মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “ভগবান শ্রীহরি নিত্যকাল তাঁর চিন্ময় পদে অবস্থিত, তবুও তিনি বিভিন্ন অবতারে এই জড় জগতে অবতীর্ণ হন। প্রথমে তিনি এক মহামৎস রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। হে পরম শক্তিমান শুকদেব গোস্বামী, আমি আপনার কাছে সেই মৎস্যাবতারের বিষয়ে শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি। সাধারণ জীব যেমন কর্মফলের অধীন হয়ে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে, তেমনই কি উদ্দেশ্যে ভগবান লোকনিন্দিত মৎস্যরূপ ধারণ করেছিলেন? মৎসরূপ নিশ্চিতরূপে গর্হিত এবং দুঃসহ বেদনাপূর্ণ। হে ভগবন্, এই অবতারের কি উদ্দেশ্য ছিল? দয়া করে আমাদের কাছে সেই কথা বর্ণনা করুন, কারণ ভগবানের লীলাবিলাস শ্রবণ করা সকলেরই পক্ষে মঙ্গলজনক।”
সূত গোস্বামী বললেন- “পরীক্ষিৎ মহারাজ শুকদেব গোস্বামীকে এইভাবে জিজ্ঞাসা করলে, সেই পরম শক্তিমান মহাত্মা ভগবানের মৎস্যাবতারের লীলা বর্ণণা করতে শুরু করেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! গো, ব্রাহ্মণ, দেবতা, ভক্ত, বৈদিক শাস্ত্র, ধর্ম এবং জীবনাদর্শের নীতি রক্ষা করার জন্য ভগবান অবতারমূর্তি ধারণ করেন। বায়ু যেমন বিভিন্ন প্রকার পরিবেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও তার দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তেমনই ভগবানও কখনও মানুষরূপে এবং কখনও নিকৃষ্ট স্তরের পশুরূপে আবির্ভূত হলেও সর্বদাই গুণাতীত। যেহেতু তিনি জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত, তাই তিনি উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট রূপের দ্বারা প্রভাবিত হন না। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ। পূর্ব কল্পের অবসানে, ব্রহ্মার দিনান্তে তিনি যখন নিদ্রিত হয়েছিলেন, তখন প্রলয় হয়েছিল এবং ত্রিলোক তখন সমুদ্রের জলে নিমগ্ন হয়েছিল। ব্রহ্মার দিনান্তে ব্রহ্মার ঘুম পেলে, তিনি তখন শয়ন করতে ইচ্ছা করেছিলেন। তখন তাঁর মুখ-নিঃসৃত বেদসমূহ হয়গ্রীব নামক এক মহান দানব হরণ করেছিল। সেই দানবশ্রেষ্ঠ হয়গ্রীবের আচরণ অবগত হয়ে, সবৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান শ্রীহরি সেই দানবকে সংহার করে বেদ উদ্ধার করার জন্য একটি মৎস্যের রূপ ধারণ করেছিলেন।”
“চাক্ষুষ মন্বন্তরে সত্যব্রত নামক এক মহান ভগবদ্ভক্ত রাজর্ষি ছিলেন, তিনি কেবলমাত্র জলপানপূর্বক জীবন ধারণ করে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। এই (বর্তমান) কল্পে রাজা সত্যব্রত শ্রাদ্ধদেব নামে সূর্যদেব বিবস্বানের পুত্ররূপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ভগবানের কৃপায় তিনি মনুর পদ প্রাপ্ত হয়েছেন। একদিন তপস্যারত রাজা সত্যব্রত যখন কৃতমালা নদীতে তর্পণ করছিলেন, তখন তাঁর অঞ্জলিস্থিত জলে একটি ক্ষুদ্র মৎস্য আবির্ভূত হয়েছিল।”
“হে ভরতকুলতিলক মহারাজ পরীক্ষিৎ! দ্রবিড় দেশের রাজা সত্যব্রত তখন তাঁর অঞ্জলিস্থিত জল সহ সেই মৎস্যটিকে নদীর জলে ফেলে দিয়েছিলেন। তখন সেই মৎস্যটি অত্যন্ত দয়াশীল রাজা সত্যব্রতের কাছে কাতর স্বরে বলতে লাগলেন- হে দীনবৎসল রাজন্! কেন আপনি আমাকে নদীর জলে নিক্ষেপ করছেন, যেখানে অন্য জলজন্তুরা আমাকে হত্যা করতে পারে? আমি তাদের ভয়ে অত্যন্ত ভীত। সেই মৎসটি যে স্বয়ং ভগবান সেই কথা না জেনেই, রাজা সত্যব্রত নিজেকে অনুগৃহীত করার জন্য মহা আনন্দে সেই মৎস্যটির রক্ষণে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেই দয়ালু রাজা সেই মৎস্যের সকাতর বাক্য শ্রবণ করে, তাঁকে একটি কলসের জলে রেখে তাঁর আশ্রমে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সেই মৎস্যটি এক রাত্রেই এত বর্ধিত হয়েছিলেন যে, সেই কমণ্ডলুতে তিনি আর স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারছিলেন না। তিনি তখন রাজাকে এইভাবে বলেছিলেন। হে রাজন্! আমি এই কমণ্ডলুতে কষ্টের সঙ্গে বাস করতে ইচ্ছা করি না, অতএব যেখানে আমি স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারব, সেই প্রকার একটি বৃহৎ জলাশয়ের অন্বেষণ করুন। তখন রাজা সেই মৎস্যটিকে কমণ্ডলু থেকে বার করে নিয়ে একটি বিশাল কূপে নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই মৎস্যটি তিন হস্ত পরিমাণ বর্ধিত হয়েছিলেন।”
মৎসটি তখন বলেছিলেন- “হে রাজন্, এই জলাশয়টি আমার সুখে বাস করার উপযুক্ত নয়। দয়া করে আপনি আমাকে আরও বিস্তৃত একটি জলাশয় প্রদান করুন, কারণ আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করেছি। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! রাজা তখন সেই মৎস্যটিকে কূপ থেকে উত্তোলন করে একটি সরোবরে নিক্ষেপ করেছিলেন, কিন্তু মৎস্যটি তৎক্ষণাৎ সেই জলের সীমা অতিক্রম করে বর্ধিত হয়েছিলেন।”
“ হে রাজন! আমি এক বিশাল জলচর, তাই এই জলাশয় আমার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়। এখন দয়া করে আপনি আমাকে রক্ষা করার কোন উপায় উদ্ভাবন করুন। আপনি আমাকে কোন অক্ষয় সরোবরে স্থাপন করুন।”
“মৎসটি এইভাবে অনুরোধ করলে, রাজা সত্যব্রত তখন তাঁকে সব চাইতে বড় জলাশয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্থানও তাঁর পক্ষে পর্যাপ্ত না হওয়ায়, রাজা তখন এই মহামৎস্যকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছিলেন।”
সমুদ্রে নিক্ষেপকালে সেই মৎস্য রাজা সত্যব্রতকে বলেছিলেন- “হে বীর, এই জলে অত্যন্ত বলবান মকর আদি জলজন্তুরা আমাকে ভক্ষণ করবে, অতএব আমাকে এই স্থানে ত্যাগ করার আপনার উচিত নয়।”
“মৎসরূপী ভগবানের এই প্রকার মধুর বাক্য শ্রবণ করে বিমোহিত রাজা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ‘আপনি কে? আপনি কেবল আমাদের মোহিত করছেন।’ হে ভগবান একদিনেই আপনি শত যোজন পরিমিত বিস্তৃত হয়ে নদী এবং সমুদ্রের জল আচ্ছাদিত করেছেন। পূর্বে আমি কখনও এই প্রকার জলচরকে দেখিনি অথবা শ্রবণও করিনি। আপনি নিশ্চয়ই সাক্ষাৎ ভগবান অব্যয় নারায়ণ শ্রীহরি। সমস্ত জীবের প্রতি আপনার কৃপা প্রদর্শন করার জন্য আপনি এখন জলচর রূপ ধারণ করেছেন। হে সৃষ্টি, স্থিতি এবং বিনাশের ঈশ্বর! হে পুরুষোত্তম! হে বিষ্ণু! আপনি আমাদের মতো ভক্তদের একমাত্র নায়ক এবং গতি। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনার সমস্ত লীলা এবং অবতারণগণ সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্য প্রকাশিত হয়। তাই হে ভগবান, কি উদ্দেশ্যে আপনি এই মৎস্যরূপ ধারণ করেছেন, তা আমি জানতে চাই। হে পদ্ম-পলাশলোচন প্রভু! দেহাত্মবুদ্ধি-সম্পন্ন দেবতাদের আরাধনা সর্বতোভবে ব্যর্থ হয়। কিন্তু যেহেতু আপনি সকলের পরম সুহৃদ, পরম প্রিয় এবং পরমাত্মা, তাই আপনার শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা কখনও ব্যর্থ হয় না। সেই জন্য আপনি এই বিচিত্র মৎস্য রূপে প্রকাশিত হয়েছেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজা সত্যব্রত যখন এই কথা বললেন, তখন ভক্তদের মঙ্গল বিধানের জন্য এবং প্রলয়বারিতে লীলা উপভোগ করার জন্য যুগাবসানে মীন রূপধারী ভগবান উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হে শত্রুদমনকারী রাজন! আজ থেকে সপ্তম দিবসে ভূঃ, ভুবঃ এবং স্বঃ- এই ত্রিলোক প্রলয় সমুদ্রে নিমগ্ন হবে। ত্রিভুবন যখন সেই প্রলয় জলে নিমগ্ন হবে, তখন আমার প্রেরিত একটি বিশাল নৌকা তোমার কাছে উপস্থিত হবে। তারপর হে রাজন্, তুমি সমস্ত ওষধি এবং বিধিধ বীজরাশি সেই বিশাল নৌকায় সংগ্রহ করবে। তারপর সপ্তর্ষিগণ এবং সর্বপ্রকার জন্তু পরিবেষ্টিত হয়ে, তুমি সেই নৌকায় আরোহণ করে অকাতরে এবং অনায়াসে মহর্ষিদের তেজের প্রভাবে আলোকিত প্রলয় সমুদ্রে বিচরণ করবে। তারপর প্রবল বায়ুবেগে সেই নৌকা যখন আন্দোলিত হবে, তখন তাকে বাসুকি সর্পের দ্বারা আমার শৃঙ্গে বন্ধন করবে, কারণ আমি তখন তোমার পাশেই উপস্থিত থাকব।’ ”
“হে রাজন্! তুমি এবং ঋষিগণ সহ সেই নৌকাকে আকর্ষণ করে ব্রহ্মার নিদ্রাকালীন রাত্রি পর্যন্ত আমি প্রলয় সমুদ্রে বিচরণ করব। তখন তুমি আমার দ্বারা উপদিষ্ট এবং অনুগৃহীত হবে। পরমব্রহ্ম নামক আমার মহিমা সম্বন্ধে তোমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তোমার হৃদয়ে প্রকাশিত হবে। এইভাবে তুমি আমার সম্বন্ধে সব কিছু জানতে পারবে। এইভাবে রাজাকে আদেশ দিয়ে ভগবান তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হয়েছিলেন। তখন রাজা সত্যব্রত ভগবানের আদিষ্ট কালের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। রাজর্ষি তখন পূর্বমুখী কুশ বিস্তার করে ঈশান কোণ অভিমুখী হয়ে মৎসরূপী ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করতে লাগলেন। তারপর, মহা মেঘের নিরন্তর বারি বর্ষণে সমুদ্র বর্ধিত হতে হতে তীরভূমি লঙ্ঘন করে সারা পৃথিবীকে প্লাবিত করতে লাগল। সত্যব্রত যখন ভগবানের আদেশ স্মরণ করছিলেন, তখন তিনি দেখলেন যে, একটি নৌকা তাঁর নিকটে আসছে। তখন তিনি সমস্ত ওষধি এবং লতা সংগ্রহ করে শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ সহ সেই নৌকায় আরোহণ করেছিলেন।”
ব্রাহ্মণ ঋষিগণ রাজার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বললেন- “হে রাজন্, দয়া করে ভগবান কেশবের ধ্যান করুন। তিনি আমাদের এই সঙ্কট থেকে উদ্ধার করবেন এবং আমাদের মঙ্গল বিধান করবেন। তখন রাজা নিরন্তর ভগবানের ধ্যান করতে থাকলে, সেই প্রলয় সমুদ্রে একটি বিশাল নিযুত যোজন পরিমিত একশৃঙ্গধারী স্বর্ণময় মৎস্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবানের পূর্ব প্রদত্ত উপদেশ অনুসারে, রাজা সেই মৎস্যের শৃঙ্গে রজ্জুরূপ বাসুকি সর্পের দ্বারা নৌকা নিবদ্ধ করে, প্রসন্ন চিত্তে ভগবানের স্তব করতে লাগলেন।”
রাজা বললেন- “যাঁরা অনাদি কাল থেকে আত্মজ্ঞান বিস্তৃত হয়েছে এবং অবিদ্যার ফলে এই জড় জগতে দুঃখ-দুর্দশাময় বদ্ধ জীবনে আবদ্ধ হয়েছে, তাঁরা ভগবানের কৃপায় ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ লাভের সুযোগ প্রাপ্ত হয়। আমি সেই ভগবানকে পরম গুরুরূপে বরণ করি। এই জড় জগতে সুখী হওয়ার বাসনায় মূর্খ বদ্ধ জীবেরা কর্ম করে, যার ফলে তাদের কেবল দুঃখই ভোগ হয়। কিন্তু ভগবানের সেবা করার ফলে সুখভোগের ভ্রান্ত অভিলাষ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। আমার গুরুদেব আমার সেই অসৎ মতিরূপ হৃদয়গ্রন্থি ছিন্ন করুন। যে ব্যক্তি ভববন্ধন থেকে মুক্ত হতে চান, তাঁর কর্তব্য ভগবানের সেবা করা এবং তমোগুণের কলুষ পরিত্যাগ করা, যে গুণের প্রভাবে পাপ এবং পুণ্যকর্ম অনুষ্ঠিত হয়। স্বর্ণ অথবা রৌপ্য যেমন অগ্নির সংস্পর্শে সমস্ত মল থেকে মুক্ত হয়, জীবও তেমনই ভগবানের সেবার প্রভাবে নির্মল হয়ে তার স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। সেই অব্যয় ভগবান আমাদের গুরু হোন, কারণ তিনি হচ্ছেন সমস্ত গুরুর গুরু। সমস্ত দেবতা, তথাকথিত গুরু এবং অন্য সমস্ত লোকে স্বতন্ত্রভাবে অথবা সমবেতভাবে আপনার কৃপার দশ সহস্রভাগের এক ভাগও প্রদান করতে পারে না। তাই আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করি। দর্শনে অক্ষম এক অন্ধ যেমন অন্য অন্ধকে নেতারূপে বরণ করে, তেমনই অজ্ঞ ব্যক্তিরাই অন্য আর একজন অজ্ঞ ব্যক্তিকে তাদের গুরুরূপে বরণ করে। কিন্তু আমরা আত্মতত্ত্ব লাভের অভিলাষী। তাই, আমরা পরমেশ্বর ভগবান আপনাকে আমাদের গুরুরূপে বরণ করি, কারণ আপনি সর্বদিকে দর্শন করতে সক্ষম এবং আপনি সূর্যের মতো সর্বজ্ঞ। প্রাকৃত গুরু তার প্রাকৃত শিষ্যকে অর্থনৈতিক উন্নতি ও বিষয় ভোগের শিক্ষা প্রদান করে এবং তার ফলে মূর্খ শিষ্য জড় জগতের অজ্ঞানেই আচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু আপনি শাশ্বত জ্ঞান দান করেন এবং সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধিমান মানুষেরা অতি শ্রীঘ্রই তাদের স্বরূপে অধিষ্ঠিত হন। হে প্রভু! আপনি সকলের পরম সুহৃদ, প্রিয়, নিয়ন্তা, পরমাত্মা, পরম উপদেষ্টা, পরম জ্ঞান প্রদাতা এবং সমস্ত বাসনা পূরণকারী। কিন্তু, আপনি যদিও হৃদয়ে রয়েছেন, তবুও মূর্খেরা তাদের কাম-বাসনার ফলে আপনাকে জানতে পারে না। হে ভগবান, আমি আত্মজ্ঞান লাভের জন্য দেবতাদের বরণ্যে এবং পরম ঈশ্বর আপনার শরণ গ্রহণ করছি। আপনার উপদেশের দ্বারা জীবনের পরম উদ্দেশ্য প্রকাশ করে, আপনি আমার হৃদয়গ্রন্থি ছেদন করুন এবং আমার জীবনের উদ্দেশ্য আমার কাছে প্রকাশ করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভগবানকে এইভাবে প্রার্থনা জানালে, প্রলয় সাগরে বিচরণশীল মৎসরূপী আদিপুরুষ ভগবান তাঁকে পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে বলেছিলেন। ভগবান এইভাবে রাজা সত্যব্রতকে সাংখ্যযোগ নামক আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান উপদেশ দিয়েছিলেন, যে বিজ্ঞানের দ্বারা জড় এবং চেতনের পার্থক্য নিরূপণ করা যায় (অর্থাৎ ভক্তিযোগ), সেই সঙ্গে তিনি পুরাণ (প্রাচীন ইতিহাস) এবং সংহিতা তাঁর কাছে নিঃশেষে বর্ণনা করেছিলেন। ভগবান স্বয়ং তাঁকে এই সমস্ত শাস্ত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন। নৌকায় উপবিষ্ট ঋষিগণ সহ রাজা সত্যব্রত ভগবান কর্তৃক বর্ণিত আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান শ্রবণ করেছিলেন। এই সমস্ত উপদেশ সনাতন বৈদিক শাস্ত্রের (ব্রহ্ম) বাণী। তাই রাজা এবং ঋষিদের পরম তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে কোন সংশয় ছিল না। প্রলয়ের অবসানে (স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে) ভগবান হয়গ্রীব অসুরকে বিনাশ করে নিদ্রা থেকে উত্থিত ব্রহ্মাকে বেদ প্রদান করেছিলেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর কৃপায় রাজা সত্যব্রত সমস্ত বৈদিক জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং এই কল্পে তিনি সূর্যদেবের পুত্র বৈবস্বত মনুরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। রাজর্ষি সত্যব্রত এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মৎস্যাবতারের এই মহৎ দিব্য আখ্যান শ্রবণ করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। যে ব্যক্তি মৎস্যাবতার এবং রাজা সত্যব্রতের এই আখ্যানটি কীর্তন করেন, তাঁর সমস্ত সঙ্কল্প সিদ্ধ হয় এবং তিনি নিঃসন্দেহে ভগবদ্ধামে ফিরে যান।”
“যিনি প্রলয় সলিলে বিচরণ করতে করতে নিদ্রাভিভূত ব্রহ্মার মুখ থেকে অপহৃত বেদরাশি পুনরায় ব্রহ্মাকে অর্পন করেছিলেন এবং মহারাজ সত্যব্রত ও মহর্ষিদের বেদের সারমর্ম উপদেশ দিয়েছিলেন সেই বিশাল মীনরূপে আবির্ভূত ভগবানকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
চতুর্বিংশতি অধ্যায়- ভগবানের মৎস্যাবতার
02 Apr 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ