শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সনাতন পুরুষ ভগবান এইভাবে বললে, সমস্ত সাধুদের দ্বারা শুদ্ধ ভক্তরূপে স্বীকৃত মহামতি বলি মহারাজের নয়ন অশ্রুপূর্ণ হয়েছিল। তিনি ভক্তিব্যাকুল চিত্তে কৃতাঞ্জলি সহকারে গদগদবাক্যে বলতে লাগলেন।”
বলি মহারাজ বললেন- “আপনার প্রতি প্রণামেরও কী আশ্চর্য মহিমা! আমি কেবল আপনাকে প্রণাম করার প্রয়াস করেছিলাম, কিন্তু সেই প্রয়াসই শুদ্ধ ভক্তির পরম সিদ্ধি প্রদান করেছে। এই অধঃপতিত দৈত্যের প্রতি আপনি যে অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করেছেন, তা দেবতা এবং লোকপালেরাও কখনও লাভ করতে পারেননি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই কথা বলে বলি মহারাজ প্রথমে ভগবান শ্রীহরিকে এবং তারপর ব্রহ্মা ও শিবকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। এইভাবে নাগপাশ (বরুণপাশ) থেকে মুক্ত হয়ে তিনি পূর্ণরূপে প্রসন্নতা সহকারে তাঁর অসুর অনুচরগণ সহ সুতললোকে প্রবেশ করেছিলেন। এইভাবে ইন্দ্রকে পুনরায় স্বর্গের অধিকার প্রদান করে এবং দেবমাতা অদিতির কামনা পূর্ণ করে, ভগবান সমস্ত জগৎ শাসন করতে লাগলেন। ভক্তপ্রবর প্রহ্লাদ মহারাজ যখন শুনলেন যে, তাঁর পৌত্র বলি মহারাজ তাঁর বন্ধন মুক্ত হয়ে ভগবানের আশীর্বাদ লাভ করেছেন, তখন তিনি ভক্তির আনন্দে উদ্বেলিত কন্ঠে বলতে লাগলেন- হে ভগবান, আপনি সারা জগতের পূজ্য; এমন কি ব্রহ্মা, শিব আদি মহাপুরুষেরাও আপনার শ্রীপাদপদ্মের পূজা করেন। তবুও আপনি আমাদের অর্থাৎ অসুরদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রকার অনুগ্রহ ব্রহ্মা, শিব অথবা লক্ষ্মীদেবীও লাভ করতে পারেননি, অতএব অন্যান্য দেবতা অথবা সাধারণ মানুষদের কথা কি আর বলার আছে। হে পরম আশ্রয়। ব্রহ্মা প্রভৃতি মহাপুরুষেরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবারূপী মধু পান করার দ্বারাই কেবল সিদ্ধি লাভ করেছেন। কিন্তু ক্রূর অসুরকুলে উদ্ভুত দুর্বৃত্ত আমরা কিভাবে আপনার কৃপা লাভ করলাম? তা কেবল আপনার অহৈতুকী কৃপার ফলেই সম্ভব হয়েছে। হে ভগবান! আপনার অচিন্ত্য চিৎশক্তির দ্বারা আপনার লীলা অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে সম্পাদিত হয়। সেই অচিন্ত্য স্বরূপ শক্তির ছায়ারূপিণী মায়াশক্তির দ্বারা আপনি এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। সমস্ত জীবের পরমাত্মারূপে আপনি সব কিছু জানেন এবং তাই আপনি সকলের প্রতি সমদর্শী। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি আপনার ভক্তদের অনুগ্রহ করেন। সেটি আপনার পক্ষপাতিত্ব নয়, কারণ আপনি কল্পবৃক্ষের মতো সকলের বাসনা পূর্ণ করেন।”
ভগবান বললেন- “হে বৎস প্রহ্লাদ! তোমার মঙ্গল হোক। এখন তুমি সুতললোকে গমন কর, ও সেখানে তোমার পৌত্র এবং আত্মীয়-স্বজনগণ সহ আনন্দ উপভোগ কর।”
ভগবান প্রহ্লাদ মহারাজকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন- “সেখানে তুমি শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম হস্তে সর্বদা আমাকে দর্শন করবে। নিরন্তর আমাকে দর্শন করার আনন্দে তুমি কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে পরীক্ষিৎ মহারাজ, বলি মহারাজ সহ সমস্ত অসুরনায়কদের অধিপতি বিশুদ্ধমতি প্রহ্লাদ মহারাজ কৃতাঞ্জলিপুটে ভগবানের আদেশ শিরোধার্য করেছিলেন। তারপর ভগবানকে প্রদক্ষিণ করে এবং সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করে সুতললোকে প্রবেশ করেছিলেন। তারপর নিকটে ঋত্বিকদের (ব্রহ্মা, হোতা, উদ্গাতা এবং অধ্বর্যু) সভায় উপবিষ্ট শুক্রাচার্যকে সম্বোধন করে ভগবান শ্রীহরি বা নারায়ণ এই কথাগুলি বলেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! এই সমস্ত পুরোহিতেরা সকলেই ছিলেন ব্রহ্মাবাদী, অর্থাৎ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য বৈদিক সিদ্ধান্ত অনুসরণকারী। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শুক্রাচার্য, আপনার যজ্ঞ অনুষ্ঠানকারী শিষ্য বলি মহারাজের যজ্ঞ অনুষ্ঠানে যে দোষ-ত্রুটি হয়েছে তা আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন। যোগ্য ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে যদি তা বিচার করা হয়, তা হলে সেই ত্রুটি খণ্ডন হয়ে যাবে।”
শুক্রাচার্য বললেন- “হে ভগবান, আপনি সমস্ত কর্মের প্রবর্তক এবং সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা। আপনি যজ্ঞপুরুষ, আপনার উদ্দেশ্যেই সমস্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। কেউ যদি সর্বতোভাবে আপনার প্রসন্নতা বিধান করে, তা হলে তার যজ্ঞ অনুষ্ঠানে কোন রকম ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা কোথায়? মন্ত্র উচ্চারণে এবং বিধিবিধান অনুশীলনে ত্রুটি থাকতে পারে এবং দেশ, কাল, পাত্র এবং উপকরণের বিষয়েও ত্রুটি হতে পারে, কিন্তু আপনার নাম সংকীর্তনের প্রভাবে সব কিছু ত্রুটিহীন হয়ে যায়। হে বিষ্ণু, তবুও আপনার আদেশ আমি পালন করব, কারণ আপনার আদেশ পালনই সকলের পক্ষে পরম কল্যাণজনক।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে মহা শক্তিশালী শুক্রাচার্য সসম্মানে ভগবানের আদেশ গ্রহণ করে, ব্রহ্মজ্ঞ ঋষিগণ সহ বলি মহারাজের যজ্ঞের ত্রুটির সমাধান করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! এইভাবে বলি মহারাজের কাছ থেকে সমস্ত ভূমি ভিক্ষা করে, ভগবান বামনদেব তাঁর ভ্রাতা দেবরাজ ইন্দ্রকে শত্রু কর্তৃক অপহৃত স্বর্গ প্রদান করেছিলেন। সমস্ত দেবতা, ঋষি, পিতৃ, মনুবর্গ, মুনিগণ, দক্ষ, ভৃগু, অঙ্গিরা প্রমুখ নেতাগণ এবং কার্ত্তিকেয় ও মহাদেব সহ দক্ষ আদি সমস্ত প্রজাপতিদের অধিপতি ব্রহ্মা ভগবান বামনদেবকে সকলের পালকরূপে বরণ করেছিলেন। কশ্যপ মুনি এবং তাঁর পত্নী অদিতির আনন্দ বিধানের জন্য এবং লোকপালগণ সহ ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত অধিবাসীদের কল্যাণের জন্য তিনি তা করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! ইন্দ্রকে যদিও সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের রাজা বলে মনে করা হয়, তবুও ব্রহ্মা আদি সমস্ত দেবতারা উপেন্দ্র বা বামনদেবকে বেদ, ধর্ম, যশ, ঐশ্বর্য, মঙ্গল, ব্রত, স্বর্গ এবং অপবর্গের পালকরূপে চেয়েছিলেন। তাই তাঁরা উপেন্দ্র বা বামনদেবকে সব কিছুর পরম প্রভু বলে বরণ করেছিলেন। তার ফলে সমস্ত জীবেরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল। তারপর ইন্দ্র ব্রহ্মা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে স্বর্গলোকের নেতাদের সঙ্গে ভগবান বামনদেবকে অগ্রবর্তী করে দিব্য বিমানে স্বর্গলোকে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভগবান বামনদেবের বাহুর দ্বারা রক্ষিত হয়ে, দেবরাজ ইন্দ্র ত্রিভুবনের আধিপত্য লাভ করেছিলেন এবং নির্ভয় ও পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর পরম ঐশ্বর্যমণ্ডিত পদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ব্রহ্মা, মহাদেব, কার্ত্তিকেয়, ভৃগু প্রভৃতি মুনিগণ, পিতৃগণ, সমস্ত ভূতগণ, সিদ্ধগণ এবং যে সমস্ত বিমানচর সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা সকলে ভগবান বামনদেবের অসাধারণ কার্যকলাপের মহিমা কীর্তন করেছিলেন। হে রাজন্, ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে করতে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ ধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তাঁরা সকলে অদিতি দেবীরও প্রশংসা করেছিলেন।”
“হে কুলনন্দন মহারাজ পরীক্ষিৎ! আমি ভগবান বামনদেবের অদ্ভুত সমস্ত কার্যকলাপ বর্ণনা করলাম। তা শ্রবণ করার ফলে শ্রোতার সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়। মরণশীল মানুষের পক্ষে ভগবান ত্রিবিক্রয় বিষ্ণুর মহিমার পরিমাপ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, ঠিক যেমন তার পক্ষে সারা পৃথিবীর সমস্ত পরমাণুর সংখ্যা গণনা করা সম্ভব নয়। যাদের ইতিমধ্যে জন্ম হয়েছে অথবা ভবিষ্যতে যাদের জন্ম হবে, তাদের কারও পক্ষেই তা সম্ভব নয়। সেই কথা মহর্ষি বশিষ্ঠ কীর্তন করেছেন। কেউ যদি ভগবানের বিভিন্ন অবতারের অদ্ভুত কার্যকলাপ শ্রবণ করেন, তা হলে তিনি অবশ্যই উচ্চতর লোকে উন্নীত হন অথবা ভগবদ্ধামে ফিরে যান। দেবতাদের, পিতৃদের অথবা মানুষদের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্মে (অর্থাৎ পূজা, শ্রাদ্ধ বা বিবাহে) যেখানে যেখানে বামনদেবের কার্যকলাপ কীর্তিত হয়, সেই সমস্ত অনুষ্ঠান পরম মঙ্গলজনক বলে বুঝতে হবে।”
ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়- দেবতাদের পুনরায় স্বর্গপ্রাপ্তি
31 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ