একবিংশতি অধ্যায়- ভগবান কর্তৃক বলি মহারাজের বন্ধন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পদ্মফুলে যাঁর জন্ম হয়েছিল সেই ব্রহ্মা যখন দেখলেন, ভগবান বামনদেবের পদ-নখচন্দ্রের ছটায় তাঁর ধাম ব্রহ্মলোকের দ্যুতি নিষ্প্রভ হয়েছে, তখন তিনি ভগবানের সমীপবর্তী হয়েছিলেন। মরীচি প্রমুখ ঋষিগণ এবং সনন্দন প্রমুখ মহাব্রত যোগীরাও তখন ব্রহ্মার সঙ্গে ছিলেন। হে রাজন্, তখন পার্ষদ সহ ব্রহ্মাকে নিতান্ত তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিল। তখন যম, নিয়ম, ন্যায়, শাস্ত্র, ইতিহাস, শিক্ষা, কল্প প্রভৃতি গ্রন্থ, পুরাণ, সংহিতা, বেদ, আযুর্বেদাদি, উপবেদে পূর্ণরূপে অভিজ্ঞ মহাত্মাগণ এবং যাঁরা যোগবায়ুর দ্বারা প্রজ্বলিত জ্ঞানাগ্নির বলে কর্মফল দগ্ধ করেছেন, সেই সমস্ত পুরুষগণ, অন্যান্য সত্যলোকবাসীগণ যাঁরা শ্রীহরির সেই পাদপদ্মের স্মরণ করার ফলে কর্মফলের দ্বারা অলভ্য এই ব্রহ্মালোক প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা সকলেই শ্রীহরির পাদপদ্ম বন্দনা করতে লাগলেন। তারপর ব্রহ্মা ঊর্ধ্বদিকে প্রসারিত বিষ্ণুর পাদপদ্মের উদ্দেশ্যে পাদ্যার্ঘ্য প্রদান করলেন এবং ভগবানের নাভিপদ্ম থেকে যাঁর জন্ম হয়েছিল সেই ব্রহ্মা ভক্তিভরে বিষ্ণুর অর্চনা করে স্তব করতে লাগলেন। হে রাজন্, ব্রহ্মার কমণ্ডলুর জল উরুক্রম বামনদেবের পাদপদ্ম ধৌত করে অত্যন্ত পবিত্র হওয়ার স্বর্ধুনীরূপে পরিণত হয়েছিল। সেই নদী আকাশে প্রবাহিত হয়ে ভগবানের বিমল কীর্তির মতো ত্রিলোক পবিত্র করছে। ব্রহ্মা এবং বিভিন্ন লোকের সমস্ত লোকপালগণ তাঁদের পরম প্রভু বামনদেবের পূজা করতে শুরু করেছিলেন, যিনি তাঁর সর্বব্যাপ্ত রূপকে ছোট করে তাঁর আদি রূপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁর পূজার জন্য সমস্ত উপচার সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁরা সুগন্ধি, ফুল, জল, পাদ্য, অর্ঘ্য, অগুরু-চন্দন অনুলেপন, ধূপ, দীপ, খই, অক্ষত শস্য, ফল, অঙ্কুর, ভগবানের মাহাত্মসূচক স্তব, জয়ধ্বনি, নৃত্য, বাদ্য, গীত, শঙ্খ এবং দুন্দুভির ধ্বনি সহকারে ভগবানের আরাধনা করেছিলেন। ঋক্ষরাজ জাম্ববানও তখন সেই উৎসবে সমাগত হয়ে ভেরীর শব্দে সর্বদিকে ভগবান বামনদেবের বিজয় ঘোষণা করেছিলেন। বলি মহারাজের অনুগামী অসুরেরা যখন দেখল, যজ্ঞ অনুষ্ঠানে দৃঢ়সঙ্কল্প তাদের প্রভুর সর্বস্ব ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষার অছিলায় বামনদেব অপহরণ করেছেন, তখন তারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বলতে লাগল।”
“এই বামন নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণ নয়, এ মায়াবীশ্রেষ্ঠ বিষ্ণু। ব্রাহ্মণবেশে তার স্বরূপ গোপন করে সে দেবতাদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছে। আমাদের প্রভু বলি মহারাজ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য তাঁর দণ্ডদানের ক্ষমতা পরিত্যাগ করেছেন। সেই সুযোগে আমাদের চিরশত্রু বিষ্ণু ব্রহ্মচারী ভিক্ষুকবেশে তাঁর সর্বস্ব হরণ করেছে। আমাদের প্রভু বলি মহারাজ সর্বদাই সত্যব্রত, বিশেষ করে এখন, যেহেতু তিনি যজ্ঞ অনুষ্ঠানে দীক্ষিত হয়েছেন। তিনি সর্বদাই ব্রাহ্মণদের হিতকারী এবং দয়াবান, তিনি কখনই মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। ‘তাই আমাদের কর্তব্য এই বামনরূপী বিষ্ণুকে বধ করা। এটিই আমাদের ধর্ম এবং আমাদের প্রভুর সেবা করার উপায়।’ এইভাবে সঙ্কল্প করে বলি মহারাজের অনুচর অসুরেরা বামনদেবকে বধ করার উদ্দেশ্যে অস্ত্রধারণ করেছিল।”
“হে রাজন্, স্বভাবত ক্রুদ্ধ অসুরেরা উত্তেজিত হয়ে তাদের শূল, ভল্ল আদি অস্ত্র হাতে নিয়ে বলি মহারাজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভগবান বামনদেবকে বধ করার জন্য ধাবিত হয়েছিল। হে রাজন্, হিংসা-পরায়ণ হয়ে দৈত্যসৈন্যদের আসতে দেখে, ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অনুচরেরা হেসেছিলেন। তাঁদের অস্ত্র উদ্যত করে তাঁরা দৈত্যদের নিষেধ করতে লাগলেন। অযুত হস্তীতুল্য বলশালী ভগবৎ-পার্ষদ নন্দ, সুনন্দ, জয়, বিজয়, প্রবল, বল, কুমুদ, কুমুদাক্ষ, বিষ্বক্‌সেন,পতত্রিরাট্ (গরুড়), জয়ন্ত, শ্রুতদেব, পুষ্পদন্ত এবং সাত্বত অসুর-সৈন্যদের বিনাশ করেছিলেন। বলি মহারাজ যখন দেখলেন, তাঁর সৈন্যেরা বিষ্ণুর পার্ষদদের দ্বারা নিহত হচ্ছে, তখন তিনি শুক্রাচার্যের অভিশাপ স্মরণ করে তাঁর সৈন্যদের যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। হে বিপ্রচিত্তি, হে রাহু, হে নেমি, তোমরা আমার কথা শ্রবণ কর। এক্ষুনি যুদ্ধ বন্ধ কর, কারণ বর্তমান কাল আমাদের অনুকূল নয়। হে দৈত্যগণ, যিনি সমস্ত জীবের সুখ এবং দুঃখ প্রদানকারী সেই ভগবানকে কেউই পৌরুষের দ্বারা পরাস্ত করতে পারে না। ভগবানের প্রতিনিধি কাল, যিনি পূর্বে আমাদের অনুকূল ছিলেন এবং দেবতাদের প্রতিকূল ছিলেন, সেই কাল এখন আমাদের বিপরীত হয়েছেন। কোন জীবই বল, মন্ত্রীদের পরামর্শ, বুদ্ধি, রাজনীতি, দুর্গ, মন্ত্র, ঔষধি অথবা অন্য কোন উপায়ের দ্বারা ভগবানের প্রতিনিধি কালকে অতিক্রম করতে পারে না। পূর্বে দৈববলে বলীয়ান হয়ে তোমরা বহুবার বিষ্ণুর এই সমস্ত অনুচরদের যুদ্ধে পরাজিত করেছ, আজ তারাই যুদ্ধে আমাদের পরাজিত করে সিংহনাদ করছে। দৈব যদি আমাদের অনুকূল হয়, তা হলে আমরা আবার তাদের পরাজিত করতে পারব। অতএব সেই অনুকূল কালের জন্য প্রতীক্ষা করা কর্তব্য।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, বিষ্ণুর অনুচরদের দ্বারা বিতাড়িত দৈত্যদানবযূথপতিরা তাদের প্রভুর আজ্ঞা শ্রবণ করে রসাতলে প্রবেশ করেছিল। তারপর যজ্ঞান্তে সোমরস পানের দিন পক্ষীরাজ গরুড় তাঁর প্রভুর অভিলাষ বুঝতে পেরে, বরুণ পাশের দ্বারা বলি মহারাজকে বন্ধন করেছিলেন। সর্বোত্তম প্রভাবশালী ভগবান বিষ্ণু যখন এইভাবে বলি মহারাজকে বন্ধন করলেন, তখন ঊর্ধ্ব এবং অধঃলোকের সমস্ত দিকে এক মহা হাহাকার ধ্বনি উত্থিত হয়েছিল।”
“হে রাজন্, ভগবান বামনদেব তখন বরুণপাশে আবদ্ধ নষ্টশ্রী অথচ স্থিরবুদ্ধি, উদার এবং যশস্বী বলি মহারাজকে বলেছিলেন। হে দৈত্যরাজ, তুমি আমাকে ত্রিপাদ ভূমি দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, কিন্তু আমি দুই পদেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড আবৃত করেছি। এখন আমার তৃতীয় পদ কোথায় স্থাপন করব তা তুমি স্থির কর। নক্ষত্রগণ সহ সূর্য ও চন্দ্র যতদূর কিরণ বিতরণ করে এবং যতদূর মেঘ বারি বর্ষন করে, ব্রহ্মাণ্ডের সেই সমস্ত ভূমি তোমার অধিকারে রয়েছে। তোমার অধিকৃত ভূমির মধ্যে আমি এক পদবিন্যাসের দ্বারা ভূর্লোক অধিকার করেছি এবং আমার শরীরের দ্বারা সমগ্র আকাশ ও সমস্ত দিক অধিকার করেছি এবং তোমার উপস্থিতিতে আমার দ্বিতীয় পদবিন্যাসের দ্বারা আমি স্বর্গলোক অধিকার করেছি। তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি অনুসারে দান না করতে পারায়, তোমার পাতালে বাসই শাস্ত্রসম্মত। অতএব, তোমার গুরু শুক্রাচার্যের নির্দেশ অনুসারে তুমি পাতালে গিয়ে বাস কর। যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুত বস্তু প্রদান না করে যাচককে বঞ্চিত করে, তার স্বর্গে উন্নীত হওয়া অথবা মনোবাসনা পূর্ণ হওয়া তো দূরের কথা, সে নরকে অধঃপতিত হয়। তুমি তোমার ঐশ্বর্যগর্বে গর্বিত হয়ে আমাকে ভূমি দান করার প্রতিজ্ঞা করেছিলে, কিন্তু তোমার সেই প্রতিজ্ঞা তুমি পূর্ণ করতে পারনি। তাই এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গরূপ মিথ্যা বাক্যের ফলে তুমি কয়েক বছর নরক ভোগ কর।”

Leave a Reply

March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Blog Stats

  • 140,943 hits