পঞ্চদশ অধ্যায়- বলি মহারাজের স্বর্গলোক জয়

মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন- “ভগবান সব কিছুর অধীশ্বর হওয়া সত্ত্বেও কেন এক দরিদ্র ব্যক্তির মতো বলি মহারাজের কাছে ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা করেছিলেন এবং সেই প্রার্থিত বস্তু প্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি বলি মহারাজকে বন্ধন করেছিলেন? সেই আপাতবিরোধী আচরণের রহস্য জানতে আমার অত্যন্ত কৌতূহল হয়েছে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, বলি মহারাজ যখন যুদ্ধে তাঁর সমস্ত ঐশ্বর্য এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন, তখন ভৃগুমুনির বংশধর শুক্রাচার্য তাঁকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। সেই জন্য মহাত্মা বলি মহারাজ শুক্রাচার্যের শিষ্যত্ব বরণ করে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে, তাঁর সব কিছু তাঁকে নিবেদন করে তাঁকে সেবা করতে শুরু করেছিলেন। ভৃগু মুনির বংশধর ব্রাহ্মণেরা ইন্দ্রলোক জয়ের অভিলাষী বলি মহারাজের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাই, তাঁরা বলি মহারাজকে মহা অভিষেকের দ্বারা যথাবিধি অভিষিক্ত করে বিশ্বজিৎ-যজ্ঞ অনুষ্ঠানে নিযুক্ত করেছিলেন। যজ্ঞাগ্নিতে যখন ঘৃত আহুতি দেওয়া হয়েছিল, তখন সেই অগ্নি থেকে স্বর্ণময় ও রেশমী বস্ত্রে আচ্ছাদিত একটি রথ, ইন্দ্রের অশ্বের মতো পীতবর্ণ কতকগুলি অশ্ব এবং সিংহ চিহ্নিত একটি ধ্বজা উত্থিত হয়েছিল। স্বর্ণখচিত একটি ধনুক, দুটি অক্ষয় তূণীর এবং দিব্য কবচও আবির্ভূত হয়েছিল। বলি মহারাজের পিতামহ প্রহ্লাদ মহারাজ বলিকে এমন একটি পুষ্পের মালা দিয়েছিলেন, যা কখনও ম্লান হয় না। শুক্রাচার্য তাঁকে একটি শঙ্খ দান করেছিলেন। বলি মহারাজ এইভাবে ব্রাহ্মণদের উপদেশ অনুসারে সেই বিশেষ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন এবং তাঁদের কৃপায় যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তারপর তিনি তাঁদের প্রদক্ষিণ ও প্রণাম করে পিতামহ প্রহ্লাদ মহারাজকে সম্ভাষণপূর্বক প্রণাম করেছিলেন। তারপর বলি মহারাজ শুক্রাচার্য প্রদত্ত দিব্য রথে আরোহনপূর্বক, সুন্দর মালায় ভূষিত হয়ে, কবচের দ্বারা তাঁর দেহ আচ্ছাদিত করে ধনুক, খ্ড়্‌গ, তূণ ধারণ করেছিলেন। স্বর্ণবলয় এবং মরকত মণির কুণ্ডলে শোভিত হয়ে তিনি যখন রথে উপবেশন করেছিলেন, তখন তিনি আহ্বনীয় অগ্নির মতো শোভা পাচ্ছিলেন। তিনি যখন বল, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যে তাঁরই সমান তাঁর সৈন্য এবং দৈত্য যূথপতিদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল যেন তারা আকাশকে গ্রাস করছিল এবং দৃষ্টির দ্বারা দিকসমূহ দগ্ধ করছিল। এইভাবে অসুর সৈন্যদের সমবেত করে বলি মহারাজ পৃথিবী কম্পিত করতে করতে সমৃদ্ধশালী ইন্দ্রপুরীতে প্রস্থান করেছিলেন। সেই ইন্দ্রপুরী পত্র, পুষ্প, ও ফলের গুরুভারে অবনত দেববৃক্ষসমূহে পূর্ণ নন্দনকাননের মতো অতীব মনোরম উপবন এবং উদ্যানের দ্বারা অত্যন্ত রমণীয়। সেই সমস্ত উদ্যানগুলি কূজন-পরায়ণ বিহঙ্গ-মিথুন এবং গুঞ্জনরত ভ্রমরে পূর্ণ। সেই পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণরূপে স্বর্গীয়। হংস, সারস, চক্রবাক, কারণ্ডবসমূহে সমাকীর্ণ পদ্মসরোবর সমন্বিত সেই সমস্ত উদ্যানে দেবতাদের দ্বারা রক্ষিতা সুন্দরী রমণীরা খেলা করেন। সেই পুরী পরিখাস্বরূপ আকাশগঙ্গার দ্বারা এবং অগ্নিবর্ণ উচ্চ প্রাচীরের দ্বারা পরিবেষ্টিত। সেই প্রাচীরের উপর যুদ্ধস্থানসমূহ বিরচিত ছিল। সেখানকার দরজাগুলি স্বর্ণপট্টের দ্বারা নির্মিত এবং পুরদ্বারগুলি অপূর্ব সুন্দর স্ফটিকের দ্বারা নির্মিত। সেগুলি বিভিন্ন রাজপথের দ্বারা যুক্ত। সেই সমগ্র পুরীটি নির্মান করেছিলেন বিশ্বকর্মা। সেই নগর অঙ্গন, বিস্তৃত পথ, সভাগৃহ এবং কোটি কোটি বিমানে পূর্ণ ছিল। সেখানকার চতুষ্পথগুলি ছিল মণিময় এবং সেখানে হীরক ও প্রবাল নির্মিত উপবেশনের স্থান ছিল। নিত্য রূপ এবং যৌবন-সম্পন্না নির্মল বসনা, রূপবতী রমণীগণ অগ্নিশিখার মতো দীপ্তিশালিনী হয়ে সেই নগরীতে বিরাজ করতেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন শ্যামাগুণ সমন্বিতা। সেখানে বায়ু দেবাঙ্গনাদের কেশ থেকে নিপতিত ফুলের সৌরভ বহন করে পথে প্রবাহিত হয়। সেখানে অপ্সরাগণ স্বর্ণময় গবাক্ষ থেকে নির্গত অগুরুর গন্ধযুক্ত সিক্ত শুভ্র ধূমে আচ্ছাদিত পথে পরিভ্রমণ করেন। সেই পুরী মুক্তা শোভিত চন্দ্রাতপের দ্বারা সজ্জিত ছিল এবং সেখানকার প্রাসাদের গম্বুজগুলি মণি ও সুবর্ণময় পতাকা শোভিত ছিল। সেই পুরী সর্বদা ময়ূর, কপোত এবং মধুকরদের গুঞ্জনের নিনাদিত এবং সেখানে বিমানচারিণী সুন্দরী রমণীরা নিরন্তর যে মঙ্গলময় সংগীত গাইতেন তা ছিল অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। সেই পুরী মৃদঙ্গ, শঙ্খ, আনকদুন্দুভি, বেনু, বীণা, আদি সমস্ত বাদ্যযন্ত্র একত্রে বাদিত হওয়ার শব্দে পূর্ণ ছিল। গন্ধর্বদের সংগীতে সেখানে নিরন্তর নৃত্য হত। ইন্দ্রপুরীর সৌন্দর্য সাক্ষাৎ প্রভাদেবীকে পরাভূত করেছিল। যারা পাপী, খল, জীবহিংসক, শঠ, দাম্ভিক, কামুক এবং লোভী তারা সেই পুরীতে প্রবেশ করতে পারে না। এই সমস্ত দোষরহিত ব্যক্তিরাই সেখানে বাস করে। অসংখ্য সৈনিকদের সেনাপতি বলি মহারাজ তাঁর সৈনিকদের দ্বারা সেই ইন্দ্রপুরীর বাইরে চতুর্দিকে অবরোধ করে আক্রমণ করেছিলেন এবং ইন্দ্রপত্নীদের ভয় উৎপাদন করে শুক্রাচার্য প্রদত্ত শঙ্খ বাজিয়েছিলেন। বলি মহারাজের বিপুল উদ্যম দর্শন করে, দেবরাজ ইন্দ্র দেবগণ সহ তাঁর গুরু বৃহস্পতির কাছে গিয়ে এই কথাগুলি বলেছিলেন।”
“হে প্রভু, আমাদের পূর্বশত্রু বলি মহারাজ এখন নতুন উদ্যম এবং এমন আশ্চর্যজনক শক্তি প্রাপ্ত হয়েছে যে, আমাদের মনে হয় তার সেই তেজ হয়ত আমরা প্রতিহত করতে পারব না। বলির এই সামরিক আয়োজন কেউই কোথাও প্রতিহত করতে পারবে না। মনে হচ্ছে যেন সে তাঁর মুখের দ্বারা সমগ্র জগৎ পান করছে, জিহ্বার দ্বারা দশ দিক লেহন করছে এবং চক্ষুর দ্বারা সর্বদিক দহন করছে। সে যেন সংবর্তক নামক প্রলয়াগ্নির মতো উত্থিত হয়েছে। দয়া করে আমাকে বলুন, বলি মহারাজের শক্তি, প্রয়াস, প্রভাব এবং বিজয়ের কারণ কি? তাঁর এই উদ্যম এল কোথা থেকে?”
দেবগুরু বৃহস্পতি বললেন- “হে ইন্দ্র, তোমার শত্রু কিভাবে এত শক্তিশালী হয়েছে তা আমি জানি। ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণেরা তাঁদের শিষ্য বলি মহারাজের প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাকে এই অসাধারণ শক্তি প্রদান করেছেন। তুমি অথবা তোমার নিজ জনেরা কেউই পরম শক্তিমান বলিকে জয় করতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে, ভগবান ছাড়া কেউই তাকে জয় করতে পারবে না, কারণ সে এখন ব্রহ্মতেজ সমন্বিত হয়েছে। কেউই যেমন যমরাজের সম্মুখে অবস্থান করতে পারে না, তেমনই কেউই এখন বলি মহারাজের সম্মুখে দাঁড়াতে পারবে না। অতএব, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমাদের এই শত্রুর বিপর্যয় না হয়, ততক্ষণ তোমরা সকলে স্বর্গলোক ত্যাগ করে অন্য কোথাও গিয়ে থাক, যেখানে তোমাদের কেউ দেখতে পাবে না। সম্প্রতি বলি মহারাজ ব্রাহ্মণদের আশীর্বাদের ফলে অত্যন্ত পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে, কিন্তু পরে সে যখন সেই ব্রাহ্মণদের অপমান করবে, তখন সে সগনে বিনষ্ট হবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “দেবতারা তৎক্ষণাৎ বৃহস্পতির সেই কল্যাণকর উপদেশ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের ইচ্ছা অনুসারে রূপ ধারণ করে, দৈত্যদের অলক্ষ্যে স্বর্গলোক ত্যাগ করেছিলেন। দেবতারা অন্তর্হিত হলে, বিরোচনের পুত্র বলি মহারাজ ইন্দ্রপুরীতে অধিষ্ঠিত হয়ে ত্রিভুবন বশীভূত করেছিলেন। ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণেরা তাঁদের বিশ্ববিজয়ী শিষ্যের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, তাঁর দ্বারা শত অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিয়েছিলেন। সেই সমস্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার ফলে বলি মহারাজের কীর্তি ত্রিভুবনের সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছিল। তার ফলে তিনি তাঁর পদে চন্দ্রের মতো উজ্জ্বলভাবে শোভা পাচ্ছিলেন। ব্রাহ্মণদের অনুগ্রহে মহাত্মা বলি মহারাজ নিজেকে কৃতার্থ মনে করেছিলেন এবং অত্যন্ত ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি লাভ করে রাজ্য ভোগ করতে লাগলেন।”

Leave a Reply

March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Blog Stats

  • 140,959 hits