নারদ মুনি বললেন- “সমস্ত দৈত্যনন্দনেরা প্রহ্লাদ মহারাজের দিব্য উপদেশ অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে গ্রহণ করেছিল এবং তারা তাদের শিক্ষক ষণ্ড ও অমর্কের বৈষয়িক উপদেশ গ্রহণ করেনি। শুক্রচার্যের পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক যখন দেখল যে, প্রহ্লাদ মহারাজের সঙ্গ প্রভাবে অসুর-বালকেরা কৃষ্ণভক্তিতে নিষ্ঠাপরাযণ হয়ে উঠছে, তখন তারা অত্যন্ত ভীত হয়ে, দৈত্যরাজের কাছে গিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি যথাযথভাবে বর্ণনা করেছিল। সেই পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে হিরণ্যকশিপু এত ক্রুদ্ধ হয়েছিল যে, তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করেছিল। তখন সে স্থির করেছিল তার পুত্র প্রহ্লাদকে সে বধ করবে। হিরণ্যকশিপু স্বভাবতই ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং এইভাবে অপমানিত বোধ করে, সে পদাহত সর্পের মতো নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে শুরু করেছিল। তার পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন শান্ত, বিনীত এবং নম্র, তাঁর ইন্দ্রিয়গুলি সংযত ছিল এবং তিনি করজোড়ে হিরণ্যকশিপুর সম্মুখে দণ্ডায়মান ছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজের কোমল বয়স এবং মহান আচরণের জন্য তিনি তিরস্কারের উপযুক্ত ছিলেন না, তবুও হিরণ্যকশিপু বক্রদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কঠোর বাক্যে তাঁকে তিরস্কার করেছিল।”
হিরণ্যকশিপু বলল- “হে দুর্বিনীত, হে মন্দবুদ্ধি, হে কুলভেদকারক, হে অধম, তুই আমার শাসন লঙ্ঘন করেছিস্, তাই তুই এক জেদী মূর্খ। আজ আমি তোকে যমালয়ে প্রেরণ করব। ওরে মূঢ় প্রহ্লাদ, তুই জানিস যে আমি ক্রদ্ধ হলে লোকপালগণ সহ ত্রিভুবন কম্পিত হয়। কিন্তু তুই কার বলে ভয়শূণ্য হয়ে আমার শাসন অতিক্রম করছিস?”
প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন- “হে রাজন্, আমার যে বলের উৎসের কথা জিজ্ঞাসা করছেন, তিনি আপনারও উৎস। প্রকৃতপক্ষে সমস্ত বলের আদি উৎস একজন। তিনি কেবল আমার অথবা আপনার বলেরই নয়, তিনি সকলেরই বলের উৎস। তাঁরই বলে সকলেই বলীয়ান। স্থাবর-জঙ্গম, উচ্চ-নিচ, সকলেই এমন কি ব্রহ্মা পর্যন্ত সেই পরমেশ্বর ভগবানের বলের নিয়ন্ত্রনাধীন। সেই পরমেশ্বর ভগবান, যিনি পরম নিয়ন্তা এবং কালস্বরূপ, তিনিই ইন্দ্রিয়ের বল, মনের বল, দেহের শক্তি এবং ইন্দ্রিয়ের আত্মা। তাঁর পরাক্রম অসীম। তিনিই সকলের শ্রেষ্ঠ, তিনিই জড়া প্রকৃতির তিন গুণের অধীশ্বর। তিনি তাঁর শক্তির দ্বারা এই বিশ্ব সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং সংহার করেন।”
“হে পিতৃদেব, দয়া করে আপনি আপনার আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করুন। আপনার হৃদয়ে শত্রু এবং মিত্রের ভেদ না করে সকলের প্রতি সমভাব পোষণ করুন। অসংযত এবং বিপথগামী মন ব্যতীত এই জগতে অন্য কোন শত্রু নেই। সর্বভূতে সমদর্শনের ফলেই পূর্ণরূপে ভগবানের আরাধনার স্তরে উন্নীত হওয়া যায়। পূর্বে আপনার মতো বহু মূর্খ ব্যক্তি তাদের দেহের সর্বস্ব অপহরণকারী ছয়টি শত্রুকে জয় না করে গর্বভরে মনে করেছে, ‘আমি দশ দিকস্থ আমার সমস্ত শত্রুদের জয় করেছি।’ কিন্তু যে ব্যক্তি তাঁর ষড়রিপু জয় করেছেন এবং সমস্ত জীবের প্রতি সমদর্শী, তাঁর কোন শত্রু নেই। অজ্ঞানের ফলেই শত্রুর কল্পনা হয়।”
হিরণ্যকশিপু বলল- “ওরে মূর্খ, তুই আমার মহিমা খর্ব করে, নিজেকে জিতেন্দ্রিয় বলে গর্ব করছিস। এটি তোর অতি বুদ্ধিমত্তা। তাই আমি বুঝতে পারছি যে, আমার হাতে তোর মরবার ইচ্ছা হয়েছে, কারণ মরণাপন্ন ব্যক্তিরাই এইভাবে অর্থহীন কথা বলে। ওরে হতভাগা প্রহ্লাদ, তুই সব সময় বলিস যে আমি ছাড়া অন্য কোন জগদীশ্বর রয়েছেন, যিনি সকলের ঊর্ধ্বে, যিনি সকলের নিয়ন্তা এবং যিনি সর্বব্যাপ্ত। কিন্তু তিনি কোথায়? তিনি যদি সর্বত্রই থাকেন, তা হলে কেন তিনি আমার সম্মুখস্থ এই স্তম্ভে উপস্থিত নন? তোর এই অকথ্য কথনের জন্য আমি এখন তোর শরীর থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করব। তোর পরম আরাধ্য ভগবান এসে এখন তোকে রক্ষা করুক। আমি তা দেখতে চাই। ক্রোধান্ধ হয়ে মহাবলবান হিরণ্যকশিপু এইভাবে তার মহাভাগবত পুত্র প্রহ্লাদকে কঠোর বাক্যে তিরস্কার করেছিল। তার প্রতি বার বার তর্জন করে হিরণ্যকশিপু তাঁর খড়্গ গ্রহণপূর্বক তার রাজসিংহাসন থেকে উত্থিত হয়ে মহাক্রোধে সেই স্তম্ভে মুষ্ট্যাঘাত করেছিল। তখন সেই স্তম্ভ থেকে এক ভয়ঙ্কর ধ্বনি উত্থিত হয়েছিল, যার ফলে মনে হয়েছিল যেন ব্রহ্মাণ্ডের আবরণ বিদীর্ণ হয়েছে। হে যুধিষ্ঠির, সেই শব্দ ব্রহ্মা আদি দেবতাদের ধামে পৌছেছিল এবং তা শুনে তাঁরা মনে করেছিলেন, ‘হায়, আমাদের গ্রহলোক বুঝি বিনষ্ট হয়ে গেল!’ হিরণ্যকশিপু যখন তার পুত্রকে বধ করতে অভিলাষী হয়ে তার অসাধারণ পরাক্রম প্রদর্শন করছিল, তখন সে সেই অতি অদ্ভুত প্রচণ্ড ধ্বনি শ্রবণ করেছিল, যা পূর্বে কখনও শোনা যায়নি। সেই শব্দ শুনে অন্যান্য অসুর-নায়কেরাও ভীত হয়েছিল। সেই সভায় কেউই বুঝতে পারেনি সেই শব্দের উৎস কোথায় ছিল।”
তাঁর ভৃত্য প্রহ্লাদ মহারাজের বাক্যের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য অর্থাৎ ভগবান যে সর্বত্র বিরাজমান, এম কি সভাগৃহের স্তম্ভের মধ্যেরও বিরাজমান, সেই কথা প্রমাণ করার জন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি এক অদৃষ্টপূর্ব অদ্ভুত রূপ প্রদর্শন করেছিলেন। সেই রূপটি ছিল না মানুষের না সিংহের। এইভাবে ভগবান এক অদ্ভুত মূর্তিতে সভাগৃহে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হিরণ্যকশিপু যখন সেই শব্দের উৎস অন্বেষণ করে চতুর্দিকে দেখছিল, তখন সে স্তম্ভের মধ্যে থেকে ভগবানের সেই অদ্ভুত রূপ বহির্গত হতে দেখেছিল, যা মানুষও নয়, সিংহও নয়। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে হিরণ্যকশিপু ভেবেছিল, ‘এই প্রাণীটি কি অর্ধেক মানুষ এবং অর্ধেক সিংহ?’ হিরণ্যকশিপু তার সম্মুখে দণ্ডয়মান নরসিংহরূপী ভগবানকে দর্শন করে বিচার করার চেষ্টা করে তিনি কে। তাঁর সেই রূপ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর- তাঁর ক্রোধান্বিত নয়নযুগল উত্তপ্ত স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল; তাঁর দীপ্ত কেশর তাঁর ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডলকে বিস্তার করেছে; তাঁর দন্তপঙ্ক্তি ভয়ানক; এবং তাঁর ক্ষুরধার জিহ্বা খড়্গের মতো চঞ্চল। তাঁর উন্নত কর্ণযুগল নিশ্চল এবং তাঁর মুখ ও নাসিকাবিবর পর্বতের গুহার মতো। তাঁর হনুদেশ ভয়ঙ্করভাবে বিদীর্ণ এবং তাঁর শরীর আকাশকে স্পর্শ করছে। তাঁর গ্রীবা হ্রস্ব এবং স্থূল, বক্ষ বিশাল, উদর কৃশ এবং তাঁর দেহের লোম চন্দ্রকিরণের মতো শুভ্র। তাঁর অসংখ্য বাহু সেনাবাহিনীর মতো চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মা এবং অন্যান্য স্বাভাবিক অস্ত্রের দ্বারা দৈত্য, দানব এবং নাস্তিকদের বিনাশ করে। হিরণ্যকমিপু মনে মনে বলেছিল, ‘মহা মায়াবী ভগবান বিষ্ণু আমাকে হত্যা করার এই পরিকল্পনা করেছে, কিন্তু তাঁর এই চেষ্টায় কি হতে পারে? আমার সঙ্গে কে যুদ্ধ করতে পারবে?’ এই বলে হস্তীর মতো বিশালকায় হিরণ্যকশিপু গদা ধারণ করে ভগবানকে আক্রমণ করেছিল। পতঙ্গ যেমন অগ্নিতে পতিত হলে অদৃশ্য হয়, তেমনই হিরণ্যকশিপু যখন তেজোময় ভগবানকে আক্রমণ করেছিল, তখন সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়, কারণ ভগবান সর্বদাই শুদ্ধ সত্ত্বে অবস্থিত। পূর্বে, সৃষ্টির সময় তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন ব্রহ্মাণ্ডে প্রবেশপূর্বক তাঁর চিন্ময় জ্যোতির দ্বারা সেই অন্ধকার বিনাশ করে ব্রহ্মাণ্ডকে আলোকিত করেছিলেন। তারপর মহা অসুর হিরণ্যকশিপু ক্রোধপূর্বক দ্রুতবেগে নৃসিংহদেবকে আক্রমণ করে তার গদার দ্বারা তাঁকে আঘাত করেছিল। কিন্তু গরুড় যেভাবে মহাসর্পকে গ্রাস করে, ঠিক সেইভাবে ভগবান নৃসিংহদেব গদা সহ হিরণ্যকশিপুকে গ্রহণ করেছিলেন।”
“হে ভরত-বংশজ মহারাজ যুধিষ্ঠির, ভগবান নৃসিংহদেব যখন তাঁর হাত থেকে হিরণ্যকশিপুকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে গরুড় খেলার ছলে কখনও কখনও সর্পকে তার মুখ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সুযোগ দেয়, তখন দৈত্যভয়ে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্থানভ্রষ্ট দেবতারা ভগবানের হাত থেকে দৈত্যের নির্গমনের ব্যাপারটি ভাল বলে মনে করলেন না। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিলেন। হিরণ্যকশিপু যখন নৃসিংহদেবের হস্ত থেকে মুক্ত হয়েছিল, তখন সে ভ্রান্তভাবে মনে করেছিল যে, ভগবান তার শক্তিতে ভীত হয়েছেন। তাই সে ক্ষণকাল বিশ্রামের পরে, খড়্গ এবং ঢাল গ্রহণ করে পুনরায় মহাবেগে ভগবানকে আক্রমণ করেছিল। হিরণ্যকশিপু তার খড়্গ এবং ঢাল নিয়ে নিশ্ছিদ্রভাবে আবৃত হয়ে নিজেকে রক্ষা করছিল, কিন্তু তখন ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ম অট্টহাস্য করে পরম শক্তিমান ভগবান নারায়ণ হিরণ্যকশিপুকে গ্রহণ করেছিলেন। বাজপাখির মতো তীব্র গতিতে হিরণ্যকশিপু কখনও আকাশে এবং কখনও পৃথিবীতে বিচরণ করছিল, নৃসিংহদেবের অট্টহ্রাস্যের ফলে ভয়ে তার চক্ষু মুদিত ছিল। সর্প যেভাবে ইঁদুরকে ধরে অথবা গরুড় যেভাবে একটি অত্যন্ত বিষধর সর্পকে ধরে, ঠিক সেইভাবে ভগবান নৃসিংহদেব ইন্দ্রের বজ্রের আঘাতেও অক্ষত হিরণ্যকশিপুকে ধরেছিলেন। এইভাবে ধৃত হওয়ার ফলে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে হিরণ্যকশিপু যখন সর্বত্র তার অঙ্গ সঞ্চালন করছিল, তখন ভগবান নৃসিংহদেব সভাগৃহের দ্বারদেশে অসুরটিকে তাঁর ঊরুর উপর স্থাপন করে অনায়াসে তার দেহ নখের দ্বারা বিদীর্ণ করেছিলেন। ভগবান নৃসিংহদেবের মুখ এবং কেশর রক্তবিন্দুর দ্বারা সিক্ত হয়েছিল এবং তাঁর ক্রোধোদ্দীপ্ত নয়নের দিকে কেউই তাকাতে পারছিল না। তাঁর জিহ্বার দ্বারা মুখের প্রান্তভাগ অবলেহন করে ভগবান নৃসিংহদেব হিরণ্যকশিপুর অন্ত্রের মালায় বিভূষিত হয়েছিলেন। তখন তাঁকে সদ্য একটি হস্তী সংহারকারী সিংহের মতো দেখাচ্ছিল। বহু হস্ত সমন্বিত ভগবান প্রথমে তাঁর নভাঙ্কুরের দ্বারা হিরণ্যকশিপুর হৃদয় উৎপাটনপূর্বক তাকে পরিত্যাগ করে অসুর সৈন্যদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এই সমস্ত হাজার হাজার অস্ত্রধারী সৈনিকেরা ছিল হিরণ্যকশিপুর অতি বিশ্বস্ত অনুচর, কিন্তু ভগবান নৃহিংহদেব তাঁর নখাগ্রভাগের দ্বারা তাদের সকলকে সংহার করেছিলেন। ভগবান নৃসিংহদেবের জটার দ্বারা মেগসমূহ কম্পিত এবং বিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তাঁর জ্বলন্ত দৃষ্টিতে গ্রহগুলির জ্যোতি নিষ্প্রভ হয়েছিল, তাঁর নিঃশ্বাসে আহত হয়ে সমুদ্র ক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং তাঁর গর্জনে দিগ্হস্তীরা ভীত হয়ে আর্তনাদ করেছিল। নৃসিংহদেবের জটার দ্বারা বিমানসমূহ অন্তরীক্ষে এবং উচ্চলোকে প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল। ভগবানের চরণ-কমলের গুরুভারে পৃথিবী যেন তাঁর স্ব-স্থান থেকে বিচলিত হয়েছিল এবং তাঁর অসহ্য বলের প্রভাবে যেন সমস্ত পাহাড়-পর্বতগুলি উৎপতিত হয়েছিল। ভগবানের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটার প্রভাবে আকাশ এবং সমস্ত দিক তাদের স্বাভাবিক দীপ্তি হারিয়েছিল। পূর্ণ তেজ এবং ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল প্রদর্শন করে ভগবান নৃসিংহদেব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে এবং বীরত্বে ও ঐশ্বর্যে তাঁর কোন প্রতিদ্বন্দী নেই দেখে, সভাগৃহে অতি উৎকৃষ্ট রাজ-সিংহাসনে উপবেশন করেছিলেন। ভয় এবং সম্ভ্রমবশত কেউই প্রত্যক্ষভাবে ভগবানের সেবা করার জন্য এগিয়ে আসতে সাহস করেননি। হিরণ্যকশিপু ত্রিলোকের শিরঃপীড়া সদৃশ ছিল। তাই স্বর্গের দেবপত্নীগণ যখন দেখলেন যে, সেই মহা অসুর ভগবানের হস্তে নিহত হয়েছে, তখন তাঁদের মুখমণ্ডল পরম আনন্দে বিকশিত হয়েছিল। তাঁরা তখন স্বর্গ থেকে নৃসিংহদেবের উপর পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। তখন ভগবান নারায়ণের দর্শনাভিলাষী দেবতাদের বিমানে আকাশ ভরে গিয়েছিল। দেবতারা তাঁদের ঢাক এবং দুন্দুভি বাজাতে শুরু করেছিলেন। মুখ্য গন্ধর্বগণ মধুর স্বরে গান গাইতে শুরু করেছিলেন এবং অপ্সরাগণ নৃত্য করতে শুরু করেছিলেন।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, তারপর ব্রহ্মা, ইন্দ্র, শিব প্রভৃতি দেবতাগণ, ঋষি, পিতৃ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, মহাসর্প, মনু, প্রজাপতি, অপ্সরা, গন্ধর্ব, চারণ, যক্ষ, কিন্নর, বেতাল, কিম্পুরুষ এবং সুনন্দ, কুমুদ প্রভৃতি বিষ্ণুপার্ষদগণ ভগবানের নিকটে এসেছিলেন। উজ্জ্বল জ্যোতিতে উদ্ভাসিত ভগবানের সমীপবর্তী হয়ে তাঁদের মস্তকে হাত জোর করে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং স্তব করেছিলেন।”
শ্রীব্রহ্মা ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে বললেন- “হে প্রভু আপনি অনন্ত এবং আপনার শক্তি অসীম। আপনার পরাক্রম এবং অদ্ভুত প্রভাব কেউই অনুমান করতে পারে না, কারণ আপনার কার্যকলাপ কখনও জড়া প্রকৃতির দ্বারা কলুষিত হয় না। জড় গুণের দ্বারা আপনি অনায়াসে এই জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং ধ্বংস করেন, তবুও আপনি অপরিবর্তনীয় এবং অব্যয়ই থাকেন। আমি তাই আপনার প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীরুদ্রদেব বললেন- “যুগের অন্ত হচ্ছে আপনার ক্রোধের সময়। এখন এই নগণ্য অসুর হিরণ্যকশিপু নিহত হয়েছে। হে ভগবান, আপনি স্বভাবতই ভক্তবৎসল, দয়া করে আপনি তার পুত্র প্রহ্লাদ মহারাজকে রক্ষা করুন, যে সর্বতোভাবে আপনার শরণাগত ভক্তরূপে আপনার নিকটেই দণ্ডায়মান।”
দেবরাজ ইন্দ্র বললেন- “হে পরমেশ্বর, আপনি আমাদের উদ্ধারকারী রক্ষাকর্তা। আমাদের যজ্ঞভাগ যা প্রকৃতপক্ষে আপনার, তা আপনি দৈত্যের কাছ থেকে পুনরায় আহরণ করেছেন। যেহেতু দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ছিল অত্যন্ত ভয়ানক, তাই আপনার আবাসস্থল আমাদের হৃদয়পদ্ম সে অধিকার করে নিয়েছিল। এখন, আপনার উপস্থিতির ফলে আমাদের হৃদয়ের বিষাদ এবং অন্ধকার দূর হয়েছে। হে ভগবান, যাঁরা সর্বদাই আপনার সেবায় যুক্ত, তাঁদের কাছে সমস্ত জড় ঐশ্বর্য নিতান্তই তুচ্ছ, কারণ আপনার সেবা মুক্তিরও ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্তির বহুমানন করেন না, অতএব কাম, অর্থ এবং ধর্মের আর কি কথা।”
সমস্ত ঋষিগণ তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করে বললেন- “হে ভগবান, হে শরণাগত পালক, হে আদি পুরুষ, পূর্বে আপনি আমাদের যে তপস্যার বিধি উপদেশ দিয়েছিলেন তা আপনারই চিন্ময় শক্তি। এই তপস্যার দ্বারাই আপনি এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেন, যা আপনার মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এই অসুরের কার্যকলাপের দ্বারা এই তপস্যা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন, আমাদের রক্ষা করার জন্য এবং এই অসুরকে সংহার করার জন্য নৃসিংহদেব রূপে আপনার আবির্ভাবের ফলে, তপস্যার পন্থা পুনরায় আপনি অনুমোদন করেছেন।”
পিতৃগণ তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করে বললেন- “সারা জগতের ধর্মপালক ভগবান নৃসিংহদেবকে আমরা আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। যে দৈত্য বলপূর্বক আমাদের পুত্র এবং পৌত্রদের দ্বারা প্রদত্ত শ্রাদ্ধপিণ্ড আদি অধিকার করে ভোগ করত এবং তীর্থস্থানে প্রদত্ত তিলোদক পান করত, সেই হিরণ্যকশিপুকে আপনি সংহার করেছেন। হে ভগবান, সেই দৈত্যের উদর আপনার নখের দ্বারা বিদীর্ণ করে, আপনি তার উদর থেকে সেই সমস্ত অপহৃত বস্তু আহরণ করেছেন। তাই আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
সিদ্ধগণ ভগবানের বন্দনা করে বললেন- “হে ভগবান নৃসিংহদেব, আমরা, সিদ্ধলোকের অধিবাসীগণ স্বভাবতই অষ্ট যোগসিদ্ধি সমন্বিত। তবুও হিরণ্যকশিপু এতই অসৎ ছিল যে, সে তার বল এবং তপস্যার প্রভাবে আমাদের সমস্ত ক্ষমতা অপহরণ করে নিয়েছিল। তার ফলে সে তার যোগবলের গর্বে অত্যন্ত গর্বিত হয়েছিল। এখন, আপনার নখের দ্বারা সেই দুর্বৃত্ত নিহত হয়েছে, তাই আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
বিদ্যাধরণগণ প্রার্থনা করে বললেন- “আমাদের পৃথক পৃথক ধ্যানের প্রভাবে প্রাপ্ত অন্তর্ধান আদি বিদ্যা, যে মূর্খ হিরণ্যকশিপু তার দেহের বল এবং অন্যদের পরাজিত করার ক্ষমতার গর্বে গর্বিত হয়ে নিষেধ করেছিল, পরমেশ্বর ভগবান সেই অসুরকে একটি পশুর মতো বধ করেছেন। সেই পরম লীলাবিগ্রহ ভগবান নৃসিংহদেবকে আমরা নিত্য প্রণতি নিবেদন করি।”
নাগগণ বললেন- “মহাপাপী হিরণ্যকশিপু আমাদের মস্তকের মণি এবং সুন্দরী স্ত্রীদের অপহরণ করেছিল। এখন, আপনার নখের দ্বারা তার বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ফলে, আপনি আমাদের পত্নীদের আনন্দ প্রদান করেছেন। তাই আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
মনুগণ তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করে বললেন- “হে ভগবান, আপনার আজ্ঞাকারী দাসরূপে আমরা মনুগণ মানব-সমাজের আইন প্রদান করি। কিন্তু এই মহা অসুর হিরণ্যকশিপুর সাময়িক শ্রেষ্ঠত্বের ফলে বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন করার প্রথা বিনষ্ট হয়েছিল। হে ভগবান, এই মহা অসুরকে সংহার করার ফলে এখন আমরা আমাদের স্বাভাবিক স্থিতি লাভ করেছি। আমরা আপনার নিত্যদাস। দয়া করে আপনি আমাদের আদেশ করুন এখন আমরা কি করব।”
“প্রজাপতিগণ তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করে বললেন- “ব্রহ্মা এবং শিবেরও ঈশ্বর হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনার আদেশ পালন করার জন্য আপনি আমাদের সৃষ্টি করেছিন, কিন্তু হিরণ্যকশিপুর নিষেধের ফলে আমরা প্রজা সৃষ্টি করতে পারিনি। এখন সেই অসুর নিহত হয়ে আমদের সম্মুখে শায়িত। আপনি তার বক্ষ বিদীর্ণ করেছেন। তাই, সমগ্র জগতের মঙ্গল সাধনকারী শুদ্ধ সত্ত্বমূর্তি আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
গন্ধর্বেরা প্রার্থনা করলেন- “হে ভগবান, আমরা নাট্য অনুষ্ঠানে নৃত্য-গীতের দ্বারা আপনার সেবা করি, কিন্তু এই হিরণ্যকশিপু তার বল এবং বীর্যের দ্বারা আমাদের তার নিয়ন্ত্রণাধীন করেছিল। এখ্ন সে আপনার দ্বারা এই অধম দশা প্রাপ্ত হয়েছে। তার মতো কুপথগামীর কার্যকলাপের দ্বারা কি লাভ হতে পারে?”
চারণলোকের অধিবাসীগণ বললেন- “হে ভগবান, সাধুদের হৃদয়ে ভয়ের উৎপাদনকারী দৈত্য হিরণকশিপুকে যেহেতু আপনি সংহার করেছেন, তাই আমরা এখন আশ্বস্ত হয়েছি। আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেছি, যা বদ্ধ জীবদের জড় কলুষ থেকে মুক্ত করে।”
যক্ষগণ প্রার্থনা করে বললেন- “হে চতুর্বিংশতি তত্ত্বের নিয়ন্তা, আপনার প্রসন্নতা বিধানের জন্য আমরা আপনার সেবা করি বলে আমাদের আপনার শ্রেষ্ঠ সেবক বলে মনে করা হয়, তবুও দিতিপুত্র হিরণ্যকশিপুর আদেশে আমরা তার শিবিকা-বাহকের কার্যে নিযুক্ত হয়েছিলাম। হে নৃসিংহদেব, এই অসুর যে কিভাবে সকলকে কষ্ট দিয়েছিল তা আপনি জানেন, কিন্তু এখন আপনি তাকে সংহার করেছেন এবং তার শরীর পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েছে।”
কিম্পুরুষেরা বললেন- “আমরা অত্যন্ত নগণ্য জীব এবং আপনি পরমেশ্বর ভগবান, পরম নিয়ন্তা। সুতরাং আমরা কিভাবে আপনার স্তব করব? যখন ভক্তেরা এই অসুরের প্রতি বিরক্ত হয়ে তাকে ধিক্কার করেছিল, তখনই আপনার দ্বারা তার মৃত্যু হয়েছিল।”
বৈতালিকগণ বললেন- “হে ভগবান, মহতী সভায় এবং যজ্ঞস্থলে আপনার নির্মল যশ গান করি বলে সকলের কাছে আমরা মহতী পূজা প্রাপ্ত হই। কিন্তু এই দৈত্য আমাদের সেই পূজা তার আয়ত্ত করে নিয়েছিল। এখন আমাদের মহা সৌভাগ্যের ফলে রোগের মতো সেই দুর্জনকে আপনি বধ করেছেন।”
কিন্নরগণ বললেন- “হে পরম ঈশ্বর, আমরা আপনার নিত্যদাস, কিন্তু আপনার সেবা করার পরিবর্তে আমরা বিনা পারিশ্রমিকে এই অসুরের সেবায় নিযুক্ত হয়েছিলাম। এই মহাপাপী এখন অপনার দ্বারা নিহত হয়েছে। তাই, হে ভগবন, নৃসিংহদেব, হে প্রভু, আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। দয়া করে আপনি আমাদের সংরক্ষক হোন।”
বৈকুন্ঠলোকের বিষ্ণুপার্ষদেরা ভগবানের প্রতি তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করে বললেন- “আমাদের পরম আশ্রয় প্রদানকারী হে ভগবান, আজ আমাদের সমস্ত জগতের মঙ্গল প্রদানকারী আপনার এই অদ্ভুত নৃসিংহরূপ দর্শন করলাম। হে ভগবান, আমরা বুঝতে পেরেছি যে, এই হিরণ্যকশিপু আপনারই সেবক জয়, যে ব্রাহ্মণের অভিশাপের ফলে অসুর-শরীর প্রাপ্ত হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি যে, তাকে বধ করে আপনি তার প্রতি আপনার বিশেষ কৃপা প্রদর্শন করেছেন।”
অষ্টম অধ্যায়- ভগবান নৃসিংহদেবের দৈত্যরাজ বধ
25 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান