শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয় যে, ভগবান বামনদেব এইভাবে বলির অনিষ্ট সাধন করেছিলেন, তবুও বলি মহারাজ তাঁর সঙ্কল্পে অবিচলিত ছিলেন। তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেননি বলে মনে করে, এই কথাগুলি বলেছিলেন।”
বলি মহারাজ বললেন- “হে উত্তমশ্লোক, হে দেবপূজ্য, আপনি যদি মনে করেন যে, আমার প্রতিজ্ঞা মিথ্যা হয়েছে, তা হলে আমি তা অবশ্যই সংশোধন করে সত্যে পরিণত করব। আমার প্রতিজ্ঞা আমি ভঙ্গ হতে দিতে পারি না। তাই, দয়া করে আপনি আমার মস্তকে আপনার তৃতীয় পদ প্রদান করুন। আমি অপযশকে যেভাবে ভয় করি, সমস্ত সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া, অর্থাভাব, বরুণপাশ অথবা আপনার প্রদত্ত দণ্ড থেকেও আমি সেই প্রকার ভীত নই। মাতা, পিতা, ভ্রাতা অথবা বন্ধু যদিও কখনও কখনও শুভাকাঙ্ক্ষীরূপে দণ্ডদান করেন, তবুও তাঁরা তাঁদের আশ্রিত জনকে কখনও এইভাবে দণ্ডদান করেন না। কিন্তু আপনি যেহেতু পরম আরাধ্য ভগবান, তাই আমি আপনার প্রদত্ত এই দণ্ডকে সব চাইতে প্রশংসনীয় বলে মনে করি। যেহেতু আপনি পরোক্ষভাবে আমাদের মতো অসুরদের পরম হিতকারী, তাই আপনি শত্রুর ভূমিকা অবলম্বন করে আমাদের পরম হিত সাধন করেন। যেহেতু আমাদের মতো অসুরেরা সর্বদাই প্রতিষ্ঠা আকাঙ্ক্ষা করে, সেই হেতু আপনি আমাদের দণ্ডদান করে প্রকৃত সৎপথ দর্শন করার জ্ঞানচক্ষু দান করেন। বহু অসুরেরা আপনার প্রতি নিরন্তর বৈরীভাবাপন্ন হয়ে অবশেষে মহান যোগীদের লভ্য সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন। আপনি এক কার্যের দ্বারা অনেক উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেন এবং তার ফলে যদিও আপনি আমাকে নানাভাবে দণ্ডদান করেছেন এবং বরুণপাশে আবদ্ধ করেছেন, তবুও আমি একটু লজ্জা বা ব্যথা অনুভব করছি না। আমার পিতামহ প্রহ্লাদ মহারাজ আপনার সমস্ত ভক্তদের পূজনীয়। যদিও তিনি তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপু কর্তৃক নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি আপনার শরণাগত হয়ে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ ছিলেন। এই জড় দেহের কি প্রয়োজন, যা জীবনান্তে আপনা থেকেই তার মালিককে পরিত্যাগ করে? আত্মীয-স্বজনের কি প্রয়োজন যারা প্রকৃতপক্ষে ধন অপহরণ করে, যা ভগবানের চিন্ময় সেবায় ব্যবহার করা যেত? পত্নীর কি প্রয়োজন যে কেবল সংসার-বন্ধন বৃদ্ধির কারণ মাত্র এবং পরিবার-পরিজন, গৃহ, দেহ এবং জাতির কি প্রয়োজন? তাদের প্রতি আসক্তি কেবল মূল্যবান আয়ুর অপচয় মাত্র। অসীম জ্ঞানসম্পন্ন পূজনীয় আমার পিতামহ প্রহ্লাদ মহারাজ সংসারী ব্যক্তিদের সঙ্গ থেকে অত্যন্ত ভীত ছিলেন। তিনি তাঁর পিতা এবং বন্ধুবান্ধনবদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অসুর সংহারকারী আপনার শ্রীপাদপদ্মকে একমাত্র আশ্রয় জেনে, আপনার অবিনশ্বর এবং অভয় পাদপদ্মের শরণাগত হয়েছিলেন। দৈববশত আমি আমার সমস্ত ঐশ্বর্য হারিয়ে, বলপূর্বক আপনার শ্রীপাদপদ্মের সমীপে নীত হয়েছি। অনিত্য ঐশ্বর্যজনিত মোহবশত মরণশীল জীব বুঝতে পারে না যে, তার জীবন নশ্বর। আমি দৈববশত সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার লাভ করেছি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরুশ্রেষ্ঠ, বলি মহারাজ যখন এইভাবে তাঁর সৌভাগ্যের প্রশংসা করছিলেন, তখন ভগবৎপ্রিয় প্রহ্লাদ মহারাজ উদীয়মান পূর্ণচন্দ্রের মতো সেখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তখন বলি মহারাজ পরম সৌভাগ্যবান, অঞ্জনের মতো কৃষ্ণবর্ণ, উন্নত কলেবর, পীতবসনধারী, লম্বিতভুজ, পদ্মলোচন, পরম শোভাসম্পন্ন তাঁর পিতামহকে দর্শন করেছিলেন। বরুণপাশে আবদ্ধ থাকায় বলি মহারাজ পূর্বের মতো তাঁর পিতামহকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে পারলেন না। পরন্তু তিনি অশ্রুপ্লাবিত নয়নে কেবল মস্তকের দ্বারা প্রণাম করে লজ্জায় অধোমুখ হয়েছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজ সুনন্দ আদি অনুচরবৃন্দের দ্বারা আরাধিত ভগবানকে সেখানে উপবিষ্ট দর্শন করে আনন্দে বিহ্বল হয়েছিলেন এবং তখন তাঁর নয়নযুগল আনন্দাশ্রুতে প্লাবিত হয়েছিল। ভগবানের কাছে এসে ভূপতিত হয়ে, তাঁর মস্তকের দ্বারা ভগবানকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন।”
প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন- “হে প্রভু, আপনি এই বলিকে মহা সম্পদশালী ইন্দ্র পদ প্রদান করেছিলেন এবং আজ আপনি তা হরণ করলেন। আমার মনে হয় আপনার এই দেওয়া এবং নেওয়া দুই-ই সমান সুন্দর। কারণ এই অতি উচ্চ ইন্দ্রপদ তাকে অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন করেছিল, অতএব আপনি তার সমস্ত ঐশ্বর্য অপহরণ করে তাকে বিশেষভাবে কৃপা করেছেন। জড় ঐশ্বর্য এমনই মোহজনক যে, তা বিদ্বান এবং আত্মসংযত ব্যক্তিকেও আত্মজ্ঞানের লক্ষ্য থেকে ভ্রষ্ঠ করে। কিন্তু জগদীশ্বর ভগবান নারায়ণ তাঁর ইচ্ছার দ্বারা সব কিছু দর্শন করতে পারেন। অতএব আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তখন ব্রহ্মা কৃতাঞ্জলিপুটে অদূরে দণ্ডায়মান প্রহ্লাদ মহারাজের শ্রুতিগোচরেই ভগবানকে বলতে লাগলেন। বলি মহারাজের সাধ্বী পত্নী তাঁর পতিকে পাশবদ্ধ দর্শন করে ভীতা এবং ব্যাকুলিতা হয়েছিলেন। তিনি তখন ভগবান বামনদেবকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং কৃতাঞ্জলিপুটে অবনত বদনে এই কথাগুলি বলেছিলেন।”
শ্রীমতি বিন্ধ্যাবলি বললেন- “হে প্রভু, আপনি আপনার লীলা-বিলাসের আনন্দ আস্বাদনের জন্য এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মূর্খ ব্যক্তিরা তাদের ভোগবুদ্ধিবশত এই জগতের উপর প্রভুত্ব আরোপ করে। তারা নিশ্চিতভাবে নির্লজ্জ সংশয়বাদী। মিথ্যা প্রভুত্ব দাবি করে তারা মনে করে যে, তারা দান করতে পারে এবং ভোগ করতে পারে। এই অবস্থায়, জগতের স্বতন্ত্র স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা আপনার প্রীতি সাধনের জন্য তারা কি করতে পারে?”
শ্রীব্রহ্মা বললেন- “হে ভূতভাবন, হে ভূতেশ, হে দেবদেব, হে জগন্ময়, আপনি বলির যথাসর্বস্ব হরণ করেছেন, এখন আপনি এঁকে মুক্ত করুন। তিনি আর দণ্ডযোগ্য নন। বলি মহারাজ ইতিমধ্যেই সব কিছু আপনাকে দান করেছেন। অকাতরে তিনি তাঁর ভূমি, লোক এবং তাঁর পূর্ণকর্মের দ্বারা তিনি যা কিছু অর্জন করেছিলেন সেই সব, এমন কি তাঁর দেহ পর্যন্ত আপনাকে দান করেছেন। আপনার শ্রীপাদপদ্মে জল, দূর্বা অথবা ফুলের কলি নিবেদন করে, নিষ্কপট ব্যক্তি চিৎ-জগতে উত্তম গতি লাভ করেন। এই বলি মহারাজ ত্রিভুবনের সব কিছুই আপনাকে অকাতর চিত্তে দান করেছেন । তা হলে কেন তিনি বন্দী হওয়ার কষ্ট ভোগ করবেন?”
ভগবান বললেন- “হে ব্রহ্মা, জড় ঐশ্বর্যের প্রভাবে মূর্খ ব্যক্তি স্থূলবুদ্ধি এবং উন্মত্ত হয়। তার ফলে সে এই ত্রিভুবনে কউকে সম্মান করেন না, এমন কি আমাকে পর্যন্ত অবজ্ঞা করে। আমি এই প্রকার ব্যক্তি সর্বস্ব অপহরণ করে তার প্রতি বিশেষ কৃপা প্রদর্শন করি। পরতন্ত্র জীব তার কর্মফলে সংসার-চক্রে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করতে করতে ভাগ্যক্রমে কদাচিৎ মনুষ্যজন্ম প্রাপ্ত হয়। এই মনুষ্যজন্ম অত্যন্ত দুর্লভ। কোন মানুষ যদি সম্ভ্রান্ত পরিবারে বা উচ্চকুলে জন্ম, অদ্ভুত কর্ম, যৌবন, দেহের সৌন্দর্য, বিদ্যা এবং ঐশ্বর্য বা ধনের গর্বে গর্বিত না হয়, তা হলে বুঝতে হবে যে, সে ভগবানের বিশেষ কৃপা লাভ করেছে। যদিও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম আদি ঐশ্বর্য ভগবদ্ভক্তিকে উন্নতি সাধনের প্রতিবন্ধক যেহেতু সেগুলি অভিমান এবং দম্ভের মূল কারণ, তবুও এই সমস্ত ঐশ্বর্য ভগবানের শুদ্ধ ভক্তকে বিচলিত করে না। বলি মহারাজ দৈত্য এবং দানবদের মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত হয়েছে, কারণ সে তার সমস্ত ঐশ্বর্য থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভক্তিতে অবিচলিত ছিল। বলি মহারাজ যদিও তার ধন-সম্পদ হারিয়েছে, তার উচ্চপদ থেকে অধঃপতিত হয়েছে, শত্রুদের দ্বারা পরাজিত হয়ে বন্দী হয়েছে, আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছে, বন্ধনের দ্বারা পীড়িত হয়েছে এবং গুরুর দ্বারা তিরস্কৃত ও অভিশপ্ত হয়েছে, তবুও সে তার প্রতিজ্ঞায় অবিচলিত ছিল এবং সত্যভ্রষ্ট হয়নি। আমি কপটতাপূর্বক ধর্মতত্ত্ব বলেছিলাম, তবুও সে ধর্ম পরিত্যাগ করেনি, কারণ সে সত্যপ্রতিজ্ঞ।”
“তার মহান সহনশক্তির ফলে আমি তাকে সেই স্থান প্রদান করেছি যা দেবতাদেরও দুর্লভ। সাবর্ণি মন্বন্তরে সে দেবলোকের রাজা ইন্দ্র হবে। সেই ইন্দ্রপদ প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত বলি মহারাজ বিশ্বকর্মা বিরচিত সুতললোকে বাস করবে। সেই স্থান যেহেতু আমার দ্বারা বিশেষভাবে সংরক্ষিত, তাই সেখানে মানসিক ক্লেশ, দৈহিক ক্লেশ, ক্লান্তি, তন্দ্রা, পরাজয় প্রভৃতি উপদ্রব নেই। বলি মহারাজ, এখন তুমি সেখানে গিয়ে শান্তিতে বাস কর। হে বলি মহারাজ (ইন্দ্রসেন), এখন তুমি দেবতাদেরও বাঞ্ছিত সুতললোক যেতে পার। সেখানে তোমার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব পরিবৃত হয়ে তুমি শান্তিতে বসবাস কর। তোমার কল্যাণ হোক। সুতললোক সাধারণ মানুষদের কি কথা, লোকপালেরাও তোমাকে পরাভূত করতে পারবে না। আর দৈত্যেরা যদি তোমার শাসন লঙ্ঘন করে, তা হলে আমার চক্র তাদের সংহার করবে। হে মহাবীর, আমি সর্বদা তোমার সঙ্গে থাকব এবং তোমার পার্ষদগণ ও উপকরণ সহ তোমাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করব। অধিকন্তু, সেখানে তুমি আমাকে সর্বদা দর্শন করতে পারবে। সেখানে আমার পরম প্রভাব দর্শন করার ফলে, দানব এবং দৈত্যদের সঙ্গ প্রভাবে তোমার যে জড় ধারণা এবং উৎকন্ঠার উদয় হয়েছে, তা তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয়ে যাবে।”
দ্বাবিংশতি অধ্যায়- বলি মহারাজের আত্মসমর্পণ
30 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ