চতুর্থ অধ্যায়- অম্বরীষ মহারাজের চরণে দুর্বাসা মুনির অপরাধ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নভগের পুত্র নাভাগ দীর্ঘকাল গুরুগৃহে বাস করেছিলেন। তাই তাঁর ভাইয়েরা মনে করেছিলেন যে, তিনি গৃহস্থ-আশ্রম অবলম্বন করার জন্য আর ফিরে আসবেন না। অতএব তাঁরা তাঁর জন্য তাঁদের পিতার সম্পত্তির কোন অংশ না রেখেই নিজেদের মধ্যে তা বন্টন করে নিয়েছিলেন। নাভাগ যখন তাঁর গুরুগৃহ থেকে ফিরে এসেছিলেন, তখন তাঁরা তাঁদের পিতাকে তাঁর সম্পত্তির অংশ বলে নির্দেশ করেছিলেন। নাভাগ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে ভ্রাতাগণ, আমার জন্য আপনারা পিতার সম্পত্তির অংশস্বরূপ কি রেখেছেন?’ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমরা তোমার অংশস্বরূপ আমাদের পিতাকে রেখেছি।’ কিন্তু নাভাগ যখন তাঁরা পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘পিতৃদেব, আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারা আপনাকে আমার সম্পত্তির অংশরূপে প্রদান করেছেন,’ তখন তাঁর পিতা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হে বৎস! তাদের সেই উক্তি প্রতারণামূলক, তাদের সেই বাক্যে বিশ্বাস করো না। আমি তোমার সম্পত্তির অংশ নই’।”
নাভাগের পিতা বলেছিলেন- “অঙ্গিরোগোত্রীয় ঋষিরা এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠান করছেন। কিন্তু যদিও তাঁরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, তবুও তাঁরা ষষ্ঠ দিবসে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে মোহপ্রাপ্ত হয়ে তাঁদের কর্তব্য সম্পাদনে ভুল করবেন। তুমি সেই মহাত্মাদের কাছে যাও এবং বৈশ্বদেব সম্বন্ধীয় দুটি বৈদিক মন্ত্র বর্ণনা করো। সেই মহর্ষিরা যজ্ঞ সমাপ্ত হলে যখন স্বর্গলোকে যাবেন, তখন তাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট সমস্ত ধন তোমাকে প্রদান করবেন। অতএব তুমি সেখানে যাও। নাভাগ তাঁর পিতার আদেশ যথাযথভাবে পালন করেছিলেন এবং অঙ্গিরাগোত্রীয় ঋষিরা তাঁকে যজ্ঞাবশিষ্ট ধন প্রদান করে স্বর্গে গমন করেছিলেন। তারপর, নাভাগ যখন সেই ধন গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন এক কৃষ্ণবর্ণ পুরুষ উত্তর দিক থেকে এসে তাঁকে বলেছিলেন, ‘এই যজ্ঞভূমির সমস্ত ধন আমার।’ নাভাগ তখন বলেছিলেন, ‘এই ধন আমার। ঋষিরা আমাকে এগুলি দান করেছেন।’ নাভাগ সেই কথা বললে সেই কৃষ্ণবর্ণ পুরুষটি বললেন, ‘চলো, আমরা তোমার পিতার কাছে যাই এবং তাঁকে আমাদের এই মতবিরোধের মীমাংসা করতে বলি।’ সেই বাক্য অনুসারে নাভাগ তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।”
নাভাগের পিতা বলেছিলেন- “ঋষিরা দক্ষযজ্ঞে সব কিছু রুদ্রের অংশ বলে বিবেচনা করে তাঁকে তা নিবেদন করেছিলেন, তাই যজ্ঞভূমিগত সমস্ত বস্তুই শিবের।”
তখন রুদ্রকে প্রণতি নিবেদন করে নাভাগ বলেছিলেন- “হে পরমপূজ্য প্রভু! এই যজ্ঞভূমির সব কিছুই আপনার। আমার পিতা সেই কথাই আমাকে বলেছেন। এখন আমি অবনত মস্তকে আপনার কৃপা প্রার্থনা করছি।”
রুদ্র বললেন- “তোমার পিতা যা বলেছেন তা সত্য এবং তুমিও সত্য কথাই বলছ। অতএব আমি মন্ত্রজ্ঞ, তোমাকে সনাতন ব্রহ্মজ্ঞান দান করব। এখন তুমি এই যজ্ঞাবশিষ্ট সমস্ত ধন গ্রহণ কর, কারণ আমি তোমাকে তা দান করছি।” সেই কথা বলে ধর্মানুরাগী শিব সেই স্থান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন।
“এই আখ্যানটি যিনি মনোযোগ সহকারে সকালে ও সন্ধ্যায় শ্রবণ করেন এবং কীর্তন করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে বিদ্বান ও মন্ত্রতত্ত্বে অভিজ্ঞ হয়ে আত্মজ্ঞান লাভ করেন। নাভাগ থেকে মহারাজ অম্বরীষের জন্ম হয়েছিল। মহারাজ অম্বরীষ ছিলেন একজন মহাভাগবত এবং সুকৃতিবান পুরুষ। যদিও তিনি এক মহা তেজস্বী ব্রাহ্মণের দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছিলেন, তবুও সেই ব্রহ্মশাপ তাঁকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করেছিলেন- “হে মহাত্মন্, মহারাজ অম্বরীষ নিশ্চয়ই ছিলেন অতি উন্নত চরিত্র এবং সুবুদ্ধিমান। আমি তাঁর কথা শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, ব্রাহ্মণের অপ্রতিহত অভিশাপও তাঁকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পরম সৌভাগ্যবান মহারাজ অম্বরীষ সপ্তদ্বীপ সমন্বিত পৃথিবীর আধিপত্য এবং অক্ষয় ঐশ্বর্য ও অন্তহীন সমৃদ্ধি লাভ করেছিলেন। যদিও এই প্রকার পদ লাভ করা অত্যন্ত দুর্লভ, তবুও মহারাজ অম্বরীষের তাতে একটুও আসক্তি ছিল না। কারণ তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে এই প্রকার সমস্ত ঐশ্বর্যই জড়-জাগতিক। স্বপ্নের মতো অলীক এই ঐশ্বর্য চরমে বিনষ্ট হয়ে যাবে। রাজা ভালভাবেই অবগত ছিলেন যে, কোন অভক্ত যখন এই প্রকার ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হয়, তখন সে তমোগুণের গভীর থেকে গভীরতর অন্ধকারে অধঃপতিত হয়। মহারাজ অম্বরীষ ছিলেন ভগবান শ্রীবাসুদেব এবং ভগবদ্ভক্ত মহাত্মাদের এক পরম ভক্ত। তাঁর এই ভক্তির প্রভাবে তিনি সমগ্র জড় জগৎকে একটি মাটির ঢেলার মতো তুচ্ছ বলে মনে করেছিলেন। মহারাজ অম্বরীষ সর্বদা তাঁর মনকে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যানে, তাঁর বাণী ভগবানের মহিমা বর্ণনায়, তাঁর হস্তদ্বয় মন্দির মার্জনে, তাঁর কর্ণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা শ্রবণে, তাঁর চক্ষুদ্বয় শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং মথুরা-বৃন্দাবন আদি স্থানে শ্রীকৃষ্ণের মন্দির দর্শনে, তাঁর স্পর্শেন্দ্রিয় ভগবদ্ভক্তের অঙ্গস্পর্শনে, তাঁর ঘ্রাণেন্দ্রিয় ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে নিবেদিত তুলসীর ঘ্রাণ গ্রহণে, তাঁর রসনা কৃষ্ণপ্রসাদ আস্বাদনে, তাঁর চরণদ্বয় তীর্থস্থান এবং ভগবানের মন্দিরে গমনে, তাঁর মস্তক ভগবানকে প্রণতি নিবেদনে এবং তাঁর কামনাকে সর্বক্ষণ ভগবানের সেবা সম্পাদনে, নিযুক্ত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মহারাজ অম্বরীষ তাঁর নিজের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য কোন কিছু কামনা করেননি। তিনি তাঁর সব কটি ইন্দ্রিয় ভগবানের বিভিন্ন সেবায় যুক্ত করেছিলেন। ভগবানের প্রতি আসক্তি লাভ করে সমস্ত জড় বাসনা থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত হওয়ার এটিই পন্থা।”
“মহারাজ অম্বরীষ সর্বদা তাঁর রাজকীয় কার্যকলাপের সমস্ত ফল পরতত্ত্ব, পরম ভোক্তা, অধোক্ষজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সমর্পণ করে, ভগবদ্ভক্ত ব্রাহ্মণদের উপদেশ অনুসারে অনায়াসে পৃথিবী শাসন করতেন। মরুপ্রদেশে যেখানে সরস্বতী নদী প্রবাহিত হয়, সেখানে অম্বরীষ মহারাজ অশ্বমেধ আদি যজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি-বিধান করেছিলেন। এই প্রকার যজ্ঞ মহা ঐশ্বর্য, উপযুক্ত উপকরণ এবং ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা দান করার দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। যজ্ঞে যজমান রাজার প্রতিনিধিত্ব করে বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম প্রমুখ মহাত্মারা এই সমস্ত যজ্ঞের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। মহারাজ অম্বরীষের যজ্ঞে সুন্দর বস্ত্রে বিভূষিত সদস্যবর্গ এবং পুরোহিতদের (বিশেষ করে হোতা, উদ্‌গাতা, ব্রহ্মা এবং অধ্বর্যুদের) ঠিক দেবতাদের মতো দেখাত। তাঁরা গভীর ঔৎসুক্য সহকারে নিমেষহীন দৃষ্টিতে যজ্ঞ দর্শন করতেন। অম্বরীষ মহারাজের রাজ্যের নাগরিকেরা ভগবানের লীলাকথা শ্রবণ এবং কীর্তন করতেন। তাই তাঁরা দেবতাদেরও অত্যন্ত প্রিয় স্বর্গলোকে উন্নীত হওয়ার বাসনা করতেন না। যাঁরা ভগবানের সেবাজনিত চিন্ময় আনন্দে মগ্ন, তাঁরা সিদ্ধপুরুষদেরও যা পরম প্রাপ্তি সেই সমস্ত বিষয়েও আগ্রহী নন, কারণ হৃদয়ে নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করার ফলে যে দিব্য আনন্দ অনুভূত হয়, তার কাছে সিদ্ধপুরুষদের সিদ্ধিও নিতান্তই তুচ্ছ। এই পৃথিবীর রাজা অম্বরীষ এইভাবে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং সেই প্রচেষ্টায় কঠোর তপস্যা করেছিলেন। সর্বদা তাঁর স্বরূপে ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করে, তিনি ক্রমশ সর্বপ্রকার জড় বাসনা পরিত্যাগ করেছিলেন। অম্বরীষ মহারাজ তাঁর গৃহ, পত্নী, সন্তানসন্ততি, বন্ধুবান্ধব, শ্রেষ্ঠ হস্তী, সুন্দর রথ, অশ্ব, অক্ষয় রত্ন, অলঙ্কার, বস্ত্র এবং অক্ষয় ধনভাণ্ডারের প্রতি সমস্ত আসক্তি পরিত্যাগ করেছিলেন। তিনি সেগুলি নিতান্তই অনিত্য এবং তুচ্ছ জড় বিষয় বলে মনে করেছিলেন।”
“অম্বরীষ মহারাজের ঐকান্তিক ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান তাঁকে তাঁর সুদর্শন চক্র প্রদান করেছিলেন, যা ভক্তদের সংরক্ষক এবং যা শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিদের পক্ষে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তাঁরই মতো গুণবতী মহিষী সহ এক বৎসর কাল যাবৎ একাদশী এবং দ্বাদশীব্রত পালন করেছিলেন। এক বছর ধরে ব্রত ধারণ করার পর, কার্তিক মাসের ত্রিরাত্র উপবাস করে এবং তারপর যমুনায় স্নান করে, মহারাজ অম্বরীষ মধুবনে ভগবান শ্রীহরির অর্চনা করেছিলেন। মহারাজ অম্বরীষ মহা অভিষেকের বিধি অনুসারে সর্বপ্রকার উপকরণ দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহের অভিষেক করেছিলেন এবং তারপর সুন্দর বস্ত্র, অলঙ্কার, সুগন্ধি, ফুলমালা এবং পূজার অন্যান্য উপকরণের দ্বারা ভগবানের আরাধনা করেছিলেন। ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে তিনি শ্রীকৃষ্ণ এবং জড় বাসনাশূণ্য মহাভাগ্যবান ব্রাহ্মণদের পূজা করেছিলেন। তারপর অম্বরীষ মহারাজ তাঁর গৃহে সমাগত অতিথিদের বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের সন্তুষ্ট করেছিলেন। তিনি তাঁদের ষাট কোটি গাভী দান করেছিলেন, যাদের শৃঙ্গ স্বর্ণমণ্ডিত ছিল এবং যাদের খুর রৌপ্যমণ্ডিত ছিল। সেই গাভীগুলি সুন্দর বস্ত্রে সুশোভিতা এবং দুগ্ধে পূর্ণ ছিল। তারা ছিল সুন্দর স্বভাগ, যৌবন, রূপ এবং বৎস সমন্বিতা। সেই সমস্ত গাভী দান করার পর রাজা ব্রাহ্মণদের প্রচুর পরিমাণে অত্যন্ত সুস্বাদু আহার্য ভোজন করিয়েছিলেন এবং যখন তাঁরা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁদের অনুমতি গ্রহণপূর্বক তাঁর উপবাস ভঙ্গ করে একাদশীব্রত সমাপ্ত করার উপক্রম করেছিলেন। ঠিক তখন মহাশক্তিমান দুর্বাসা মুনি সেখানে অতিথিরূপে উপস্থিত হয়েছিলেন। অম্বরীষ মহারাজ উঠে দাঁড়িয়ে দুর্বাসা মুনিকে স্বাগত জানিয়ে আসন প্রদান করেছিলেন এবং পূজার উপকরণের দ্বারা পূজা করেছিলেন। তারপর তাঁর পাদ সমীপে উপবিষ্ট হয়ে রাজা সেই মহর্ষিকে ভোজন করতে অনুরোধ করেছিলেন। দুর্বাসা মুনি সানন্দে অম্বরীষ মহারাজের অনুরোধ অঙ্গীকার করে, মধ্যাহ্নকালীন বিধি অনুষ্ঠান করার জন্য যমুনা নদীতে গমন করেছিলেন। সেখানে যমুনার পবিত্র জলে নিমগ্ন হয়ে তিনি নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যান করেছিলেন। দ্বাদশীর উপবাস পারণের যখন আর মাত্র অর্ধ মুহূর্ত বাকি ছিল, অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ উপবাস ভঙ্গ করা আবশ্যক হয়েছিল, সেই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে রাজা তত্ত্ববিদ্ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তখন কি করা কর্তব্য সেই সম্বন্ধে বিচার করতে শুরু করেছিলেন।”
রাজা বললেন- “ব্রাহ্মণকে অশ্রদ্ধা করা হলে মহা অপরাধ হয়। অথচ দ্বাদশীতে উপবাস ভঙ্গ না করলে ব্রতপালনে ত্রুটি হয়। অতএব, হে ব্রাহ্মণগণ, আপনারা যদি মনে করেন যে, জলপান করে উপবাস ভঙ্গ করলে মঙ্গল হবে এবং অধর্ম হবে না, তা হলে আমি তাই করব।” এইভাবে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, কারণ ব্রাহ্মণদের মতে জলপান করা, ভক্ষণ এবং অভক্ষণ উভয়ই।
“হে কুরুকুলশ্রেষ্ঠ! রাজর্ষি এইভাবে বিচার করে, তাঁর হৃদয়ে ভগবান অচ্যুতের ধ্যানপূর্বক একটু জলপান করে, তিনি মহাযোগী দুর্বাসা মুনির আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। মধ্যাহ্নকালীন কর্তব্য সমাপন করে দুর্বাসা মুনি যমুটার তট থেকে ফিরে এলে, রাজা তাঁকে পূজা করে স্বাগত জানালেন, কিন্তু দুর্বাসা মুনি তাঁর যোগশক্তির বলে বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহারাজ অম্বরীষ তাঁর অনুমতি না নিয়ে জলপান করেছেন। ক্রোধে দুর্বাসা মুনির দেহ কম্পিত হতে লাগল, তাঁর মুখ ভ্রূকুটির দ্বারা কুটিল ভাব ধারণ করল এবং ক্ষুধার্ত হয়ে ক্রুদ্ধভাবে তিনি কৃতাঞ্জলি সহকারে দণ্ডায়মান মহারাজ অম্বরীষকে বলতে লাগলেন। আহা! এই নিষ্ঠুর প্রকৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিটিকে দেখ, সে বিষ্ণুভক্ত নয়। তাঁর ধন এবং পদমর্যাদার গর্বে গর্বিত হয়ে সে নিজেকে ভগবান বলে মনে করছে। দেখ কিভাবে সে ধর্মনীতি লঙ্ঘন করেছে। মহারাজ অম্বরীষ, তুমি আমাকে তোমার অতিথিরূপে ভোজন করতে নিমন্ত্রণ করেছ, কিন্তু আমাকে ভোজন না করিয়ে তুমি নিজেই প্রথমে ভোজন করেছ। তোমার এই অন্যায় আচরণের ফল এখনই আমি তোমাকে দেখাব। এইভাবে বলতে বলতে দুর্বাসার মুখ ক্রোধে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। তিনি তাঁর মস্তক থেকে জটা ছিন্ন করে, অম্বরীষ মহারাজকে দণ্ডদান করার জন্য তাঁর দ্বারা কালাগ্নিতুল্য এক অসুরকে সৃষ্টি করেছিলেন। সেই জ্বলন্ত কৃত্যা তার হাতে অসি নিয়ে পদবিক্ষেপের দ্বারা পৃথিবী কম্পিত করতে করতে তাঁর দিকে আসছে দেখেও মহারাজ অম্বরীষ তাঁর স্থান থেকে বিচলিত হলেন না। দাবানল যেভাবে ক্রুদ্ধ সর্পকে দগ্ধ করে, ভক্তকে রক্ষা করার জন্য পূর্ব থেকে ভগবানের আদেশপ্রাপ্ত সুদর্শন চক্রও সেইভাবে দুর্বাসাসৃষ্ট অসুরটিকে দগ্ধ করেছিল। দুর্বাসা যখন দেখলেন যে, তাঁর প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই চক্র দ্রুতবেগে তাঁরই দিকে এগিয়ে আসছে, তখন তিনি ভীত হয়ে প্রাণ রক্ষার জন্য চতুর্দিকে ধাবিত হতে লাগলেন। দাবানলের প্রজ্বলিত শিখা যেভাবে সর্পকে অনুসরণ করে, ভগবানের চক্রও সেইভাবে দুর্বাসা মুনিকে অনুসরণ করতে লাগল। দুর্বাসা মুনি দেখেছিলেন যে, সেই চক্র প্রায় তাঁর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করছে এবং তার ফলে তিনি সুমেরু পর্বতের গুহায় প্রবেশ করার বাসনায় অত্যন্ত দ্রুতবেগে ধাবিত হয়েছিলেন। দুর্বাসা মুনি আত্মরক্ষার জন্য সর্বদিকে, আকাশে, পৃথিবীতে, গুহায়, সমুদ্রে, ত্রিভুবনের লোকপালদের লোকে এবং স্বর্গে গমন করেছিলেন। কিন্তু যেখানেই তিনি গিয়েছিলেন, সেখানেই তিনি দেখেছিলেন যে, অসহ্য তেজোময় সুদর্শন চক্র তাঁকে অনুসরণ করছে। ভীত চিত্তে দুর্বাসা আশ্রয়ের অন্বেষণ করতে করতে সর্বত্র গমন করেছিলেন, কিন্তু কোথায় তিনি আশ্রয় পাননি। অবশেষে তিনি ব্রহ্মার কাছে গিযে বলেছিলেন ‘হে বিধাতা! হে ব্রহ্মা! দয়া করে আপনি ভগবানের জ্বলন্ত সুদর্শন চক্র থেকে আমাকে রক্ষা করুন।’ ”
শ্রীব্রহ্মা বললেন- “দ্বিপরার্ধ কালের অবসানে ভগবানের লীলা যখন সমাপ্ত হয়, তখন ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর ভ্রূভঙ্গির দ্বারা আমাদের বাসস্থান সহ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস করেন। আমি, শিব, দক্ষ, ভৃগু প্রমুখ ঋষিবৃন্দ, প্রজাপতি, মানব-সমাজের শাসকবর্গ এবং দেবতাদের শাসকবর্গ- আমরা সকলেই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরণাগত এবং সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্য আমরা অবনত মস্তকে তাঁর আদেশ পালন করি। সুদর্শন চক্রের তাপের দ্বারা অত্যন্ত সন্তপ্ত দুর্বাসা এইভাবে ব্রহ্মার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে কৈলাসবাসী শিবের শরণাগত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।”
শ্রীশঙ্কর বললেন- “হে বৎস! আমি, ব্রহ্মা এবং অন্যান্য দেবতারা যাঁরা আমাদের মহত্ত্ব সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এই ব্রহ্মাণ্ডে বিরাজ করি, ভগবানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার শক্তি প্রদর্শন করার কোন ক্ষমতা আমাদের নেই, কারণ জীবগণ সহ অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড ভগবানের নির্দেশে উৎপন্ন হয় এবং বিনষ্ট হয়। ত্রিকালজ্ঞ আমি (শিব), সনৎকুমার, নারদ, পরম পূজ্য ব্রহ্মা, কপিল (দেবহূতি পুত্র), অপান্তরতম (ব্যাসদেব), দেবল, যমরাজ, আসুরি, মরীচি প্রমুখ ঋষিগণ এবং অন্য বহু সিদ্ধশ্রেষ্ঠগণ সর্বজ্ঞ হওয়া স্বত্ত্বেও ভগবানের মায়ার দ্বারা আবৃত হওয়ার ফলে, তার মায়ার প্রভাব যে কি প্রকার তা জানতে পারি না। তাঁর সুদর্শন চক্র আমাদেরও দুর্বিষহ, সুতরাং তুম সেই বিষ্ণুর কাছে গিয়ে তাঁর শরণাগত হও। তিনি অবশ্যই তোমার প্রতি সদয় হয়ে তোমার কল্যাণ বিধান করবেন।”
“তারপর, শিবের কাছেও নিরাশ হয়ে দুর্বাসা মুনি বৈকুন্ঠধামে গমন করেছিলেন, যেখানে ভগবান শ্রীনারায়ণ লক্ষ্মীদেবী সহ অবস্থান করেন। মহাযোগী দুর্বাসা মুনি সুদর্শন চক্রের অগ্নির দ্বারা দগ্ধ হয়ে, নারায়ণের শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়েছিলেন। কম্পিত কলেবরে তিনি বলেছিলেন- হে অচ্যুত! হে অনন্ত! হে বিশ্বপালক! আপনি সমস্ত ভক্তদের একমাত্র ইপ্সিত বস্তু। হে প্রভো! আমি মহা অপরাধ করেছি। দয়া করে আপনি আমাকে রক্ষা করুন। হে পরমেশ্বর ভগবান! আপনার অনন্ত শক্তির কথা না জেনে আমি আপনার অতি প্রিয় ভক্তের প্রতি অপরাধ করেছি। দয়া করে আপনি আমাকে সেই অপরাধ থেকে মুক্ত করুন। আপনি সব কিছুই করতে পারেন। নরকে যাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকেও আপনি কেবল তাঁর হৃদয়ে আপনার পবিত্র নাম জাগরিত করার মাধ্যমে তাঁকে উদ্ধার করতে পারেন।”
ভগবান সেই ব্রাহ্মণকে বললেন- “আমি সম্পূর্ণভাবে আমার ভক্তের অধীন। প্রকৃতপক্ষে আমার কোনই স্বাতন্ত্র্য নেই। যেহেতু আমার ভক্তরা সর্বতোভাবে জড় বাসনা থেকে মুক্ত, তাই আমি তাঁদের হৃদয়ে বিরাজ করি। আমার ভক্তের কি কথা, যাঁরা আমার ভক্তের ভক্ত তাঁরাও আমার অত্যন্ত প্রিয়। হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, যে সমস্ত মহাত্মাদের আমিই একমাত্র আশ্রয়, তাঁদের ছাড়া আমি আমার চিন্ময় আনন্দ এবং পরম ঐশ্বর্য উপভোগ করতে চাই না। শুদ্ধ ভক্ত যেহেতু তাঁর গৃহ, পত্নী, সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন, ধনসম্পদ এমন কি তাঁদের জীবন পর্যন্ত পরিত্যাগ করে- তাঁদের ইহলোকে এবং পরলোকে কোন প্রকার জড়-জাগতিক উন্নতি সাধনের বাসনা তাঁদের থাকে না, সেই প্রকার ভক্তদের আমি কিভাবে পরিত্যাগ করব? সতী স্ত্রী যেভাবে সেবার মাধ্যমে সৎপতিকে বশীভূত করে, সর্বতোভাবে আমার প্রতি আসক্ত সমদৃষ্টিসম্পন্ন শুদ্ধ ভক্তেরাও সেইভাবে তাঁদের ভক্তির প্রভাবে আমাকে বশীভূত করেন। আমার ভক্তরা আমার প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত থাকার ফলে সর্বদা পরিতৃপ্ত, তাই তাঁরা চার প্রকার মুক্তি (সালোক্য, সারূপ্য, সামীপ্য এবং সার্ষ্টি), স্বয়ং উপস্থিত হলেও তাঁরা তা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করেন না। অতএব স্বর্গলোকে উন্নতি আদি অনিত্য জড় সুখের কি আর কথা? শুদ্ধ ভক্ত সর্বদা আমার হৃদয়ে থাকেন এবং আমিও সর্বদা শুদ্ধ ভক্তের হৃদয়ে থাকি। ভক্তেরা আমাকে ছাড়া অন্য কাউকেও জানেন না, আমিও তাঁদের ছাড়া আর কিছুই জানি না।”
“হে ব্রাহ্মণ! তোমার আত্মরক্ষার উপায় আমি তোমাকে বলছি, শ্রবণ কর। অম্বরীষ মহারাজের চরণে অপরাধ করার ফলে তুমি আত্মহিংসা করেছ। তাই এক্ষুণি তুমি তাঁর কাছে যাও, বিলম্ব করো না। কারও তথাকথিত শক্তি যখন ভক্তের বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হয়, তখন প্রয়োগকারীরই অনিষ্ট হয়। যার উপর প্রয়োগ করা হয় তার কোন ক্ষতি হয় না, পক্ষান্তরে, যে প্রয়োগ করে তারই অনিষ্ট হয়। ব্রাহ্মণের পক্ষে তপস্যা এবং বিদ্যা অবশ্যই মঙ্গলজনক, কিন্তু যে ব্যক্তির স্বভাব নম্র নয়, তার পক্ষে এই তপস্যা এবং বিদ্যা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! তাই তুমি এক্ষুণি মহারাজ নাভাগের পুত্র অম্বরীষ মহারাজের কাছে যাও। আমি তোমার মঙ্গল কামনা করি। তুমি যদি মহারাজ অম্বরীষকে প্রসন্ন করতে পার, তা হলে তোমার শান্তি হবে।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,943 hits