শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ব্রহ্মা, শিব আদি মহাজনদের আদরণীয় প্রহ্লাদ মহারাজের চরিত্র শ্রবণ করে, মহাত্মাদের অগ্রগণ্য যুধিষ্ঠির মহারাজ অত্যন্ত প্রীত হয়ে পুনরায় ব্রহ্মার পুত্র নারদ মুনিকে জিজ্ঞাসা করলেন- হে প্রভু, যে ধর্ম থেকে মানুষ জীবনের পরম লক্ষ্য ভগবদ্ভক্তি প্রাপ্ত হয়, আমি আপনার কাছে সেই ধর্মের কথা শুনতে চাই। মানুষের বৃত্তি অনুসারে মানব-সমাজকে সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় যে বর্ণাশ্রম-ধর্ম, সেই সম্বন্ধে আমি শুনতে চাই। হে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, আপনি প্রজাপতি ব্রহ্মার সাক্ষাৎ পুত্র। আপনার তপস্যা, যোগ এবং সমাধির প্রভাবে পরমেষ্ঠি ব্রহ্মার সমস্ত পুত্রদের মধ্যে আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ। আপনার মতো শান্ত এবং দয়ালু আর কেউ নেই এবং কিভাবে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করতে হয় এবং কিভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ হতে হয়, সেই সম্বন্ধে আপনার থেকে ভালভাবে আর কেউই জানেন না। তাই, আপনি ধর্মের সমস্ত গুহ্যতত্ত্ব অবগত আছেন এবং তা আপনার থেকে ভালভাবে আর কেউ জানেন না।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “সর্বপ্রথমে আমি সমস্ত জীবের ধর্মরক্ষক ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি নিবেদন করে, নারায়ণের মুখ থ্রেক শ্রুত সনাতন ধর্ম বিশ্লেষণ করছি। ভগবান নারায়ণ তাঁর অংশ নর সহ ধর্মের ঔরসে দক্ষের কন্যা মূর্তির গর্ভে সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। এখনও তিনি জীবের মঙ্গলের জন্য বদরিকাশ্রমে তপস্যা করছেন। সর্ববেদময় ভগবান শ্রীহরিই ধর্মের মূল এবং বেদবেত্তা মহাত্মাদের স্মৃতি। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, এই ধর্মই প্রমাণস্বরূপ। এই ধর্মের ভিত্তিতেই মন, আত্মা, দেহ ইত্যাদি সব কিছুই প্রসন্ন হয়। সমস্ত মানুষেরই যে সাধারণ নীতিগুলি মেনে চলা উচিত সেগুলি হচ্ছে- সত্য, দয়া, তপস্যা (একদশী প্রভৃতি তিথিতে উপবাস), শৌচ (দিনে অন্তত দুবার স্নান), সহনশীলতা, ভাল-মন্দের বিচার, মনঃসংযম, ইন্দ্রিয়-সংযম, অহিংসা, ব্রহ্মচর্য, দান, শাস্ত্র, অধ্যয়ন, সরলতা, সন্তোষ, সাধুসেবা, অনাবশ্যক কার্য থেকে ধীরে ধীরে অবসর গ্রহণ, মানব-সমাজের অনাবশ্যক কার্যকলাপের নিরর্থকতা দর্শন, মৌন এবং গম্ভীর হয়ে বৃথা আলাপ পরিত্যাগ, জীব তার স্বরূপে দেহ না আত্মা তার বিচার, সমস্ত জীবকে (মানুষ এবং পশু উভয়কে) সমভাবে খাদ্য বিতরণ, প্রতিটি আত্মাকে (বিশেষ করে মনুষ্যরূপে) ভগবানের অংশরূপে দর্শন, (সাধুদের আশ্রয়) পরমেশ্বর ভগবানের কার্যকলাপ এবং উপদেশ শ্রবণ, এই সমস্ত কার্যকলাপ এবং উপদেশের মহিমা কীর্তন, সর্বদা এই সমস্ত কার্যকলাপ এবং উপদেশের কথা স্মরণ, ভগবানের সেবা করার চেষ্টা, ভগবানের পূজা, ভগবানকে প্রণতি নিবেদন, ভগবানের দাস হওয়া, ভগবানের সখা হওয়া এবং সর্বতোভাবে ভগবানের শরণাগত হওয়া। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, এই ত্রিশটি গুণ অর্জন করা মানুষের অবশ্য কর্তব্য। কেবল এই গুণগুলি অর্জন করার ফলেই পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধান করা যায়। যাঁরা অবিচ্ছিন্নরূপে বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা সম্পাদিত গর্ভাদান এবং অন্যান্য সংস্কারের দ্বারা শুদ্ধ হয়েছেন এবং ব্রহ্মা যাঁদের অনুমোদন করেছেন, তাঁরা দ্বিজ। এই প্রকার ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য, যাঁরা তাঁদের কুল-পরম্পরা এবং আচরণের দ্বারা শুদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের কর্তব্য ভগবানের পূজা করা, বেদ অধ্যয়ণ করা এবং দান করা। এই পদ্ধতিতে তাঁদের চতুরাশ্রমের (ব্রহ্মচর্য, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস) নিয়ম পালন করা কর্তব্য।”
“ব্রাহ্মণের অধ্যয়ন আদি ছয়টি কর্ম। ক্ষত্রিয় দান গ্রহণ ব্যতীত অন্য পাঁচটি কর্ম অনুষ্ঠান করতে পারেন। রাজা অথবা ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণদের উপর কর ধার্য করতে পারেন না। কিন্তু তাঁরা প্রজাদের উপর ন্যূনতম কর, শুল্ক, দণ্ড ধার্য করে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। বৈশ্যদের কর্তব্য সর্বদা ব্রাহ্মণদের আদেশ পালন করা এবং কৃষি, গোরক্ষা ও বানিজ্য দ্বারা জীবিকা অর্জন করা। শূদ্রদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে উচ্চ বর্ণের সেবা করার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা। প্রয়োজন হলে ব্রাহ্মণও বৈশ্যের বৃত্তি- কৃষি, গোরক্ষা এবং বানিজ্য গ্রহণ করতে পারেন। অযাচিতভাবে যা পাওয়া যায় তার উপর তিনি নির্ভর করতে পারেন। তিনি প্রতিদিন ক্ষেত্রে ধান ভিক্ষা করতে পারেন, ক্ষেত্রস্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত ধান সংগ্রহ করতে পারেন, অথবা দোকানে পরিত্যক্ত শস্যকণা সংগ্রহ করতে পারেন। এই চারটি বৃত্তিও ব্রাহ্মণ অবলম্বন করতে পারেন। এই চারটি বৃত্তির মধ্যে পূর্ববর্তী অপেক্ষা পরবর্তী বৃত্তি শ্রেষ্ঠ। বিপদে উপস্থিত না হলে, নিম্নস্তরের মানুষ শ্রেষ্ঠ বৃত্তি অবলম্বন করবেন না। আপৎকালে ক্ষত্রিয় ভিন্ন অন্য সকলেই অন্যের বৃত্তি অবলম্বন করতে পারে। আপৎকালে ঋত, অমৃত, মৃত, প্রমৃত এবং সত্যানৃত নামক বিভিন্ন বৃত্তির মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু কখনও শ্ব-বৃত্তি অবলম্বন করা উচিত নয়। উঞ্ছশীল বৃত্তি, অর্থাৎ শস্যক্ষেত্র থেকে পতিত শস্য সংগ্রহ করাকে বলা হয় ঋত। অযাচিত বৃত্তিকে বলা হয় অমৃত, শস্য ভিক্ষা করাকে বলা হয় মৃত, কৃষিকার্যকে বলা হয় প্রমৃত এবং বানিজ্যকে বলা হয় সত্যানৃত। নিচ ব্যক্তির সেবাকে বলা হয় শ্ব-বৃত্তি বা কুকুরের বৃত্তি। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের কখনও এই নিন্দিত এবং ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। কারণ ব্রাহ্মণ সর্ব-বেদময় এবং ক্ষত্রিয় সর্ব-দেবময়। শম, দম, তপস্যা, শৌচ, সন্তোষ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান, দয়া, সত্যভাষণ এবং ভগবানের কাছে সর্বতোভাবে নিজেকে সমর্পণ- এইগুলি ব্রাহ্মণের লক্ষণ। যুদ্ধে পরাক্রম, অন্যের দ্বারা পরাভূত না হওয়া, ধৈর্য, তেজ, দান, দৈহিক আবশ্যকতার দ্বারা বিচলিত না হওয়া, ক্ষমাশীলতা, ব্রাহ্মণ-পরায়ণতা, প্রসন্নতা এবং সত্যভাষণ- এইগুলি ক্ষত্রিয়ের লক্ষণ। দেবতা, গুরু এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রতি ভক্তি, ধর্ম-অর্থ-কাম- এই ত্রি-বর্গের অনুষ্ঠান, শ্রীগুরুদেব এবং শাস্ত্রের বাণীতে শ্রদ্ধা এবং সর্বদা অর্থ উপার্জনের জন্য উদ্যম এবং নিপুণতা- এইগুলি বৈশ্যের লক্ষণ। সমাজের উচ্চ বর্ণের মানুষদের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের) প্রণতি নিবেদন করা, শৌচ, নিষ্কপটতা, প্রভুর সেবা, মন্ত্রবিহীন যজ্ঞ অনুষ্ঠান করা, চুরি না করা, সর্বদা সত্যভাষণ এবং গাভী ও ব্রাহ্মণদের রক্ষা- এইগুলি শূদ্রের লক্ষণ।”
“পতির সেবা করা, সর্বদা পতির প্রতি অনুকূল থাকা, পতির আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের প্রতিও সমানভাবে অনুকূল থাকা এবং পতির ব্রত পালন করা- এই চারটি পতিব্রতা স্ত্রীর লক্ষণ। সাধ্বী স্ত্রীর কর্তব্য পতির প্রসন্নতার জন্য সুন্দর বসন এবং স্বর্ণ অলঙ্কারে সজ্জিতা হওযা এবং সর্বদা পরিষ্কার ও আকষর্ণীয় বস্ত্র পরিধান করে, সম্মার্জন এবং অনুলেপনের দ্বারা গৃহকে সর্বদা পরিষ্কার ও পবিত্র রাখা। তাঁর কর্তব্য গৃহস্থালির সমস্ত উপকরণগুলি সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা এবং ধূপ ও ফুলের দ্বারা গৃহকে সর্বদা সুরভিত রাখা এবং সর্বদা পতির বাসনা পূর্ণ করার জন্য প্রস্তুত থাকা। বিনীত এবং সত্যনিষ্ঠ হয়ে, ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে এবং মধুর বাক্যে কাল ও পরিস্থিতি অনুসারে পতিব্রতা স্ত্রীর কর্তব্য প্রেম দ্বারা তাঁর পতির সেবা করা। পতিব্রতা স্ত্রীর কর্তব্য লোভী না হওয়া এবং সমস্ত পরিস্থিতিতেই সন্তুষ্ট থাকা। গৃহকার্যে তিনি অত্যন্ত নিপুণা এবং ধর্ম সম্বন্ধে পূর্ণরূপে অবগতা। তিনি প্রিয়ভাষিণী এবং সত্যবাক্, পবিত্র ও নির্মল। এইভাবে সাধ্বী স্ত্রী সর্বদা সতর্ক এবং স্নেহযুক্তা হয়ে সেই পতির সেবা করবেন, যিনি পতিত নন। যে নারী লক্ষ্মীদেবীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিষ্ঠা সহকারে তাঁর পতির সেবা করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে তাঁর পতি সহ বৈকুন্ঠলোকে ফিরে গিয়ে মহাসুখে সেখানে বাস করেন।”
“সঙ্কর বর্ণের মধ্যে যারা চোর নয়, তাদের বলা হয় অন্তেবসায়ী বা চণ্ডাল (শ্বপচঃ) এবং তাদেরও কুল-পরস্পরাগত বৃত্তি রয়েছে। হে রাজন্, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা যুগে যুগে, জড়া প্রকৃতির গুণ অনুসারে মানুষের আচরণকেই ইহলোকে এবং পরলোকে মঙ্গলজনক বলে নির্দেশ দিয়েছেন। যদি কেউ তাঁর স্বভাবজাত বৃত্তি অনুসারে আচরণ করেন, তা হলে তিনি ধীরে ধীরে তাঁর স্বভাবজাত কর্ম পরিত্যাগ করে নিষ্কাম ভাব প্রাপ্ত হন। হে রাজন্, কৃষিক্ষেত্রে বার বার বীজ বপন করা হলে ক্ষেত নির্বীর্য হয়ে পড়ে এবং তখন বীজ বপন করা হলেও সেই বীজ নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক যেমন বিন্দু বিন্দু ঘৃতের দ্বারা অগ্নি নির্বাপিত না হলেও প্রচুর ঘি নিক্ষেপের ফলে অগ্নি নির্বাপিত হয়, তেমনই কাম-বাসনায় অত্যন্ত লিপ্ত হওয়ার ফলে সেই সমস্ত বাসনা সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্ত হয়। যদি কেউ উপরোক্ত বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রের লক্ষণগুলি প্রদর্শন করেন, তা হলে তাঁকে ভিন্ন বর্ণের বলে মনে হলেও এই লক্ষণ অনুসারে তাঁর বর্ণ নির্দিষ্ট হবে।”
একাদশ অধ্যায়- আদর্শ সমাজ- চাতুর্বণ্য
01 Feb 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান