শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! মনুর আর এক পুত্র শর্যাতি ছিলেন পূর্ণরূপে বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত রাজা। তিনি অঙ্গিরার বংশধরদের যজ্ঞে দ্বিতীয় দিবসের কর্তব্য কর্ম উপদেশ দিয়েছিলেন। শর্যাতির সুকন্যা নামক এক অতি সুন্দরী কমলনয়না কন্যা ছিল। সেই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে বনে গমন করে, রাজা শর্যাতি চ্যবন মুনির আশ্রমে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই সুকন্যা যখ্ন সখীগণ পরিবেষ্টিতা হয়ে বনে গাছ থেকে ফল আহরণ করছিলেন, তখন তিনি একটি বল্মীকের গর্তে জোনাকির মতো দুটি জ্যোতি দেখতে পেলেন। দৈবের প্রেরণাবশতই যেন সেই কন্যা মুগ্ধা হয়ে একটি কাঁটার দ্বারা সেই জ্যোতিময় পদার্থ দুটি বিদ্ধ করেছিলেন এবং বিদ্ধ হওয়া মাত্রই সেখান থেকে রক্ত নির্গত হতে লাগল। তৎক্ষণাৎ শর্যাতির সৈন্যদের মল-মূত্র নিরুদ্ধ হয়েছিল। তা দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে শর্যাতি তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেন। কি আশ্চর্য! আমাদের মধ্যে কেউ নিশ্চয়ই ভৃগুনন্দন চ্যবন মুনির কোন অনিষ্ট করেছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন এই আশ্রমকে কলুষিত করেছে। সুকন্যা তখন ভয়ে ব্যাকুল হয়ে তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, ‘আমি কিছু অন্যায় করেছি, কারণ আমি না জেনে একটি কন্টকের দ্বারা দুটি জ্যোতি বিদীর্ণ করেছি।’ তাঁর কন্যার সেই উক্তি শ্রবণ করে রাজা শর্যাতি অত্যন্ত ভীত হয়েছিলেন এবং তিনি নানাভাবে স্তবস্তুতির দ্বারা বল্মীকের মধ্যে অবস্থিত চ্যবন মুনিকে প্রসন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। সংযত চিত্ত শর্যাতি চ্যবন মুনির অভিপ্রায় বুঝতে পেরে, তাঁকে তাঁর কন্যা সমর্পণ করেছিলেন এবং অতি কষ্টে বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে মুনির অনুমতি গ্রহণ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। অত্যন্ত উগ্র স্বভাগ চ্যবন মুনিকে পতিরূপে প্রাপ্ত হওয়ায় সুকন্যা তাঁর হৃদয়গত ভাব অবগত হয়ে, অত্যন্ত সাবধানে সেই অনুসারে কার্য করে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে লাগলেন। তারপর, কিছুকাল গত হলে, স্বর্গের চিকিৎসক অশ্বিনীকুমারদ্বয় চ্যবন মুনির আশ্রমে এসেছিলেন। চ্যবন মুনি শ্রদ্ধা সহকারে তাঁদের পূজা করে, তাঁদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে যৌবনত্ব প্রদান করতে, কারণ তাঁরা যৌবন দানে সমর্থ ছিলেন।”
চ্যবন মুনি বললেন- “যদিও আপনারা যজ্ঞে সোমরস পানে বঞ্চিত, আমি আপনাদের সোমরসপূর্ণ পাত্র প্রদান করব। দয়া করে আপনারা আমাকে রূপ এবং যৌবন সম্পাদন করে দিন, কারণ তা যুবতী রমণীদের আকৃষ্ট করে। চিকিৎসকশ্রেষ্ঠ অশ্বিনীকুমারদ্বয় অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে চ্যবন মুনির প্রস্তাব অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁরা সেই ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন, “এই সিদ্ধ সরোবরে আপনি নিমগ্ন হোন।” (এই সরোবরে যে স্নান করে তার বাসনা পূর্ণ হয়)। এই কথা বলে অশ্বিনীকুমারদ্বয় জরাজীর্ণ শরীর বলীপলিত দেহ অতি বৃদ্ধ চ্যবন মুনিকে নিয়ে হ্রদে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর, সেই হ্রদ থেকে অতি সুন্দর তিনজন পুরুষ উঠে এলেন। তাঁরা পরম সুন্দর পদ্মমালা, কুণ্ডল এবং সুন্দর বসনে ভূষিত ছিলেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন সৌন্দর্য বিশিষ্ট। সেই পতিব্রতা সুন্দরী সুকন্যা কে যে অশ্বিনীকুমার এবং কে তাঁর পতি তা বুঝতে পারলেন না, কারণ তাঁরা সকলেই ছিলেন সমান সুন্দর। কে তাঁর পতি তা বুঝতে না পেরে, তিনি অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। অশ্বিনীকুমারদ্বয় সুকন্যার পাতিব্রত্য-ধর্ম দর্শন করে তাঁর প্রতি বিশেষ প্রীত হয়েছিলেন এবং তাঁর পতিকে দেখিয়ে দিয়ে ও চ্যবন মুনির অনুমতি নিয়ে তাঁরা তাদের বিমানে স্বর্গলোকে ফিরে গিয়েছিলেন। তারপর, রাজা শর্যাতি, যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে অভিলাষী হয়ে চ্যবন মুনির আশ্রমে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর কন্যার পাশে সূর্যের মতো তেজস্বী এক অতি সুন্দর যুবককে দর্শন করেছিলেন। তাঁর কন্যা তাঁকে প্রণতি নিবেদন করলেও, রাজা শর্যাতি তাঁকে আশীর্বাদ না করে অসন্তুষ্ট চিত্তে বলতে লাগলেন। হে অসতী! তুমি কি করতে অভিলাষী হয়েছ? তুমি সর্বজনপূজ্য পরম শ্রদ্ধেয় পতিকে প্রতারণা করেছ, যেহেতু তিনি বৃদ্ধ এবং জরাগ্রস্ত, তাই তুমি অপ্রিয় পতিকে পরিত্যাগ করে এই যুবকটিকে উপপতিরূপে বরণ করেছ, যে ঠিক একটি পথের ভিক্ষুকের মতো। হে কন্যা, তুমি এক সৎকুলে জন্মগ্রহণ করেছ, তোমার মতি এইভাবে অধোগামী হল কিভাবে? তুমি কিভাবে নির্লজ্জের মতো এক উপপতির ভজনা করছ? তার ফলে তুমি তোমার পিতৃকুল এবং পতিকুল উভয় কুলকেই ঘোর নরকে পতিত করলে। সুকন্যা কিন্তু তার সতীত্বের গর্বে গর্বিতা হয়ে হেসে এই প্রকার কটুবাক্য প্রয়োগকারী পিতাকে বললেন, ‘হে পিতঃ! আমার পার্শ্বস্থিত এই ব্যক্তিটি আপনারই জামাতা ভৃগুনন্দন চ্যবন মুনি।’ এই বলে সুকন্যা তাঁর পিতাকে চ্যবনের রূপ এবং যৌবন প্রাপ্তির কারণ বর্ণনা করেছিলেন। তা শুনে শর্যাতি অত্যন্ত বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে কন্যাকে স্নেহে আলিঙ্গন করেছিলেন।”
“চ্যবন মুনি তাঁর শক্তিবলে রাজা শর্যাতিকে দিয়ে সোমযজ্ঞ অনুষ্ঠান করিয়েছিলেন। অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের যদিও সোমরস পানে অধিকার ছিল না, তবুও মুনি তাঁদের সোমরসের পূর্ণপাত্র প্রদান করেছিলেন। ইন্দ্র অত্যন্ত বিচলিত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে চ্যবন মুনিকে হত্যা করার জন্য তাঁর বজ্র গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু চ্যবন মুনি তাঁর শক্তির বলে বজ্রসহ ইন্দ্রের হস্ত নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন। যদি অশ্বিনীকুমারদ্বয় চিকিৎসক বলে যজ্ঞে সোমরস পানের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তবুও সেই সময় থেকে দেবতারা তাঁদের সোমরস পান করতে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। রাজা শর্যাতির উত্তানবর্হি, আনর্ত এবং ভূরিষেণ নামক তিনটি পুত্র ছিল। আনর্ত থেকে রেবতের জন্ম হয়।”
“হে শত্রুনাশন মহারাজ পরীক্ষিৎ! এই রেবত সমুদ্রের মধ্যে কুশস্থলী নামক একটি নগরী নির্মাণপূর্বক সেখানে বাস করে আনর্ত প্রভৃতি দেশ পালন করতেন। তাঁর একশত অতি উত্তম পুত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন ককুদ্মী। ককুদ্মী তাঁর কন্য রেবতীকে নিয়ে তাঁর কন্যার পতি কে হবে তা জিজ্ঞাসা করার জন্য প্রকৃতির তিনগুণের অতীত ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মার কাছে গিয়েছিলেন। ককুদ্মী যখন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন ব্রহ্মা গন্ধর্বদের গীতবাদ্য শ্রবণ করছিলেন এবং তাই ক্ষণকালের জন্যও তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় হয়নি। সেই জন্য ককুদ্মী প্রতীক্ষা করেছিলেন এবং গীতবাদ্যের অবসানে তিনি ব্রহ্মাকে প্রণাম করে নিজের অভিপ্রায় নিবেদন করেছিলেন। তাঁর কথা শুনে পরম শক্তিমান ব্রহ্মা উচ্চহাস্য সহকারে ককুদ্মীকে বলেছিলেন, “হে রাজন্, তুমি মনে মনে যাদের তোমার জামাতারূপে স্থির করেছিলে, তারা সকলেই কালের প্রভাবে গত হয়েছে।” সপ্তবিংশতি চতুর্যুগ ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। যাদের তুমি মনে মনে স্থির করেছিলে তারা এখন গত হয়েছে, এমন কি তাদের পুত্র, পৌত্র এবং গোত্রাদির নাম পর্যন্ত তুমি শুনবে পাবে না।”
“হে রাজন্, তুমি যাও, দেবদেব বিষ্ণু যাঁর অংশ সেই মহাবলী বলদেব এখন সেখানে বিরাজ করছেন, তোমার এই কন্যারত্নটি সেই পুরুষরত্নকে সমর্পণ কর। শ্রীবলদেব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। তাঁর মহিমা শ্রবণ ও কীর্তনের ফলে মানুষ পবিত্র হয়। তিনি যেহেতু সমস্ত জীবের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী, তাই তিনি এখন ভূভার হরণ করার জন্য তাঁর অংশসহ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন।”
“ব্রহ্মার দ্বারা এইভাবে আদিষ্ট হয়ে, ককুদ্মী তাঁকে প্রণাম করে নিজের গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন যে তাঁর পুরী শূণ্য, কারণ তাঁর ভায়েরা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনেরা যক্ষ আদি উচ্চতর জীবদের ভয়ে পুরী পরিত্যাগ করে চতুর্দিকে অবস্থান করছিলেন। তারপর রাজা তাঁর পরমা সুন্দরী কন্যাকে পরম শক্তিশালী শ্রীবলদেবকে সমর্পণ করে, নর-নারায়ণকে সন্তুষ্ট করার জন্য তপস্যা করতে বদরিকাশ্রমে গিয়েছিলেন।”
তৃতীয় অধ্যায়- সুকন্যা এবং চ্যবন মুনির বিবাহ
07 Apr 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি