শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ব্রহ্মা এইভাবে ভগবানের কর্ম এবং বীর্য সম্বন্ধে স্তব করলে, জন্ম-মৃত্যু রহিত ভগবান অদিতির গর্ভে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর চতুর্ভুজ শঙ্খ, গদা, পদ্মা এবং চক্র শোভিত, তাঁর পরনে পীতবসন এবং তাঁর চোখ দুটি যেন পূর্ণবিকশিত কমলদলের মতো। ভগবানের দেহ শ্যামবর্ণ এবং সর্বতোভাবে মায়ামুক্ত। মকরকুণ্ডল শোভিত তাঁর মুখপদ্মা অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে শোভা পাচ্ছিল। তাঁর বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন, হাতে বলয়, বাহুতে অঙ্গদ, মাথায় মুকুট, কটিদেশে মেখলা, বক্ষে যজ্ঞসূত্র এবং পায়ে নূপুর শোভা পাচ্ছিল। ভগবানের গলদেশ এক অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত ফুলমালায় সুশোভিত ছিল এবং সেই ফুলগুলি অত্যন্ত সুবাসিত হওয়ার ফলে, মধুকরকুল মধুলোভে গুঞ্জন করতে করতে তাঁর চতুর্দিকে উড়ছিল। কন্ঠে কৌস্তুভ মণি ধারণ করে ভগবান যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তাঁর কান্তি প্রজাপতি কশ্যপের গৃহের অন্ধকার দূর করেছিল। তখন সর্বদিক, নদী, সাগর আদি জলাশয় এবং সকলের হৃদয় নির্মল হয়েছিল। বিভিন্ন ঋতু তাদের নিজ নিজ গুণ প্রদর্শন করেছিল এবং স্বর্গ, অন্তরীক্ষা ও পৃথিবীর সমস্ত জীবেরা হরষিত হয়েছিল। দেবতা, গাভী, ব্রাহ্মণ এবং সমস্ত গিরিপর্বত আনন্দে মগ্ন হয়েছিল। শ্রবণ দ্বাদশীর দিন (ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশী) যখন চন্দ্র শ্রবণস্থ হয়েছিল, অভিজিৎ নক্ষত্রে পরম শুভলগ্নে ভগবান এই ব্রহ্মাণ্ডে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভগবানের আবির্ভাব অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে মনে করে, সূর্য থেকে শনি পর্যন্ত সমস্ত নক্ষত্র এবং গ্রহ অত্যন্ত উদার ও মঙ্গলপ্রদ হয়েছিল।”
“হে রাজন্! দ্বাদশী তিথিতে ভগবান যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, সূর্য তখন মধ্য গগনে ছিল। পণ্ডিতেরা তা জানেন। এই দ্বাদশী বিজয়া নামে প্রসিদ্ধ। তখন শঙ্খ, দুন্দুভি, মৃদঙ্গ, পণব আনক প্রভৃতির ঐক্যতান ধ্বনিত হয়েছিল। এই সমস্ত বাদ্যযন্ত্র এবং অন্যান্য বিবিধ বাদ্যযন্ত্রের তুমুল শব্দ উত্থিত হয়েছিল। তখন অপ্সরাগণ আনন্দে নৃত্য করেছিলেন, শ্রেষ্ঠ গন্ধর্বগণ গান গেয়েছিলেন এবং মুনি, দেবতা, মনু, পিতৃ ও অগ্নিদেবগণ ভগবানের প্রসন্নতা বিধানের জন্য স্তব করেছিলেন। সিদ্ধ, বিদ্যাধর, কিম্পুরুষ, কিন্নর, চারণ, যক্ষ, রাক্ষস, সুপর্ণ, শ্রেষ্ঠ ভুজঙ্গ এবং দেবতাদের অনুচরগণ ভগবানের মহিমা কীর্তন করে নৃত্য করতে করতে অদিতির আশ্রম পুষ্পবর্ষণে সমাকীর্ণ করেছিল। অদিতি যখন দেখলেন যে, ভগবান তাঁর যোগমায়ার দ্বারা চিন্ময় শরীর ধারণ করে তাঁর গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়েছেন, তখন তিনি অত্যন্ত বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলেন। প্রজাপতি কশ্যপ তাঁকে দেখে বিস্ময়ে এবং আনন্দে অভিভূত হয়ে জয়ধ্বনি করেছিলেন। ভগবান অলঙ্কার এবং অস্ত্রসহ তাঁর আদি রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যদিও তাঁর এই নিত্য রূপ জড় জগতে প্রকাশিত নয়, তবুও তিনি এই রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারপর, তাঁর পিতা-মাতার সমক্ষেই একজন নটের মতো তিনি বামন ব্রাহ্মণকুমার হয়েছিলেন। মহর্ষিরা সেই বামন ব্রাহ্মণকুমারকে দর্শন করে অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন। তখন তাঁরা প্রজাপতি কশ্যপ মুনিকে অগ্রবর্তী করে তাঁর জাতকর্ম প্রভৃতি ক্রিয়া সম্পাদন করেছিলেন। সেই বামনদেবের উপনয়নের সময় স্বয়ং সূর্যদেব গায়ত্রী মন্ত্র উপদেশ করেছিলেন, বৃহস্পতি যজ্ঞসূত্র দান করেছিলেন এবং কশ্যপ মুনি মেখলা প্রদান করেছিলেন। পৃথিবী তাকে কৃষ্ণাজিন দান করেছিলেন, বনস্পতি চন্দ্রদেব তাঁকে ব্রহ্মদণ্ড (ব্রহ্মাচারীর দণ্ড) দান করেছিলেন, তাঁর মা অদিতি তাঁকে কৌপীন বসন দান করেছিলেন এবং স্বর্গ তাঁকে ছত্র দান করেছিলেন।”
“হে রাজন্, ব্রহ্মা সেই অব্যয় পরম পুরুষকে কমণ্ডলু দান করেছিলেন, সপ্তর্ষিগণ কুশ দান করেছিলেন এবং সরস্বতী দেবী রুদ্রাক্ষের মালা দান করেছিলেন। এইভাবে বামনদেবের উপনয়ন হলে, যক্ষরাজ কুবের তাঁকে ভিক্ষাপাত্র প্রদান করেছিলেন এবং সাক্ষাৎ ভগবতী জগন্মাতা ভবানী দেবী তাঁকে প্রথম ভিক্ষা প্রদান করেছিলেন। এইভাবে সকলের দ্বারা সমাদৃত হয়ে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মাচারী ভগবান বামনদেব তাঁর ব্রহ্মজ্যোতি প্রদর্শন করেছিলেন। তার ফলে তাঁর সৌন্দর্য ব্রহ্মর্ষিবৃন্দ সমন্বিত সেই সভার সৌন্দর্যকে অতিক্রম করেছিল। ভগবান শ্রীবামনদেব যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত করে অর্চনা করেছিলেন এবং তাতে সমিধের দ্বারা হোম নিবেদন করে যজ্ঞ করেছিলেন।”
“ভগবান যখন শুনলেন, ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণদের তত্তাবধানে বলি মহারাজ অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করছেন, তখন বলি মহারাজের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করার জন্য সমস্ত গুণে পরিপূর্ণ ভগবান তাঁর গুরুভারে প্রতি পদবিক্ষেপে পৃথিবীকে অবনত করতে করতে সেখানে গমন করেছিলেন। নর্মদা নদীর উত্তর তটে ভৃগুকচ্ছ নামক স্থানে ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা নিকটে উদিত সূযের মতো বামনদেবকে দর্শন করেছিরেন। হে রাজন্, তখন বামনদেবের তেজের প্রভাবে হতপ্রভু ঋত্বিকগণ, যজমান বলি এবং সভাসদেরা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন যে, যজ্ঞ দর্শন করার বাসনায় স্বয়ং সূর্যদেব, সনৎকুমার অথবা অগ্নিদেব সমাগত হয়েছেন কিনা। ভৃগুবংশীয় পুরোহিতেরা এবং তাঁদের শিষ্যেরা যখন এইভাবে নানা প্রকার তর্কবিতর্ক করছিলেন, তখন ভগবান বামনদেব দণ্ড, ছত্র এবং জলপূর্ণ কমণ্ডলু হাতে নিয়ে সেই অশ্বমেধ যজ্ঞমণ্ডপে প্রবেশ করেছিলেন। মৌঞ্জী মেখলা, যজ্ঞোপবীত, কৃষ্ণাজিনের উত্তরীয় ধারণ করে এবং জটাধারী ব্রাহ্মণ বালকরূপে ভগবান বামদেব সেই যজ্ঞস্থলে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর তেজের প্রভাবে সমস্ত পুরোহিত এবং তাঁদের শিষ্যগণ হতপ্রভ হয়েছিলেন। তাঁরা তখন তাঁদের আসন থেকে উত্থিত হয়ে, প্রণতি নিবেদন করে যথাযথভাবে অভিনন্দন করেছিলেন। যাঁর দেহের প্রতিটি অঙ্গ তাঁর দেহের সৌন্দর্যের অনুরূপ, সেই ভগবান বামনদেবকে দর্শন করে বলি মহারাজ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তাঁকে আসন প্রদান করেছিলেন। তারপর বলি মহারাজ মুক্ত পুরুষদের দৃষ্টিতে যিনি পরম সুন্দর সেই ভগবানকে স্বাগত বচনে অভিনন্দিত করে, তাঁর পাদদ্বয় প্রক্ষালনপূর্বক তাঁর অর্চনা করেছিলেন। দেবাদিদেব চন্দ্রমৌলি মহাদেব পরম ভক্তি সহকারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্ম উদ্ভুত গঙ্গাকে মস্তকে ধারণ করেন। ধর্মজ্ঞ বলি মহারাজও মহাদেবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভগবানের পাদপ্রক্ষালনের জল তাঁর মস্তকে ধারণ করেছিলেন।”
বলি মহারাজ তখন বামদেবকে বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, আমি আপনাকে আমার আন্তরিক স্বাগত জানাই এবং সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। দয়া করে আপনি আমাদের বলুন, আমরা আপনার জন্য কি করতে পারি। আমাদের মনে হয়, আপনি ব্রহ্মর্ষিদের সাক্ষাৎ মূর্তিমান তপস্বরূপ। হে ভগবান, যেহেতু আপনি কৃপা করে আমাদের গৃহে উপস্থিত হয়েছেন, তাই আমাদের পূর্বপুরুষেরা পরিতৃপ্ত হয়েছেন, আমাদের বংশ পবিত্র হয়েছে এবং এই যজ্ঞ অনুষ্ঠান যথাযথাভাবে সম্পন্ন হয়েছে। হে ব্রাহ্মণকুমার! আজ যজ্ঞাগ্নি শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে প্রজ্বলিত হয়েছে এবং আমি আপনার পাদধৌত জলের দ্বারা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছে। হে প্রভু, আপনার ক্ষুদ্র চরণ-কমলের স্পর্শের দ্বারা সারা পৃথিবী পবিত্র হয়েছে। হে ব্রাহ্মণকুমার! মনে হয়, আপনি যেন কোন কিছুর প্রার্থী হয়ে এখানে এসেছেন। অতএব, আপনি যা কিছু চান তাই আমার কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারেন। হে পূজ্যতম, আপনি আমার কাছ থেকে গাভী, স্বর্ণ, সুসজ্জিত গৃহ, সুস্বাদু আহার্য এবং পানীয়, ব্রাহ্মণকন্যা, সমৃদ্ধ গ্রাম, অশ্ব, হস্তী, রথ অথবা যা কিছু আপনি চান, তাই গ্রহণ করুন।”
অষ্টাদশ অধ্যায়- বামনদেবরূপে ভগবানের অবতরণ
15 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ