প্রথম অধ্যায়- ব্রহ্মাণ্ডের প্রশাসক মনুগণ

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে গুরুদেব, আপনার কৃপায় আমি স্বায়ম্ভুব মনুর বংশ-বৃত্তান্ত পূর্ণরূপে শ্রবণ করলাম। কিন্তু অন্য মনুদের সম্বন্ধেও আমি শ্রবণ করতে ইচ্ছুক। দয়া করে আপনি তাঁদের কথা বর্ণনা করুন। হে ব্রহ্মজ্ঞানী শুকদেব গোস্বামী, পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিরা বিভিন্ন মন্বন্তরে ভগবানের কার্যকলাপ এবং আবির্ভাবের বর্ণনা করেন। সেই সমস্ত বর্ণনা শ্রবণ করতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। দয়া করে তা বর্ণনা করুন। হে মহাজ্ঞানী ব্রাহ্মণ, এই জগতের সৃষ্টিকর্তা ভগবান অতীত মন্বন্তরে যে সমস্ত কার্য করেছেন, বর্তমানে যা করছেন এবং আগামী মন্বন্তরে যা করবেন, তা দয়া করে আমাদের কাছে বর্ণনা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই কল্পে ছয়জন মনু ইতিমধ্যেই অতীত হয়েছেন। আমি আপনার কাছে স্বায়ম্ভুব মনু এবং দেবতাদের উৎপত্তির কথা বর্ণনা করছি। ব্রহ্মার এই কল্পে স্বায়ম্ভুবই প্রথম মনু। স্বায়ম্ভুব মনুর দুই কন্যা আকূতি ও দেবহূতির গর্ভে ভগবান যথাক্রমে যজ্ঞমূর্তি এবং কপিল নামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁরা ধর্ম এবং জ্ঞান উপদেশ দিয়েছিলেন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, আমি পূর্বেই (তৃতীয় স্কন্ধে) দেবহূতি-পুত্র কপিলের কার্যকলাপ বর্ণনা করেছি। এখন আমি আপনার কাছে আকূতির পুত্র যজ্ঞপতির কার্যকলাপ বর্ণনা করব। শতরূপার পতি স্বায়ম্ভুব মনু স্বভাবতই ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি অনাসক্ত ছিলেন। তাই তিনি রাজ্যভোগ পরিত্যাগ করে, তাপস্যা করার জন্য তাঁর পত্নী সহ বনে প্রবেশ করেছিলেন। হে ভারত, স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর পত্নী সহ বনে গমন করে সুনন্দা নদীর তীরে এক পায়ে ভূমি স্পর্শ করে একশ বছর ঘোর তপস্যা করেছিলেন। তপস্যা করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘পরমেশ্বর ভগবান চৈতন্যযুক্ত এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেছেন; এমন নয় যে তিনি এই জড় জগতের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছেন। সব কিছু নিদ্রিত হলেও ভগবান সাক্ষী রূপে জাগ্রত থাকেন। জীব তাঁকে জানে না, কিন্তু তিনি সব কিছু জানেন। এই জগতে যেখানে স্থাবর এবং জঙ্গম প্রাণী রয়েছে, সেখানেই ভগবান পরমাত্মারূপে বিরাজমান। তাই তিনি যেটুকু বরাদ্দ নির্ধারণ করেছেন, কেবল সেটুকুই গ্রহণ করা উচিত; কখনও অন্যের ধন আকাঙ্ক্ষা করা উচিত নয়। ভগবান যদিও নিরন্তর সমগ্র বিশ্বের কার্যকলাপ দর্শন করেন, তবুও তাঁকে কেউ দর্শন করতে পারে না। কিন্তু, তা বলে এই মনে করা উচিত নয় যে, যেহেতু কেউই তাঁকে দেখতে পায় না, তাই তিনিও কিছুই দেখছেন না, কারণ তাঁর দর্শন শক্তি কখনও বিনষ্ট হয় না। তাই সকলেরই কর্তব্য জীবাত্মার সঙ্গে সখারূপে যিনি নিরন্তর বিরাজ করেন, সেই পরমাত্মার আরাধনা করা। ভগবানের আদি নেই, মধ্য নেই এবং অন্ত নেই। তিনি কোন বিশেষ ব্যক্তি বা জাতির নন। তাঁর অন্তর এবং বাহির নেই। এই জড় জগতে আদি এবং অন্ত, আমার এবং তাদের ইত্যিাদি যে দ্বৈতভাব দেখা যায়, তা ভগবানের মধ্যে নেই। এই জগৎ যা তাঁর থেকে প্রকাশিত হয়েছে, তা তাঁরই আর একটি রূপ। তাই ভগবান হচ্ছেন পরম সত্য এবং তিনি পূর্ণ ব্রহ্ম। সমগ্র জড় জগৎ পরমতত্ত্ব ভগবানের শরীর, যাঁর অসংখ্য নাম এবং অনন্ত শক্তি রয়েছে। তিনি স্বয়ংপ্রকাশ, অজ এবং নির্বিকার। তিনি সব কিছুর আদি, কিন্তু তাঁর কোন আদি নেই। যেহেতু তিনি তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাই মনে হয় যেন তিনি এই বিশ্বের স্রষ্টা, পালক এবং সংহারক। কিন্তু তা সত্ত্বেও, তিনি তাঁর চিন্ময় শক্তিতে নিষ্ক্রিয় থাকেন এবং জড়া প্রকৃতির কার্যকলাপ তাঁকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে না। অতএব কর্মফল থেকে মানুষকে মুক্ত স্তরে উন্নীত করার জন্য মহান ঋষিরা প্রথমে মানুষদের সকাম কর্মে নিযুক্ত করেন। কারণ শাস্ত্রবিহিত কর্ম অনুষ্ঠান না করলে, মুক্তির বা নৈষ্কর্ম্যরে স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায় না। আত্মলাভপূর্ণ সর্বৈশ্বর্য সমন্বিত ভগবান সৃষ্টি, পালন এবং সংহারকার্য সম্পাদন করেন। এইভাবে কার্য করা সত্ত্বেও তিনি কখনও আসক্ত হন না। তাঁর যে সমস্ত ভক্তবৃন্দ তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাঁরাও কখনও বদ্ধ হন না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক একজন সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করলেও, কখনও তিনি তাঁর কর্মের ফল ভোগ করার বাসনা করেন না। তিনি পূর্ণ জ্ঞানময়, সমস্ত জড় বাসনা থেকে মুক্ত, অচ্যুত এবং সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র। মানব-সমাজের পর শিক্ষকরূপে তিনি তাঁর নিজের মার্গ শিক্ষা দেন এবং এইভাবে তিনি প্রকৃত ধর্মের পন্থা প্রবর্তন করেন। আমি সকলকে তাঁর প্রদর্শিত সেই পন্থা অনুসরণ করতে অনুরোধ করি।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “স্বায়ম্ভুব মনু যখন উপনিষদ নামক এই বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে সমাধিস্থ হয়েছিলেন, তখন তাঁকে দেখে রাক্ষস এবং অসুরেরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে তাঁকে গ্রাস করতে চেয়েছিল এবং তাই তারা অতি দ্রুতবেগে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। ভগবান শ্রীবিষ্ণু যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান, তিনিই যজ্ঞরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাক্ষস এবং অসুরদের স্বায়ম্ভুব মনুকে গ্রাস করতে উদ্যত দেখে, তিনি যাম নামক তাঁর পুত্র এবং অন্যান্য দেবতাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, সেই সমস্ত রাক্ষস এবং অসুরদের সংহার করেছিলেন। তারপর তিনি ইন্দ্রের পদ গ্রহণ করে স্বর্গলোক শাসন করেছিলেন। অগ্নির পুত্র স্বারোচিষ দ্বিতীয় মনু হয়েছিলেন। দ্যুমৎ, সুষেণ এবং রোচিষ্মৎ প্রভৃতি তাঁর কয়েকটি পুত্র ছিল। সেই স্বারোচিষ মন্বন্তরে যজ্ঞের পুত্র রোচন ইন্দ্রের পদ গ্রহণ করেছিলেন। তুষিত আদি মুখ্য দেবতা হয়েছিলেন এবং ঊর্জ, স্তম্ভ আদি সপ্তর্ষি হয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন ভগবানের নিষ্ঠাপরায়ণ ভক্ত। বিখ্যাত ঋষি বেদশিরার পত্নী তুষিতার গর্ভে বিভু নামক অবতারের জন্ম হয়েছিল। বিভু আজীবন ব্রহ্মাচারী এবং চিরকুমার ছিলেন। অষ্টাশি হাজার মুনি তাঁর কাছে আত্ম-সংযম, তপস্যা আদি আচরণ শিক্ষা গ্রহণ করেন।”
“হে রাজন্, তৃতীয় মনু উত্তম ছিলেন মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র। পবন, সৃঞ্জয় এবং যজ্ঞহোত্র প্রভৃতি এই মনুর পুত্র ছিলেন। তৃতীয় মন্বন্তরে প্রমদ আদি বসিষ্ঠের পুত্রেরা সপ্তর্ষি হয়েছিলেন। সত্য, বেদশ্রুত এবং ভদ্রেরা দেবতা হয়েছিলেন এবং সত্যজিৎ দেবরাজ ইন্দ্ররূপে মনোনীতি হয়েছিলেন। এই মন্বন্তরে ধর্মের পত্নী সূনৃতার গর্ভে ভগবান আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তিনি সত্যসেন নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি সত্যব্রত নামক দেবতাগণ সহ আবির্ভূত হয়েছিলেন। ইন্দ্রের পদে অধিষ্ঠিত সখা সত্যজিৎ সহ সত্যসেন মিথ্যাভাষী, দুরাচারী এবং দুষ্ট প্রাণীপীড়ক যক্ষ, রাক্ষস এবং ভূত-প্রেতদের সংহার করেছিলেন। তৃতীয় মনু উত্তমের ভ্রাতা তামস চতুর্থ মনু হয়েছিলেন। তামসের পৃথু, খ্যাতি, নর, কেতু আদি দশটি পুত্র ছিল। তামস মন্বন্তরে সত্যক, হরি এবং বীরগণ দেবতা হয়েছিলেন। ইন্দ্র হয়েছিলেন ত্রিশিখ এবং জোতির্ধাম আদি সপ্তর্ষি হয়েছিলেন। হে রাজন্, তামস মন্বন্তরে বিধৃতির বৈধৃতি নামক পুত্রগণ দেবতা হয়েছিলেন। কালের প্রভাবে বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান নষ্ট হতে থাকলে, সেই সমস্ত দেবতারা তাঁদের তেজের প্রভাবে বেদ রক্ষা করেছিলেন। এই মন্বন্তরেও ভগবান শ্রীবিষ্ণু হরিমেধার পত্নী হরিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি হরি নামে খ্যাত হন। তিনি কুমিরের মুখ থেকে গজেন্দ্রকে রক্ষা করেছিলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে বাদরায়ণি, কুমিরের দ্বারা গজেন্দ্র আক্রান্ত হলে, শ্রীহরি কিভাবে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন, সেই কথা আমরা বিস্তারিতভাবে শুনতে ইচ্ছা করি। যে শাস্ত্রে অথবা বর্ণনায় উত্তমশ্লোক ভগবানের মহিমা বর্ণিত হয়, তা নিশ্চিতভাবে মহান, শুদ্ধ, ধন্য, মঙ্গলজনক এবং শুভ। ”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “হে ব্রাহ্মণগণ, আসন্ন মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। প্রায়োপবিষ্ট পরীক্ষিৎ মহারাজ যখন শুকদেব গোস্বামীকে এইভাবে বলতে অনুরোধ করলেন, তখন মহারাজের বাক্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, শুকদেব গোস্বামী রাজাকে অভিনন্দন জানিয়ে শ্রবণেচ্ছু মহর্ষিদের সভায় মহা আনন্দে বলেছিলেন।”

Leave a Reply

February 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728  

Blog Stats

  • 140,943 hits