নবম অধ্যায়- প্রহ্লাদের প্রার্থনায় নৃসিংহদেবের ক্রোধোপশম

দেবর্ষি নারদ বললেন- “ভগবান তখন অত্যন্ত ক্রোধাবিষ্ট ছিলেন বলে ব্রহ্মা, রুদ্র প্রমুখ দেবতারা তাঁর সামনে যেতে সাহস করেননি। সমস্ত দেবতারা লক্ষ্মীদেবীকে ভগবানের সামনে যেতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তিনিও ভগবানের এই অদৃষ্ট এবং অশ্রুতপূর্ব অদ্ভুত রূপ দর্শন করে ভয়ভীত হওয়ার ফলে তাঁর সামনে যেতে পারেননি। তখন ব্রহ্মা তাঁর নিকটে দণ্ডায়মান প্রহ্লাদ মহারাজকে অনুরোধ করেছিলেন- হে বৎস, ভগবান নৃসিংহদেব তোমার আসুরিক পিতার প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাঁর কাছে গিয়ে তুমি তাঁকে শান্ত কর।”
নারদ মুনি বললেন- “হে রাজন্, মহাভাগবত প্রহ্লাদ মহারাজ একটি ছোট্ট বালক হওয়া সত্ত্বেও, ব্রহ্মার বাণী শিরোধার্য করে ধীরে ধীরে ভগবান নৃসিংহদেবের কাছে গিয়ে ভূতলে পতিত হয়ে, কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজকে তাঁর শ্রীপাদপদ্মে পতিত দেখে ভগবান নৃসিংহদেব করুণার্দ্র হয়ে তাঁকে উত্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর ভক্তদের অভয় প্রদানকারী করকমল তাঁর মস্তকে স্থাপন করেছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজের মস্তকে ভগবান নৃসিংহদেবের করকমলের স্পর্শের ফলে, প্রহ্লাদ মহারাজ সমস্ত জড় কলুষ এবং বাসনা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছিলেন, যেন তিনি তখন সম্পূর্ণরূপে বিধৌত হয়েছিলেন। তার ফলে তিনি তখন চিন্ময় স্তরে অবস্থিত হয়েছিলেন এবং তাঁর শরীরে চিন্ময় আনন্দের সমস্ত লক্ষণগুলি প্রকাশিতত হয়েছিল। তাঁর হৃদয় ভগবৎ প্রেমে পূর্ণ হয়েছিল, তাঁর নয়নযুগল থেকে অশ্রুধারা ঝরে পড়ছিল এবং তিনি তখন পরম আনন্দে ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম তাঁর হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজ একাগ্র চিত্তে সমাহিত হয়ে, ভগবান নৃসিংহদেবের প্রতি তাঁর মন এবং দৃষ্টি নিবদ্ধ করে প্রেম-গদ্‌গদ বচনে তাঁর স্তব করতে লাগলেন।”
প্রহ্লাদ মহারাজ প্রার্থনা করেছিলেন- “অসুর কুলোদ্ভুত আমার পক্ষে ভগবানের প্রসন্নতা বিধানের জন্য স্তব করা কি করে সম্ভব? সত্ত্বগুণান্বিত এবং অত্যন্ত যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ব্রহ্মা আদি দেবতাগণ এবং ঋষিগণ অপূর্ব সুন্দর বাক্য প্রবাহের দ্বারা ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করতে সক্ষম হননি, সুতরাং আমার পক্ষে কি করে সম্ভব হবে? আমার তো কোনই যোগ্যতা নেই।”
“আমি মনে করি যে, ধন-সম্পদ, সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম, তপস্যা, পাণ্ডিত্য, ইন্দ্রিয়নৈপুণ্য, তেজ, প্রতাপ, শারীরিক বল, পৌরুষ, বুদ্ধি এবং যোগশক্তি, এই সমস্ত গুণের দ্বারাও ভগবানে প্রসন্নতা বিধান করা যায় না। ভগবান কেবল ভক্তির দ্বারাই প্রসন্ন হন। এই সমস্ত গুণে গুণান্বিত না হলেও গজেন্দ্র কেবল ভক্তির দ্বারা ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করেছিলেন। (সনৎসুজাত গ্রন্থ বর্ণিত) বারোটি ব্রাহ্মণোচিত গুণে ভূষিত অথচ ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম-বিমুখ অভক্ত-ব্রাহ্মণ অপেক্ষা যাঁর মন, বাক্য, কর্ম, ধন এবং প্রাণ ভগবানের অর্পিত, সেই চণ্ডালও শ্রেষ্ঠ। এই প্রকার ভক্ত সেই রকম ব্রাহ্মণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কারণ ভক্ত তাঁর কুল পবিত্র করতে পারে, কিন্তু সেই অতি গর্বান্বিত ব্রাহ্মণ নিজেকেও পবিত্র করতে পারে না। ভগবান সর্বদাই সর্বতোভাবে আত্মতৃপ্ত। তাই কেউ যখন তাঁকে কিছু নিবেদন করেন, তখন সেই ভক্তের মঙ্গলের জন্যই ভগবান তা কৃপাপূর্বক গ্রহণ করেন। ভগবানের কারও সেবার প্রয়োজন হয় না। উদাহরণ-স্বরূপ বলা যায় যে, নিজের মুখের সৌন্দর্যই দর্পণে প্রতিবিম্বিত হয় (অর্থাৎ ভগবানের আরাধনার ফলে নিজেরই মঙ্গল হয়)। অতএব, অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করলেও আমার বুদ্ধি এবং পূর্ণ প্রয়াস অনুসারে আমি শঙ্কা পরিত্যাগপূর্বক ভগবানের মহিমা বর্ণনা করব। ভগবানের মহিমা শ্রবণ বা পাঠ করলে অবিদ্যাবশত এই জড় জগতে প্রবিষ্ট মানুষও পবিত্র হয়।”
“হে ভগবান, ব্রহ্মা আদি সমস্ত দেবতারা চিন্ময় স্থিতিতে অবস্থিত আপনার নিষ্ঠাপরায়ণ সেবক তাই তাঁরা আমাদের মতো নন (প্রহ্লাদ এবং তাঁর আসুরিক পিতার হিরণ্যকশিপু)। এই ভয়ঙ্কর রূপে আপনার আবির্ভাব আপনার নিজের আনন্দ বিধানের জন্য আপনারই লীলাবিলাস। আপনার এই প্রকার অবতার জগতের মঙ্গল এবং শ্রীবৃদ্ধির জন্য। হে ভগবান নৃসিংহদেব, তাই, আপনি এখন আপনার ক্রোধ সম্বরণ করুন, কারণ আমার পিতা মহা অসুর হিরণ্যকশিপু এখন নিহত হয়েছে। সাধু ব্যক্তিও যেমন সর্প অথবা বৃশ্চিক হত্যা করে আনন্দিত হন, সমগ্র জগৎ এই অসুরের মৃত্যুতে পরম সন্তোষ লাভ করে। এখন তারা তাদের সুখ সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছে এবং ভয় থকে মুক্ত হওয়ার জন্য তারা সর্বদা আপনার এই মঙ্গলময় অবতারকে স্মরণ করবে। হে অজিত ভগবান, আপনার অত্যন্ত ভয়ঙ্কর মুখ, জিহ্বা, সূর্যের মতো উজ্জ্বল নেত্র অথবা ভ্রূকুটিভঙ্গির ভয়ে আমি ভীত নই। আমি আপনার তীক্ষ্ম, দন্ত, অন্ত্রের মালা, রক্তাক্ত কেশর অথবা উন্নত কর্ণের ভয়ে ভীত নই। এমন কি আপনার যে গর্জনের ফলে দিগ্‌গজেরা পলায়ন করে অথবা যে নখাগ্রের দ্বারা শত্রুরা বিনাশ প্রাপ্ত হয়, তার ভয়েও আমি ভীত নই। হে পরম শক্তিমান, পতিত-বৎসল, দুর্জয় প্রভু, আমার কর্মের ফলে আমি অসুরদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছি এবং তাই এই দুঃসহ সংসার-চক্রে অত্যন্ত ভীত হয়েছি। কবে আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে ভব-বন্ধন থেকে মুক্তির আশ্রয় আপনার পাদমূলে আমাকে আহ্বান করবেন? হে মহান্, হে পরমেশ্বর ভগবান, প্রিয় এবং অপ্রিয় পরিস্থিতির সংযোগের ফলে এবং তার সংযোগ ও বিয়োগের ফলে জীবকে স্বর্গ অথবা নরকের অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় পতিত হয়ে শোকাগ্নিতে দগ্ধ হতে হয়। যদিও এই দুঃখময় জীবনের নিবৃত্তি সাধনের বহু উপায় রয়েছে। কিন্তু সেই সেই সমস্ত উপায়গুলি সেই দুঃখদায়ক পরিস্থিতি থেকেও অধিক দুঃখজনক। তাই আমি মনে করি যে, তার একমাত্র নিরাময় হচ্ছে আপনার সেবায় যুক্ত হওয়া। দয়া করে আপনি আমাকে সেই সেবার উপদেশ প্রদান করুন। হে ভগবান নৃসিংহদেব, মুক্ত পুরুষদের (হংস) সঙ্গে আপনার দিব্য প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হয়ে আমি জড়া প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে কলুষমুক্ত হব এবং তার ফলে আমার অত্যন্ত প্রিয় প্রভু আপনার মহিমা কীর্তন করতে সক্ষম হব। আমি ব্রহ্মার পদাঙ্ক অুসরণ করে তাঁর পরম্পরায় আপনার মহিমা কীর্তন করব। এইভাবে আমি অনায়াসে ভবসাগর উর্ত্তীর্ণ হব। হে নৃসিংহদেব, হে বিভো, দেহাত্মবুদ্ধির ফলে আপনার দ্বারা উপেক্ষিত দেহধারী জীবেরা তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্য কিছুই করতে পারে না। তারা তাদের দুঃখ নিবারণের যে উপায়ই গ্রহণ করে তা সাময়িকভাবে লাভজনক হলেও, ক্ষণস্থায়ী। যেমন, পিতা এবং মাতা তাদের শিশুকে রক্ষা করতে পারে না, চিকিৎসক এবং ঔষধ রোগীর কষ্ট দূর করতে পারে না এবং তরণি সমুদ্রে নিমজ্জমান ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারে না। হে প্রভু, এই জড় জগতে সকলেই সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জড়া প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণাধীন। ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেই এই গুণের বশীভূত হয়ে কর্ম করে। তাই এই জড় জগতে সকলেই আপনরার প্রকৃতির বশীভূত। যে কারণে তারা কর্ম করে, যে স্থানে তারা কর্ম করে, যে সময়ে তারা কর্ম করে, যে পদার্থ নিয়ে তারা কর্ম করে, তাদের জীবনের যে উদ্দেশ্যকে তারা চরম বলে বিবেচনা করেছে এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের উপায়- তা সবই আপনারই শক্তির প্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে, যেহেতু শক্তি এবং শক্তিমান অভিন্ন, তাই সেই সবই আপনারই প্রকাশ। হে ভগবান, হে পরম শাশ্বত, আপনার স্বীয় অংশ বিস্তার করে কালের দ্বারা ক্ষোভিত আপনার বহিরঙ্গা শক্তির মাধ্যমে আপনি জীবের সূক্ষ্ম শরীর সৃষ্টি করেছেন। এইভাবে মন বৈদিক কর্ম-কাণ্ডের নির্দেশ এবং ষোলটি উপাদানের দ্বারা অন্তহীন বাসনার বন্ধনে জীবকে বেঁধে রাখে। আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ বিনা, এই বন্ধন থেকে কে মুক্ত হতে পারে? হে প্রভু, হে বিভো, আপনি ষোলটি উপাদানের দ্বারা এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু আপনি তাদের জড় গুণের অতীত। অর্থাৎ, এই জড় গুণগুলি সর্বতোভাবে আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন এবং আপনি কখনও তাদের দ্বারা পরাভূত হন না। তাই, কাল আপনার প্রতিনিধিত্ব করে। হে প্রভু, হে পরমেশ্বর, হে অজেয়, আমি কালচক্রে নিষ্পেষিত এবং তাই আমি সর্বতোভাবে আপনার শরণাগত হয়েছি, এখন দয়া করে আপনি আমাকে আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয়ে গ্রহণ করুন।”
“হে ভগবান, মানুষ সাধরণত দীর্ঘ আয়ু, ঐশ্বর্য এবং সুখভোগের জন্য স্বর্গলোকে উন্নীত হতে চায়, কিন্তু আমার পিতার কার্যকলাপের দ্বারা আমি তা দেখেছি। আমার পিতা যখন ক্রুদ্ধ হয়ে ব্যঙ্গভরে অট্টহাস্য করত, তখন তার ভ্রূকুটি দর্শন করে দেবতারা বিনষ্ট হত। কিন্তু আমার সেই পিতা, যিনি এত শক্তিশালী ছিলেন, তিনি এখন নিমেষের মধ্যে আপনার দ্বারা বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছেন। হে ভগবান, এখন আমি ব্রহ্মা থেকে শুরু করে পিপীলিকা পর্যন্ত সমস্ত জীবের জড় ঐশ্বর্য, যোগশক্তি, দীর্ঘ আয়ু এবং অন্যান্য জড় সুখের পূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। মহাকাল রূপে আপনি এই সবই ধ্বংস করেন। তাই, আমি সেগুলি চাই না। হে ভগবান, আমি কেবল আপনার কাছে অনুরোধ করি, দয়া করে আমাকে শুদ্ধ ভক্তের সান্নিধ্য প্রদান করুন এবং ঐকান্তিক সেবকরূপে তাঁকে সেবা করতে দিন। এই জড় জগতে প্রতিটি জীবই ভবিষ্যৎ সুখের কামনা করে, যা ঠিক মরুভূমির মরীচিকার মতো। মরুভূমিতে জল কোথায়? ঠিক তেমনই এই জড় জগতে সুখ কোথায়? এই শরীরটির কি মূল্য? ইট কেবল নানা প্রকার রোগের উদ্ভবস্থল। তথাকথিত দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং রাজনীতিবিদেরা সেই কথা ভালভাবেই জানে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা অনিত্য সুখের আকাঙ্ক্ষা করে। সুখ লাভ করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু যেহেতু তারা তাদের ইন্দ্রিয়-সংযমে অক্ষম, তাই তারা জড় জগতের তথাকথিত সুখের পিছনে ধাবিত হয় এবং কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না। হে ভগবান, হে পরমেশ্বর, নারকীয় তম ও রজোগুণাচ্ছন্ন অসুরকুল জাত আমি বা কোথায়? আর ব্রহ্মা, শিব অথবা লক্ষ্মীদেবীকেও যা কখনও প্রদান করা হয়নি, আপনার সেই অহৈতুকী কৃপাই বা কোথায়? আপনি কখনও তাঁদের মস্তক আপনার করকমল অর্পণ করেননি, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আপনি তা করেছেন। হে ভগবান, আপনি সাধারণ জীবের মতো শত্রু ও মিত্রের এবং অনুকূল ও প্রতিকূলের মধ্যে ভেদভাব দর্শন করেন না, কারণ আপনার মধ্যে উচ্চ এবং নিচ ধারণা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও কল্পবৃক্ত যেমন মহৎ এবং ক্ষুদ্রের মধ্যে পার্থক্য দর্শন না করে জীবের বাসনা অনুসারে ফল প্রদান করে, তেমনই আপনি ভক্তের সেবার মাত্রা অনুসারে তাঁকে আপনার আশীর্বাদ প্রদান করেন। হে ভগবান, একের পর এক জড় বাসনার সঙ্গ প্রভাবে আমি সাধারণ মানুষদের অনুসরণ করে সর্পপূর্ণ অন্ধকূপে পতিত হয়েছি। আপনার সেবক নারদ মুনি কৃপা করে আমাকে তঁর শিষ্যরূপে গ্রহণ করেছেন এবং দিব্য স্থিতি প্রাপ্ত হওয়ার শিক্ষা প্রদান করেছেন। তাই আমার সর্বপ্রথম কর্তব্য তাঁর সেবা করা। তাঁর সেবা আমি কি করে পরিত্যাগ করতে পারি? হে ভগবান, হে চিন্ময় গুণের অন্তহীন উৎস, আপনি আমার পিতা হিরণ্যকশিপুকে বধ করে তাঁর খড়্‌গ থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলেছিলেন, “আমি এখন তোর দেহ থেকে তোর মস্তক ছিন্ন করব। আমি ব্যতীত অন্য কোন ঈশ্বর যদি থাকে তা হলে সে তোকে ক্ষমা করুক।” তাই আমি মনে করি যে, আপনার ভক্তের বাণীর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য আপনি আমাকে রক্ষা করেছেন এবং আমার পিতাকে বধ করেছেন। এই ছাড়া অন্য কোন কারণ নেই।”
“হে ভগবান, আপনি নিজেকে সমগ্র জগৎরূপে প্রকাশিত করেন, কারণ সৃষ্টির পূর্বে আপনি ছিলেন, সৃষ্টির পরে আপনি থাকেন এবং আদি ও অন্তের মধ্যবর্তী অবস্থায় আপনি পালন করেন। তা সবই প্রকৃতির তিনটি গুণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয়। অতএব অন্তরে এবং বাইরে যা কিছু বিরাজ করে, তা সবই আপনি। হে ভগবান, হে পরমেশ্বর, সমগ্র জড় সৃষ্টির কারণ আপনি এবং এই জড় সৃষ্টি আপনারই শক্তির পরিণাম। যদিও সমগ্র জড় জগৎ আপনার থেকেই প্রকাশিত তবুও আপনি তা থেকে ভিন্ন। ‘আমার এবং তোমার’ ধারণা তা অবশ্যই মিথ্যা মায়া, কারণ প্রতিটি বস্তুই আপনার থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে আপনার থেকে ভিন্ন নয়। বস্তুতপক্ষে জড় জগৎ আপনার থেকে অভিন্ন এবং তার বিনাশও আপনারই দ্বারা সাধিত হয়। আপনার সঙ্গে আপনার সৃষ্টির সম্পর্ক বীজ এবং বৃক্ষ, অথবা সূক্ষ্ম কারণ এবং স্থূল প্রকাশের মতো। হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনি প্রলয়ের পর আপনার সৃজনী শক্তিকে আপনার মধ্যে রাখেন এবং তখন মনে হয় যে, আপনি অর্ধ-নিমীলিত নেত্রে নিদ্রামগ্ন। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে আপনি সাধারণ মানুষের মতো নিদ্রা যান না, কারণ আপনি সর্বদাই জড় সৃষ্টির অতীত। তুরীয় অবস্থায় আপনি চিন্ময় আনন্দ অনুভব করেন। কারণোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে আপনি একইভাবে জড়া প্রকৃতিকে স্পর্শ না করে আপনার চিন্ময় স্থিতিতে অবস্থান করেন। আপনাকে নিদ্রিত বলে মনে হলেও, এই নিদ্রা অবিদ্যাজনিত নিদ্রা থেকে ভিন্ন। এই বিশাল জড় জগৎ আপনারই শরীর। আপনার কাল শক্তির দ্বারা প্রকৃতি ক্ষোভিত হয় এবং তার ফলে প্রকৃতির তিনটি গুণ প্রকাশিত হয়। আপনি তখ্ন অনন্তশেষের শয্যা থেকে জেগে ওঠেন এবং আপনার নাভি থেকে একটি চিন্ময় বীজ উৎপন্ন হয়। এই বীজ থেকে বিশাল ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশকারী পদ্ম উদ্ভূত হয়, ঠিক যেমন একটি ক্ষুদ্র বীজ থেকে এক বিশাল বটবৃক্ষের জন্ম হয়। সেই মহাপদ্ম থেকে উৎপন্ন ব্রহ্মা সেই পদ্মা ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাননি। তাই, আপনাকে বাইরে অবস্থিত বলে মনে করে, ব্রহ্মা সেই জলে নিমগ্ন হয়ে শতবর্ষব্যাপী সেই পদ্মের উৎসের অণ্বেষণ করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আপনাকে খুঁজে পাননি, কারণ বীজ যখন অঙ্কুরিত হয়, তখন আর সেই বীজ দেখা যায় না। সেই আত্মযোনি ব্রহ্মা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে, সেই পদ্মকে আশ্রয় করে বহু শত বৎসর কঠোর তপস্যা করার ফলে পবিত্র হয়ে, সর্বকারণের পরম কারণস্বরূপ ভগবানকে দর্শন করেছিলেন। পৃথিবীতে যেমন গন্ধ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাপ্ত থাকে, তেমনই তাঁর নিজের শরীরে এবং ইন্দ্রিয়ে তিনি ভগবানকে ব্যাপ্ত দেখেছিলেন। ব্রহ্মা তখন সহস্র সহস্র বদন, চরণ, মস্তক, হস্ত, ঊরু, নাসিকা, কর্ণ ও নয়ন সমন্বিত আপনাকে দেখেছিলেন। আপনি সুন্দর অলঙ্কার এবং অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ছিলেন। পাতাললোকে বিস্তৃত পদ সমন্বিত, চিন্ময় লক্ষণযুক্ত আপনার বিষ্ণুরূপ দর্শন করে ব্রহ্মা দিব্য আনন্দ লাভ করেছিলেন।”
“হে ভগবান, আপনি হয়গ্রীবরূপে আবির্ভূত হয়ে রজ এবং তমোগুণের প্রতীক মধু এবং কৈটভ নামক অসুরদের সংহার করে ব্রহ্মাকে বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। সেই কারণে সমস্ত ঋষিরা আপনার রূপকে জড়াতীত শুদ্ধ সত্ত্বময় বলে বর্ণনা করেন। হে ভগবান, এইভাবে আপনি নর, পশু, ঋষি, দেবতা, মৎস্য অথবা কূর্মরূপে অবতরণ করে সমগ্র জগৎ পালন করেন এবং অসুরদের সংহার করেন। হে ভগবান, আপনি যুগ অনুসারে ধর্মকে রক্ষা করেন। কিন্তু কলিযুগে আপনি আপনার ভগবত্তা প্রকাশ করেন না, তাই আপনাকে ত্রিযুগ বলা হয়। হে বৈকুন্ঠনাথ, আমার পাপপূর্ণ কামাতুর মন হর্ষ, শোক, ভয় এবং ধন লাভের বাসনায় পূর্ণ। তার ফলে তা অত্যন্ত কলুষিত এবং আপনার কথায় প্রীতি লাভ করে না। সুতরাং দীন এবং পতিত আমি কিভাবে আপনার তত্ত্ব আলোচনা করতে সক্ষম হব? হে অচ্যুত, আমার অবস্থা বহু সপত্নীর স্বামীর মতো, যারা তাকে তাদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। জিহ্বা সুস্বাদু আহারের প্রতি, উপস্থ সুন্দরী রমণীর প্রতি, ত্বক কোমল বস্তুর প্রতি, উদর ভোজনের প্রতি এবং কর্ণ গ্রাম সঙ্গীতের প্রতি, নাক ঘ্রাণের প্রতি, চঞ্চল দৃষ্টি ইন্দ্রিয় তৃপ্তিদায়ক সুন্দর দৃশ্যের প্রতি এবং কর্মেন্দ্রিয় বিভিন্ন কর্মের প্রতি আমাকে আকর্ষণ করছে। এইভাবে বিভিন্ন দিকে আকৃষ্ট হয়ে আমি বিনাশ প্রাপ্ত হচ্ছি। হে ভগবান, আপনি সর্বদাই মৃত্যুনদীর অপর পারে চিন্ময়ভাবে অবস্থিত, কিন্তু আমরা আমাদের পাপকর্মের ফলে সেই নদীর এই পারে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করছি। প্রকৃতপক্ষে আমরা এই নদীতে পতিত হয়ে বার বার জন্ম-মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছি এবং অত্যন্ত ঘৃণ্য বস্তুসমূহ আহার করছি। দয়া করে আপনি আমাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন- কেবল আমার প্রতিই নয়, অন্য যারা কষ্টভোগ করছে তাদের প্রতিও- এবং আপনার অহৈতুকী কৃপা ও অনুকম্পার প্রভাবে আমাদের উদ্ধার করুন এবং পালন করুন।”
“হে পরমেশ্বর ভগবান, হে সমগ্র জগতের আদি গুরু, আপনি সারা জগতের সমস্ত কার্যের পরিচালক, অতএব আপনার পক্ষে আপনার সেবায় যুক্ত অধঃপতিত জীবদের উদ্ধার করা এমন কি পরিশ্রম? আপনি সমস্ত আর্তদের বন্ধু এবং মহতের কর্তব্য হচ্ছে মূর্খদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করা। তাই আমি মনে করি যে, আপনার সেবায় যুক্ত আমাদের মতো ব্যক্তিদের প্রতি আপনি আপনার অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করবেন। হে সর্বোত্তম আপনার গুণগান এবং কার্যকলাপের চিন্তায় সম্পূর্ণরূপে মগ্ন থাকার ফলে আমি সংসার ভয়ে ভীত নই। আমার একমাত্র চিন্তা কেবল সেই সমস্ত মূর্খ এবং দুষ্কৃতকারীদের জন্য, যারা জড় সুখ ভোগের জন্য এবং তাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিপালনের জন্য বিশাল পরিকল্পনা করে। হে ভগবান নৃসিংহদেব, মুনিরা কেবল তাঁদের নিজেদের মুক্তির জন্য আগ্রহী। তাঁরা বড় বড় নগর এবং শহর পরিত্যাগপূর্বক মৌন ব্রত অবলম্বন করে ধ্যান করার জন্য হিমালয়ে অথবা অরণ্যে গমন করেন। তাঁরা অন্যদের উদ্ধারের জন্য আগ্রহী নন। কিন্তু আমি, এই সমস্ত মূর্খদের ফেলে রেখে নিজের মুক্তি কামনা করি না। আমি জানি যে, কৃষ্ণভক্তি ব্যতীত এবং আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ ব্যতীত কেউই কখনও সুখী হতে পারে না। তাই আমি তাদের আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয়ে নিয়ে আসতে চাই। চুলকানির উপশমের জন্য দুই হাতের ঘর্ষণের সঙ্গে মৈথুনের তুলনা করা হয়। গৃহমেধী বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানরহিত তথাকথিত গৃহস্থেরা মনে করে যে, এই চুলকানিটিই সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে সমস্ত দুঃখের উৎস। কৃপণ অথবা মূর্খেরা, যারা ব্রাহ্মণের ঠিক বিপরীত, বার বার ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের ফলেও তারা কখনও তৃপ্ত হয় না। কিন্তু যাঁরা ধীর, তাঁরা এই চুলকানি সহ্য করেন এবং তার ফলে তাঁদের মূঢ়দের মতো দুঃখভোগ করতে হয় না।”
“হে পরমেশ্বর ভগবান, মুক্তির মার্গে দশটি উপায়- মৌন, ব্রত, বৈদিক জ্ঞান আহরণ, তপস্যা, বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন, বর্ণাশ্রম-ধর্ম আচরণ, ধর্ম-শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, নির্জন স্থানে বাস, মন্ত্র জপ এবং সমাধি। মুক্তির এই সমস্ত উপায়গুলি অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিদের পেশাদারি অভ্যাস এবং জীবিকা। যেহেতু এই ধরণের মানুষেরা অত্যন্ত দাম্ভিক, তাই এই উপায়গুলো সফল নাও হতে পারে। প্রামাণিক বৈদিক জ্ঞানের দ্বারা দেখা যায় যে, জড় জগতে কার্য এবং কারণের রূপ ভগবানেরই রূপ, কারণ জড় জগৎ তাঁরই শক্তি। কার্য এবং কারণ উভিয়েই ভগবানের শক্তি ব্যতীত অন্য কিছু নয়। তাই, হে ভগবান, জ্ঞানী ব্যক্তি যেমন কার্য এবং কারণের বিচার করে দেখতে পান কিভাবে কাঠের মধ্যে অগ্নি ব্যাপ্ত, তেমনই ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত ভক্তও হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন যে, আপনিই কার্য এবং কারণ। হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনি বায়ু, পৃথিবী, আগুন, আকাশ, জল, তন্মাত্র, প্রাণবায়ু, পঞ্চেন্দ্রিয়, মন, চেতনা এবং অহঙ্কার। বস্তুতপক্ষে, সূক্ষ্ম এবং স্থূল, সব কিছুই আপনি। মন এবং বাক্যের দ্বারা প্রকাশিত কোন বস্তুই আপনার থেকে ভিন্ন নয়। জড়া প্রকৃতির তিন গুণ (সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণ), এই তিন গুণের অধিষ্ঠাতৃ দেবতাগণ, পঞ্চ স্থূল তত্ত্ব, মন, দেবতা, মানুষ, কেউই আপনাকে জানতে পারে না, কারণ তারা সকলেই জন্ম-মৃত্যুর অধীন। সেই কথা বিবেচনা করে, প্রকৃত জ্ঞানবান ব্যক্তিরা ভগবদ্ভক্তির পন্থা অবলম্বন করেন। এই প্রকার জ্ঞানবান ব্যক্তিরা বেদ অধ্যয়ন থেকে বিরত হয়ে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হন। অতএব, হে পূজ্যতম ভগবান, আপনাকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, কারণ স্তব, কর্মফল অর্পণ, পূজা, কর্ম-সমর্পণ, চরণযুগল স্মরণ এবং লীলা শ্রবণ- এই ষড়ঙ্গ সেবা ব্যতীত কে পরমহংসগণের প্রাপ্য আপনার প্রতি ভক্তি লাভ করতে পারে?”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “এইভাবে ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের অপ্রাকৃত প্রার্থনা শ্রবণ করে ভগবান নৃসিংহদেব তাঁর ক্রোধ সম্বরণ করেছিলেন এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মে প্রণত প্রহ্লাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বলেছিলেন- হে ভদ্র প্রহ্লাদ, তোমার মঙ্গল হোক। হে অসুরোত্তম, তোমার প্রতি আমি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। আমি সমস্ত মানুষের বাসনা পূর্ণ করি, সুতরাং তুমি আমার কাছে তোমার অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর। হে প্রহ্লাদ, তুমি দীর্ঘজীবী হও। আমাকে প্রসন্ন না করে কেউই আমাকে জানতে পারে না বা উপলব্ধি করতে পারে না, কিন্তু যে আমাকে দর্শন করেছে অথবা আমাকে প্রসন্ন করেছে, তাকে আর তার নিজের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য শোক করতে হয় না। হে প্রহ্লাদ, তুমি মহা-ভাগ্যবান। যাঁরা অত্যন্ত জ্ঞানী এবং উন্নত, তাঁরা সর্বতোভাবে আমার প্রসন্নতা বিধানের চেষ্টা করেন, কারণ আমিই সকলের সমস্ত বাসনা পূর্ণ করতে পারি।”
নারদ মুনি বললেন- “প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন অসুরকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। অসুরেরা সর্বদা জড় সুখের বাসনা করে। কিন্তু ভগবান যদিও এই জগতের সমস্ত সুখ ভোগ করার বর প্রদান করে তাঁকে প্রলোভিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শুদ্ধ কৃষ্ণভক্ত হওয়ার ফলে প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য কোন কিছুই গ্রহণ করতে চাননি।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits