নারদ মুনি বললেন- “হিরণ্যকশিপুর কঠোর তপস্যায় ব্রহ্মা অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাই হিরণ্যকশিপু যখন তাঁর কাছে বর প্রার্থনা করেছিল, তা অত্যন্ত দুর্লভ হলেও তখন তিনি তাকে সেই সমস্ত বর প্রদান করেছিলেন।”
শ্রীব্রহ্মা বললেন- “হে হিরণ্যকশিপু, তুমি যে সমস্ত বর আমার কাছে প্রার্থনা করেছ, তা অধিকাংশ মানুষের পক্ষে দুর্লভ। কিন্তু তা সত্ত্বেও হে বৎস, আমি তোমাকে তা দান করব। তারপর ভগবান ব্রহ্মা, যিনি অব্যর্থ বর প্রদান করেন, তিনি অসুরশ্রেষ্ঠ হিরণ্যকশিপুর দ্বারা পূজিত এবং মহান ঋষি ও মহাত্মগণ কর্তৃক সংস্তুত হয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন। দৈত্য হিরণকশিপু এইভাবে ব্রহ্মার বর লাভ করে স্বর্ণের মতো কান্তি সমন্বিত দেহ লাভ করেছিল এবং তার ভাতৃবধের কথা স্মরণ করে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করতে লাগল। হিরণকশিপু সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জয় করেছিল। সেই দৈত্য প্রকৃতপক্ষে ত্রিলোকের (উচ্চ, মধ্য এবং অধোলোকের) দেবতা, মনুষ্য, গন্ধর্ব, গরুড়, উরগ, সিদ্ধ, চারণ, বিদ্যাধর, ঋষি, যম, আদি পিতৃপতি, মনু, যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, প্রেত, ভূত আদি সমস্ত প্রাণীদের অধিপতিগণ সহ তাঁদের গ্রহলোকসমূহ জয় করেছিল। এইভাবে সে সমস্ত গ্রহলোকের অধিপতিদের পরাভূত করে তাঁদের তার বশীভূত করেছিল। তাঁদের স্থানসমূহ জয় করে সে তাঁদের শক্তি এবং প্রভাব অপহরণ করেছিল। সমস্ত ঐশ্বর্য সমন্বিত হিরণ্যকশিপু স্বর্গের দেবতাদের প্রসিদ্ধ প্রমোদোদ্যান নন্দনকাননে বাস করতে লাগল। প্রকৃতপক্ষে সে দেবরাজ ইন্দ্রের মহা ঐশ্বর্য সমন্বিত প্রাসাদে বাস করত। সেই প্রাসাদ স্বয়ং বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেছিলেন এবং তা এত সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল যেন ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবী সেখানে বাস করতেন। দেবরাজ ইন্দ্রের ভবনের সোপানগুলি প্রবাল দিয়ে তৈরী ছিল। ভূমিতল মহামূল্য মরকত মণিখচিত, ভিত্তিসমূহ স্ফটিক শোভিত এবং স্তম্ভশ্রেণী বৈদূর্য মণি ভূষিত ছিল। উপরের চন্দ্রাতপগুলি অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলঙ্কৃত, আসনসমূহ পদ্মরাগ মণি খচিত এবং দুগ্ধফেননিভ রেশমের শয্যা মুক্তা দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। সেই প্রাসাদের রমণীরা অত্যন্ত সুন্দর দন্তবিশিষ্ট এবং তাদের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য অতুলনীয় ছিল। তারা যখন প্রাসাদে ইতস্তত বিচরণ করত, তখন তাদের পায়ের নূপুর অত্যন্ত সুন্দর সুরে ধ্বনিত হত এবং রত্নে তাদের সৌন্দর্য প্রতিবিম্বিত হত। দেবতারা কিন্তু অত্যন্ত নির্যাতিত হয়েছিল এবং হিরণ্যকশিপুর পদযুগলে মস্তক অবনত করে তাদের প্রণত হতে হয়েছিল। হিরণ্যকশিপু অকারণে দেবতাদের অত্যন্ত কঠোরভাবে দণ্ড দিয়েছিল। এইভাবে হিরণ্যকশিপু তার কঠোর শাসনের দ্বারা সকলকে নিয়ন্ত্রিত করে সেই প্রাসাদে বাস করছিল।”
“হে রাজন্, হিরণ্যকশিপু সর্বদা উগ্রগন্ধ সুরাপানে মত্ত থাকত এবং তাই তার তাম্রলোচন সর্বদা ঘূর্ণিত হত। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেহেতু সে কঠোর তপস্যা এবং যোগসাধনার বলে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, তাই সে নিতান্ত ঘৃণিত হলেও ব্রহ্মা, শিব এবং বিষ্ণু ব্যতীত সমস্ত দেবতারাই উপহার হস্তে তার উপাসনা করতেন। হে পাণ্ডপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির, হিরণ্যকশিপু তার স্বীয় শক্তির দ্বারা দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে, অন্য সমস্ত লোকের অধিবাসীদের তার নিয়ন্ত্রণাধীন করেছিল। বিশ্বাবসু, তুম্বুরু আদি গন্ধর্বগণ, আমি স্বয়ং এবং বিদ্যাধর, অপ্সরা এবং সমস্ত মহর্ষিরা তার যশোগান করার জন্য বার বার তার স্তব করতাম। নিষ্ঠা সহকারে বর্ণাশ্রম-ধর্ম অনুসরণকারীরা যে প্রচুর উপহার এবং উপচার দিয়ে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতেন, হিরণ্যকশিপু দেবতাদের সেই যজ্ঞভাগ না দিয়ে স্বয়ং তা গ্রহণ করত। তখন হিরণ্যকশিপুর ভয়েই যেন সপ্তদ্বীপ সমন্বিতা পৃথিবী বিনা কর্ষণেই চিৎ-জগতের সুরভির মতো অথবা স্বর্গের কামধেনেুর মতো বিবিধ শস্য উৎপন্ন করেছিল। পৃথিবী প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য উৎপন্ন করেছিল, গাভী পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ দিয়েছিল এবং নভোমণ্ডল বিশেষ শোভা প্রাপ্ত হয়েছিল। ব্রহ্মাণ্ডের বিবিধ সমুদ্র তাদের পত্নীসদৃশ নদীসমূহের তরঙ্গের দ্বারা হিরণ্যকশিপুর কাছে বিবিধ মণিরত্ন প্রেরণ করত। এই সমুদ্রগুলি হচ্ছে লবন, ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, দুগ্ধ, দধি এবং মিষ্টি জলের সমুদ্র। পর্বতের মধ্যবর্তী উপত্যকাগুলি হিরণ্যকশিপুর ক্রীড়াস্থলী হয়েছিল। তার প্রভাবে সমস্ত বৃক্ষ এবং লতা সমস্ত ঋতুতেই প্রচুর ফল এবং ফুলে শোভিত ছিল। বারিবর্ষণ, শোষণ এবং দহনের ক্রিয়া, যেগুলি ব্রহ্মাণ্ডের বিভাগীয় অধ্যক্ষ- ইন্দ্র, বায়ু এবং অগ্নির কার্য, সেগুলি হিরণ্যকশিপু দেবতাদের সহায়তা ব্যতীত একাকীই পরিচালনা করছিল। সর্বদিক নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা লাভ করা সত্ত্বেও এবং যথাসম্ভব ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করা সত্ত্বেও হিরণ্যকশিপু তৃপ্ত হতে পারেনি, কারণ তার ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে সে তার ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হয়েছিল। এইভাবে তার ঐশ্বর্যগর্বে অত্যন্ত গর্বিত হয়ে এবং শাস্ত্রবিধি লঙ্ঘন করে হিরণ্যকশিপু দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেছিল। তার ফলে সে সনকাদি মহান ব্রাহ্মণদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছিল। বিভিন্ন লোকের লোকপালগণ সহ সমস্ত অধিবাসীরা হিরণ্যকশিপুর প্রচণ্ড উৎপীড়নে অত্যন্ত পীড়িত হয়েছিল। ভীত এবং বিচলিত হয়ে, অন্য কোথাও আশ্রয় না পেয়ে, তারা অবশেষে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়েছিল।”
“যেখানে পরমেশ্বর ভগবান বিরাজ করেন, সেখানে অমল আত্মা সন্ন্যাসীগণ গমন করে আর ফিরে আসেন না, সেই দিককে আমরা নমস্কার করি।” এইভাবে ধ্যান করে লোকপালগণ নিদ্রাহীন হয়ে, পূর্ণরূপে তাদের মন সংযত করে এবং কেবল বায়ুমাত্র আহার করে ভগবান হৃষীকেশের আরাধনা করতে লাগলেন। তখন জড় চক্ষুর দ্বারা অদৃশ্য এক ব্যক্তির দিব্য কন্ঠস্বর তাঁরা শুনতে পেয়েছিলেন। সেই স্বর মেঘের ধ্বনির মতো গম্ভীর ছিল এবং তা সমস্ত ভয় দূর করে সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ভগবানের সেই বাণী ঘোষণা করেছিল, ‘হে বিবুধশ্রেষ্ঠগণ, ভয় করো না! তোমাদের মঙ্গল হোক। আমার মহিমা শ্রবণ-কীর্তন করে এবং আমার প্রার্থনা করে তোমরা আমার ভক্ত হও। তার ফলে সমস্ত জীবের পরম মঙ্গল লাভ হয়। হিরণ্যকশিপুর সমস্ত কার্যকলাপ সম্বন্ধে আমি অবগত আছি এবং অচিরেই আমি তার সেই সমস্ত দুষ্কর্মের সমাপ্তি সাধন করব। ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা কর।’ কেউ যখন ভগবানের প্রতিনিধি দেবতাদের প্রতি, সমস্ত জ্ঞান প্রদানকারী বেদের প্রতি, গাভীদের প্রতি, ব্রাহ্মণদের প্রতি, বৈষ্ণবদের প্রতি, ধর্মের প্রতি এবং চরমে পরমেশ্বর ভগবান আমার প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়, সে শ্রীঘ্রই বিনাশ প্রাপ্ত হয়। হিরণ্যকশিপু যখন তার নির্বৈর, প্রশান্ত এবং মহাত্মা স্বপুত্র প্রহ্লাদের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করবে, তখন ব্রহ্মার বর সত্ত্বেও আমি তাকে সংহার করব।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “সকলের পরম গুরু পরমেশ্বর ভগবান যখন স্বর্গের দেবতাদের এইভাবে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা তাঁকে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করে, দৈত্য হিরণ্যকশিপুর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে তাঁদের আলয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। হিরণ্যকশিপুর চারজন অত্যন্ত সুযোগ্য পুত্রের মধ্যে প্রহ্লাদ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রকৃতপক্ষে, প্রহ্লাদ ছিলেন সমস্ত দিব্য গুণের আধার, কারণ তিনি ছিলেন ভগবানের অনন্য ভক্ত। (এখানে হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ মহারাজের গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে)। তিনি ব্রহ্মণ্য গুণসম্পন্ন, সচ্চরিত্র এবং পরম সত্যকে জানতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাঁর মন এবং ইন্দ্রিয়কে সর্বতোভাবে সংযত করেছিলেন। পরমাত্মার মতো তিনি সমস্ত জীবের প্রতি দয়ালু এবং সৌহার্দ্য-পরায়ণ ছিলেন। সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি তিনি ভৃত্যের মতো আচরণ করতেন, দরিদ্রদের প্রতি তিনি পিতার মতো বাৎসল্য প্রকাশ করতেন, সমান ব্যক্তিদের প্রতি তিনি ভ্রাতার মতো অনুরক্ত ছিলেন এবং তিনি তাঁর গুরু ও জ্যেষ্ঠ গুরুভ্রাতাদের ঈশ্বরতুল্য সম্মান করতেন। তিনি বিদ্যা, ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য ও আভিজাত্য জনিত গর্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ছিলেন। প্রহ্লাদ মহারাজ যদিও আসুরিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তবুও তিনি আসুরিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। অন্য অসুরদের মতো তিনি বৈষ্ণব-বিদ্বেষী ছিলেন না। চরম বিপদেও তিনি উদ্বিগ্ন হতেন না এবং তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈদিক সকাম কর্মে আগ্রহী ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি সমস্ত জড় বস্তুকে অর্থহীন বলে মনে করতেন এবং তাই তিনি সমস্ত কামনা-বাসনা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ছিলেন। তিনি সর্বদা তাঁর ইন্দ্রিয় এবং প্রাণকে সংযত করে, স্থির বুদ্ধি এবং দৃঢ়সংকল্প সহকারে তাঁর সমস্ত কামবাসনা দমন করেছিলেন।”
“হে রাজন, প্রহ্লাদ মহারাজের মহৎ গুণাবলী আজও জ্ঞানবান মহাত্মা এবং বৈষ্ণবেরা কীর্তন করে থাকেন। সমস্ত সদ্গুণ যেমন ভগবানের মধ্যে সর্বদাই বিরাজমান, তেমনই তাঁর ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের মধ্যেও সেইগুলি নিত্য বিরাজমান। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, যে সভায় সাধু এবং ভগবদ্ভক্তদের সম্বন্ধে আলোচনা হয়, সেখানে অসুরদের শত্রু দেবতারাও মহান ভগবদ্ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেন। আপনাদের মতো মহৎ ব্যক্তিদের তো কথাই নেই। প্রহ্লাদ মহারাজের অসংখ্য গুণাবলী কে নির্ণয় করতে পারে? বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর অবিচলিত শ্রদ্ধা এবং অনন্য ভক্তি ছিল। তাঁর পূর্বকৃত ভক্তির প্রভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আসক্তি ছিল। যদিও তাঁর সদ্গুণগুলির গণণা করা সম্ভব নয়, তবুও তার ফলে সিদ্ধ হয় যে, তিনি ছিলেন একজন মহাত্মা। প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর শৈশব থেকেই শিশুসুলভ খেলাধুলার প্রতি উদাসীন ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি সর্বতোভাবে সেগুলি পরিত্যাগ করে, শ্রীকৃষ্ণের ভাবনায় পূর্ণরূপে মগ্ন হয়ে জড়বৎ অবস্থা প্রাপ্ত হন। যেহেতু তাঁর মন সর্বদা কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন থাকত, তাই তিনি বুঝতে পারতেন না কিভাবে এই জগৎ ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের কার্যকলাপে মগ্ন হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রহ্লাদ মহারাজ সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। এইভাবে ভগবানের দ্বারা সর্বদা আলিঙ্গিত হয়ে, তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন না কিভাবে উপবেশন, পর্যটন, ভোজন, শয়ন, পান, কথোপকথন আদি দৈহিক প্রয়োজনগুলি আপনা থেকেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কৃষ্ণপ্রেমে বিহ্বল চিত্তে কখনও তিনি ক্রন্দন করতেন, কখনও হাসতেন, কখনও আনন্দ প্রকাশ করতেন, কখনও উচ্চস্বরে কীর্তন করতেন। কখনও ভগবানকে দর্শন করে, প্রহ্লাদ মহারাজ পূর্ণ উৎকন্ঠার বশে উচ্চস্বরে তাঁকে ডাকতেন। কখনও আনন্দে লজ্জারহিত হয়ে নিত্য করতেন, কখনও শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন হয়ে তন্ময়তা লাভ করতেন এবং ভাবে বিভোর হয়ে ভগবানের লীলার অনুকরণ করতেন। কখনও কখনও ভগবানের করকমলের স্পর্শ অনুভব করে, তিনি আনন্দমগ্ন হয়ে মৌন হয়ে থাকতেন, তাঁর শরীর রোমাঞ্চিত হত এবং ভগবৎ প্রেমে তাঁর অর্ধনিমীলিত নেত্র থেকে অশ্রুধারা ঝরে পড়ত। অকিঞ্চন শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ প্রভাবে প্রহ্লাদ মহারাজ নিরন্তর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর পূর্ণ আনন্দময় রূপ দর্শন করে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানে দরিদ্র ব্যক্তিরাও পবিত্র হত। অর্থাৎ, প্রহ্লাদ মহারাজ তাদের দিব্য আনন্দ প্রদান করতেন। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, হিরণ্যকশিপু সেই মহাভাগবত, মহাভাগ্যবান প্রহ্লাদকে নির্যাতন করেছিল, যদিও তিনি ছিলেন তার নিজের পুত্র।”
মহারাজ যুধিষ্ঠির বললেন- “হে দেবর্ষে, হে সুব্রত, প্রহ্লাদ যদিও ছিল তার পুত্র, তবুও হিরণ্যকশিপু কিভাবে সেই নির্মল হৃদয় মহাত্মাকে দুঃখ দিয়েছিল? এই বিষয়ে আমি আপনার কাছে জানতে ইচ্ছা করি। পিতামাতা সর্বদাই তাঁদের সন্তানদের প্রতি স্নেহপরায়ণ হন। সন্তান অবাধ্য হলে পিতামাতা তাদের তিরস্কার করেন। সেই তিরস্কার শত্রুতার বশে নয়, পক্ষান্তরে সন্তানদের শিক্ষার জন্য এবং তার মঙ্গলের জন্য। কিন্তু প্রহ্লাদ মহারাজের পিতা হিরণ্যকশিপু কিভাবে তার এই প্রকার মহান পুত্রকে উৎপীড়ন করেছিল? সেই কথাই আমি জানতে উৎসুক। এই প্রকার আজ্ঞানুবর্তী, সদাচারী এবং পিতৃভক্ত পুত্রের প্রতি হিংসা আচরণ করা পিতার পক্ষে কিভাবে সম্ভব হতে পারে? হে ব্রাহ্মণ, হে প্রভু, স্বভাবত স্নেহশীল পিতা তার মহান পুত্রকে দণ্ড দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে, সেই কথা আমি কখনও শুনিনি। দয়া করে আপনি আমার এই সন্দেহ দূর করুন।”
চতুর্থ অধ্যায়- ব্রহ্মাণ্ডে হিরণ্যকশিপুর সন্ত্রাস
19 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান