শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, ত্রিকূট নামে এক অতি বিশাল পর্বত রয়েছে। তার উচ্চতা দশ হাজার যোজন (আশি হাজার মাইল)। ক্ষীর সমুদ্রের দ্বারা বেষ্টিত এই পর্বতটি অত্যন্ত সুন্দর। সেই পর্বত দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে সমান (আশি হাজার মাইল)। লৌহময়, রৌপ্যময় এবং স্বর্ণময় তার তিনটি শিখর সর্বদিকে এবং আকাশকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে। সেই পর্বতের অন্যান্য শৃঙ্গও রয়েছে, যেগুলি মণিরত্ন ও ধাতুতে পূর্ণ এবং বৃক্ষ, লতা ও গুল্মে সুশোভিত। সেই পর্বতের ঝর্নার জলের ধ্বনি অত্যন্ত মনোহর শব্দ-তরঙ্গের সৃষ্টি করে। সমস্ত দিকের শোভা বর্ধন করে সেই পর্বত বিরাজমান। সেই পর্বতের পাদদেশ সর্বদা দুগ্ধ-তরঙ্গের দ্বারা ধৌত হয়, এবং সেই দুধ অষ্টদিকে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং তাদের মধ্যবর্তী আরও চারটি দিক) মরকত মণি সৃষ্টি করে। সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, মহাসর্প, কিন্নর এবং অপ্সরাগণ সেই পর্বতে খেলা করতে যান। তার ফলে সেই পর্বতের গুহাগুলি সেই সমস্ত উচ্চলোকের অধিবাসীদের দ্বারা পূর্ণ থাকে। পর্বত কন্দরে স্বর্গলোকবাসীদের সঙ্গীতের প্রতিধ্বনি শ্রবণ করে সিংহেরা অন্য কোন সিংহ সেইভাবে গর্জন করছে মনে করে, তাদের নিজেদের শক্তিতে গর্বিত হয়ে অসহ্য ক্রোধে গর্জন করে। ত্রিকূট পর্বতের প্রান্তদেশ নানাবিধ বন্য পশুসমূহে অলঙ্কৃত এবং দেবতাদের উদ্যানের বৃক্ষে পক্ষীরা সুমধুর স্বরে কূজন করে। ত্রিকূট পর্বতে বহু সরোবর এবং নদী রয়েছে, তার তট মণিময় বালুকারাশির দ্বারা আচ্ছাদিত। তার জল স্ফটিকের মতো নির্মল এবং স্বর্গ-ললনাগণ যখন সেখানে স্নান করেন, তখন তাঁদের দেহের সৌরভে সেখানকার জল এবং বায়ু সুরভিত হয়। ত্রিকূট পর্বতের উপত্যকায় ঋতুমৎ নামক এক উদ্যান রয়েছে। সেই উদ্যানটি মহান ভগবদ্ভক্ত বরুণদেবের এবং সেটি দেবস্ত্রীদের ক্রীড়োদ্যান। সেটি সমস্ত ঋতুতে নানা প্রকার ফুল এবং ফলে পূর্ণ থাকে। তাদের মধ্যে রয়েছে- মন্দার, পারিজাত, পাটল, অশোক, চম্পক, চূত, পিয়াল, পনস, আম্র, আম্রাতক, ক্রমুক, নারিকেল, খর্জুর, ডালিম, মধুক, তাল, তমাল, অসন, অর্জুন, অরিষ্ট, উড়ুম্বর, প্লক্ষ, অশ্বত্থ, বট, কিংশুক, চন্দন, পিচুমর্দ, কোবিদার, সরল, দেবদারু, দ্রাক্ষা, ইক্ষু, রম্ভা, জম্বু, বদরী, অক্ষ, অভয়, আমলকী প্রভৃতি নানা প্রকার বৃক্ষ। সেই উদ্যানে স্বর্ণকমলে পূর্ণ এক বিশাল সরোবর রয়েছে। তা কুমুদ, কহ্লার, উৎপল এবং শতপত্রে পূর্ণ, যা সেই পর্বতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সেখানে বিল্ব, কপিত্থ, জম্বীর এবং ভল্লাতক বৃক্ষ রয়েছে। মধুপানে মত্ত ভ্রমরেরা পাখির অত্যন্ত সুমধুর কূজনের সঙ্গে গুঞ্জন করছিল। সেই সরোবরটি হংস, কারণ্ডক, চক্রবাক, সারস, জলকুক্কুট, দাত্যূহ, কোযষ্টি এবং অন্যান্য কূজনশীল পক্ষীতে পূর্ণ থাকে। মৎস্য, কচ্ছপ, প্রভৃতির সঞ্চারে পতিত পদ্মপরাগ নিঃসৃত হওয়ার ফলে, সেই জল এক অপূর্ব সৌন্দর্য ধারণ করে। সেই সরোবরটি কদম্ব, বেতস, নল, নীপ, বঞ্জুলক, কুন্দ, কুরুবক, অশোক, শিরীষ, কূটজ, ইঙ্গুদ, কুব্জক, স্বর্ণযূথী, নাগ, পুন্নাগ, জাতী, মল্লিকা, শতপত্র, জালকা এবং মাধবীলতায় পরিবৃত। সেই সরোবরের তীর সর্বঋতুতে ফুল এবং ফল উৎপাদনকারী বৃক্ষের দ্বারাও অলঙ্কৃত। এইভাবে সেই পর্বতটি অপূর্ব শোভায় মণ্ডিত হয়ে বিরাজমান। সেই ত্রিকূট পর্বতের কাননবাসী এক গজযূথপতি হস্তিনীগণ সহ বহু বৃক্ষ, লতা, গুল্ম ভগ্ন করে, তাদের তীক্ষ্ম কন্টক গ্রাহ্য না করে, সরোবর অভিমুখে বিচরণ করছিল। সেই গজেন্দ্রের গন্ধ মাত্রই সিংহ, অন্য গজেন্দ্র, ব্যাঘ্র আদি হিংস্র জন্তু, গণ্ডার, মহাসর্প, শ্বেত এবং কৃষ্ণবর্ণ সরভ এবং চমরী মৃগসমূহ ভয়বশত পলায়ন করেছিল। সেই গজেন্দ্রের কৃপায় শৃগাল, নেকড়ে, মহিষ, বরাহ, ভল্লুক, গোপুচ্ছ, শজারু, বানর, শশক, হরিণ আদি ক্ষুদ্র পশুরা তার ভয়ে ভীত না হয়ে, অরণ্যের অন্যত্র বিচরণ করছিল। যূথের অন্য হস্তী ও হস্তিনীগণ পরিবেষ্টিত হয়ে এবং শাবকগণ কর্তৃক অনুসৃত হয়ে, সেই গজপতি তার দেহের ভারে ত্রিকূট পর্বত কম্পিত করেছিল। ঘর্মাক্ত কলেবরে সেই মদস্রাবী গজেন্দ্রের দৃষ্টি মদবিহ্বল হয়েছিল। মধুপায়ী ভ্রমরকুলের দ্বারা সে সেবিত হয়েছিল এবং পদ্মরাগ সুবাসিত সরোবরের মৃদুমন্দ বায়ু সে দূর থেকে আঘ্রাণ করেছিল। এইভাবে সে তার তৃষ্ণার্ত পার্ষদ পরিবৃত হয়ে, শ্রীঘ্র সরোবরের তীরে এসে উপস্থিত হয়েছিল। গজেন্দ্র সরোবরে প্রবেশপূর্বক খুব ভালভাবে স্নান করে তার ক্লান্তি থেকে মুক্ত হয়েছিল। তারপর সে তার শুঁড়ের দ্বারা সেই সরোবরের শীতল, নির্মল, অমৃততুল্য জল, যা পদ্ম এবং উৎপলের রেনু মিশ্রিত ছিল, তা পূর্ণরূপে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত পান করেছিল। আধ্যাত্মিক জ্ঞান রহিত মানুষ যেমন তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়, তেমনই সেই গজেন্দ্র ভগবানের মায়ায় মোহিত হয়ে তার পত্নীদের ও শাবকদের স্নান করিয়েছিল এবং জল পান করিয়েছিল। সে তার শুঁড়ের দ্বারা সেই সরোবরের জল আকর্ষণ করে তাদের গায়ে তা সিঞ্চন করেছিল। সেই প্রচেষ্টায় তার যে কঠোর পরিশ্রম হয়েছিল, সেই জন্য সে কিছুই মনে করেনি। হে রাজন্, দৈবক্রমে এক অত্যন্ত বলবান কুমির সেই গজেন্দ্রের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে জলে তার চরণ আক্রমণ করেছিল। সেই গজেন্দ্র অবশ্যই অতন্ত বলবান ছিল এবং দৈববশত এই প্রকার বিপদে পতিত হয়ে সে নিজেকে মুক্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। তখন গজেন্দ্রের সেই ভীষণ পরিস্থিতি দর্শন করে, তার পত্নীরা অত্যন্ত দুখিত হয়ে ক্রন্দন করতে শুরু করেছিল। অন্য হস্তীরা গজেন্দ্রকে পিছন থেকে ধরে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই কুমির ছিল মহাশক্তিশালী, তাই তারা তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।”
“হে রাজন্, সেই গজেন্দ্র ও কুমির এইভাবে জলের মধ্যে এবং জলের বাইরে পরস্পরকে আকর্ষণ করে এক হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করেছিল। তাদের সেই যুদ্ধ দেখে দেবতারা অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। তারপর জলে আকৃষ্ট হয়ে দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ করার ফলে, গজেন্দ্রের মানসিক, দৈহিক এবং ইন্দ্রিয়ের বল ক্ষয় হয়েছিল। কিন্তু জলনিবাসী কুমিরের সেই সময় সমস্ত বল বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেহধারী সেই গজেন্দ্র যখন দেখল যে, দৈববশত কুমিরের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পরিস্থিতির বশে সে সম্পূর্ণ অসহায় এবং নিজেকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে অক্ষম, তখন সে মৃত্যুভয়ে অত্যন্ত ভীত হয়েছিল। তার ফলে দীর্ঘকাল ধরে চিন্তা করে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। আমার আত্মীয় এবং অন্যান্য বন্ধু হাতিরা আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারল না। সুতরাং আমার পত্নীদের আর কি কথা? তাদের পক্ষে কিছু করাই সম্ভব নয়। বিধাতার ইচ্ছাক্রমে আমি এই কুমিরের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি, তাই আমি এখন ভগবানের শরণ গ্রহণ করব, যিনি সর্বদা সকলকে আশ্রয় প্রদান করেন এমন কি মহাপুরুষদেরও। ভগবান দুর্জ্ঞেয়, কিন্তু তাঁর শক্তি এবং প্রভাব অসীম। তাই, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং বলবান কালসর্প যদিও সকলকে গ্রাস করার জন্য প্রচণ্ড বেগে অবিরামভাবে তাদের পিছনে ধাবিত হচ্ছে, তবুও সেই কালসর্পের ভয়ে ভীত হয়ে কেউ যদি ভগবানের শরণাগত হন, তা হলে ভগবান তাঁকে রক্ষা করেন, কারণ ভগবানের ভয়ে স্বয়ং মৃত্যুও পলায়ন করে। তাই আমি সকলের আশ্রয় সেই পরম শক্তিমান পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হই।”
দ্বিতীয় অধ্যায়- গজেন্দ্রের সঙ্কট
17 Feb 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ