পঞ্চম অধ্যায়- দুর্বাসা মুনির জীবন রক্ষা

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আদেশে, সুদর্শন চক্রের দ্বারা সন্তপ্ত দুর্বাসা মুনি তৎক্ষণাৎ অম্বরীষ মহারাজের কাছে গিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দুঃখিত চিত্তে তিনি তাঁর চরণে পতিত হয়ে তাঁর চরণযুগল ধারণ করেছিলেন। দুর্বাসা মুনি তাঁর চরণ স্পর্শ করায় অম্বরীষ মহারাজ অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছিলেন এবং তিনি যখন দেখলেন দুর্বাসা মুনি তাঁর স্তব করতে উদ্যত হয়েছেন, তখন তিনি কৃপাবশত অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি ভগবানের সেই মহা অস্ত্রের উদ্দেশ্যে স্তব করতে শুরু করেছিলেন।”
মহারাজ অম্বরীষ বললেন- “হে সুদর্শন চক্র! আপনি অগ্নি, আপনি পরম শক্তিমান সূর্য, আপনি সমস্ত জ্যোতিষ্কের পতি চন্দ্র, আপনি জল, ক্ষিতি, আকাশ, বায়ু, পঞ্চতন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ) এবং আপনি ইন্দ্রিয়সমূহ। হে অচ্যুতপ্রিয়! আপনি সহস্র অর সমন্বিত। হে জড় জগতের পতি, সর্ব অস্ত্র বিনাশক, ভগবানের আদি ঈক্ষণ, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। দয়া করে আপনি এই ব্রাহ্মণকে আশ্রয় দান করুন এবং তাঁর মঙ্গল বিধান করুন। হে সুদর্শন চক্র! আপনি ধর্ম, আপনি সত্য, আপনি অনুপ্রেরণাদায়ক বাণী, আপনি যজ্ঞ এবং আপনি সমস্ত যজ্ঞফলের ভোক্তা। আপনিই সমগ্র জগতের পালনকর্তা এবং আপনিই ভগবানের হস্তে তাঁর পরম প্রভাব। আপনি ভগবানের মূল ঈক্ষণ এবং তাই আপনি সুদর্শন নামে পরিচিত। আপনারই কার্যের দ্বারা সব কিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং তাই আপনি সর্বব্যাপ্ত। হে সুদর্শন, আপনি অত্যন্ত মঙ্গলময় নাভি সমন্বিত এবং তাই আপনি সমস্ত ধর্মের ধারক ও বাহক। অধর্ম-পরায়ণ অসুরদের পক্ষে আপনি অশুভ ধূমকেতুর মতো। বস্তুতপক্ষে, আপনি ত্রিভুবনের পালনকর্তা। আপনি চিন্ময় জ্যোতি সমন্বিত, আপনি মনের মতো দ্রুতগামী এবং আপনি অদ্ভুতকর্মা। আমি কেবল ‘নম’ শব্দটি উচ্চরণ করার দ্বারা আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে বাণীর পতি! আপনার ধর্মময় তেজের দ্বারা এই জগতের অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে এবং মহাজনদের জ্ঞানের আলোক প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে কেউই আপনার জ্যোতি অতিক্রম করতে পারে না, কারণ প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত, স্থূল এবং সূক্ষ্ম, উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট সব কিছু আপনারই জ্যোতির দ্বারা প্রকাশিত রূপ। হে অজিত! আপনি যখন ভগবানের দ্বারা প্রেরিত হন, তখন দৈত্য ও দানব সৈন্যদের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের বাহু, উদর, ঊরু, পদ এবং মস্তক নিরন্তর ছিন্ন করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রে বিরাজ করেন। হে জগৎত্রাতা। ভগবানের সর্বশক্তিমান অস্ত্ররূপে খল অসুরদের বিনাশ করার জন্য আপনি নিযুক্ত হয়েছেন। আমাদের কুলের মঙ্গলের জন্য দয়া করে আপনি এই ব্রাহ্মণের মঙ্গল বিধান করুন। তাহ হলে নিশ্চিতভাবে আমাদের সকলের প্রতি অনুগ্রহ করা হবে। আমাদের বংশ যদি সৎপাত্রে দান করে থাকে, সৎকর্ম ও যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে থাকে, সুষ্ঠভাবে স্বধর্ম অনুষ্ঠান করে থাকে এবং তত্ত্বজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে, তা হলে আমি কামনা করি যে, তার বিনিময়ে এই ব্রাহ্মণ যেন সুদর্শন চক্রের সন্তাপ থেকে মুক্ত হন। অদ্বিতীয় পরমেশ্বর ভগবান, যিনি সমস্ত চিন্ময় গুণের আধার এবং যিনি সমস্ত জীবের আত্মা, তিনি যদি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে থাকেন, তা হলে আমরা কামনা করি যে, এই ব্রাহ্মণ দুর্বাসা মুনি যেন সমস্ত সন্তাপ থেকে মুক্ত হন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজা যখন এইভাবে সুদর্শন চক্র এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর স্তব করেছিলেন, তখন তাঁর প্রার্থনায় সুদর্শন চক্র শান্ত হয়েছিলেন এবং ব্রাহ্মণ দুর্বাসা মুনিকে দহন করার থেকে নিরস্ত হয়েছিলেন। মহাশক্তিশালী যোগী দুর্বাসা মুনি সুদর্শন চক্রের আগুন থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেছিলেন। তখন তিনি মহারাজ অম্বরীষের গুণের প্রশংসা করেছিলেন এবং তাঁকে পরম আশীর্বাদ প্রদান করেছিলেন।”
দুর্বাসা মুনি বললেন- “হে রাজন্! আজ আমি ভগবদ্ভক্তের মাহাত্ম্য দর্শন করলাম, কারণ যদিও আমি অপরাধ করেছি, তবুও আপনি আমার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছেন। যঁরা শুদ্ধ ভক্তেদের পতিত ভগবান শ্রীহরিকে লাভ করেছেন, তাঁদের পক্ষে অসাধ্য এবং দুস্ত্যজ্য কি আছে? যাঁর পবিত্র নাম শ্রবণ করা মাত্রই জীব নির্মল হয়, সেই তীর্থপাদ ভগবানের ভক্তদের পক্ষে কি-ই বা অসম্ভব হতে পারে? হে রাজন্, আপনি আমার অপরাধ দর্শন না করে আমার জীবন রক্ষা করেছেন, তাই অত্যন্ত কৃপালু আপনার দ্বারা আমি অনুগৃহীত হলাম। দুর্বাসা মুনির প্রত্যাবর্তনের আশায় রাজা কিছুই আহার করেননি। তাই দুর্বাসা মুনি ফিরে এলে, রাজা তাঁর চরণে পতিত হয়ে তাঁকে সর্বতোভাবে সন্তুষ্ট করেছিলেন এবং তৃপ্তি সহকারে ভোজন করিয়েছিলেন। রাজা এইভাবে দুর্বাসাকে সাদরে আনয়ন করেছিলেন। দুর্বাসা বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু আহার্য ভোজন করে এত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তিনি অত্যন্ত আদরের সঙ্গে রাজাকে বলেছিলেন, “দয়া করে আপনিও ভোজন করুন।”
“হে রাজন্, আমি আপনার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। প্রথমে আমি আপনাকে একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে করে আপনার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম, কিন্তু পরে আমি আমার বুদ্ধির দ্বারা উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, আপনি একজন মহাভাগবত। তাই কেবল আপনাকে দর্শনের দ্বারা, আপনার চরণ স্পর্শের দ্বারা এবং আপনার সঙ্গে কথোপকথনের দ্বারা আমি অনুগৃহীত ও প্রীত হয়েছি। দেবাঙ্গনাগণ আপনার নির্মল কীর্তি অনুক্ষণ কীর্তন করবে এবং এই পৃথিবীর মানুষেরাও আপনার পরম পবিত্র চরিত্র গান করবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহাযোগী দুর্বাসা সর্বতোভাবে প্রসন্ন হয়ে রাজার অনুমতি গ্রহণ করে, রাজার মহিমা কীর্তন করতে করতে আকাশমার্গে ব্রহ্মলোকে গমন করেছিলেন। সেই ব্রহ্মলোকে কোন নাস্তিক এবং শুষ্ক মনোধর্মী দার্শনিক নেই। মহারাজ অম্বরীষের কাছ থেকে দুর্বাসা মুনি চলে যাওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত এক বছর অতীত হয়েছিল। রাজাও ততদিন কেবলমাত্র জলপান করে উপবাস করেছিলেন। এক বছর পরে দুর্বাসা মুনি যখন ফিরে এসেছিলেন, তখন মহারাজ অম্বরীষ তাঁকে অত্যন্ত পবিত্র নানাবিধ অন্ন ভোজন করিয়েছিলেন এবং তারপর স্বয়ং ভোজন করেছিলেন। রাজা যখন দেখলেন ব্রাহ্মণ দুর্বাসা দগ্ধ হওয়ার মহাবিপদ থেকে মুক্ত হয়েছেন, তখন ভগবানের কৃপায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনিও অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু তিনি সেই জন্য কোন কৃতিত্ব গ্রহণ করেননি। তিনি মনে করেছিলেন সব কিছু ভগবানই করেছেন। এইভাবে ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে বিবিধ চিন্ময় গুণ সমন্বিত মহারাজ অম্বরীষ পূর্ণরূপে ব্রহ্ম, পরমাত্মা এবং ভগবানকে উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার ফলে তিনি পূর্ণরূপে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তাঁর ভক্তির প্রভাবে তিনি এই জড় জগতের ব্রহ্মলোককে পর্যন্ত নরকতুল্য মনে করেছিলেন।”
“তারপর, ভগবদ্ভক্তির অতি উচ্চস্তরে উন্নীত হওয়ার ফলে যাঁর ভোগবাসনা বিনষ্ট হয়েছিল, সেই অম্বরীষ মহারাজ গৃহস্থ-জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁরই মতো গুণসম্পন্ন তাঁর পুত্রদের মধ্যে তাঁর রাজ্য বিভাগ করে দিয়ে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে, তাঁর মনকে সর্বতোভাবে ভগবান বাসুদেবে একাগ্র করার জন্য বনে প্রবেশ করেছিলেন। মহারাজ অম্বরীষের এই পবিত্র কার্যকলাপের কথা যিনি সংকীর্তন করেন অথবা অনুক্ষণ চিন্তা করেন, তিনি অবশ্যই ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত হবেন। যাঁরা মহান ভক্ত অম্বরীষ মহারাজের চরিত্র ভক্তি সহকারে শ্রবণ করেন, তাঁরা অচিরেই মুক্ত হন অথবা ভগবানের ভক্ত হন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,963 hits