নবম অধ্যায়- অংশুমানের বংশ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজা অংশুমান তাঁর পিতামহের মতো দীর্ঘকাল তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি গঙ্গাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসতে পারেননি এবং তারপর কালক্রমে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অংশুমানের পুত্র দিলীপও তাঁর পিতার মতো গঙ্গাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসতে অসমর্থ হয়ে কালক্রমে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন। তারপর দিলীপের পুত্র ভগীরথ গঙ্গাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তারপর রাজা ভগীরথের সম্মুখে মা গঙ্গা আবির্ভূত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার তপস্যায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তাই আমি তোমাকে এখন তোমার বাসনা অনুসারে বর প্রদান করতে চাই।’ মা গঙ্গা এইভাবে বললে, রাজা ভগীরথ প্রণত হয়ে তাঁর অভিপ্রায় তাঁর কাছে ব্যক্ত করেছিলেন।”
মা গঙ্গা উত্তর দিলেন- “আমি যখন আকাশ থেকে পৃথিবীতে পতিত হব, তখন কে আমার বেগ ধারণ করবে? এইভাবে ধারণ না করলে, আমি পৃথিবী ভেদ করে পাতালে প্রবেশ করব। হে রাজন্, আমি পৃথিবীতে যেতে চাই না, কারণ সেখানে মানুষেরা আমার জলে স্নান করে তাদের পাপ প্রক্ষালণ করবে, সেই সঞ্চিত পাপ থেকে আমি কিভাবে মুক্ত হব? তার উপায় তুমি বিশেষভাবে চিন্তা কর।”
ভগীরথ বললেন- “ভগবদ্ভক্তি পরায়ণ সাধুরা যাঁরা স্বভাবতই অনাসক্ত, জড় বাসনা থেকে মুক্ত শুদ্ধ ভক্ত এবং বৈদিক বিধি অনুশীলনে দক্ষ, তাঁরা সর্বদা মহিমান্বিত ও তাঁদের আচরণ শুদ্ধ এবং তাঁরা সমস্ত অধঃপতিত জীবদের উদ্ধার করতে সমর্থ। এই প্রকার শুদ্ধ ভক্তরা যখন আপনার জলে স্নান করবেন, তখন পাপীদের সঞ্চিত পাপ দূর হয়ে যাবে, কারণ এই প্রকার ভক্তরা পাপনাশক ভগবানকে তাঁদের হৃদয়ে সর্বদা ধারণ করেন। বস্ত্রে যেমন সুতা ওতপ্রোতভাবে বর্তমান থাকে, তেমনই এই বিশ্বে ভগবানের বিভিন্ন শক্তি ওতপ্রোতভাবে অবস্থিত। শিব ভগবানের অবতার এবং তাই তিনি সমস্ত দেহধারী জীবের পরমাত্মা। তিনি আপনার প্রবাহের বেগ তাঁর মস্তকে ধারণ করতে পারবেন।”
“এই কথা বলে ভগীরথ তপস্যার দ্বারা মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মহাদেবও ভগীরথের প্রতি অতি শ্রীঘ্রই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। মহারাজ ভগীরথ যখন মহাদেবের কাছে গঙ্গার বেগ ধারণ করার জন্য প্রার্থনা করেছিলেণ, তখন মহাদেব ‘তথাস্তু’ বলে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। তারপর তিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের স্পর্শে পবিত্র গঙ্গার জল একাগ্রচিত্তে তাঁর মস্তকে ধারণ করেছিলেন।’ রাজর্ষি ভগীরথ পতিতপাবনী গঙ্গাকে যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের দেহ ভস্মীভূত হয়ে পড়েছিল, সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভগীরথ অত্যন্ত দ্রুতগামী রথে আরোহণ করে মা গঙ্গার অগ্রে গমন করতে লাগলেন এবং গঙ্গাদেবী তাঁর পিছনে ধাবিত হয়ে বহু দেশ পবিত্র করতে করতে ভগীরথের পূর্বপুরুষ সগরপুত্রদের ভস্ম অভিষিক্ত করেছিলেন। মহারাজ সগরের পুত্রেরা একজন মহাপুরুষের চরণে অপরাধ করেছিলেন বলে, তাঁদের দেহের তাপ বর্ধিত হয়েছিল এবং সেই আগুনে তাঁরা ভস্মীভূত হয়েছিলেন। কিন্তু গঙ্গার জলের স্পর্শে তাঁরা স্বর্গলোকে গমন করেছিলেন। তা হলে যাঁরা শ্রদ্ধা সহ মা গঙ্গাকে পূজা করেন, তাঁদের সম্বন্ধে কি আর বলার আছে? কেবলমাত্র গঙ্গার জলস্পর্শে ভস্মীভূত সগরপুত্রেরা স্বর্গলোকে উন্নীত হয়েছিলেন। অতএব, যে ভক্ত ব্রত ধারণ করে শ্রদ্ধা সহকারে মা গঙ্গার পূজা করেন তাঁর কথা কি আর বলার আছে? সেই ভক্তের যে মহান লাভ হয়, তা কেবল কল্পনাই করা যায়। মা গঙ্গা ভগবান অনন্তদেবের পাদপদ্ম থেকে নির্গত হয়েছেন বলে, তিনি জীবদের সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারেন। অতএব এখানে তাঁর সম্বন্ধে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। মহর্ষিগণ ভোগবাসনা পরিত্যাগ করে তাঁদের চিত্ত সর্বতোভাবে ভগবানের সেবায় সন্নিবিষ্ট করেন। এই প্রকার ব্যক্তিরা অনায়াসে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের চিন্ময় গুণাবলী লাভ করে চিন্ময় স্তরে অবস্থিত হন। এটিই ভগবানের মহিমা।”
“ভগীরথের সুত নামক এক পুত্র ছিল, যাঁর পুত্র ছিলেন নাভ। এই নাভ পূর্ববর্ণিত নাভ থেকে ভিন্ন। নাভের সিন্ধুদ্বীপ নামক একটি পুত্র ছিল এবং সিন্ধুদ্বীপ থেকে অযুতায়ুর জন্ম হয়। অযুতায়ুর পুত্র ঋতুপর্ণ, যিনি নল রাজার বন্ধু হয়েছিলেন। ঋতুপর্ণ নলরাজকে দ্যূতবিদ্যার রহস্য শিক্ষা দেন এবং নলরাজ ঋতুপর্ণকে অশ্ব পরিচালনার বিদ্যা প্রদান করেন। ঋতুপর্ণের পুত্র সর্বকাম। সর্বকামের পুত্র সুদাস এবং সুদাসের পুত্র সৌদাস ছিলেন দময়ন্তীর পতি। সৌদাস মিত্রসহ অথবা কল্মাষপাদ নামেও পরিচিত। মিত্রসহ তাঁর কর্মদোষে অপুত্রক ছিলেন এবং বশিষ্ঠের শাপে রাক্ষস হয়েছিলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে শুকদেব গোস্বামী! মহাত্মা সৌদাসের গুরুদেব বশিষ্ঠ মুনি কেন তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন? আমি তা জানতে ইচ্ছা করি। যদি গোপনীয় না হয়, তা হলে দয়া করে তা বর্ণনা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “একসময় সৌদাস মৃগয়া করতে বনে গিয়ে এক রাক্ষসকে বধ করেন, কিন্তু সেই রাক্ষসের ভ্রাতাকে ক্ষমা করে ছেড়ে দেন। সেই রাক্ষসের ভ্রাতা প্রতিশোধ নেওয়ার বাসনায়, রাজার অনিষ্টসাধন করার চিন্তা করে, রাজার গৃহে পাচকরূপে বাস করতে থাকে। একদিন রাজার গুরু বশিষ্ঠ মুনি যখন রাজগৃহে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তখন সেই রাক্ষস পাচকটি তাঁকে নরমাংস রন্ধন করে প্রদান করেছিল। তাঁকে যে খাদ্য দেওয়া হয়েছিল তা পরীক্ষা করার সময় বশিষ্ঠ মুনি যোগবলে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁকে অভক্ষ্য নরমাংস পরিবেশন করা হয়েছে। তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে সৌদাসকে রাক্ষস হওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন।”
“বশিষ্ঠ যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেই নরমাংস রাজা তাঁকে দেননি, দিয়েছিল সেই রাক্ষস, তখন তিনি নিরপরাধ রাজাকে অভিশাপ দেওয়ার দোষ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দ্বাদশ বর্ষব্যাপী ব্রত করেছিলেন। ইতিমধ্যে রাজা সৌদাস অঞ্জলিপূর্ণ জল গ্রহণ করে বশিষ্ঠকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর পত্নী মদয়ন্তী তাঁকে নিবারণ করেন। তখন দশদিক, আকাশ এবং পৃথিবী সর্বত্রই জীবময় দর্শন করে সেই জল তার নিজের পায়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। এইভাবে সৌদাস রাক্ষস-ভাবাপন্ন হয়েছিলেন এবং তাঁর পায়ে কৃষ্ণবর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম হয়েছিল কল্মাষপাদ। একসময় এই কল্মাষপাদ বনে রতিক্রীড়ারত এক ব্রাহ্মণ দম্পতিকে দেখতে পেয়েছিলেন। তখন রাক্ষস-ভাবাপন্ন সৌদাস ক্ষুধার্ত হয়ে সেই ব্রাহ্মণকে গ্রহণ করেছিলেন। তখন ব্রাহ্মণের পত্নী অত্যন্ত দীনভাবে রাজাকে বলেছিলেন- হে বীর, আপনি প্রকৃতপক্ষে রাক্ষস নন; আপনি মহারাজ ইক্ষ্বাকুর বংশধর। আপনি এক মহাবীর এবং মদয়ন্তীর পতি। আপনার পক্ষে এই প্রকার অধর্ম আচরণ করা উচিত নয়। আমি সন্তান লাভের অভিলাষী। দয়া করে আমার পতিকে ফিরিয়ে দিন, তাঁর রতিক্রীড়া এখনও সমাপ্ত হয়নি। হে রাজন্, হে বীর, এই মনুষ্যদেহ জীবের সর্ব-পুরুষার্থপ্রদ। আপনি যদি এই দেহ অকালে বধ করেন, তা হলে আপনি সর্বপুরুষার্থ বিনষ্ট করবেন। এই ব্রাহ্মণ বিদ্বান, অত্যন্ত গুণবান, তপস্যা-পরায়ণ এবং সমস্ত জীবের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করার অভিলাষী। হে প্রভো! আপনি ধর্মতত্ত্ববেত্তা। পুত্র যেমন কখনও পিতার বধার্হ হতে পারে না, তেমনই এই ব্রাহ্মণও আপনার পাল্য। ইনি কিভাবে আপনার মতো একজন রাজর্ষির বধযোগ্য হতে পারে? আপনি সাধুদেরও পূজিত। তাই এই সাধু, নিষ্পাপ, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে আপনি কেন হত্যা করতে উদ্যত হয়েছেন? তাঁকে হত্যা করা ভ্রূণহত্যা অথবা গোহত্যারই মতো পাপ হবে। আমার পতি ব্যতীত আমি ক্ষণকালের জন্যও জীবন ধারণ করতে পারব না। আপনি যদি আমার পতিকে ভক্ষণ করতে চান, তা হলে প্রথমে আমাকে ভক্ষণ করুন, কারণ আমার পতির বিরহে আমি মৃততুল্যা।”
“ব্রাহ্মণের পত্নী যদিও করুণভাবে অনাথিনীর মতো বিলাপ করছিলেন, তবুও তাঁর সেই কাতর বাক্যে বিচলিত না হয়ে, বশিষ্ঠের শাপে মোহিত রাজা সৌদাস বাঘ যেভাবে পশু ভক্ষণ করে, ঠিক সেইভাবে সেই ব্রাহ্মণকে ভক্ষণ করেছিল। সতী ব্রাহ্মণী যখন দেখলেন যে, গর্ভাদানে উদ্যত তাঁর পতিকে সেই রাক্ষস ভক্ষণ করছে, তখন তিনি শোকে অভিভূতা হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি তখন সেই রাজাকে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন। হে মূর্খ! হে পাপিষ্ঠ! আমি যখন কামপীড়িতা হয়ে আমার পতির বীর্য ধারণ করতে উদ্যত হয়েছিলাম, তখন যেহেতু তুমি আমার পতিকে ভক্ষণ করেছ, তাই আমি তোমাকে অভিশাপ দিলাম, তুমি যখন তোমার পত্নীর গর্ভে বীর্যাধান করবে, তখন তোমার মৃত্যু হবে। অর্থাৎ, যখনই তুমি মৈথুনরত হবে, তখনই তোমার মৃত্যু হবে। সেই ব্রাহ্মণ-পত্নী মিত্রসহ নামক রাজা সৌদাসকে এইভাবে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তারপর, পতির সহগামিনী হওয়ার বাসনায় তিনি তাঁর পতির অস্থি প্রজ্বলিত অগ্নিতে স্থাপনপূর্বক সেই আগুনে স্বয়ং প্রবেশ করে তাঁর পতির গতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
“বারো বছর পর রাজা সৌদাস বশিষ্ঠের শাপ থেকে মুক্ত হয়ে যখন তাঁর পত্নীর সঙ্গে মৈথুনে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন তাঁর পত্নী তাঁকে ব্রাহ্মণীর অভিশাপ মনে করিয়ে দিয়ে রতিক্রীড়া থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন। এইভাবে উপদিষ্ট হয়ে রাজা স্ত্রীসঙ্গসুখ পরিত্যাগ করেছিলেন এবং কর্মফলবশত নিঃসন্তান হয়েছিলেন। পরে রাজার অনুমতিক্রমে, মহর্ষি বশিষ্ঠ মদয়ন্তীর গর্ভে একটি সন্তান উৎপাদন করেন। মদয়ন্তী সাত বছর যাবৎ গর্ভ ধারণ করেছিলেন এবং তা সত্ত্বেও পুত্র প্রসূত হয়নি। তাই বশিষ্ঠ তাঁর উদরে একটি প্রস্তরের দ্বারা আঘাত করেছিলেন এবং তখন পুত্রের জন্ম হয়। সেই জন্য এই পুত্র অশ্মক (‘অশ্ম বা পাথরের আঘাতে উৎপন্ন’) নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। অশ্মক থেকে বালিকের জন্ম হয়। বালিক স্ত্রীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পরশুরামের ক্রোধ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন বলে তাঁর নাম হয় নারীকবচ (‘যিনি নারীদের দ্বারা রক্ষিত হয়েছিলেন’)। পরশুরাম যখন পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন, তখন বালিক ক্ষত্রিয় বংশের মূল হয়েছিলেন। তাই তাঁর নাম হয় মূলক। বালিক থেকে দশরথ নামক পুত্রের জন্ম হয়, দশরথ থেকে ঐড়বিড়ি নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং ঐড়বিড়ি থেকে রাজা বিশ্বসহের জন্ম হয়। রাজা বিশ্বসহের পুত্র ছিলেন বিখ্যাত মহারাজ খট্বাঙ্গ।”
“রাজা খট্বাঙ্গ যুদ্ধে অজেয় ছিলেন। অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেবতাদের দ্বারা প্রার্থিত হয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন এবং দেবতারা তখন অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বরদান করতে চেয়েছিলেন। রাজা তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন তাঁর আর কতকাল আয়ু বাকি রয়েছে এবং দেবতারা তাঁকে তখন জানান যে, তাঁর আয়ু আর এক মুহূর্ত মাত্র বাকি রয়েছে। তখন তিনি তাঁর রাজধানীতে ফিরে এসে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর মনকে সম্পূর্ণরূপে নিবিষ্ট করেন। মহারাজ খট্বাঙ্গ স্থির করেছিলেন- আমার কুলের দ্বারা পূজিত ব্রাহ্মণগণ এবং ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতি আমার প্রাণ থেকে অধিক প্রিয়। অতএব আমার রাজ্য, পৃথিবী পত্নী, সন্তান এবং ঐশ্বর্যের কথা কি আর বলার আছে? কোন কিছুই আমার কাছে ব্রাহ্মণদের থেকে অধিক প্রিয় নয়। আমি আমার শৈশবেও কোনও তুচ্ছ বস্তু অথবা অধর্মে আসক্তি হইনি। আমি অন্য কোন বস্তুকে উত্তমশ্লোক ভগবান থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করিনি। ত্রিভুবনের অধিপতি দেবতারা আমাকে বাসনা অনুরূপ বর প্রদান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি সেই বর গ্রহণ করতে চাইনি, কারণ এই জড় জগতে সব কিছুর যিনি স্রষ্টা, আমি কেবল সেই ভগবানের প্রতি আসক্ত। আমি এই জড় জগতের সমস্ত বরের থেকে ভগবানের প্রতি অধিক আসক্ত। দেবতারা যদিও অত্যন্ত উন্নত চেতনাসম্পন্ন এবং উচ্চতর লোকে অবস্থিত, তবুও তাঁদের মন, ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধি জড়-জাগতিক প্রভাবে বিক্ষিপ্ত। তাই তাঁরা অন্তর্যামীরূপে তাঁদের হৃদয়ে বিরাজমান ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারেন না। অতএব সাধারণ মানুষদের আর কি কথা? তাই আমি এখন ভগবানের মায়া রচিত সমস্ত বস্তুর প্রতি আসক্তি ত্যাগ করব। আমি ভগবানের চিন্তায় মগ্ন হয়ে তাঁর শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হব। ভগবানের মায়া বিরচিত এই জড় সৃষ্টি গন্ধর্বপুরের মতো অলীক। প্রতিটি বদ্ধ জীবের জড় বিষয়ের প্রতি স্বাভাবিক আসক্তি রয়েছে, কিন্তু সেই আসক্তি ত্যাগ করে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে শরণাগত হওয়া অবশ্য কর্তব্য। মহারাজ খট্বাঙ্গ তাঁর ভক্তিপরায়ণ বুদ্ধির দ্বারা এই প্রকার স্থির করে দেহাত্মবুদ্ধিরূপ অজ্ঞান পরিত্যাগ করেছিলেন এবং ভগবানের নিত্য দাসরূপে তাঁর স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়েছিলেন। ভগবান বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে যে সমস্ত বুদ্ধিহীন মানুষেরা নিরাকার অথবা শূণ্য বলে মনে করে, তাদের পক্ষে তাঁকে জানা অসম্ভব, কারণ তিনি তা নন। তাই ভগবানের মহিমা কীর্তনকারী শুদ্ধ ভক্তরাই কেবল তাঁকে জানতে পারেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,943 hits