শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, কুলগুরু শুক্রাচার্যের দ্বারা এইভাবে উপদিষ্ট হয়ে, বলি মহারাজ ক্ষণকাল মৌনভাবে বিচার করে তাঁর গুরুদেবকে বলতে লাগলেন।”
বলি মহারাজ বললেন- “আপনি বলেছেন, যে ধর্ম অর্থনৈতিক উন্নতি, ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ, যশ এবং জীবিকার প্রতিবন্ধক নয়, তাই গৃহস্থদের প্রকৃত ধর্ম। আমিও সেই কথা সত্য বলে মনে করি। আমি প্রহ্লাদ মহারাজের পৌত্র। আমি ভূমি দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, অর্থের লালসায় কিভাবে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারি? আমি কিভাবে একজন সাধারণ প্রবঞ্চকের মতো আচরণ করতে পারি, বিশেষ করে একজন ব্রাহ্মণের প্রতি? অসত্য থেকে গুরুতর অধর্ম আর কিছুই নেই। সেই জন্যই মাতা বসুন্ধরা বলেছিলেন, “আমি মিথ্যাবাদী মানুষ ব্যতীত অন্য যে কোন ভার বহন করতে পারি।” আমি ব্রাহ্মণকে বঞ্চিত করতে যেভাবে ভয় করি, নরক, দারিদ্র্য, দুঃখের সমুদ্র, পদচ্যুতি কিংবা মৃত্যু থেকেও আমি ততটা ভীত নই।”
“হে প্রভু, দেখুন, এই জগতের সমস্ত সম্পদ মৃত পুরুষকে পরিত্যাগ করে। অতএব, যে সম্পদ মৃত্যুতে নষ্ট হয়ে যাবে, সেই সম্পদ দিয়ে তাঁর প্রসন্নতা বিধান করা হোক না কেন? দধীচি, শিবি প্রভৃতি মহাত্মাগণ জনসাধারণের উপকারের জন্য তাঁদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। এটিই ঐতিহাসিক প্রমাণ। অতএব এই সামান্য ভূমি পরিত্যাগে বিবেচনা করার কি আছে?”
“হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, যুদ্ধে অপরাঙ্খুখ যে সমস্ত মহান দৈত্য রাজারা এই পৃথিবী ভোগ করেছিলেন, কাল তাঁদের সব কিছু হরণ করে নিয়েছে, কিন্তু পৃথিবীতে তাঁদের সঞ্চিত যশোরাশি হরণ করতে পারেনি। অর্থাৎ কেবল যশ লাভ করারই চেষ্টা করা উচিত। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, বহু মানুষ যুদ্ধে ভীত না হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, কিন্তু তীর্থস্থান সৃষ্টি করেন যে মহাত্মা তাঁকে শ্রদ্ধা সহকারে সমস্ত ধন দান করার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। দান করার ফলে উদার কারুণিক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে আরও মঙ্গলজনক হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে আপনার মতো ব্যক্তিকে যখন দান করা হয়। অতএব এই ক্ষুদ্র ব্রহ্মচারী আমার কাছে যা চাইবেন, আমি তাই তাঁকে দান করব।”
“হে মুনিবর, বেদবিহিত যজ্ঞকর্মে নিপুণ আপনার মতো মহাত্মারা সর্ব অবস্থাতেই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করেন। তাই সেই বিষ্ণু আমাকে সমস্ত বর দান করবার জন্যই আসুন অথবা শত্রুরূপে দণ্ডদান করবার জন্যই আসুন, আমার কর্তব্য তাঁর আদেশ পালন করে তাঁর অনুরোধ অনুসারে তাঁকে তাঁর প্রার্থিত ভূমি দান করা। তিনি স্বয়ং বিষ্ণু হলেও ভয়বশত ব্রাহ্মণরূপ ধারণ করে আমার কাছে ভিক্ষা করতে এসেছেন। অতএব, যেহেতু তিনি ব্রাহ্মণরূপে এসেছেন, তাই তিনি যদি অধর্ম সহকারে আমাকে বন্ধন করেন অথবা হত্যাও করেন, তবুও আমি এই শত্রুকেও হিংসা করব না। যদি ইনি উত্তমশ্লোক বিষ্ণুই হন, তা হলে তিনি তার কীর্তি পরিত্যাগ করবেন না; হয় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে বধ করে এই ভূমি গ্রহণ করবেন, নয়তো আমার দ্বারা নিহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই শয়ন করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর গুরু শুক্রাচার্য ভগবানের প্রেরণাবশত উদারচরিত্র, সত্যপ্রতিজ্ঞ, তাঁর বাক্যে অশ্রদ্ধাসম্পন্ন এবং তাঁর আদেশ লঙ্ঘনকারী শিষ্য বলি মহারাজকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। যদিও তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবুও তুমি নিজেকে মস্ত বড় পণ্ডিত বলে মনে করছ এবং তাই তুমি এতই উদ্ধত হয়েছ যে, আমার আদেশ লঙ্ঘন করছ। আমাকে এইভাবে উপেক্ষা করার ফলে তুমি অচিরেই তোমার সমস্ত ঐশ্বর্যভ্রষ্ট হবে।”
“তাঁর গুরুর দ্বারা অভিশপ্ত হওয়া সত্ত্বেও মহাপুরুষ বলি মহারাজ তাঁর প্রতিজ্ঞা থেকে বিচলিত হননি। তাই, প্রথা অনুসারে তিনি বামনদেবকে প্রথমে জলদান করেছিলেন, তারপর প্রতিশ্রুত ভূমি দান করেছিলেন। মুক্তামালায় শোভিতা বলি মহারাজের পত্নী বিন্ধ্যাবলি তখন ভগবানের পাদপ্রক্ষালনের জন্য জলপূর্ণ স্বর্ণকলস নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। যজমান বলি তখন হর্ষভরে ভগবান বামনদেবের শ্রীপাদপদ্ম প্রক্ষালন করেছিলেন এবং তারপর বিশ্বপাবন সেই চরাণামৃত তাঁর মস্তকে ধারন করেছিলেন। তখন স্বর্গস্থিত দেবতা, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, সিদ্ধ এবং চারণেরা বলি মহারাজের নিষ্কপটতায় অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, তাঁর মহৎ গুণাবলীর প্রশংসা করে তাঁর উপর পুষ্প বর্ষণ করতে লাগলেন। তখন গন্ধর্ব, কিম্পুরুষ এবং কিন্নরেরা হাজার হাজার দুন্দুভি বারংবার নিনাদিত করে মহা আনন্দে ঘোষণা করতে লাগলেন- “এই বলি মহারাজ কত মহান এবং তিনি কি সুদুষ্কর কর্ম অনুষ্ঠান করেছেন! যদিও তিনি জানতেন যে, বিষ্ণু তাঁর শত্রুদের পক্ষাপাতী, তবুও তিনি তাঁকে ত্রিলোক দান করেছেন।’ ”
“তখন অনন্ত ভগবানের বামনরূপ বর্ধিত হতে লাগল। পৃথিবী, আকাশ, দিকসমূহ, ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন রন্ধ্র, সমুদ্র, পশু, পক্ষী, মানুষ, দেবতা এবং ঋষিগণ সেই বিগ্রহে অবস্থিত ছিল। বলি মহারাজ তখন সমস্ত ঋত্বিক, আচার্য এবং সদস্যগণ সহ ভগবানের ষড়ৈশ্বর্য সমন্বিত বিরাট শরীর দর্শন করেছিলেন। সেই শরীরে সমস্ত স্থূল উপাদান, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের বিষয়, মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার, বিভিন্ন প্রকার জীব এবং ত্রিগুণের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আদি ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু ছিল। তারপর, ইন্দ্রপদে অধিষ্ঠিত বলি মহারাজ ভগবানের সেই বিশ্বরূপের পদতলে রসাতল প্রভৃতি অধঃলোক, পদযুগলে পৃথিবী, জঙ্ঘায় পর্বতসমূহ, জানুতে পক্ষীসমূহ এবং ঊরুতে বায়ুগণকে দর্শন করলেন। বলি মহারাজ দেখলেন ভগবান উরুক্রমের বসনে সন্ধ্যাদেবী, গুহ্যদেশে প্রজাপতিগণ, কটির সম্মুখভাগে অন্তরঙ্গ পার্ষদগণ সহ নিজেকে, নাভিমণ্ডলে আকাশ, কুক্ষিদেশে সপ্ত সমুদ্র এবং বক্ষে নক্ষত্ররাজি। হে রাজন্, তিনি দেখলেন মুরারির হৃদয়ে ধর্ম, স্তনদ্বয়ে প্রিয় ও সত্য বাক্য, মনে চন্দ্র, বক্ষে পদ্মহস্তা লক্ষ্মীদেবী, কন্ঠে সমস্ত বেদ এবং সমস্ত শব্দরাজি, বাহুতে ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগণ, কর্ণদ্বয়ে দিকসমূহ, মস্তকে স্বর্গ, কেশে মেঘমালা, নাসিকায় বায়ু, নেত্রদ্বয়ে সূর্য, বদনে অগ্নিদেব। তাঁর বাক্যে সমস্ত বৈদিক মন্ত্র, জিহ্বায় বরুণদেব, ভ্রূযুগলে বিধি-নিষেধ, চোখের পলকের উন্মীলন এবং নিমীলনে দিবা ও রাত্রি, ললাটে ক্রোধ, অধরে লোভ। হে রাজন্, তাঁর স্পর্শে কাম, তাঁর বীর্যে সলিল, পৃষ্টে অধর্ম, পাদবিক্ষেপে যজ্ঞ, ছায়ায় মৃত্যু, হাসিতে মায়া এবং শরীরের রোমরাজিতে ওষধিসমূহ। তাঁর নাড়ীসমূহে নদী, নখে শিলারাশি, বুদ্ধিতে ব্রহ্মা, দেবতা ও ঋষিবৃন্দ, ইন্দ্রিয়সমূহে এবং সমগ্র শরীরে স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীব। এইভাবে বলি মহারাজ ভগবানের বিরাট শরীরে সব কিছু দর্শন করেছিলেন।”
“হে রাজন্, বলি মহারাজের অনুগামী অসুরেরা যখন ভগবানের বিরাটরূপে নিখিল ভুবন, সুদর্শন চক্র, অসহ্য তেজসম্পন্ন মেঘের মতো শব্দশালী শার্ঙ্গ ধনুক দর্শন করেছিল, তখন তারা সকলে তাদের হৃদয়ে খেদ অনুভব করেছিল। তখন মেঘের মতো গভীর নাদযুক্ত পাঞ্চজন্য শঙ্খ, অত্যন্ত বেগবতী কৌমোদকী নামক গদা, বিদ্যাধর নামক অসিত, শত শত চন্দ্রাকৃতি ফলকযুক্ত ঢাল এবং অক্ষয়সায়ক নামক শ্রেষ্ঠ তূণ- তাঁরা সকলেই একত্রে ভগবানের স্তব করতে লাগলেন। সমস্ত লোকপালগণ সহ সুনন্দ আদি প্রধান পার্ষদেরা উজ্জ্বল কিরীট, অঙ্গদ, মকর আকৃতি কুণ্ডল শোভিত ভগবানের স্তব করতে লাগলেন। ভগবানের বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন এবং কৌস্তুভ মণি ছিল। তাঁর পরনে পীতবসন, মেখলা এবং তিনি মধুকর বেষ্টিত ফুলমালায় শোভিত ছিলেন। হে রাজন্, এইভাবে নিজেকে প্রকাশ করে ভগবান ত্রিবিক্রম তাঁর এক পায়ের দ্বারা সমগ্র পৃথিবী, তাঁর শরীরের দ্বারা আকাশ এবং হস্তের দ্বারা বিভিন্ন দিক আচ্ছাদিত করেছিলেন। ভগবান যখন তাঁর দ্বিতীয় পদবিন্যাসের দ্বারা স্বর্গলোক আচ্ছাদিত করেছিলেন, তখন আর তৃতীয় পদবিক্ষেপের জন্য অনুমাত্র স্থানও ছিল না, কারণ ভগবানের চরণ স্বর্গ থেকে ক্রমশ ঊর্ধ্বদেশে প্রসারিত হতে হতে মহর্লোক, জনলোক এবং তপোলোকের অতীত সত্যলোক প্রাপ্ত হয়েছিল।”
বিংশতি অধ্যায়- বলি মহারাজের সর্বস্ব সমর্পণ
24 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ