ত্রয়োদশ অধ্যায়- ভাবী মনুদের বর্ণনা

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বর্তমান মনু হচ্ছেন সূর্যদেব বিবস্বানের পুত্র শ্রাদ্ধদেব। এই শ্রাদ্ধদেব সপ্তম মনু। আমি এখন তাঁর পুত্রদের কথা বর্ণনা করছি, শ্রবণ করুন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মনুর দশ পুত্র যথাক্রমে ইক্ষ্বাকু, নভগ, ধৃষ্ট, শর্যাতি, নরিষ্যন্ত, নাভাগ এবং সপ্তম পুত্র দিষ্ট নামে প্রসিদ্ধ। তারপর তরুষ ও পৃষধ্র এবং দশম পুত্র বসুমান। হে রাজন্, এই মন্বন্তরে আদিত্য, বসু, রুদ্র, বিশ্বদেব, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং ঋভুগণ দেবতা। পুরন্দর তাঁদের ইন্দ্র। কশ্যপ, অত্রি, বসিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, গৌতম, জগদগ্নি এবং ভরদ্বাজ- এঁরা সপ্তর্ষি বলে কথিত। ভগবান এই মন্বন্তরে কশ্যপ এবং অদিতির পুত্ররূপে আদিত্যদের মধ্যে কনিষ্ঠতম বামনরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। আমি সংক্ষেপে আপনার কাছে সপ্ত মন্বন্তরের বিবরণ বললাম। এখন আমি বিষ্ণুর অবতার সহ ভবিষ্যৎ মনুদের কথা বলব।”
“হে রাজন্, আমি পূর্বে (ষষ্ঠ স্কন্ধে) সংজ্ঞা এবং ছায়া নামক বিশ্বকর্মার দুই কন্যার কথা বলেছি। তাঁরা ছিলেন বিবস্বানের প্রথম দুই পত্নী। কেউ কেউ বলেন, সূর্যের তৃতীয় পত্নীর নাম বড়বা। এই তিন পত্নীর মধ্যে সংজ্ঞার তিনটি সন্তান- যম, যমী এবং শ্রাদ্ধদেব। এখন আমি ছায়ার সন্তানদের কথা বর্ণনা করব। ছায়ার সাবর্ণি নামে এক পুত্র এবং তপতী নামে এক কন্যা হয়। তপতী পরে সংবরণ নামক রাজার পত্নী হন। ছায়ার তৃতীয় সন্তান শনৈশ্চর (শনি)। বড়বার গর্ভে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের জন্ম হয়।”
“হে রাজন্, অষ্টম মন্বন্তর আগত হলে মনু হবে সাবর্ণি। নির্মোক, বিরজস্ক প্রভৃতি সেই সাবর্ণি মনুর পুত্র হবেন। অষ্টম মন্বন্তরে সুতপা, বিরজা, অমৃতপ্রভা প্রভৃতি দেবতা হবেন। বিরোচনের পুত্র বলি মহারাজ দেবতাদের রাজা ইন্দ্র হবেন। বলি মহারাজ ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে ত্রিপাদ ভূমি দান করেছিলেন এবং তার ফলে তিনি ত্রিভুবন হারিয়েছিলেন। কিন্তু বলি মহারাজ তাঁকে সব কিছু দান করায় ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন বলে, পরে বলি মহারাজ জীবনের পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হবেন। ভগবান গভীর প্রীতি সহকারে বলিকে বন্ধন করে, স্বর্গলোকের থেকেও অধিক ঐশ্বর্য সমন্বিত সুতললোকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। বলি মহারাজ এখন সেখানে ইন্দ্রের থেকেও অধিক সুখে অবস্থান করছেন। হে রাজন্, অষ্টম মন্বন্তরে গালব, দীপ্তিমান, পরশুরাম, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, ঋষ্যশৃঙ্গ এবং আমাদের পিতা নারায়ণের অবতার ব্যাসদেব, এই সাতজন মহাত্মা সপ্তর্ষি হবেন। এখন তাঁরা সকলেই তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে অবস্থান করছেন। অষ্টম মন্বন্তরে পরম শক্তিমান ভগবান সার্বভৌম দেবগুহ্যের পুত্ররূপে সরস্বতীর গর্ভে আবির্ভূত হবেন। তিনি পুরন্দরের (দেবরাজ ইন্দ্রের) কাছ থেকে স্বর্গ হরণ করে বলিকে প্রদান করবেন।”
“হে রাজন্, নবম মন্বন্তরে বরুণের পুত্র দক্ষসাবর্ণি মনু হবেন। ভূতকেতু, দীপ্তকেতু প্রভৃতি তাঁর পুত্র হবে। এই নবম মন্বন্তরে পারা, মরীচিগর্ভ প্রভৃতি দেবতা হবেন। অদ্ভুত হবেন দেবরাজ ইন্দ্র এবং দ্যুতিমান প্রভৃতি সপ্তর্ষি হবেন। ভগবানের অংশাবতার ঋষভদেব আয়ুষ্মানের পুত্ররূপে অম্বুধারার গর্ভে আবির্ভূত হবেন। তিনি অদ্ভুত নামক ইন্দ্রকে ত্রিলোকের ঐশ্বর্য ভোগ করাবেন।”
“উপশ্লোকের পুত্র ব্রহ্মসাবর্ণি দশম মনু হবেন। ভূরিষেণ প্রভৃতি তাঁর পুত্র এবং হবিষ্মান প্রমুখ ব্রাহ্মণগণ সপ্তর্ষি হবেন। হবিষ্মান, সুকৃত, সত্য, জয়, মূর্তি প্রভৃতি সপ্তর্ষি হবেন। সুবাসন, বিরুদ্ধ প্রভৃতি দেবতা এবং শম্ভু তাঁদের রাজা ইন্দ্র হবেন। বিশ্বস্রষ্টার গৃহে বিষূচীর গর্ভে ভগবানের অংশাবতার বিষ্বক্‌সেন নামে অবতীর্ণ হবেন। তিনি শম্ভুর সঙ্গে সখ্য স্থাপন করবেন।”
“একাদশ মন্বন্তরে মনু হবেন আত্মতত্ত্বজ্ঞ ধর্মসাবর্ণি। সত্যধর্ম আদি তাঁর দশটি সন্তান হবে। এই মন্বন্তরে বিহঙ্গমগণ, কামগমগণ, নির্বাণরুচি প্রভৃতি দেবতা হবেন। দেবরাজ ইন্দ্র হবেন বৈধৃত এবং অরুণ আদি সপ্তর্ষি হবেন। আর্যকের পুত্র ধর্মসেতু নামে ভগবানের অংশাবতার আর্যকের পত্নী বৈধৃতার গর্ভে আবির্ভূত হয়ে এই মন্বন্তরে ত্রিভুবন পালন করবেন।”
“হে রাজন্, দ্বাদশ মনু হবেন রুদ্রসাবর্ণি। দেববান, উপদেব, দেবশ্রেষ্ঠ প্রভৃতি তাঁর পুত্র হবেন। এই মন্বন্তরে ইন্দ্রের নাম হবে ঋতধামা এবং হরিত আদি দেবতা হবেন। তপোমূর্তি, তপস্বী, আগ্নীধ্রক প্রভৃতি সপ্তর্ষি হবেন। ভগবানের অংশাবতার স্বধামা সুনৃতা নামক মাতা এবং সত্যসহা নামক পিতার পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন। তিনি সেই মন্বন্তর পালন করবেন।”
“আত্মতত্ত্বজ্ঞ দেবসাবর্ণি ত্রয়োদশ মনু হবেন। চিত্রসেন, বিচিত্র প্রভৃতি তাঁর পুত্র হবেন। ত্রয়োদশ মন্বন্তরে সুকর্মা, সুত্রামা প্রভৃতি দেবতা হবেন। দিবস্পতি হবেন স্বর্গের রাজা এবং নির্মোক, তত্ত্বদর্শ আদি সপ্তর্ষি হবেন। দেবহোত্রের পুত্ররূপে যোগেশ্বর নামে ভগবানের অংশাবতার বৃহতীর গর্ভে আবির্ভূত হবেন। তিনি দিবস্পতির কল্যাণকর কার্য সম্পাদন করবেন।”
“চতুর্দশ মনুর নাম হবে ইন্দ্রসাবর্ণি। উরু, গম্ভীর বুধ প্রভৃতি তাঁর সন্তান হবেন। পবিত্র, চাক্ষুষ প্রভৃতি দেবতা হবেন। শুচি হবেন দেবরাজ ইন্দ্র। অগ্নি, বাহু, শুচি, শুদ্ধ, মাগধ আদি মহাতপস্বীগণ সপ্তর্ষি হবেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, চতুর্দশ মন্বন্তরে ভগবান সত্রায়ণের পুত্ররূপে বিতানার গর্ভে আবির্ভূত হবেন। বৃহদ্ভানু নামে বিখ্যাত হয়ে এই অবতার আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করবেন। হে রাজন্, অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কালচক্রে আবির্ভূত চতুর্দশ মনুর বর্ণনা আমি আপনার কাছে করলাম। এই চতুর্দশ মনুর শাসনকাল এক সহস্র চতুর্যুগ। তাকে বলা হয় কল্প বা ব্রহ্মার একদিন।”

Leave a Reply

March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Blog Stats

  • 140,963 hits