মহরাজ যুধিষ্ঠির নারদ মুনিকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে দেবর্ষি, জীবনের লক্ষ্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ আমাদের মতো গৃহব্রত ব্যক্তিরাও যে বৈদিক বিধি অনুসারে অনায়াসে মুক্তিপদ লাভ করতে পারে, দয়া করে আমাকে তা বলুন।”
নারদ মুনি উত্তর দিলেন- “হে রাজন্, যারা গৃহস্থরূপে গৃহে অবস্থান করেন, তাঁদের অবশ্য কর্তব্য, ইন্দ্রিযসুখ ভোগের জন্য তাঁদের কর্মের ফল ভোগ করার চেষ্টা না করে, যাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা যা অর্জন করেন, তা সবই বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে অর্পণ করা। ভগবানের মহান ভক্তদের সঙ্গ করার মাধ্যমে এই জীবনেই বাসুদেবকে সন্তুষ্ট করার পন্থা যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। গৃহস্থের কর্তব্য বার বার সাধুসঙ্গ করা এবং গভীর শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীমদ্ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণে ভগবান ও তাঁর অবতারদের কার্যকলাপের যে অমৃতময় বর্ণনা করা হয়েছে তা শ্রবণ করা। এইভাবে মানুষ ধীরে ধীরে তাঁর স্ত্রী-পুত্রের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারেন, ঠিক যেভাবে মানুষ স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে। প্রকৃতই যিনি পণ্ডিত তাঁর কর্তব্য, দেহ ধারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই উপার্জন করার জন্য কার্য করা এবং পারিবারিক বিষয়ে অনাসক্ত হয়ে মানব-সমাজে বসবাস করা এবং এমনভাবে আচরণ করা যাতে বাইরে থেকে তাঁকে অত্যন্ত আসক্ত বলে মনে হয়। মানব-সমাজে বুদ্ধিমান মানুষের কতর্ব্য তাঁর কার্যকলাপ অত্যন্ত সহজ-সরল রাখা। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, পিতা-মাতা, পুত্র, ভাই এবং অন্যেরা যদি তাঁকে কোন প্রস্তাব দেয়, তা হলে বাইরে “হ্যাঁ তা ঠিকই,” বলে সম্মতি প্রদর্শন করে অন্তরে যে জটিল পরিস্থিতি জীবনের উদ্দেশ্য সাফল্যমণ্ডিত করবে না, সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি না করতে তাঁর বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত। ভগবানের দ্বারা সৃষ্ট প্রাকৃতিক উপাদানগুলি জীবের প্রাণ ধারণের জন্য উপযোগ করা উচিত। জীবন ধারণের প্রযোজন তিন প্রকার- আকাশ থেকে উৎপন্ন (বৃষ্টি), ভূমি থেকে উৎপন্ন (খনি, সমুদ্র অথবা ক্ষেত্র থেকে) এবং বায়ুমণ্ডল থেকে যা (অকস্মাৎ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে) পাওয়া যায়। প্রাণ ধারণের জন্য যত পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তত পরিমাণ অর্থই কেবল অধিকার করা উচিত, তার অধিক অধিকার করা হলে চুরি করা হয় এবং সে তখন প্রকৃতির নিয়মে দণ্ডনীয় হয়। হরিণ, উট, গাধা, বানর, ইঁদুর, সাপ, পাঁখি এবং মাছি, এদের নিজের পুত্রের মতো দর্শন করা উচিত। পুত্র এবং এই সমস্ত নিরীহ প্রাণীদের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। কেউ যদি ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসী অথবা বানপ্রস্থ না হয়ে কেবল গৃহস্থও হয়, তবুও তাঁর ধর্ম, অর্থ এবং কামের জন্য কঠোর প্রয়াস করা উচিত নয়। গৃহস্থ-জীবনেও স্থান এবং কাল অনুসারে ভগবানের কৃপায় ন্যূনতম প্রয়াসের দ্বারা যা লাভ হয়, তা দিয়েই জীবন-যাপন করে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। উগ্রকর্মে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়।”
“কুকুর, পতিত মানুষ এবং চণ্ডাল প্রভৃতি অস্পৃশ্যদেরও গৃহস্থেরা যথাযোগ্য ভোগ্য বস্তু দিযে পালন করবেন। এমন কি অত্যন্ত মমতাস্পদ পত্নীকেও অতিথি সেবায় নিযুক্ত করা উচিত। মানুষ তার পত্নীকে তার এতই আপন বলে মনে করে যে, তার জন্য সে নিজেকে হত্যা করতে পারে অথবা পিতা এবং গুরুকেও হত্যা করতে পারে। অতএব কেউ যদি সেই পত্নীর প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে, তা হলে তার দ্বারা অজিত ভগবানও বিজিত হন। যথাযথভাবে বিবেচনা করে পত্নীর শরীরের প্রতি আকর্ষণ পরিত্যাগ করা কর্তব্য, কারণ সেই শরীর অন্তে কৃমি, বিষ্ঠা অথবা ভস্মে পরিণত হবে। এই তুচ্ছ শরীরের কি মূল্য? আর পরম পুরুষ ভগবান কত মহান, যিনি আকাশের মতো সর্বব্যাপ্ত! বুদ্ধিমান ব্যক্তির ভগবৎ-প্রসাদ অথবা পঞ্চসূনা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে যজ্ঞাবশিষ্ট আহার করে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তার ফলে দেহের প্রতি আসক্তি এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত বস্তুর প্রতি তথাকথিত মমতা পরিত্যাগ করা যায়। কেউ যখন তা করতে সক্ষম হন, তখন তিনি মহাত্মার পদ প্রাপ্ত হন। প্রতিদিন সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরম পুরুষের আরাধনা করা উচিত এবং তার ভিত্তিতে পৃথকভাবে দেবতাদের, ঋষিদের, মানুষদের, জীবদের, পিতৃদের ও নিজের আত্মাকে পূজা করা কর্তব্য। এইভাবে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরম পুরুষকে পূজা করা যায়। যখন মানুষ ধন এবং জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়, তখন তার কর্তব্য শাস্ত্রের বিধি অনুসারে অগ্নিহোত্র আদি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা। এইভাবে ভগবানের আরাধনা করা উচিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা। ভগবান যদিও যজ্ঞাগ্নিতে নিবেদিত আহুতি ভক্ষণ করেন, তবুও হে রাজন্, অন্ন এবং ঘি দিয়ে তৈরি সুস্বাদু আহার্য যখন যোগ্য ব্রাহ্মণের মুখের মাধ্যমে তাঁকে নিবেদন করা হয়, তখন তিনি অধিক প্রসন্ন হন। সুতরাং, হে রাজন্, প্রথমে ব্রাহ্মণ ও দেবতাদের প্রসাদ প্রদান কর এবং তাঁদের পর্যাপ্ত পরিমাণে আহার করানোর পর, সেই প্রসাদ তোমার যোগ্যতা অনুসারে অন্য জীবদের মধ্যে বিতরণ কর। এইভাবে তুমি সমস্ত জীবের অথবা সমস্ত জীবের অন্তরে যে পরমাত্মা রয়েছেন তাঁর আরাধনা করতে সমর্থ হবে।”
“ধনবান ব্রাহ্মণ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষে পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধ নিবেদন করবেন। তেমনই আশ্বিন মাসের মহালয়ার সময় পূর্বপুরুষদের আত্মীয়-স্বজনদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ নিবেদন করবেন। মকর সংক্রান্তির দিন (যখন সূর্য উত্তরায়ণে ভ্রমণ করতে শুরু করে) অথবা কর্কট সংক্রান্তির দিন (যখন সূর্য দক্ষিণায়নে ভ্রমণ করতে শুরু করে), শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করা উচিত। মেষ সংক্রান্তিতে, তুলা সংক্রান্তিতে ব্যতীপাত যোগে, ত্র্যহস্পর্শে, সূর্য এবং চন্দ্র গ্রহণের সময়, দ্বাদশীতে, শ্রবণ নক্ষত্রে, অক্ষয় তৃতীয়ায়, কার্তিক মাসের শুক্লাপক্ষের নবমী তিথিতে এবং শীত ঋতুর চারটি অষ্টকায়, মাঘ মাসের শুক্লা সপ্তমীতে, মঘাযুক্ত পূর্ণিমায়, পূর্ণ পূর্ণিমায় অথবা চন্দ্র যখন সম্পূর্ণ পূর্ণ নয় সেই সময়, মাসনাম নক্ষত্র যুক্ত পূর্ণিমায়, দ্বাদশী তিথিযুক্ত অনুরাধা, শ্রবণ, উত্তর ফাল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া, উত্তর ভাদ্রপদা নক্ষত্রে অথবা উত্তর ফাল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া অথবা উত্তর ভাদ্রপদা একাদশীতে এবং নিজের জন্ম-নক্ষত্রে অথবা শ্রবণ নক্ষত্রযুক্ত দিনে পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ করা কর্তব্য। এই সমস্ত কাল মানুষের পক্ষে অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে সমস্ত মঙ্গলজনক কার্য অনুষ্ঠান করা উচিত, কারণ সেই সমস্ত কার্যকলাপের ফলে মানুষ তার অল্প আয়ুষ্কালের মধ্যে সাফল্য অর্জন করে। এই সমস্ত ঋতুর পরিবর্তনের সময় কেউ যুদ গঙ্গা, যমুনা আদি পবিত্র নদীতে স্নান করে, জপ করে, হোম করে, ব্রত করে, ভগবান ব্রাহ্মণ, পিতৃ, দেবতা অথবা অন্য সমস্ত জীবদের পূজা করে এবং দান করে, তা হলে অক্ষয় ফল লাভ হয়।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির! পত্নীর, পুত্রের এবং নিজের সংস্কার কালে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় এবং বাৎসরিক শ্রাদ্ধে, সকাম কর্মের উন্নতি সাধনের জন্য উপরোক্ত মাঙ্গলিক কর্মসমূহ অনুষ্ঠান করা অবশ্য কর্তব্য।”
নারদ মুনি বললেন- “আমি এখন যেখানে ধর্ম অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পাদন করা যায়, সেই স্থানের বর্ণনা করব। যে স্থানে বৈষ্ণব পাওয়া যায়, সেই স্থান সমস্ত মঙ্গলজনক কর্ম অনুষ্ঠানের জন্য সর্বোত্তম। সমগ্র চরাচর বিশ্বের আধার ভগবানের শ্রীবিগ্রহ যে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত, সেই স্থান পূণ্যতম। অধিকন্তু, যেখানে ব্রাহ্মণেরা তপস্যা, বিদ্যা এবং দয়ার দ্বারা বৈদিক নিয়ম পালন করেন, সেই স্থানও পূণ্যতম। যে স্থানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে তাঁর শ্রীবিগ্রহ বিধিবৎ পূজিত হয়, সেই স্থান অবশ্যই পবিত্র এবং যে স্থানে পুরাণ-প্রসিদ্ধ গঙ্গা আদি পবিত্র নদী প্রবাহিত হয়, সেই স্থানও প্রসিদ্ধ। সেখানে যা কিছু আধ্যাত্মিক কার্য সম্পাদন হয়, তা অবশ্যই অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। পুষ্কর আদি পবিত্র সরোবর এবং যে সমস্ত স্থানে মহাত্মারা বাস করেন, যেমন কুরুক্ষেত্র, গয়া, প্রয়াগ, পুলহাশ্রম, নৈমিষারণ্য, ফল্গু নদী, সেতুবন্ধ, প্রভাস, দ্বারকা, বারাণসী, মথুরা, পম্পা, বিন্দুসরোবর, বদরিকাশ্রম (নারায়ণ আশ্রম), নন্দা নদী এবং যে সমস্ত স্থানে শ্রীরামচন্দ্র ও সীতাদেবী আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, যেমন চিত্রকেতু, মহেন্দ্র এবং মলয় আদি পর্বত- এই সমস্ত স্থান অত্যন্ত পবিত্র এবং পুণ্যতীর্থ বলে মনে করা হয়। তেমনই, ভারতবর্ষের বাইরে যে সমস্ত স্থানে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের কেন্দ্র রয়েছে এবং যেখানে রাধাকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহ পূজিত হয়, পারমার্থিক উন্নতি সাধনে অভিলাষী ব্যক্তির সেই সমস্ত স্থানে গমন করে ভগবানের আরাধনা করা উচিত। এই সমস্ত স্থানে অনুষ্ঠিত কর্ম হাজার হাজার গুণ অধিক ফল উৎপাদ্ন করে।”
“হে পৃথিবীনাথ! দক্ষ বিদ্বানগণ বিবেচনা করেছেন যে, ব্রহ্মাণ্ডের স্থাবর এবং জঙ্গম, সব কিছুর আশ্রয় এবং উৎস ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, যাঁকে সব কিছু দান করা কর্তব্য। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আপনার রাজসূয় যজ্ঞে বহু দেবতা, বহু মুনি-ঋষি, এমন কি ব্রহ্মার চারপুত্র এবং আমি উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু যখন প্রশ্ন উঠল কে অগ্রপূজা লাভ করবে, তখন সকলেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মনোনীত করেছিলেন। জীবরাশিতে পূর্ণ এই ব্রহ্মাণ্ড একটি বৃক্ষের মতো, যার মূল হচ্ছেন ভগবান অচ্যুত (শ্রীকৃষ্ণ)। তাই শ্রীকৃষ্ণের পূজা করা হলেই সমস্ত জীবের তৃপ্তি হয়। ভগবান মানুষ, পশু, পক্ষী, ঋষি, দেবতা ইত্যাদি বহু প্রকার শরীররূপী বাসস্থান সৃষ্টি করেছেন। এই সমস্ত অসংখ্য শরীরে ভগবান পরমাত্মারূপে বাস করেন, তার ফলে তিনি পুরুষাবতার নামে প্রসিদ্ধ। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, প্রতিটি শরীরে পরমাত্মা জীবকে তার উপলব্ধির ক্ষমতা অনুসারে বুদ্ধি প্রদান করেন। তাই শরীরে পরমাত্মাই হচ্ছেন প্রধান। জীবের জ্ঞান, তপস্যা, ইত্যাদির তুলনামূলক বিকাশ অনুসারে জীবাত্মার কাছে পরমাত্মা প্রকাশিত হন।”
“হে রাজন্, ত্রেতাযুগের শুরুতে ঋষিরা যখন মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ দর্শন করলেন, তখন তাঁরা মন্দিরে নানা উপচারে ভগবানের শ্রীবিগ্রহের অর্চনার প্রচলন করেছিলেন। কখনও কখনও কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্ত পূজার সমস্ত উপকরণ নিবেদন করে ভগবানের পূজা করে, কিন্তু যেহেতু সে ভগবানের ভক্তের প্রতি বিদ্বেষী, তাই ভগবান তার দ্বারা পূজিত হলেও তার প্রতি প্রসন্ন হন না। হে রাজন্, সমস্ত মানুষদের মধ্যে যোগ্য ব্রাহ্মণকেই এই জগতে সর্বোত্তম বলে মনে করা উচিত, কারণ তিনি তপস্যা, বেদ অধ্যয়ন এবং সন্তোষের দ্বারা ভগবানের শরীরস্বরূপ হয়ে থাকেন। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, ব্রাহ্মণেরা, বিশেষ করে যাঁরা সারা পৃথিবী জুড়ে ভগবানের মহিমা প্রচারে রত, তাঁরা জগদাত্মা ভগবানেরও পূজ্য। ব্রাহ্মণেরা তাঁদের প্রচারের দ্বারা, তাঁদের শ্রীপাদপদ্মের ধুলির দ্বারা ত্রিভুবনকে পবিত্র করেন এবং তাই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণেরও পূজ্য।”
চতুর্দশ অধ্যায়- আদর্শ গৃহস্থ-জীবন
05 Feb 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান