শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! অম্বরীষের তিন পুত্র- বিরূপ, কেতুমান ও শম্ভু। বিরূপ থেকে পৃষদশ্ব নামক পুত্রের জন্ম এবং পৃষদশ্বের পুত্র রথীতর। রথীতর নিঃসন্তান ছিলেন, তাই তিনি মহর্ষি অঙ্গিরাকে তাঁর জন্য সন্তান উৎপাদন করতে প্রার্থনা করেন। তাঁর সেই প্রার্থনায় অঙ্গিরা রথীতরের পত্নীর গর্ভে কয়েকটি পুত্র উৎপাদন করেন। সেই পুত্রেরা সকলেই ব্রহ্মতেজ সম্পন্ন ছিলেন। রথীতরের পত্নীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করার ফলে তাঁরা রথীতর গোত্র, কিন্তু যেহেতু তাঁরা অঙ্গিরার বীর্য থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন, তাই তাঁরা অঙ্গিরা গোত্রও। রথীতরের সমস্ত সন্তানদের মধ্যে এঁরাই শ্রেষ্ঠ, কারণ জন্মসূত্রে তাঁরা ছিলেন ব্রাহ্মণ।”
“মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু। মনু যখন হাঁচি (ক্ষুৎ) দিয়েছিলেন, তখন মনুর নাসারন্ধ্র থেকে ইক্ষ্বাকুর জন্ম হয়েছিল। ইক্ষ্বাকুর একশত পুত্রের মধ্যে বিকুক্ষি, নিমি এবং দণ্ডকা ছিলেন মুখ্য। তাঁর একশত পুত্রের মধ্যে পঁচিশজন হিমালয় এবং বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী আর্যাবর্তের পশ্চিম দিকের রাজা হয়েছিলেন। অন্য পঁচিশজন পুত্র আর্যাবর্তের পূর্ব দিকের রাজা হয়েছিলেন এবং তিনজন জ্যেষ্ঠ পুত্র মধ্যবর্তী স্থানের রাজা হয়েছিলেন। অন্যান্য পুত্রেরা অন্য স্থানের রাজা হয়েছিলেন। পৌষ, মাঘ এবং ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমী তিথিতে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে যে শ্রাদ্ধ নিবেদন করা হয়, তাকে বলা হয় অষ্টকা-শ্রাদ্ধ। মহারাজ ইক্ষ্বাকু যখন এই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করছিলেন, তখন তিনি তাঁর পুত্র বিকুক্ষিকে শ্রীঘ্র বনে গিয়ে পবিত্র মাংস আনয়ন করতে বলেছিলেন। তারপর ইক্ষ্বাকুর পুত্র বিকুক্ষি বনে গিয়ে শ্রাদ্ধে নিবেদন করার উপযুক্ত বহু পশু বধ করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়েছিলেন, তখন তাঁর বিবেক লুপ্ত হয়েছিল এবং তিনি একটি নিহত শশক ভক্ষণ করেছিলেন। বিকুক্ষি অবশিষ্ট মাংস রাজা ইক্ষ্বাকুকে দিয়েছিলেন এবং ইক্ষ্বাকু সেগুলি পবিত্রীকরণের জন্য বশিষ্ঠকে প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বশিষ্ঠ তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেই মাংসের এক অংশ বিকুক্ষি ইতিমধ্যে ভক্ষণ করেছেন। তাই তিনি বলেছিলেন সেই মাংস শ্রাদ্ধের উপযুক্ত নয়। রাজা ইক্ষ্বাকু যখন বশিষ্ঠের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন তাঁর পুত্র বিকুক্ষি কি করেছে, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। এইভাবে বিধি লঙ্ঘন করার ফলে তিনি তাঁর পুত্রকে দেশ থেকে নির্বাসন দিয়েছিলেন। মহারাজ ইক্ষ্বাকু মহাতত্ত্বজ্ঞানী ব্রাহ্মণ বশিষ্ঠের সঙ্গে তত্ত্ব আলোচনা করে বৈরাগ্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যোগবলে তিনি তাঁর দেহ ত্যাগ করে পরম সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তাঁর পিতার তিরোভাবের পর বিকুক্ষি রাজ্যে ফিরে এসে, রাজা হয়ে এই পৃথিবী শাসন করেছিলেন এবং বিবিধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছিলেন। বিকুক্ষি পরে শশাদ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন।”
“শশাদের পুত্র পুরঞ্জয় যিনি ইন্দ্রবাহ এবং কখনও বা ককুৎস্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি যে যে কর্মের দ্বারা এই সমস্ত নাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তা আমার কাছে শ্রবণ করুন। পূর্বে দেবতা এবং দৈত্যদের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেবতারা পুরঞ্জয়কে তাঁদের সহায়রূপে বরণ করেছিলেন। দৈত্যদের পুরী জয় করেছিলেন বলে এই বীরের নাম হয়েছিল পুরঞ্জয়। পুরঞ্জয় বলেছিলেন যে, ইন্দ্র যদি তাঁর বাহন হন, তা হলে তিনি সমস্ত দৈত্যদের বিনাশ করবেন, কিন্তু গর্ববশত ইন্দ্র এই প্রস্তাবে সম্মত হননি। তবে পরে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আদেশে ইন্দ্র রাজী হয়েছিলেন এবং মহাবৃষরূপ ধারণ করে পুরঞ্জয়ের বাহন হয়েছিলেন। বর্মাবৃত হয়ে যুদ্ধ করতে অভিলাষী পুরঞ্জয় একটি দিব্য ধনু এবং অতি তীক্ষ্ম বাণ গ্রহণ করেছিলেন এবং দেবতাদের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে তিনি বৃষের (ইন্দ্রের) পৃষ্ঠে আরোহন করে তাঁর ককুদে উপবিষ্ট হয়েছিলেন। তাই তাঁর নাম হয়েছিল ককুৎস্থ এবং ইন্দ্র তাঁর বাহন হয়েছিল বলে তিনি ইন্দ্রবাহন নামেও পরিচিত হয়েছিলেন। পরমাত্মা পরম পুরুষ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শক্তিতে আবিষ্ট ইন্দ্রবাহ দেবগণ পরিবৃত হয়ে পশ্চিম দিকে দৈত্যপুরী আক্রমণ করেছিলেন। দৈত্যদের সঙ্গে পুরঞ্জয়ের তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। লোমহর্ষণজনক সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে যে সমস্ত দৈত্য তাঁর সম্মুখীন হয়েছিল, পুরঞ্জয় তাঁর তীরের দ্বারা তাদের যমালয়ে প্রেরণ করেছিলেন। যুগান্তের প্রলয়াগ্নি সদৃশ ইন্দ্রবাহের জ্বলন্ত বাণ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য যে সমস্ত দৈত্য অবশিষ্ট ছিলেন, তারা দ্রুতবেগে তাদের নিজ নিজ আলয়ে পলায়ন করেছিল।”
“শত্রুদের জয় করে রাজর্ষি পুরঞ্জয় শত্রুদের ধনসম্পদ, স্ত্রী ইত্যাদি সব কিছু বজ্রপাণি ইন্দ্রকে দান করেছিলেন। সেই জন্য তিনি পুরঞ্জয় নামে বিখ্যাত হন। এইভাবে পুরঞ্জয় তাঁর বিভিন্ন কর্মের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছিলেন। পুরঞ্জয়ের পুত্র অনেনা, অনেনার পুত্র পৃথু এবং পৃথুর পুত্র বিশ্বগন্ধি। বিশ্বগন্ধির পুত্র চন্দ্র এবং চন্দ্রের পুত্র যুবনাশ্ব। যুবনাশ্বের পুত্র শ্রাবস্ত, যিনি শ্রাবস্তী পুরী নির্মাণ করেছিলেন। শ্রাবস্তের পুত্র বৃহদশ্ব এবং তাঁর পুত্র কুবলায়শ্ব। এইভাবে সেই বংশ বর্ধিত হয়েছিল। মহর্ষি উতঙ্কের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য, অত্যন্ত শক্তিশালী কুবলয়াশ্ব ধুন্ধু নামক অসুরকে বধ করেছিলেন। তিনি তাঁর একবিংশতি সহস্র পুত্রদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সেই কার্য সম্পাদন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! সেই কারণে কুবলয়াশ্ব ধুন্ধুমার (‘ধুন্ধুহন্তা’) নামে বিখ্যাত হন। দৃঢ়াশ্ব, কপিলাশ্ব এবং ভদ্রাশ্ব, এই তিনজন ব্যতীত তাঁর সমস্ত পুত্রই ধুন্ধুর মুখাগ্নির দ্বারা ভস্মীভূত হন। দৃঢ়াশ্বের পুত্র হর্যশ্ব, হর্যশ্বের পুত্র নিকুম্ভ নামে বিখ্যাত। নিকুম্ভের পুত্র বহুলাশ্ব, বহুলাশ্বের পুত্র কৃশাশ্ব, কৃশাশ্বের পুত্র সেনজিৎ এবং সেনজিতের পুত্র যুবনাশ্ব। যুবনাশ্ব অপুত্রক ছিলেন এবং তাই তিনি গৃহস্থ-আশ্রম থেকে অবসর গ্রহণ করে বনে গমন করেছিলেন। যুবনাশ্ব তাঁর একশত পত্নীসহ বনে গমন করলেও তাঁরা সকলেই অত্যন্ত বিষণ্ন ছিলেন। কিন্তু বনের ঋষিরা রাজার প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরায়ণ হয়ে, সমাহিত চিত্তে ইন্দ্রযজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে শুরু করেছিলেন, যাতে রাজা একটি পুত্রসন্তান লাভ করতে পারেন। একদিন রাত্রে রাজা তৃষ্ণার্ত হয়ে যজ্ঞমণ্ডপে প্রবেশ করে দেখলেন যে, ব্রাহ্মণেরা শয়ন করে রয়েছেন, তখন তিনি তাঁর পত্নীর পানের নিমিত্ত রক্ষিত মন্ত্রপূত জল নিজেই পান করে ফেললেন। ব্রাহ্মণেরা শয্যা থেকে উত্থিত হয়ে যখন দেখলেন যে, সেই জলের কলস শূণ্য, তখন তাঁরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন- পুত্রোৎপত্তির কারণস্বরূপ এই জল কে পান করেছে।’ ব্রাহ্মণেরা যখন জানতে পারলেন যে, দৈব কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে রাজা সেই জল পান করেছেন, তখন তাঁরা বলেছিলেন, “আহা! দৈব বলই প্রকৃত বল। পরমেশ্বরের শক্তি কেউ খণ্ডন করতে পারে না।’ এই বলে তাঁরা ভগবানকে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন।”
“তারপর যথাসময়ে যুবনাশ্বের দক্ষিণ কুক্ষি ভেদ করে সমস্ত রাজলক্ষণ সমন্বিত এক পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শিশুটি যখন স্তন্যদুগ্ধ পান করার জন্য ক্রন্দন করতে লাগল, তখন সমস্ত ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলেছিলেন, ‘কে এই শিশুটিকে পালন করবে?’ তখন যজ্ঞে আরাধিত ইন্দ্র সেই শিশুটিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে বৎস! ক্রন্দন করো না। তুমি আমাকে পান কর।’ এই বলে ইন্দ্র তাঁর তর্জনী শিশুটিকে প্রদান করেছিলেন। সেই শিশুর পিতা যুবনাশ্ব ব্রাহ্মণদের আশীর্বাদে মৃত্যুমুখে পতিত হননি। সেই ঘটনার পর তিনি তপস্যার প্রভাবে সেই স্থানেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা রাবণ এবং অন্যান্য দস্যু-তস্করদের ভয়ের কারণ হয়েছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! যেহেতু তারা তাঁর ভয়ে অত্যন্ত ভীত ছিল, তাই ইন্দ্র তাঁকে ত্রসদ্দস্যু নাম দিয়েছিলেন। ভগবানের কৃপায় যুবনাশ্বের পুত্র এতই শক্তিশালী হয়েছিলেন যে, তিনি সপ্তদ্বীপ সমন্বিতা পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে পৃথিবী পালন করেছিলেন। যজ্ঞীয় দ্রব্য, মন্ত্র, বিধি, যজমান, ঋত্বিক, যজ্ঞফল, যজ্ঞভূমি এবং যজ্ঞের কাল থেকে ভগবান অভিন্ন। সেই অতীন্দ্রিয়, সর্বান্তর্যামী, সর্বদেবময় যজ্ঞপুরুষ বিষ্ণুকে আত্মতত্ত্বজ্ঞ মান্ধাতা আরাধনা করেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণদের প্রচুর দক্ষিণা দানপূর্বক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে ভগবানের আরাধনা করেছিলেন। যেখান থেকে সূর্য উদিত হয়, উজ্জ্বলভাবে কিরণ বিতরণ করে এবং যেখানে অস্তমিত হয়, সেই সমস্ত স্থান যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতার স্থান বলে কথিত হত। মান্ধাতা শশবিন্দুর কন্যা বিন্দুমতীর গর্ভে পুরুকুৎস, অম্বরীষ এবং মহাযোগী মুচুকুন্দ এই তিনটি পুত্র উৎপাদন করেন। এই তিন ভ্রাতার পঞ্চাশটি ভগ্নী মহর্ষি সৌভরিকে পতিত্বে বরণ করেন। সৌভরি ঋষি যখন যমুনার জলে নিমগ্ন হয়ে কঠোর তপস্যা করছিলেন, তখন তিনি এক মৎস্য-মিথুনের মৈথুনজনিত আনন্দ দর্শন করে মৈথুনাসক্ত হন এবং রাজা মান্ধাতার কাছে গিয়ে তাঁর একটি কন্যা প্রার্থনা করেন। তাঁর এই অনুরোধ রাজা তাঁকে বলেছিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, আমার যেকোন কন্যা আপনাকে স্বয়ংবরে পতিত্বে বরণ করতে পারে।”
সৌভরি মুনি মনে মনে চিন্তা করেছিলেন- “আমি বার্ধক্যের ফলে জরাগ্রস্ত, আমার কেশ পলিত, আমার দেহের চর্ম শ্লথ হয়েছে এবং আমার মস্তক সর্বদা কম্পিত হয়, তার উপর আমি একজন যোগী। তাই আমি রমণীদের অপ্রিয়। রাজা যেহেতু আমাকে এইভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, আমি এমন রূপ ধারণ করব যে, রাজকন্যাদের কি কথা, দেবাঙ্গনারাও আমাকে কামনা করবে। তারপর সৌভরি মুনি এক অতি সুন্দর যুবকে পরিণত হয়েছিলেন। প্রাসাদের প্রতিহারী তাঁকে রাজকন্যাদের সমৃদ্ধিশারী অন্তঃপুরে নিয়ে গিয়েছিল। পঞ্চাশজন রাজকন্যাই তখন তাঁকে তাদের পতিত্বে বরণ করেছিল। তারপর রাজকন্যারা সৌভরি মুনির দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে, পরস্পরের প্রতি ভগ্নীবৎ স্নেহের সম্পর্ক ত্যাগ করে কলহ করতে শুরু করেছিল। তারা প্রত্যেকেই দাবি করেছিল, ‘এই পুরুষ আমারই উপযুক্ত, তোমার নয়।’ এইভাবে তাদের মধ্যে মহাকলহ উপস্থিত হয়েছিল। সৌভরি মুনি যেহেতু মন্ত্র উচ্চারণে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, তাই তাঁর কঠোর তপস্যার প্রভাবে তিনি অমূল্য পরিচ্ছদ, অলঙ্কার, সুন্দর বসনে সজ্জিত দাস-দাসী, নানাবিধ উপবন, নির্মল জল বিশিষ্ট সরোবর এবং উদ্যান সমন্বিত অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী গৃহ প্রকট করেছিলেন। সেই সমস্ত উদ্যান নানাবিধ ফুলের সৌরভে পূর্ণ ছিল এবং পাখিদের কূজন, ভ্রমরের গুঞ্জন এবং বন্দিদের সঙ্গীতের দ্বারা মুখরিত ছিল। সৌভরি মুনির ভবন শয্যা, আসন, অলঙ্কার, স্নানের উপকরণ, চন্দন আদি অনুলেপন, ফুলের মালা এবং সুস্বাদু ভোজ্যদ্রব্যে পূর্ণ ছিল। এইভাবে মহামূল্য দ্রব্যে সুশোভিত হয়ে সৌভরি ঋষি তাঁর পত্নীগণ সহ সংসার সুখে মগ্ন হয়েছিলেন। সপ্তদ্বীপ সমন্বিত পৃথিবীর অধিপতি রাজা মান্ধাতা সৌভরি মুনির গৃহস্থালির ঐশ্বর্য দর্শন করে আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। তার ফলে তিনি সারা পৃথিবীর সম্রাট হওয়ার গর্ব পরিত্যাগ করেছিলেন। সৌভরি মুনি এইভাবে জড় ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগ করেছিলেন, কিন্তু অবিরাম ঘৃতবিন্দুর দ্বারা যেভাবে আগুন কখনও শান্ত হয় না, সৌভরিও তেমনই সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তারপর একদিন মন্ত্রাচার্য সৌভরি মুনি যখন নির্জনে বসেছিলেন, তখন তিনি বিচার করেছিলেন যে, মৈথুনরত মৎস্যের সংসর্গের ফলে তাঁর অধঃপতন হয়েছে। হায়! সাধুজনোচিত সমস্ত বিধি-নিষেধ পালন করে গভীর জলে তপস্যা করার সময় মৈথুনরত মৎস্যের সঙ্গ প্রভাবে আমার দীর্ঘকালের তপস্যার ফল বিনষ্ট হয়েছে। সকলেরই কর্তব্য আমার এই অধঃপতন দর্শন করে শিক্ষা লাভ করা। জড়-জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে মৈথুন-পরায়ণ ব্যক্তিদের সঙ্গ বর্জন করা এবং ইন্দ্রিয়গুলিকে বাহ্য বিষয়ে (দর্শনে, শ্রবনে, বৈষয়িক বিষয়ের আলোচনায়, বিচরণে ইত্যাদিতে) নিযুক্ত না করা। নির্জন স্থানে বাস করে মনকে সম্পূর্ণরূপে অনন্ত ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে নিযুক্ত করা উচিত। আর যদি সঙ্গ করতে হয়, তা হলে সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদেরই কেবল সঙ্গ করা উচিত। প্রথমে আমি একা যৌগিক তপস্যা অনুষ্ঠান করেছিলাম, কিন্তু পরে মৈথুনরত মৎস্যের সঙ্গ প্রভাবে আমার বিবাহ করার বাসনা হয়েছিল। তারপর আমি পঞ্চাশজন পত্নীর পতি হয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেকের গর্ভে একশত পুত্র উৎপাদন করেছিলাম এবং তার ফলে আমার পাঁচ হাজার পুত্র হয়েছে। জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাবে আমি অধঃপতিত হয়েছি এবং মনে করেছি যে, এই জড় জগতে আমি সুখী হব। এইভাবে ইহলোকে এবং পরলোকে আমার জড়সুখ ভোগ বাসনার অন্ত নেই। এইভাবে তিনি গৃহস্থ-আশ্রমে কিছু কাল অতিবাহিত করেছিলেন, কিন্তু তারপর তিনি জড়সুখ ভোগের প্রতি অনাসক্ত হয়েছিলেন। জড়-জাগতিক সঙ্গ ত্যাগ করার জন্য তিনি বানপ্রস্থ-আশ্রম অবলম্বন করে বনে গমন করেছিলেন। তাঁর পতিব্রতা পত্নীগণ তাঁর অনুগমন করেছিলেন, কারণ পতি ব্যতীত আর তাঁদের কোন আশ্রয় ছিল না। আত্মবিৎ সৌভরি মুনি বনে গিয়ে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। এইভাবে মৃত্যুর সময় তিনি অগ্নিসহ আত্মাকে পরমাত্মার সেবায় নিযুক্ত করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! তাদের পতির আধ্যাত্মিক উন্নতি দর্শন করে, সৌভরি মুনির পত্নীরাও তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে, অগ্নিশিখা যেমন নির্বাণপ্রাপ্ত অগ্নির সঙ্গে বিলীন হয়, সেইভাবে তারাও চিৎ-জগতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।”
ষষ্ঠ অধ্যায়- সৌভরি মুনির অধঃপতন
13 Apr 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি