অষ্টম অধ্যায়- ভগবান কপিলদেবের সঙ্গে সগর-সন্তানদের সাক্ষাৎ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রোহিতের পুত্র হরিত এবং হরিতের পুত্র চম্প, যিনি চম্পাপুরী নামক নগরী নির্মাণ করেছিলেন। চম্পের পুত্র সুদেব এবং তাঁর পুত্র বিজয়। বিজয়ের পুত্র ভরুক, ভরুকের পুত্র বৃক এবং বৃকের পুত্র বাহুক। রাজা বাহুকের শত্রুরা তাঁর রাজ্য অপহরণ করে নেয় এবং তাই রাজা বানপ্রস্থ অবলম্বন করে তাঁর পত্নীসহ বনে গমন করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে বাহুকের মৃত্যু হয় এবং তাঁর এক পত্নী যখন সতীপ্রথা অনুসরণ করে সহমৃতা হতে চেয়েছিলেন, তখন ঔর্ব মুনি তাঁকে গর্ভাবতী জেনে সহমৃতা হতে নিষেধ করেছিলেন। বাহুক-পত্নীর সপত্নীরা তাঁকে গর্ভবতী জেনে তাঁর অন্নের সঙ্গে বিষ প্রদান করেছিল, কিন্তু সেই বিষ কার্যকরী হয়নি। পক্ষান্তরে, সেই বিষসহ তাঁর পুত্রের জন্ম হয়েছিল। তাই তিনি সগর নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন (‘গর বা বিষসহ যাঁর জন্ম হয়েছে’)। সগর পরবর্তীকালে সম্রাট হয়েছিলেন। গঙ্গাসাগর নামক স্থান তাঁর পুত্রদের দ্বারা রচিত হয়েছিল। মহারাজ সগর তাঁর গুরুদেব ঔর্বের নির্দেশ অনুসারে তালজঙ্ঘ, যবন, শক, হৈহয়, বর্বর আদি অসভ্য জাতিদের বধ করেননি। পক্ষান্তরে, তিনি তাদের বিকৃত বেশধারী করেছিলেন। তাদের মধ্যে কোন জাতিকে মুণ্ডিতমস্তক কিন্তু শ্মশ্রুধারী, কোন জাতিকে মুক্তকেশ, কোন জাতিকে অর্ধমুণ্ডিত, কোন জাতিকে অন্তর্বাসবিহীন এবং কোন জাতিকে বহির্বাসবিহীন করেছিলেন। এইভাবে মহারাজ সগর তাদের বধ না করে, ভিন্ন ভিন্ন জাতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন বেশ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। মহর্ষি ঔর্বের উপদেশ অনুসারে মহারাজ সগর অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারা পরমেশ্বর, তত্ত্বজ্ঞদের পরমাত্মা এবং বেদবেত্তা ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছিলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র যজ্ঞে উৎসর্গ করার অশ্ব অপহরণ করেছিলেন। (রাজা সগরের সুমতি এবং কেশিনী নাম্নী দুই পত্নী ছিলেন।) বল এবং ঐশ্বর্যের গর্বে গর্বিত সুমতির পুত্ররা তাঁদের পিতার আদেশ অনুসারে অপহৃত অশ্বের অন্বেষণ করতে করতে সারা পৃথিবী খনন করেছিলেন। তারপর, উত্তর-পূর্বদিকে কপিল মুনির আশ্রমের সন্নিকটে তাঁরা অশ্বটিকে দেখতে পেয়েছিলেন। তখন তাঁরা বলেছিলেন, ‘এই ব্যক্তিটিই অশ্ব অপহরণকারী চোর। সে চক্ষু মুদ্রিত করে রয়েছে। এই মহাপাপীকে হত্যা কর! হত্যা কর!’ এইভাবে চিৎকার করতে করতে সগরের ষাট হাজার পুত্র তাঁদের অস্ত্র উদ্যত করে কপিল মুনির অভিমুখে ধাবিত হয়েছিলেন। মুনি তখন তাঁর চক্ষু উন্মীলন করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের প্রভাবে সগর পুত্রদের বুদ্ধি বিনষ্ট হয়েছিল এবং তাই তাঁরা একজন মহাপুরুষকে অশ্রদ্ধা করেছিলেন। তার ফলে তাঁদের নিজেদের শরীরের অগ্নির দ্বারা তাঁরা তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন, মহারাজ সগরের পুত্রেরা কপিল মুনির চোখ থেকে নির্গত ক্রোধাগ্নির দ্বারা দগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু মহাজ্ঞানী তত্ত্ববেত্তা পুরুষেরা সেই কথা অনুমোদন করেন না, কারণ কপিল মুনির দেহ শুদ্ধসত্ত্বময়। অতএব সেই দেহে তমোগণ-জনিত ক্রোধের প্রকাশ হতে পারে না। ঠিক যেমন নির্মল আকাশ কখনও পৃথিবীর ধুলির দ্বারা কলুষিত হতে পারে না।”
“কপিল মুনি এই জড় জগতে সাংখ্য-দর্শন প্রবর্তন করেছেন, যা ভবসমুদ্র পার হওয়ার এক সুদৃঢ় নৌকা সদৃশ। বস্তুতপক্ষে, যে ব্যক্তি এই ভবসমুদ্র উত্তীর্ণ হতে আগ্রহী, তিনি এই দর্শনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। অতএব, চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত এই প্রকার একজন তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষের পক্ষে শত্রু-মিত্রের ভেদদৃষ্টি কিভাবে সম্ভব? সগর মহারাজের অসমঞ্জস নামক এক পুত্র ছিল, যার জন্ম হয়েছিল রাজার দ্বিতীয় পত্নী কেশিনীর গর্ভে। অসমঞ্জসের পুত্র অংশুমান এবং তিনি সর্বদা তাঁর পিতামহ সগর মহারাজের মঙ্গল অনুষ্ঠানে রত থাকতেন। অসমঞ্জস তাঁর পূর্বজন্মে এক মহান যোগী ছিলেন, কিন্তু অসৎ সঙ্গের প্রভাবে তিনি যোগভ্রষ্ট হয়ে অধঃপতিত হন। এই জন্মে তিনি জাতিস্মর হয়ে রাজকুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজেকে দুরাত্মা বলে প্রতিপন্ন করার জন্য এমনভাবে আচরণ করতেন যে, জনসাধারণ এবং আত্মীয়-স্বজনের চক্ষে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ছিল। তিনি ক্রীড়ারত বালকদের উদ্বেগ সৃষ্টি করে সরযূ নদীর জলে নিক্ষেপ করতেন। অসমঞ্জস এই প্রকার দুরাচারে রত হওয়ায় তার পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ও পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। অসমঞ্জস যোগবিভূতি বলে সরযূ নদীতে নিক্ষিপ্ত মৃত বালকদের পুনরুজ্জীবিত করে, রাজাকে ও সেই বালকদের পিতৃবর্গকে তাদের প্রদর্শন করিয়ে অযোধ্যা ত্যাগ করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! অযোধ্যাবাসীরা যখন দেখলেন যে, তাঁদের পুত্ররা পুনর্জীবিত হয়েছে, তখন তাঁরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিলেন। মহারাজ সগরও তাঁর পুত্রের জন্য গভীরভাবে শোক করেছিলেন। তারপর, মহারাজ সগরের পৌত্র অংশুমান রাজার আদেশে অশ্বটি খুঁজতে গিয়েছিলেন। তাঁর পিতৃব্যরা যে পথে গমন করেছিলেন, অংশুমান সেই পথে অনুগমন করে ভস্মস্তূপের নিকটে অশ্বটি দেখতে পেয়েছিলেন। মহাত্মা অংশুমান অশ্বের নিকটে উপবিষ্ট বিষ্ণুর অবতার কপিল নামক মুনিকে দর্শন করেছিলেন। অংশুমান তখন প্রণতি নিবেদন করে কৃতাঞ্জলিপুটে স্থির চিত্তে মুনির স্তব করেছিলেন।”
অংশুমান বললেন- “হে ভগবান! ব্রহ্মাও আজ পর্যন্ত সমাধির দ্বারা অথবা মুক্তির দ্বরা আপনাকে বুঝতে সমর্থন হননি। অতএব দেবতা, পশু, মানুষ, পক্ষী এবং জন্তু আদি রূপে ব্রহ্মার সৃষ্ট আমাদের আর কি কথা? আমরা সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। তাই, কিভাবে চিন্ময় আপনাকে আমরা জানতে পারব?”
“হে ভগবান! আপনি সম্যক্‌রূপে সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন, কিন্তু জড় দেহের আবরণে আচ্ছাদিত হওয়ার ফলে জীব আপনাকে দর্শন করতে পারে না। কারণ তারা জড়া প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রভাবিত। তাদের বুদ্ধি সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণের দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার ফলে, তারা কেবল প্রকৃতির গুণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই দর্শন করতে পারে। তমোগুণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে, জীব জাগ্রতই থাকুক অথবা নিদ্রিতই থাকুক, কেবল জড়া প্রকৃতির ক্রিয়াই দর্শন করতে পারে। তারা কখনই আপনাকে দর্শন করতে পারে না। হে ভগবান! জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত চতুঃসনদের মতো (সনক, সনাতন, সনন্দন এবং সনৎকুমার) মহর্ষিরা আপনার শুদ্ধ জ্ঞানময় মূর্তি চিন্তা করতে পারেন, কিন্তু আমার মতো অজ্ঞ ব্যক্তি কিভাবে আপনাকে চিন্তা করবে? হে প্রশান্ত! যদিও জড়া প্রকৃতি, কর্ম এবং জড় নাম ও রূপ সমস্ত আপনারই সৃষ্টি, তবুও আপনি সেগুলির দ্বারা প্রভাবিত হন না। তাই আপনার দিব্য নাম জড় নাম থেকে ভিন্ন এবং আপনার রূপ জড় রূপ থেকে ভিন্ন। ভগবদ্‌গীতার মতো দিব্যজ্ঞান উপদেশ দেওয়ার জন্য আপনি জড় দেহের মতো রূপ ধারণ করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনি পুরাণ পুরুষ। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! যাদের হৃদয় কাম, লোভ, ঈর্ষা এবং মোহের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে, তারা কেবল আপনার মায়া রচিত গৃহের প্রতি আসক্ত। গৃহ, স্ত্রী, পুত্রের প্রতি আসক্ত হয়ে তারা নিরন্তর এই জড় জগতে ভ্রমণ করে। হে সর্বান্তর্যামী! হে ভগবান, কেবল আপনার দর্শনের ফলে আমি দুস্ত্যাজ্য মায়া এবং ভব-বন্ধনের মূলস্বরূপ কামবাসনা থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত হয়েছি।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! অংশুমান যখন এইভাবে ভগবানের মাহাত্ম্য কীর্তন করেছিলেন, তখন শ্রীবিষ্ণুর শক্তিশালী অবতার মহর্ষি কপিল তাঁর প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরায়ণ হয়ে তাঁকে জ্ঞানের পন্থা উপদেশ দিয়েছিলেন।”
ভগবান বললেন- “হে অংশুমান, তোমার পিতামহের যজ্ঞের পশু এই অশ্বটিকে গ্রহণ কর। তোমার ভস্মীভূত পিতৃব্যরা কেবল গঙ্গার জলের দ্বারাই উদ্ধার লাভ করতে পারে, অন্য কোনও উপায়ে নয়। তারপর, অংশুমান কপিলদেবকে প্রদক্ষিণ করে নতমস্তকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। এইভাবে তাঁর প্রসন্নতা বিধান করে অংশুমান যজ্ঞের অশ্ব ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন এবং সেই অশ্বের দ্বারা মহারাজ সগর অবশিষ্ট যজ্ঞকর্ম সমাপ্ত করেছিলেন। তারপর অংশুমানকে রাজ্য সমর্পণপূর্বক মহারাজ সগর বিষয়-বাসনা ও মোহের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে, মহর্ষি ঔর্বের উপদিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে পরম গতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits