মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে প্রভু, হে শুকদেব গোস্বামী, আপনি বিস্তারিতভাবে বিভিন্ন মনুর শাসনকাল এবং সেই শাসনকালে অনন্তবীর্য ভগবানের অদ্ভুত কার্যকলাপ বর্ণনা করেছেন। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে, আপনার কাছে এই সমস্ত বিষয় শ্রবণ করতে পেরেছি। দ্রবিড় দেশের ঋষিতুল্য রাজা সত্যব্রত, যিনি পূর্ব কল্পান্তে ভগবানের কৃপার ফলে দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে বিবস্বানের পুত্র বৈবস্বত মনু হয়েছিলেন। আমি এই জ্ঞান আপনার কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছি। ইক্ষ্বাকু প্রভৃতি নৃপতিরা তাঁর পুত্র ছিলেন তাও আমি আপনার কাছে জানতে পেরেছি। হে মহা সৌভাগ্যবান শুকদেব গোস্বামী, হে মহান্ ব্রাহ্মণ! দয়া করে আপনি আমাদের কাছে সেই সমস্ত রাজাদের বংশ এবং গুণাবলী পৃথকভাবে বর্ণনা করুন, কারণ আমরা সর্বদাই সেই কথা শ্রবণ করতে অত্যন্ত ইচ্ছুক। এই বৈবস্বত মনুর বংশে যে সমস্ত বিখ্যাত রাজাদের আবির্ভাব হয়েছিল, যাঁরা ভবিষ্যতে আবির্ভূত হবেন এবং যাঁরা এখন বর্তমান রয়েছেন, তাঁদের সকলের বিক্রম আপনি আমাদের কাছে বর্ণনা করুন।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “ব্রহ্মজ্ঞানীদের সভায় মহারাজ পরীক্ষিৎ কর্তৃক এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে, পরম ধর্ম-তত্ত্ববেত্তা শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বলতে শুরু করেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে শত্রুজয়ী মহারাজ! এখন আমার কাছে বিস্তারিতভাবে মনু বংশের বর্ণনা শ্রবণ করুন। যতখানি বিস্তারিতভাবে সম্ভব আমি তা বর্ণনা করব, কারণ তাঁদের সমস্ত কার্যকলাপ একশ বছর ধরে বর্ণনা করলেও শেষ হবে না। উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট সমস্ত প্রাণীদের পরমাত্মা সেই পরম পুরুষই কেবল কল্পান্তে বর্তমান ছিলেন। তিনি ছাড়া এই পরিদৃশ্যমান বিশ্ব বা অন্য কিছু ছিল না। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! সেই পরম পুরুষ ভগবানের নাভি থেকে একটি স্বর্ণময় পদ্ম উদ্ভূত হয়েছিল, সেই পদ্মে চতুর্মুখ ব্রহ্মার জন্ম হয়েছিল। ব্রহ্মার মন থেকে মরীচির জন্ম হয়েছিল এবং মরীচির ঔরসে দাক্ষায়ণীর গর্ভে কশ্যপের জন্ম হয়েছিল। কশ্যপ থেকে অদিতির গর্ভে বিবস্বান জন্মগ্রহণ করেন। হে ভারত! বিবস্বান থেকে সংজ্ঞার গর্ভে শ্রাদ্ধদেব মনু জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জিতেন্দ্রিয় শ্রাদ্ধদেব তাঁর পত্নী শ্রদ্ধার গর্ভে ইক্ষ্বাকু, নৃগ, শর্যাতি, দিষ্ট, ধৃষ্ট, করূষক, নরিষ্যন্ত, পৃষধ্র, নভগ এবং কবি নামক দশটি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। প্রথমে মনু অপুত্রক ছিলেন। তাই তাঁর পুত্র লাভর নিমিত্ত মিত্র এবং বরুণ দেবতার সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য তত্ত্বজ্ঞানী এবং অত্যন্ত শক্তিমান মহর্ষি বশিষ্ঠ একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই যজ্ঞে পয়োব্রত-পরায়ণা মনুর পত্নী শ্রদ্ধা হোতার কাছে গিয়ে, প্রণতি নিবেদন করে একটি কন্যা লাভের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। “এখন আহুতি নিবেদন কর,” প্রধান পুরোহিতের দ্বারা এইভাবে আদিষ্ট হয়ে হোতা ঘৃত আহুতি দিয়েছিলেন। তিনি তখন মনুপত্নীর প্রার্থনা স্মরণ করে ‘বষট্’ শব্দসহ মন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। মনু পুত্র লাভের জন্য সেই যজ্ঞ করতে আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু পুরোহিত মনুপত্নীর অনুরোধে কন্যা লাভের সঙ্কল্প করেছিলেন, তার ফলে ইলা নামক একটি কন্যার জন্ম হয়েছিল। সেই কন্যা দর্শন করে মনু অসন্তুষ্ট চিত্তে তাঁর গুরু বশিষ্ঠকে বলেছিলেন। হে প্রভু! আপনারা সকলে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে অত্যন্ত পারদর্শী। তা হলে আপনাদের ক্রিয়ার ফলে বিপরীত হল কেন? এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। বৈদিক মন্ত্রের এই প্রকার বিপরীত ফল হওয়া উচিত নয়। আপনারা সকলে সংযতচিত্ত এবং ব্রহ্মজ্ঞ। তপস্যার প্রভাবে আপনাদের সমস্ত জড় কলুষ দগ্ধ হয়েছে। দেবতাদের মতো আপনাদের বাক্যও কখনও মিথ্যা হয় না। তা হলে কেন সঙ্কল্পিত কার্যের এই প্রকার বিপরীত ফল হল? মনু সেই কথা শুনে, হোতার কার্যে যে ব্যতিক্রম হয়েছিল পরম শক্তিমান প্রপিতামহ বশিষ্ঠ তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি তখন সূর্যপুত্রকে এই কথাগুলি বলেছিলেন। তোমার হোতার সঙ্কল্পের বিপর্যয়বশত ব্যভিচারের ফলে তা ঘটেছে। সে যাই হোক, তোমার স্বীয় তেজের দ্বারা আমি তোমাকে একটি সুপুত্র প্রদান করব।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! পরম যশস্বী এবং পরম শক্তিমান বশিষ্ঠ এইভাবে স্থির করে, ইলার পুরুষত্ব কামনায় পরম পুরুষ শ্রীবিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি বশিষ্ঠের প্রার্থনায় প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বাঞ্ছিত বর প্রদান করেছিলেন। তার ফলে ইলা সুদ্যুম্ন নামক এক শ্রেষ্ঠ পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! সেই বীর সুদ্যুম্ন একদিন কয়েকজন অমাত্য পরিবৃত হয়ে সিন্ধুদেশীয় অশ্বে আরোহন করে, মৃগয়ার উদ্দেশ্যে বনে বিচরণ করছিলেন। তিনি অঙ্গে কবচ ধারণ করে এবং হস্তে অতি সুন্দর ধনুক ও বিচিত্র শর গ্রহণপূর্বক পশুদের পিছনে ধাবিত হতে হতে অরণ্যের উত্তর দিকে উপনীত হয়েছিলেন। উত্তর দিকে মেরু পর্বতের নিম্নভাগে সুকুমার নামক একটি বন আছে, যেখানে ভগবান শিব উমাসহ সর্বদা আনন্দ উপভোগ করেন। সুদ্যুম্ন সেই বনে প্রবেশ করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! শত্রু দমনকারী সুদ্যুম্ন সেই বনে প্রবেশ করা মাত্রই নিজেকে স্ত্রীরূপে এবং ঘোটককে ঘোটকী রূপে দর্শন করলেন। তাঁর অনুচরেরা যখন দেখলেন যে, তাদের লিঙ্গের পরিবর্তন হয়েছে, তখন তাঁরা অত্যন্ত বিষণ্ন হয়ে পরস্পরকে অবলোকন করতে লাগলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে মহা শক্তিমান ব্রাহ্মণ! সেই স্থানটি কেন এই প্রকার প্রভাবসম্পন্ন ছিল? কোন্ ব্যক্তি তা এইভাবে প্রভাবসম্পন্ন করেছিলেন? দয়া করে আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করুন, কারণ তা জানতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন- “একদিন ব্রতপরায়ণ ঋষিরা তাঁদের নিজেদের তেজে সমস্ত অন্ধকার দূর করে, সর্বদিক আলোকিত করে মহাদেবকে দর্শন করতে সেই বনে উপস্থিত হয়েছিলেন। অম্বিকা দেবী তখন বিবসনা ছিলেন, তাই তিনি ঋষিদের দেখে অত্যন্ত লজ্জিতা হয়েছিলেন এবং তাঁর পতির কোল থেকে উঠে শ্রীঘ্রই তাঁর নীবী আচ্ছাদন করেছিলেন। হর-পার্বতীকে রতিক্রিয়ায় রত দেখে, ঋষিরাও সেখান থেকে নিবৃত্ত হয়ে নর-নারায়ণের আশ্রমে গমন করেছিলেন। সেই জন্য মহাদেব তাঁর পত্নীর প্রীতি বিধানের জন্য বলেছিলেন, ‘যে পুরুষ এখানে প্রবেশ করবে, সে স্ত্রী হয়ে যাবে!’ সেই সময় থেকে কোন পুরুষ আর ঐ বনে প্রবেশ করে না। কিন্তু এখন রাজা সুদ্যুম্ন তাঁর অনুচরগণ সহ স্ত্রীরূপে বনে বনে বিচরণ করতে লাগলেন। সুদ্যুম্ন কামভাব উদ্দীপনকারিণী এক পরমা সুন্দরী রমণীতে পরিণত হয়েছিলেন এবং তিনি অন্য রমণীগণ পরিবৃতা ছিলেন। চন্দ্রের পুত্র বুধ তাঁর আশ্রমের সমীপে এই সুন্দরী রমণীটিকে বিচরণ করতে দেখে, তাঁকে উপভোগ করতে ইচ্ছা করেছিলেন। সেই সুন্দরীও সোমরাজের পুত্র বুধকে পতিত্বে কামনা করেছিলেন। তার ফলে বুধ তাঁর গর্ভে পুরূরবা নামক এক পুত্র উৎপাদন করেন। আমি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে শুনেছি যে, মনুর পুত্র রাজা সুদ্যুম্ন এইভাবে স্ত্রীত্ব প্রাপ্ত হয়ে তাঁর কুলগুরু বশিষ্ঠকে স্মরণ করেছিলেন। সুদ্যুম্নের সেই শোচনীয় অবস্থা দর্শন করে বশিষ্ঠ অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। সুদ্যুম্নের পুরুষত্ব ফিরে পাওয়ার কামনায় বশিষ্ঠ তখন শঙ্করের আরাধনা করতে শুরু করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! মহাদেব বশিষ্ঠের প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাঁর প্রীতিবিধানের জন্য এবং পার্বতীর কাছে তাঁর বাণীর সত্যতা রক্ষার জন্য সেই মহর্ষিকে বলেছিলেন, “তোমার শিষ্য সুদ্যুম্ন এক মাস পুরুষ ও এক মাস স্ত্রী থাকবে। এইভাবে সে তার ইচ্ছা অনুসারে পৃথিবী শাসন করুক।” এইভাবে সুদ্যুম্ন তাঁর গুরুর কৃপায় মহাদেবের বাক্য অনুসারে এক মাস অন্তর পুরুষত্ব প্রাপ্ত হয়ে রাজ্য শাসন করছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রজারা তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। হে রাজন্, সুদ্যুম্নের উৎকল, গয় ও বিমল নামে তিনটি অতি ধার্মিক পুত্র ছিলেন, যাঁরা দক্ষিণাপথের অধিপতি হয়েছিলেন। তারপর বার্ধক্য উপনীত হলে, পৃথিবীপতি সুদ্যুম্ন তাঁর পুত্র পুরূরবাকে রাজ্য প্রদান করে বনে গমন করেছিলেন।”
প্রথম অধ্যায়- রাজা সুদ্যুম্নের স্ত্রীত্ব প্রাপ্তি
05 Apr 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, নবম স্কন্ধ- মুক্তি