাল্য প্রদান করেছিলেন এবং তাঁদের উত্তরীয় বসন আন্দোলন করে আনন্দে নৃত্য করেছিলেন।”
“হে রাজন্! ভরত শ্রীরামচন্দ্রের পাদুকাদ্বয়, সুগ্রীব এবং বিভীষণ চামর ও উৎকৃষ্ট ব্যজন, হনুমান শ্বেতছত্র, শত্রুঘ্ন ধনুক এবং দুটি তৃণ, সীতাদেবী তীর্থজলে পূর্ণ কমণ্ডলু, অঙ্গদ খড়্গ এবং ঋক্ষরাজ জাম্ববান স্বর্ণকবচ ধারণ করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! পুষ্পক রথে উপবিষ্ট ভগবানকে পুরনারীরা প্রার্থনা নিবেদন করছিলেন এবং বন্দীরা তাঁর চরিত্রগাথা কীর্তন করছিলেন। তখন তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝখানে চন্দ্রের মতো শোভা পাচ্ছিলেন। তারপর ভ্রাতা ভরত কর্তৃক অভিনন্দিত হয়ে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র উৎসব মুখরিত অযোধ্যা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন। প্রাসাদে প্রবেশকালে তিনি কৈকেয়ী প্রভৃতি মহারাজ দশরথের অন্যান্য পত্নী অর্থাৎ তাঁর বিমাতাদের এবং তাঁর নিজের মাতা কৌশল্যাকে প্রণাম করেছিলেন। তিনি বশিষ্ঠ আদি গুরুজনদেরও প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। তাঁর সমবয়স্ক বন্ধুরা এবং কনিষ্ঠরা তাঁকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং তিনিও তাঁদের প্রত্যাভিবাদন করেছিলেন। লক্ষ্মণ এবং সীতাদেবীও সেইভাবে সকলকে অভিবাদন করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা সকলে প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। মূর্ছিত দেহে চেতনার সঞ্চার হলে যেভাবে দেহ সহসা উত্থিত হয়, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের মাতৃগণ তাঁদের পুত্রদের দর্শন করে সেইভাবে সহসা উত্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের পুত্রদের কোলে নিয়ে নয়নজলে অভিষিক্ত করে দীর্ঘ বিরহজনিত শোক থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। কুলগুরু বশিষ্ঠ শ্রীরামচন্দ্রের জটামোচন করে তাঁর মস্তক মুন্ডন করিয়েছিলেন এবং তারপর কুলবৃদ্ধদের সঙ্গে মিলিত হয়ে চার সমুদ্রের জল দিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের মতো শ্রীরামচন্দ্রের অভিষেক করেছিলেন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এইভাবে মস্তক মুণ্ডণপূর্বক স্নান করে সুন্দর বসন পরিধান করেছিলেন এবং মাল্য ও অলঙ্কারে বিভূষিত হয়ে সুন্দর বসন ও অলঙ্কারে বিভূষিত ভ্রাতাগণ ও সীতাদেবী সহ শোভা পেতে লাগলেন। ভরতের প্রণতি এবং শরণাগতিতে প্রসন্ন হয়ে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তখন রাজসিংহাসন গ্রহণ করেছিলেন। পিতা যেমন সস্নেহে পুত্রকে পালন করেন, ঠিক সেইভাবে তিনি স্বধর্মনিরত বর্ণ ও আশ্রমোচিত গুণযুক্ত প্রজাদের পালন করেছিলেন এবং প্রজারাও তাঁকে ঠিক তাঁদের পিতার মতো মনে করেছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র রাজা হয়েছিলেন ক্রেতাযুগে, কিন্তু যেহেতু তাঁর শাসন-ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুন্দর, তাই তখনকার অবস্থা হয়েছিল ঠিক সত্যযুগের মতো। সেখানে সকলেই ছিলেন ধর্মপরায়ণ এবং সর্বতোভাবে সুখী।”
“হে ভরত-কুলশ্রেষ্ঠ মহারাজ পরীক্ষিৎ! ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে বন, নদী, পাহাড়-পর্বত, বর্ষ, সপ্তদ্বীপ এবং সপ্তসমুদ্র- সবই তখন প্রজাবর্গের সর্বকামদায়ক হয়েছিল। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যখন এই পৃথিবীতে রাজত্ব করছিলেন, তখন সমস্ত দৈহিক এবং মানসিক ক্লেশ, ব্যাধি, জরা, সন্তাপ, দুঃখ, শোক, ভয় ও ক্লান্তি সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিল। এমন কি ইচ্ছা না করলে মৃত্যুও কারও কাছে উপস্থিত হত না। শ্রীরামচন্দ্র কেবল একজন মাত্র পত্নী গ্রহণ করার এবং অন্য কোন রমণীর সঙ্গে কোন প্রকার সম্পর্ক না রাখার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রাজর্ষি এবং তাঁর চরিত্র ছিল রাগ, দ্বেষ আদি কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। তিনি সকলকে সদাচার শিক্ষা দিয়েছিলেন, বিশেষ করে গৃহস্থদের আচরণীয় বর্ণাশ্রম-ধর্ম। এইভাবে তিনি স্বয়ং আচরণ করে জনসাধারণকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। সীতাদেবী ছিলেন অত্যন্ত বিনম্র, শ্রদ্ধাশীলা, লজ্জাবতী এবং পতিব্রতা। তিনি সর্বদা তাঁর পতির মনোভাব বুঝতে পারতেন। এইভাবে তাঁর চরিত্র, প্রেম এবং সেবার দ্বারা তিনি ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের চিত্ত সর্বতোভাবে আকষর্ণ করেছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits