শ্রীনারদ মুনি বললেন- “প্রহ্লাদ মহারাজ নিতান্ত বালক হওয়া সত্ত্বেও, ভগবান নৃসিংহদেবের দ্বারা প্রদত্ত সেই সমস্ত বরগুলিকে ভক্তিযোগের প্রতিবন্ধক বলে মনে করে, ঈষৎ হাস্য সহকারে বলেছিলেন- হে ভগবান, অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করার ফলে আমি স্বাভাবিকভাবেই জড় সুখভোগের প্রতি আসক্ত। তাই, দয়া করে আমাকে এই সমস্ত বরে দ্বারা প্রলুব্ধ করবেন না। আমি ভৌতিক অবস্থার ভয়ে অত্যন্ত ভীত এবং তাই আমি এই বদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে চাই। সেই জন্যই আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছি। হে পরমারাধ্য ভগবান, যেহেতু সকলের হৃদয়ে ভববন্ধনের মূল কারণরূপ কাম-বাসনার বীজ রয়েছে, তাই আপনি আমাকে শুদ্ধ ভক্তের লক্ষণ প্রদর্শন করার জন্য এই জড় জগতে প্রেরণ করেছেন। অন্যথা, হে ভগবান, হে সমগ্র জগতের গুরু, আপনি আপনার ভক্তের প্রতি এতই করুণাময় যে, তাঁর পক্ষে অহিতকর কোন কিছু তাঁকে আপনি করতে দেন না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আপনার সেবার বিনিময়ে কোন জাগতিক লাভ কামনা করে, সে আপনার শুদ্ধ ভক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে, সে একটি বণিক যে তার সেবার বিনিময়ে লাভ চায়। যে ভৃত্য তার সেবার বিনিময়ে প্রভুর কাছ থেকে কোন রকম জাগতিক লাভের বাসনা করে, সে যোগ্য সেবক বা শুদ্ধ ভক্ত নয়। তেমনই, যে প্রভু তার প্রভুত্বের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য তার ভৃত্যকে জড়-জাগতিক লাভ প্রদান করেন, তিনিও শুদ্ধ প্রভু নন। হে প্রভু, আমি আপনার নিষ্কাম সেবক এবং আপনি আমার নিত্য প্রভু। আমাদের প্রভু এবং ভৃত্য হওয়া ব্যতীত অন্য কিছু হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি প্রকৃতই আমার প্রভু এবং আমি স্বভাবতই আপনার সেবক। আমাদের আর অন্য কোন সম্পর্ক নেই। হে ভগবান, হে সর্বশ্রেষ্ঠ বরদাতা, আপনি যদি আমাকে আমার অভীষ্ট বর প্রদান করতে চান, তা হলে আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমার হৃদযে কোন জড় বাসনার উদয় না হয়। হে ভগবান, জন্ম থেকেই কাম-বাসনার ফলে মানুষের ইন্দ্রিয়, মন, প্রাণ, দেহ, ধর্ম, ধৈর্য, বুদ্ধি, লজ্জা, ঐশ্বর্য, বল, স্মৃতি এবং সত্য, সব কিছুই নষ্ট হয়ে যায়। হে ভগবান, মানুষ যখন তার মনের সমস্ত জড় বাসনা পরিত্যাগ করতে সক্ষম হয়, তখন সে আপনারই মতো ঐশ্বর্য লাভ করার যোগ্য হয়। হে ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ পরমেশ্বর ভগবান! হে পরমাত্মা, সকল দুঃখহন্তা! হে অদ্ভুত নরসিংহ রূপধারী পরম পুরুষ, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
ভগবান বললেন- “হে প্রিয় প্রহ্লাদ, তোমার মতো ভক্ত ইহলোকে অথবা পরলোকে, কোন প্রকার জড় ঐশ্বর্য বাসনা করে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি যে, তুমি এই মন্বন্তর পর্যন্ত এখানে দৈত্যদের অধীশ্বর হয়ে, এই জড় জগতে তাদের সমস্ত ঐশ্বর্য উপভোগ কর। তুমি যে জড় জগতে রয়েছ তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি সর্বদা আমার উপদেশ এবং বাণী শ্রবণ করে আমার চিন্তায় মগ্ন থেকো, কারণ আমিই সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমাত্মা। তাই সকাম কর্ম পরিত্যাগ করে আমার আরাধনা কর। হে প্রহ্লাদ, এই জড় জগতে অবস্থানকালে তুমি তোমার সুখ অনুভবের দ্বারা পুণ্য কর্মের ফল এবং পুণ্য আচরণের দ্বারা পাপকর্মের ফল ক্ষয় করবে। শক্তিশালী কালের প্রভাবে তুমি তোমার দেহ ত্যাগ করবে, কিন্তু তোমার যশ স্বর্গলোকেও কীর্তিত হবে এবং সম্পূর্ণরূপে বন্ধনমুক্ত হয়ে তুমি ভগবদ্ধামে আমার কাছে ফিরে আসবে। যে ব্যক্তি সর্বদা তোমার কার্যকলাপ স্মরণ করে এবং আমার কার্যকলাপও স্মরণ করে এবং তোমার দ্বারা গীত এই স্তোত্র কীর্তন করে, সে যথাসময়ে কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়।”
প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন- “হে পরমেশ্বর, আপনি যেহেতু অধঃপতিত জীবদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাময়, তাই আমি আপনার কাছে কেবল একটি বর প্রার্থনা করি। আমি জানি যে আমার পিতা মৃত্যুর সময় আপনার দৃষ্টিপাতের প্রভাবে পবিত্র হয়েছেন, কিন্তু আপনার অপূর্ব শক্তি এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকার ফলে তিনি ভ্রান্তভাবে আপনাকে তাঁর ভ্রাতৃগাতী বলে মনে করে অনর্থক আপনার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তার ফলে তিনি সমস্ত জীবের পরম গুরু আপনাকে প্রত্যক্ষভাবে নিন্দা করেছেন এবং আপনার ভক্ত আমার প্রতি পাপাচরণ করেছেন। সেই সমস্ত দুস্তর পাপ থেকে আপনি তাঁকে পবিত্র করুন।”
ভগবান বললেন- “হে প্রহ্লাদ, হে পরম পবিত্র সাধু, তোমার পিতা পূর্বতন একবিংশতি পুরুষ সহ পবিত্র হয়েছে। যেহেতু তুমি এই বংশে জন্মগ্রহণ করেছ, তাই সমস্ত কুল পবিত্র হয়েছে। যেখানে যেখানে প্রশান্ত, সমদর্শী, সদাচার যুক্ত এবং সমস্ত সদ্গুণে বিভূষিত আমার ভক্তেরা বাস করে, অত্যন্ত অধঃপতিত হলেও সেই স্থানের এবং সেই বংশের মানুষেরা পবিত্র হয়ে যায়। হে দৈত্যেন্দ্র প্রহ্লাদ, আমার প্রতি ভক্তি হেতু আমার ভক্তেরা উৎকৃষ্ট এবং অপকৃষ্ট জীবদের মধ্যে ভেদ দর্শন করে না। তারা কখনও কাউকে হিংসা করে না। যারা তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই আমার শুদ্ধ ভক্ত হবে। তুমি আমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত এবং অন্যদের কর্তব্য তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করা। হে বৎস, তোমার পিতা তার মৃত্যুকালে আমার অঙ্গের স্পর্শে ইতিমধ্যেই পবিত্র হয়েছে। তা সত্ত্বেও, পুত্রের কর্তব্য পিতার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা, যার ফলে তার পিতা সৎ প্রজা এবং ভক্ত হওয়ার জন্য উচ্চলোকে গমন করতে পারে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করার পর তুমি তোমার পিতার রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ কর। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হও এবং বৈষয়িক কার্যকলাপের দ্বারা বিচলিত না হয়ে আমাতে মনোনিবেশ কর। বেদের নির্দেশ লঙ্ঘন না করে, তুমি তোমার কর্তব্য কর্ম সম্পাদন কর।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, প্রহ্লাদ মহারাজ ভগবানের নির্দেশ অনুসারে তাঁর পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেছিলেন। তারপর ব্রাহ্মণদের দ্বারা তিনি হিরণ্যকশিপুর সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। ভগবান প্রসন্ন হওয়ার ফলে ব্রহ্মার মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়েছিল। দেবতাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তিনি তখন ভগবানের উদ্দেশ্যে দিব্য বাণীর দ্বারা প্রার্থনা করতে শুরু করেছিলেন।”
ব্রহ্মা বললেন- “হে দেবদেব, হে অখিল অধ্যক্ষ, হে ভূতভাবন, হে পূর্বজ (আদিপুরুষ), আমাদের সৌভাগ্যের ফলে আপনি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সন্তাপ প্রদানকারী মহাপাপী অসুরকে সংহার করেছেন। এই অসুর হিরণ্যকশিপু আমার কাছ থেকে বর লাভ করেছিল যে, আমার সৃষ্ট কোন জীবের দ্বারা সে নিহত হবে না। এই প্রতিশ্রুতি এবং তার তপস্যা ও যোগশক্তির বলে সে অত্যন্ত গর্বিত হয়ে সমস্ত বৈদিক নির্দেশ লঙ্ঘন করেছিল। ভাগ্যক্রমে হিরণ্যকশিপুর পুত্র মহাভাগবত সাধু বালক প্রহ্লাদ মহারাজ মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন সে সম্পূর্ণভাবে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণে রয়েছে। হে ভগবান, আপনি পরমাত্মা। যদি কেউ আপনার চিন্ময় শরীরের ধ্যান করেন, তা হলে আপনি তাঁকে সমস্ত ভয় থেকে রক্ষা করেন, এমন কি আসন্ন মৃত্যুভয় থেকেও।”
ভগবান উত্তর দিলেন- “হে ব্রহ্মা, হে পদ্মসম্ভব, সর্পদের দুধ প্রদান করা যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনই অত্যন্ত ক্রূরস্বভাব এবং ঈর্ষাপরায়ণ অসুরদের বরদান করাও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। অসুরদের আর কখনও এই প্রকার বর দান করো না।”
নারদ মুনি বললেন- “হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, সাধারণ জীবদের অগোচর ভগবান এইভাবে ব্রহ্মাকে নির্দেশ দিয়ে ব্রহ্মা কর্তৃক পূজিত হয়ে সেই স্থান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। তারপর প্রহ্লাদ মহারাজ ভগবানের অংশ ব্রহ্মা, শিব, প্রজাপতি আদি সমস্ত দেবতাদের পূজা করে বন্দনা করেছিলেন। তারপর কমলাসন ব্রহ্মা শুক্রাচার্য প্রভৃতি মুনিদের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রহ্লাদকে দৈত্য এবং দানবদের অধিপতি করেছিলেন।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, তারপর ব্রহ্মা আদি দেবতাগণ প্রহ্লাদ মহারাজ কর্তৃক যথাযথভাবে পূজিত হয়ে, প্রহ্লাদকে চরম আশীর্বাদ প্রদান করে তাঁদের স্বধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এইভাবে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দুই পার্ষদ হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুরূপে দিতির পুত্রত্ব প্রাপ্ত হয়ে, ভ্রান্তিবশত সকলের হৃদয়স্থিত ভগবানকে তাঁদের শত্রু বলে মনে করে, নিহত হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণদের অভিশাপে ভগবানের সেই দুই পার্ষদ পুনরায় কুম্ভকর্ণ এবং দশানন রাবণরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই দুই রাক্ষস ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের অসাধারণ পরাক্রমে নিহত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বাণের দ্বারা বিদ্ধ হয়ে কুম্ভকর্ণ এবং রাবণ উভয়েই রণক্ষেত্রে শায়িত হয়েছিলেন এবং হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপুরূপে তাদের পূর্বজন্মের মতোই পূর্ণরূপে ভগবানের চিন্তায় মগ্ন হয়ে দেহত্যাগ করেছিল। তারা পুনরায় মনুষ্য-সমাজে শিশুপাল এবং দন্তবক্ররূপে জন্মগ্রহণ করে ভগবানের প্রতি বৈরীভাব পোষণ করেছিল এবং তোমার সমক্ষে ভগবানের শরীরে লীন হয়েছিল। কেবল শিশুপাল এবং দন্তবক্রই নয়, অন্য বহু রাজারাও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শত্রুবৎ আচরণ করে মৃত্যুর সময় মুক্তি লাভ করেছিল। যেহেতু তারা ভগবানের কথা চিন্তা করেছিল, তাই তারা ভগবানেরই মতো চিন্ময় দেহ এবং রূপ প্রাপ্ত হয়েছিল, ঠিক যেমন ভ্রমরের দ্বারা বন্দী কীট ভ্রমরের কথা চিন্তা করতে করতে ভ্রমরেরই মতো রূপ প্রাপ্ত হয়। যে শুদ্ধ ভক্তেরা ভগবদ্ভক্তির দ্বারা নিরন্তর নিরন্তর ভগবানের কথা চিন্তা করেন, তাঁরা ভগবানেরই মতো শরীর প্রাপ্ত হন। তাকে বলা হয় সারূপ্য-মুক্তি। যদিও শিশুপাল, দন্তবক্র এবং অন্যান্য রাজারা শত্রুরূপে শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করেছিল, তারও সেই ফল প্রাপ্ত হয়েছিল। শিশুপাল এবং অন্যেরা ভগবানের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে মুক্তি লাভ করেছিল, সেই সম্বন্ধে তুমি আমাকে যে সমস্ত প্রশ্ন করেছিলে, তার বিশ্লেষণ আমি করলাম।”
“ব্রাহ্মণদের শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনায় ভগবানের বিভিন্ন অবতারের কথা এবং হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু নামক দুই দৈত্য কিভাবে নিহত হয়েছিল, তার বর্ণনা করা হল। এই কাহিনী মহাভাগবত প্রহ্লাদ মহারাজের চরিত্র, তাঁর দৃঢ় ভক্তি, পূর্ণ জ্ঞান ও তাঁর পূর্ণ বৈরাগ্য বর্ণনা করেছে। এখানে সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহারের কারণরূপেও ভগবানের বর্ণণা করা হয়েছে। প্রহ্লাদ মহারাজ তার প্রার্থনায় ভগবানের দিব্য গুণাবলী এবং সেই সঙ্গে কিভাবে দেবতা ও অসুরদের আবাস, তা যতই ঐশ্বর্যশালী হোক না কেন, ভগবানের নির্দেশ মাত্রই ধ্বংস হয়, তারও বর্ণনা করা হয়েছে। যে ধর্মের দ্বারা ভগবানকে জানা যায়, তাকে বলা হয় ভাগবত-ধর্ম। তাই এই আখ্যানে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। যে ব্যক্তি এই আখ্যানে বর্ণিত ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সর্ব-শক্তিমত্তার কথা শ্রবণ করেন এবং কীর্তন করেন, তিনি অবশ্যই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হন। প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন সমস্ত ভক্তদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রহ্লাদ মহারাজের কার্যকলাপ, হিরণ্যকশিপু বধ এবং ভগবান নৃসিংহদেবের লীলা যিনি সমাহিত চিত্তে শ্রবণ করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে অকুতোভয় বৈকুন্ঠধাম প্রাপ্ত হবেন।”
নারদ মুনি বললেন- “হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, তোমরা সকলে (পাণ্ডবেরা) অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মনুষ্যরূপে তোমাদের প্রাসাদে বাস করেন। মহর্ষিগণ সেই কথা জানেন এবং তাই তাঁরা সর্বদা তোমাদের গৃহে গমন করেন। নির্বিশেষ ব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং, কারণ শ্রীকৃষ্ণই নির্বিশেষ ব্রহ্মের উৎস। তিনিই মহাপুরুষদের অন্বেষণীয় পরমানন্দের উৎস, তবুও সেই পরমেশ্বর ভগবান তোমাদের প্রিয়তম বন্ধু, সুহৃদ এবং মাতুলপুত্র রূপে তোমাদের সঙ্গে অতি অন্তরঙ্গভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তোমাদের আত্মাস্বরূপ। তিনি তোমাদের পূজনীয়, তবুও তিনি কখনও কখনও তোমাদের সেবকরূপে এবং কখনও আবার গুরুরূপে আচরণ করেন। শিব, ব্রহ্মা আদি মহাপুরুষেরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তত্ত্ব যথার্থভাবে বর্ণনা করতে পারেননি। যিনি মহাপুরুষদের মৌনব্রত, ধ্যান, ভক্তি এবং ত্যাগের দ্বারা ভক্তরক্ষক-রূপে পূজিত হন, সেই পরমেশ্বর ভগবান আমাদের প্রতি প্রসন্ন হোন। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, বহুকাল পূর্বে অনন্ত মায়াধারী ময়দানব যখন দেবাদিদেব মহাদেবের যশ খর্ব করেছিল, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণে শিবের যশ উদ্ধার করে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন।”
মহারাজ যুধিষ্ঠির বললেন- “কি কারণে ময়দানব শিবের যশ বিনষ্ট করেছিল? কিভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিবকে রক্ষা করে পুনরায় তাঁর যশ বিস্তার করেছিলেন? সেই কথা আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন।”
নারদ মুনি বললেন- “শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় সর্বদা পরম শক্তিসম্পন্ন দেবতারা যুদ্ধে অসুরদের পরাজিত করেছিলেন। তখন অসুরেরা মায়াবীশ্রেষ্ঠ ময়দানবের শরণ গ্রহণ করেছিল। অসুরদের মহান নায়ক ময়দানব তিনটি অদৃশ্য পুরী নির্মাণ করে অসুরদের সেগুলি দিয়েছিল। সেই পুরীগুলি ছিল স্বর্ন, রৌপ্য এবং লৌহ নির্মিত এবং সেগুলি বিমানের মতো অন্তরীক্ষে গমনশীল ছিল এবং সেগুলি অসাধারণ উপকরণে পূর্ণ ছিল। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, এই তিনটি পুরীতে দেবতাদের অগোচর থেকে অসুর সেনাপতিরা দেবতাদের সঙ্গে তাদের পূর্বে শত্রুতা স্মরণ করে ত্রিলোক বিনাশ করতে শুরু করেছিল। তারপর অসুরদের দ্বারা বিনষ্ট স্বর্গলোকের দেবতারা মহাদেবের কাছে গিয়ে প্রণত হয়ে বলেছিলেন- হে প্রভু, আমরা দেবতারা ত্রিপুরবাসী অসুরদের দ্বারা বিনষ্টপ্রায় হয়েছি। আমরা আপনার অনুগামী। দয়া করে আপনি আমাদের রক্ষা করুন। তখন পরম শক্তিমান এবং ক্ষমতাসম্পন্ন দেবাদিদেব মহাদেব তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় করো না।’ তারপর তিনি তাঁর ধনুকে বাণ যোজন করে অসুরদের সেই তিনটি পুরীতে নিক্ষেপ করেছিলেন। সূর্যমণ্ডল থেকে রশ্মিসমূহের মতো মহাদেবের ধনুক থেকে আগুনের মতো উজ্জ্বল বাণসমূহ নিক্ষিপ্ত হয়ে, সেই তিনটি পুরী আচ্ছাদিত হওয়ার ফলে দৃষ্টির অগোচর হয়েছিল। মহাদেবের স্বর্ণনির্মিত বাণের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে, সেই পুরী তিনটির অধিবাসী অসুরেরা প্রাণ হারিয়ে পতিত হয়েছিল। তখন মহাযোগী ময়দানব তার নির্মিত অমৃতের কূপে তাদের নিক্ষেপ করেছিল। সেই অমৃতের স্পর্শে অসুরদের মৃতদেহ বজ্রের মতো দুর্ভেদ্য হয়েছিল। মহা বলে বলীয়ান হয়ে, তারা তখন মেঘভেদী বিদ্যুতের মতো উত্থিত হয়েছিল। মহাদেবকে অত্যন্ত নিরাশ এবং অসুখী দর্শন করে, ভগবান শ্রীবিষ্ণু ময়দানবের সেই উৎপাত কিভাবে নিবারণ করা যায়, তার উপায় বিবেচনা করেছিলেন। তখন ব্রহ্মা গোবৎস এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণু গাভী হয়ে পুরীতে প্রবেশ করে কূপের সমস্ত অমৃত পান করেছিলেন। অসুরেরা গোবৎস এবং গাভীটিকে দেখেছিল, কিন্তু ভগবানের মায়ার দ্বারা মোহিত হওয়ার ফলে, তারা তাদের নিষেধ করতে পারেনি। মহাযোগী ময়দানব যখন জানতে পেরেছিল যে, একটি গোবৎস এবং গাভী সেই কূপের সমস্ত অমৃত পান করেছে, তখন সে বুঝতে পেরেছিল যে, দৈবের অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই তা হয়েছে। তখন সে শোকার্ত অসুরদের বলেছিল- যা হয়েছে তা নিজের, অপরের অথবা নিজের এবং অপরের উভয়ের প্রতি দৈবনির্দিষ্ট ভাগ্য এবং দেবতা, অসুর, মানুষ অথবা অন্য কারও পক্ষে কখনই তার অন্যাথা করা সম্ভব নয়।”
“তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য, তপস্যা, বিদ্যা এবং ক্রিয়া সমন্বিত স্বীয় শক্তির দ্বারা রথ, সারথি, ধ্বজা, অশ্ব, হস্তী, ধনুক, বর্ম, বাণ প্রভৃতি প্রয়োজনীয় উপকরণ সৃষ্টি করে মহাদেবকে সজ্জিত করেছিলেন। এইভাবে পূর্ণরূপে সজ্জিত হয়ে মহাদেব তখন অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য রথে আরোহণ করে ধনুর্বাণ গ্রহণ করেছিলেন। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, পরম শক্তিমান মহাদেব তাঁর ধনুকে শর সংযোজন করে, দ্বিপ্রহরে অসুরদের তিনটি পুরীতে আগুন জ্বালিয়ে সেগুলি ভস্মসাৎ করেছিলেন। স্বর্গের দেবতারা তাঁদের বিমানে চড়ে দুন্দুভি বাজিয়েছিলেন। দেবতা, ঋষি, পিতৃ, সিদ্ধ এবং অন্যান্য মহান ব্যক্তিগণ জয়ধ্বনি দিয়ে শিবের মস্তকে পুষ্পবর্ষণ করেছিলেন এবং অপ্সরাগণ মহা আনন্দে গান ও নৃত্য করতে শুরু করেছিলেন। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, এইভাবে অসুরদের তিনটি পুরী ভস্মীভূত করার ফলে শিব ত্রিপুরারি নামে পরিচিত হয়েছিলেন। ব্রহ্মা আদি দেবতাদের দ্বারা পূজিত হয়ে মহাদেব তখন তাঁর নিজের ধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একজন সাধারণ মানুষের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন, তবুও তাঁর স্বীয় শক্তির দ্বারা তিনি অসাধারণ এবং আশ্চর্যজনক বহু লীলাবিলাস করেছিলেন। মহর্ষিগণ তাঁর কার্যকলাপ ইতিমধ্যেই বর্ণনা করেছেন, তার অতিরিক্ত আমি আর কি বলতে পারি? যথাযথ সূত্রে তাঁর কার্যকলাপের বর্ণনা কেবল শ্রবণ করার ফলেই সকলে পবিত্র হতে পারে।”
দশম অধ্যায়- ভক্তপ্রবর প্রহ্লাদ
29 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান