শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এইভাবে স্বীয় পতি কশ্যপের দ্বারা উপদিষ্টা হয়ে, অদিতি আলস্য পরিত্যাগ করে দ্বাদশ দিন অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত অনুষ্ঠান করেছিলেন। পূর্ণ একাগ্রতা সহকারে অদিতি ভগবানের চিন্তা করে, বুদ্ধিরূপ সারথির সাহায্যে মনরূপ রশ্মির দ্বারা ইন্দ্রিয়রূপ দুষ্ট অশ্বদের সংযত করেছিলেন। তিনি একাগ্র চিত্তে ভগবান বাসুদেবে মন স্থির করে পয়োব্রত আচরণ করেছিলেন। হে রাজন্, তখন অদিতির সম্মুখে চতুর্ভুজ পীতবাস, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী আদিপুরুষ ভগবান আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবান যখন অদিতির নেত্রের গোচরীভূত হয়েছিলেন, অদিতি তখন দিব্য আনন্দে অভিভূত হয়ে সহসা উত্থিত হয়েছিলেন এবং তারপর দণ্ডবৎ ভূপতিত হয়ে ভগবানকে তাঁর সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। অদিতি ভগবানের স্তব করতে সমর্থ না হয়ে কৃঞ্জলিপুটে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর নয়নযুগল তখন আনন্দাশ্রুতে পূর্ণ হয়েছিল, সারা দেহে রোমাঞ্চের সঞ্চার হতে লাগল এবং ভগবানের দর্শনজনিত গভীর আনন্দে তাঁর শরীর কম্পিত হতে লাগল। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, তারপর সেই দেবী অদিতি গভীর প্রেমে স্খলিত কন্ঠে ভগবানের স্তব করতে লাগলেন। তখন মনে হচ্ছিল তিনি যেন রমাপতি যজ্ঞেশ্বর জগৎপতিকে তাঁর চক্ষুর দ্বারা পান করেছিলেন।”
দেবী অদিতি বললেন- “হে যজ্ঞেশ্বর! হে যজ্ঞপুরুষ! হে অচ্যুত! হে পুণ্যকীর্তে! হে শ্রবণমঙ্গল নামধারী! হে ভগবান! হে পরমেশ্বর! হে তীর্থপাদ! বিপন্ন জনগণের দুঃখ উপশমের জন্য আবির্ভূত দীননাথ আপনি আমাদের মঙ্গলবিধান করুন। হে ভগবান, আপনি সর্বব্যাপক বিশ্বরূপ এবং এই বিশ্বের পূর্ণ স্বতন্ত্র স্রষ্টা, পালক ও সংহারক। যদিও আপনি জড় তত্ত্বে আপনিার শক্তি নিযুক্ত করেন, তবুও আপনি সর্বদা আপনার আদি স্বরূপে অবস্থিত থাকেন এবং কখনও সেই স্থিতি থেকে বিচ্যুত হন না। কারণ আপনার জ্ঞান অচ্যুত এবং আপনি সর্বদাই যে কোন পরিস্থিতির উপযুক্ত। আপনি কখনও মায়ার দ্বারা মোহিত হন না। হে ভগবান, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে অনন্ত! আপনি সন্তুষ্ট হলে ব্রহ্মার মতো দীর্ঘ আয়ু, স্বর্গ, মর্ত্য অথবা পাতালে ইচ্ছানুরূপ দেহ, অতুলনীয় ঐশ্বর্য, ধর্ম-অর্থ-কাম এই ত্রিবর্গ, পূর্ণ দিব্য জ্ঞান এবং অষ্ট যোগসিদ্ধি অনায়াসে লাভ হতে পারে। অতএব শত্রুজয়ের মতো তুচ্ছ লাভের কি আর কথা।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! হে ভারত! সর্বভূতের পরমাত্মা কমললোচন ভগবান অদিতির দ্বারা এইভাবে স্তুত হয়ে বলেছিলেন, ‘হে দেবমাতা! শত্রুদের দ্বারা হৃতসম্পদ এবং বাসস্থান থেকে বিচ্যুত তোমার পুত্রদের মঙ্গলের জন্য দীর্ঘকাল ধরে যে বাসনা তুমি তোমার মনের মধ্যে পোষণ করেছ তা আমি জানি। হে দেবী! আমি বুঝতে পারছি যে, তুমি মদোদ্ধত অসুরশ্রেষ্ঠদের যুদ্ধে জয় করে তোমার বাসস্থান এবং ঐশ্বর্য পুনঃপ্রাপ্ত হয়ে তোমার পুত্রগণ সহ আমার পূজা করতে ইচ্ছা করছ। ইন্দ্র যাঁদের জ্যেষ্ঠ সেই পুত্রদের দ্বারা যুদ্ধে নিহত শত্রুদের পত্নীগণকে তাদের মৃত পতির সামনে এসে বিলাপ করতে দেখার বাসনা করেছ। তোমার যে পুত্রেরা যশ এবং শ্রী হারিয়েছে, সেই পুত্রেরা সুসমৃদ্ধ হয়ে স্বর্গলোকে পুনরায় বাস করুক- তা তুমি দেখতে ইচ্ছা করছ।’ ”
“হে দেবমাতা! আমার মনে হয় যে, সমস্ত অসুর যূথপতিরাই প্রায় অজেয়, কারণ, ভগবান যাঁদের সর্বদা অনুগ্রহ করেন সেই ব্রাহ্মণদের দ্বারা তাঁরা সুরক্ষিত। তাই তাঁদের প্রতি বিক্রম প্রকাশ করা এখন সুখের কারণ হবে না। হে দেবী অদিতি! তবুও যেহেতু আমি তোমার ব্রত অনুষ্ঠানে সন্তুষ্ট হয়েছি, তাই তোমাকে অনুগ্রহ করার জন্য আমাকে কোন উপায় অবশ্যই চিন্তা করতে হবে। কারণ আমার অর্চনা কখনই বিফল হয় না- তা অবশ্যই অনুষ্ঠানকারীর বাসনানুরূপ ফল প্রদান করে। তোমার পুত্রদের রক্ষা করার জন্য তুমি পয়োব্রত পালন করে যথাযথভাবে আমার পূজা করেছ এবং স্তব করেছ। অতএব আমি কশ্যপ মুনির তপস্যায় স্থিত হয়ে স্বাংশে তোমার পুত্রত্ব গ্রহণ করব এবং তোমার অন্য পুত্রদের রক্ষা করব। আমি তোমার পতি কশ্যপের শরীরে অবস্থিত আছি, এইভাবে সর্বদা আমাকে চিন্তা করে তোমার পতির ভজনা কর, যিনি তাঁর তপস্যার প্রভাবে শুদ্ধ হয়েছেন। হে দেবী! কেউ জিজ্ঞাসা করলেও এই বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করো না। অত্যন্ত গোপনীয় বিষয় গোপন রাখলেই তা সফল হয়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই কথা বলে ভগবান সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। ভগবান তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন, এই দুর্লভ বর লাভ করে অদিতি কৃতার্থ হয়েছিলেন এবং পরম ভক্তি সহকারে তাঁর পতির সমীপবর্তী হয়েছিলেন। অব্যর্থদৃষ্টি কশ্যপ মুনি সমাধিযোগে দর্শন করেছিলেন যে, ভগবানের অংশ তার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছেন। বায়ু যেমন দুটি কাষ্ঠখণ্ডের মধ্যে ঘর্ষন করিয়ে আগুন উৎপাদন করে, তেমনই ভগবানের চিন্তায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন কশ্যপ মুনি অদিতির গর্ভে তাঁর তেজ সংস্থাপন করেছিলেন। ব্রহ্মা যখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভগবান অদিতির গর্ভে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তখন তিনি ভগবানের দিব্যনাম উচ্চারণ করে তাঁর স্তব করতে শুরু করেছিলেন।”
ব্রহ্মা বললেন- “হে ভগবান, আপনার জয় হোক! আপনার কার্যকলাপ অসাধারণ এবং সকলেই আপনার মহিমা কীর্তন করে। হে ব্রহ্মণ্যদেব, হে ত্রিগুণাধীশ, আপনাকে আমি বার বার আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। সমস্ত জীবের হৃদয়ে যিনি অন্তর্যামীরূপে প্রবিষ্ট হয়েছেন, সেই সর্বব্যাপ্ত ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। ত্রিভুবন তাঁর নাভিতে বিরাজ করে, তবুও তিনি ত্রিভুবনের অতীত। পূর্বে আপনি পৃশ্নির পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হে পরম স্রষ্টা, যাঁকে কেবল বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমেই হৃদয়ঙ্গম করা যায়, সেই আপনাকে আমি আমর সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, আপনি ত্রিভুবনের আদি, মধ্য এবং অন্ত। বেদে আপনি অনন্ত শক্তির উৎস পরমেশ্বর ভগবানরূপে পূজিত। হে প্রভু, গভীর স্রোত যেমন তৃণ, পল্লব আদি আকর্ষণ করে, তেমনই আপনি কালরূপে এই জগতের সকলকে আকর্ষণ করেন। হে ভগবান, আপনি স্থাবর অথবা জঙ্গম সমস্ত জীবের আদি জনক। আপনি প্রজাপতিদের জনক। হে প্রভু, নৌকা যেমন জলমগ্ন ব্যক্তির একমাত্র ভরসা, তেমনই আপনি স্বর্গভ্রষ্ট দেবতাদের একমাত্র আশ্রয়।”
সপ্তদশ অধ্যায়- ভগবানের অদিতির পুত্রত্ব স্বীকার
12 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ