সপ্তম অধ্যায়- মান্ধাতার বংশধরগণ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “যিনি অম্বরীষ নামে বিখ্যাত, তিনি মান্ধাতার পুত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই অম্বরীষ পিতামহ যুবনাশ্ব কর্তৃক পুত্ররূপে পরিগৃহীত হয়েছিলেন। অম্বরীষের পুত্র যৌবনাশ্ব এবং যৌবনাশ্বের পুত্র হারীত। মান্ধাতার বংশে অম্বরীষ, হারীত এবং যৌবনাশ্ব শ্রেষ্ঠ। নর্মদার ভ্রাতা সর্পগণ নর্মদাকে পুরুকুৎসের হস্তে সম্প্রদান করেন। বাসুকি কর্তৃক প্রেরিতা হয়ে নর্মদা পুরুকুৎসকে পাতালে নিয়ে যান। রসাতলে পুরুকুৎস ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শক্তির দ্বারা আবিষ্ট হয়ে বধার্হ গন্ধর্বদের সংহার করেছিলেন। পুরুকুৎস সর্পদের কাছ থেকে এই বর লাভ করেছিলেন যে, এই ইতিবৃত্ত স্মরণকারীদের সর্পভয় থাকবে না। পুরুকুৎসের পুত্র ত্রসদ্দস্যু, যিনি ছিলেন অনরণ্যের পিতা, অনরণ্যের পুত্র হর্যশ্ব প্রারুণের পিতা। প্রারুণ ছিলেন ত্রিবন্ধনের পিতা। ত্রিবন্ধনের পুত্র সত্যব্রত, যিনি ত্রিশঙ্কু নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। এক ব্রাহ্মণের কন্যার বিবাহের সময় তাঁকে ত্রিশঙ্কু হরণ করেছিলেন বলে, তাঁর পিতা তাঁকে চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হওয়ার অভিশাপ দেন। পরে, বিশ্বামিত্রের প্রভাবে তিনি সশরীরে স্বর্গে গমন করে দেবতাদের প্রভাবে তিনি অধঃপতিত হচ্ছিলেন, কিন্তু বিশ্বামিত্রের তপোবলের প্রভাবে তিনি অধঃপতিত হননি; আজও তাঁকে নতশিরে আকাশে ঝুলতে দেখা যায়।”
“ত্রিশঙ্কুর পুত্র হরিশ্চন্দ্র। এই হরিশ্চন্দ্রের নিমিত্ত বিশ্বামিত্র এবং বশিষ্ঠের মধ্যে বহু বর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ হয়। তাঁরা পক্ষীতে রূপান্তরিত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। হরিশ্চন্দ্র নিঃসন্তান ছিলেন বলে সর্বদা অত্যন্ত বিষণ্ন থাকতেন। তাই একদিন নারদের উপদেশে তিনি বরুণের শরণাগত হয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘হে প্রভু! আমার কোন পুত্র নেই। আপনি কি দয়া করে আমাকে একটি পুত্র দান করবেন?’
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! হরিশ্চন্দ্র বরুণের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে প্রভু! আমার যদি একটি পুত্র হয়, তা হলে সেই পুত্রের দ্বারা আপনার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আমি একটি যজ্ঞ করব।’ হরিশ্চন্দ্র সেই কথা বললে বরুণ উত্তর দিয়েছিলেন, “তাই হোক।’ বরুণের বরে হরিশ্চন্দ্রের রোহিত নামক একটি পুত্রের জন্ম হয়েছিল। তারপর, পুত্রের জন্ম হলে, বরুণ হরিশ্চন্দ্রের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘এখন তোমার পুত্র হয়েছে। এই পুত্রের দ্বারা তুমি আমার যজ্ঞ করবে বলেছিলে, অতএব এই পুত্রের দ্বারা তুমি আমার যজ্ঞ কর।’ তার উত্তরে হরিশ্চন্দ্র বলেছিলেন, ‘পশু জন্মের পর দশদিন গত হলে পশু যজ্ঞের উপযুক্ত হয়।’ দশদিন পর বরুণ আবার হরিশ্চন্দ্রের কাছে এসে বললেন, ‘এখন তুমি যজ্ঞ কর।’ হরিশ্চন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন, ‘পশুর যখন দন্তোদ্গম হয়, তখন তা যজ্ঞের জন্য পবিত্র হয়।” দন্তোদ্‌গম হলে বরুণ এসে হরিশ্চন্দ্রকে বললেন, ‘এখন পশুর দন্তোদ্‌গম হয়েছে। অতএব এখন যজ্ঞ কর।’ হরিশ্চন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন, “যখন দন্ত সমূহ নিপতিত হবে, তখন এ যজ্ঞের উপযুক্ত হবে।’ দন্ত নিপতিত হলে বরুণ হরিশ্চন্দ্রের কাছে ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘এখন পশুর দন্ত পতিত হয়েছে, অতএব তুমি যজ্ঞ অনুষ্ঠান কর।’ কিন্তু হরিশ্চন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যখন পশুর দন্ত পুনরায় উদ্‌গত হবে, তখন তা যজ্ঞের জন্য পবিত্র হবে।’ পুনরায় দন্তের উদ্্গম হলে বরুণ এসে হরিশ্চন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘এখন তুমি যজ্ঞ করতে পার।’ কিন্তু হরিশ্চন্দ্র বলেছিলেন, ‘হে রাজন্, যজ্ঞের পশু যখন ক্ষত্রিয় হয় এবং কবচ বন্ধন করে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে সমর্থ হয়, তখনই তা পবিত্র হয়।’ হরিশ্চন্দ্র তাঁর পুত্রের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। এই স্নেহের বশে তিনি বরুণদেবকে প্রতীক্ষা করতে বলেছিলেন। বরুণদেবও সেই কালের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।”
“রোহিত বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর পিতা তাঁকে যজ্ঞে পশুর মতো নিবেদন করবেন। তাই, তিনি তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য ধনুর্বাণ ধারণ করে বনে গমন করেছিলেন। রোহিত যখন জানতে পারলেন যে, বরুণগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর পিতার উদর অত্যন্ত বর্ধিত হয়েছে, তখন তিনি রাজধানীতে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র রোহিতকে বিভিন্ন পবিত্র তীর্থে পর্যটন করার উপদেশ দিয়েছিলেন, কারণ এই প্রকার কার্যকলাপ অবশ্যই পবিত্র। সেই উপদেশ অনুসারে রোহিত এক বছর বনে বাস করেছিলেন। এইভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম বৎসর অতিবাহিত হলে, রোহিত যখন রাজধানীতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন, তখন দেবরাজ ইন্দ্র এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণরূপে, পূর্বোক্ত বাক্যের পুনরোক্তি করে তাঁকে রাজধানীতে ফিরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তারপর, ছয় বছর বনে ভ্রমণ করে রোহিত তাঁর পিতার রাজধানীতে ফিরে এসেছিলেন। তিনি অজীগর্তের কাছ থেকে তাঁর মধ্যম পুত্র শুনঃশেফকে ক্রয় করেছিলেন এবং তাকে বরুণ যজ্ঞে পশুরূপে নিবেদন করার জন্য তাঁর পিতা হরিশ্চন্দ্রকে প্রদান করে প্রণাম করেছিলেন। তারপর, ইতিহাসে মহৎ ব্যক্তিদের মধ্যে প্রসিদ্ধ রাজা হরিশ্চন্দ্র নরমেধ যজ্ঞের দ্বারা বরুণ আদি দেবতাদের প্রসন্নতা বিধান করেছিলেন। এইভাবে বরুণের অসন্তোষের ফলে তাঁর যে উদরী রোগ হয়েছিল তা থেকে তিনি মুক্ত হয়েছিলেন। সেই নরমেধ যজ্ঞে বিশ্বামিত্র হোতা, আত্মতত্ত্বজ্ঞ জমদগ্নি (যজুর্বেদের মন্ত্র উচ্চারণকারী) অধ্বর্যু, বশিষ্ঠ প্রধান ব্রাহ্মণ পুরোহিত এবং ঋষি অয়াস্য সামবেদের মন্ত্র উচ্চারণকারী উদ্্গাতা হয়েছিলেন। হরিশ্চন্দ্রের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে রাজা ইন্দ্র তাঁকে একটি স্বর্ণনির্মিত রথ উপহার দিয়েছিলেন। বিশ্বামিত্রের পুত্রদের কথা প্রসঙ্গে শুনঃশেফের মাহাত্ম বর্ণিত হবে। সস্ত্রীক রাজা হরিশ্চন্দ্রের সত্যবাদিতা, ধৈর্য এবং সারগ্রাহিতা দর্শন করে, বিশ্বামিত্র তাঁকে মনুষ্য-জীবনের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অক্ষয় জ্ঞান দান করেছিলেন। হরিশ্চন্দ্র প্রথমে জড়সুখ ভোগের বাসনায় পূর্ণ মনকে পৃথিবীসহ একীভূত করে পবিত্র করেছিলেন। তারপর পৃথিবীকে জলসহ, জলকে অগ্নিসহ, অগ্নিকে বায়ুসহ এবং বায়ুকে আকাশসহ একীভূত করেছিলেন। তারপর তিনি আকাশকে মহত্তত্ত্বে এবং মহত্তত্ত্বকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে একীভূত করেছিলেন। এই আধ্যাত্মিক জ্ঞান হচ্ছে ভগবানে অংশরূপে স্বরূপ উপলব্ধি। অনির্দেশ্য এবং অচিন্ত্য স্বস্বরূপে অবস্থিত এবং ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে হরিশ্চন্দ্র সমস্ত জড় বন্ধন থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত হয়েছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits