দ্বিতীয় অধ্যায়- মনুপুত্রদের বংশ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর, পুত্র সুদ্যুম্ন যখন বানপ্রস্থ-আশ্রম অবলম্বন করার জন্য বনে গমন করেন, তখন বৈবস্বত মনু (শ্রাদ্ধদেব) আরও পুত্রাভিলাষী হয়ে যমুনার তীরে শত বৎসর কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তারপর, শ্রাদ্ধদেব পুত্র লাভের বাসনায় দেবদেব ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করার ফলে, ঠিক তাঁর নিজের মতো দশটি পুত্র লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইক্ষ্বাকু ছিলেন জ্যেষ্ঠ। এই পুত্রদের অন্যতম পৃষধ্র তাঁর গুরুর আদেশে গোরক্ষকরূপে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি রাত্রিবেলায় খড়্গ হস্তে দণ্ডায়মান থেকে গাভীদের রক্ষা করতেন। একদিন রাত্রে যখন বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন একটি বাঘ গোষ্ঠে প্রবেশ করে। সেই বাঘটিকে দেখে সমস্ত শয়ান গাভীরা ভয় পেয়ে গোষ্ঠে ইতস্তত বিচরণ করতে লাগল। সেই অতি বলবান ব্যাঘ্রটি যখন একটি গাভীকে আক্রমণ করেছিল, তখন গাভীটি ভয়াতুর হয়ে আর্তনাদ করতে শুরু করেছিল। সেই আর্তনাদ শুনে পৃষধ্র তৎক্ষণাৎ সেই শব্দ অনুসরণ করে ধাবিত হয়েছিলেন। তখন নক্ষত্রসমূহ মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হওয়ায় পৃষধ্র গাভীটিকে ব্যাঘ্র বলে মনে করে তাঁর খড়্গরে দ্বারা গাভীটির মস্তক ছেদন করেছিলেন। খড়্গের অগ্রভাগের আঘাতে ব্যাঘ্রটির কর্ণ ছিন্ন হয়েছিল, তার ফলে অত্যন্ত ভীত হয়ে পথে রক্ত নিঃসৃত করতে করতে সেই ব্যাঘ্রটিও সেখান থেকে পলায়ন করেছিল। শত্রুদমনকারী পৃষধ্র মনে করেছিলেন যে, ব্যাঘ্রটি নিহত হয়েছে, কিন্তু সকালবেলায় তিনি যখন দেখলেন যে, তাঁর দ্বারা গাভীটি নিহত হয়েছে, তখন তিনি অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন। পৃষধ্র যদিও না জেনে সেই অপরাধ করেছিলেন, তবুও তাঁর কুলগুরু বশিষ্ঠ তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন- ‘তোমার পরবর্তী জন্মে তুমি ক্ষত্রিয় হতে পারবে না। পক্ষান্তরে, এই গোবধজনিত অপরাধের ফলে তোমাকে শূদ্ররূপে জন্মগ্রহণ করতে হবে।’ তাঁর গুরু কর্তৃক এইভাবে অভিশপ্ত হয়ে বীর পৃষধ্র কৃতাঞ্জলিপুটে সেই অভিশাপ স্বীকার করেছিলেন। তারপর জিতেন্দ্রিয় হয়ে তিনি মহর্ষিদের অনুমোদিত ব্রহ্মচর্য ব্রত অবলম্বন করেছিলেন।”
“এইভাবে, পৃষধ্র সমস্ত সংসর্গ থেকে মুক্ত হয়ে শান্তচিত্ত ও সংযতেন্দ্রিয় হয়েছিলেন এবং নিস্পৃহভাবে ভগবানের কৃপার প্রভাবে লব্ধ বস্তুর দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে করতে তিনি ভক্তিযোগের প্রভাবে সমস্ত জীবের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ও সমদর্শী হয়েছিলেন এবং অন্তর্যামী পরম পুরুষ ভগবান বাসুদেবের প্রতি পূর্ণ ঐকান্তিকতা লাভ করেছিলেন। এইভাবে শুদ্ধ জ্ঞানের প্রভাবে সর্বতোভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে এবং সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানে চিত্ত সন্নিবিষ্ট করে, পৃষধ্র ভগবানের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি লাভ করেছিলেন এবং জড় অন্ধ ও বধিরের মতো জড় কার্যকলাপের প্রতি সম্পূর্ণরূপে নিস্পৃহ হয়ে এই পৃথিবীতে বিচরণ করতে লাগলেন। এইরূপ ভাবাপন্ন হয়ে পৃষধ্র একজন মহান ঋষি হয়েছিলেন এবং বনে গমন করে যখন তিনি প্রজ্বলিত দাবাগ্নি দর্শন করেছিলেন, তখন তাতে তাঁর দেহ দগ্ধ করে তিনি চিন্ময়লোক প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
“মনুর কনিষ্ঠ পুত্র কবি কৈশোর বয়সেই জড় সুখভোগের প্রতি নিস্পৃহ হয়েছিলেন এবং তিনি রাজ্য পরিত্যাগ করে তাঁর বন্ধুগণ সহ বনে গমন করেছিলেন এবং স্বপ্রকাশ পরম পুরুষ ভগবানকে তাঁর হৃদয় অভ্যন্তরে চিন্তা করে পরম গতি লাভ করেছিলেন। মনুর আর এক পুত্র করূষ থেকে কারূষ নামক এক ক্ষত্রিয় জাতি উৎপন্ন হয়। কারূষ ক্ষত্রিয়েরা ছিলেন উত্তর দিকের রাজা। তাঁরা ধর্মনিষ্ঠ এবং ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির রক্ষকরূপে বিখ্যাত ছিলেন। ধৃষ্ট নামক মনুর পুত্র থেকে ধার্ষ্ট নামক ক্ষত্রিয় জাতির উৎপত্তি হয়, যাঁরা পৃথিবীতে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মনুর পুত্র নৃগ থেকে সুমতির জন্ম হয়। সুমতি থেকে ভূতজ্যোতি এবং ভূতজ্যোতি থেকে বসু জন্মগ্রহণ করেন। বসুর পুত্র প্রতীক, প্রতীকের পুত্র ওঘবান। ওঘবানের পুত্রের নামও ওঘবান এবং তাঁর কন্যার নাম ওঘবতী। সুদর্শন সেই কন্যাকে বিবাহ করেন। নরিষ্যন্ত থেকে চিত্রসেন নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং তাঁর থেকে ঋক্ষ নামক পুত্রের জন্ম হয়। ঋক্ষ থেকে মীঢ্বান, মীঢ্বান থেকে পূর্ণ এবং পূর্ণ থেকে ইন্দ্রসেনের জন্ম হয়। ইন্দ্রসেন থেকে বীতিহোত্র, বীতিহোত্র থেকে সত্যশ্রবা, সত্যশ্রবা থেকে উরুশ্রবা এবং উরুশ্রবা থেকে দেবদত্তের জন্ম হয়। দেবদত্ত থেকে অগ্নিবেশ্য জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন স্বয়ং অগ্নিদেব। এই পুত্রটি কানীন ও জাতূকর্ণ্য ঋষিরূপে বিখ্যাত হন।”
“হে রাজন্, অগ্নিবেশ্য থেকে আগ্নিবেশ্যায়ন নামক ব্রাহ্মণকুল ইৎপন্ন হয়েছে। নরিষ্যন্তের বংশ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন দিষ্টের বংশ বর্ণনা করছি, শ্রবণ কর। দিষ্টের নাভাগ নামে এক পুত্র ছিল। এর পরে যে নাভাগের কথা বর্ণনা করা হবে তার থেকে এই নাভাগ ভিন্ন। এই দিষ্টপুত্র নাভাগ কর্মের দ্বারা বৈশ্যত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। নাভাগের পুত্র ভলন্দন, ভলন্দনের পুত্র বৎসপ্রীতি এবং তাঁর পুত্র প্রাংশু। প্রাংশুর পুত্র প্রমতি, প্রমতির পুত্র খনিত্র, খনিত্রের পুত্র চাক্ষুষ এবং তাঁর পুত্র বিবিংশতি। বিবিংশতির পুত্র রম্ভ, রম্ভের পুত্র পরম ধার্মিক খনীনেত্র। হে রাজন্, এই খনীনেত্রের পুত্র রাজা করন্ধম। করন্ধম থেকে অবীক্ষিৎ নামক এক পুত্রের জন্ম হয় এবং অবীক্ষিতের পুত্র মরুত্ত, যিনি রাজচক্রবর্তী হয়েছিলেন। অঙ্গিরার পুত্র মহাযোগী সংবর্ত মরুত্তকে দিয়ে এক যজ্ঞ করিয়েছিলেন। রাজা মরুত্তের যজ্ঞের মতো আর কোন যজ্ঞ হয়নি। তাঁর যজ্ঞের সমস্ত সামগ্রী ছিল সুবর্ণময়, সুতরাং তা অত্যন্ত সুন্দর ছিল। সেই যজ্ঞে ইন্দ্র প্রচুর পরিমাণে সোমরস পান করে মত্ত হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণেরা প্রচুর দক্ষিণা প্রাপ্ত হয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সেই যজ্ঞে বায়ুর দেবতাগণ খাদ্য পরিবেশন করেছিলেন এবং বিশ্বদেবগণ সভাসদ ছিলেন। মরুত্তের পুত্র দম, দমের পুত্র রাজ্যবর্ধন, রাজ্যবর্ধনের পুত্র সুধৃতি এবং তাঁর পুত্র নর। নরের পুত্র কেবল এবং তাঁর পুত্র ধুন্ধুমান, ধুন্ধুমানের পুত্র বেগমান, বেগমানের পুত্র বুধ এবং বুধের পুত্র তৃণবিন্দু। এই তৃণবিন্দু পৃথিবীর অধিপতি হয়েছিলেন। অত্যন্ত গুণবতী অপ্সরাশ্রেষ্ঠা অলম্বুষা অনুরূপ বহু গুণসম্পন্ন তৃণবিন্দুকে পতিত্বে বরণ করেছিলেন। তাঁর গর্ভে কয়েকটি পুত্র এবং ইলবিলা নামক একটি কন্যার জন্ম হয়। মহাযোগী ঋষি বিশ্রবা তাঁর পিতার কাছ থেকে তত্ত্ববিদ্যা লাভ করে, ইলবিলার গর্ভে ধনাধিপতি কুবের নামক পুত্র উৎপাদন করেন। তৃণবিন্দুর বিশাল, শূণ্যবন্ধু এবং ধূম্রকেতু নামক তিনটি পুত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে বিশাল বংশ সৃষ্টি করেন এবং বৈশালী নামক পুরী নির্মাণ করেন। বিশালের পুত্র হেমচন্দ্র, তাঁর পুত্র ধূম্রাক্ষ, ধূম্রাক্ষের পুত্র সংযম এবং সংযমের পুত্র দেবজ ও কৃশাশ্ব। কৃশাশ্বের পুত্র সোমদত্ত, যিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারা বিষ্ণুর আরাধনা করে মহাযোগীদের প্রাপ্য অতি উত্তম গতি লাভ করেছিলেন। সোমদত্তের পুত্র সুমতি, সুমতির পুত্র জনমেজয়। বিশাল রাজার বংশোদ্ভুত রাজারা তৃণবিন্দুর কীর্তি রক্ষা করেছিলেন।”

Leave a Reply

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,963 hits