নারদ মুনি মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন- “দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু অজেয় এবং জরা ও মৃত্যুরহিত হতে চেয়েছিল। সে অণিমা, লঘিমা আদি সমস্ত যোগসিদ্ধি লাভ করতে চেয়েছিল, মৃত্যুহীন হতে চেয়েছিল এবং ব্রহ্মলোক সহ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হতে চেয়েছিল। হিরণ্যকশিপু মন্দর পর্বতের উপত্যকায় পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে, ঊর্ধ্ববাহু হয়ে এবং আকাশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করতে শুরু করেছিল। এইভাবে থাকা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু সে সিদ্ধিলাভের উপায় স্বরূপ সেই অবস্থা অবলম্বন করেছিল। হিরণ্যকশিপুর জটা থেকে প্রলয়কালীন সূর্যের কিরণের মতো উজ্জ্বল এবং অসহ্য দীপ্তি বিচ্ছুরিত হতে লাগল। তাকে এইভাবে কঠোর তপস্যারত দেখে ব্রহ্মাণ্ডে বিচরণকারী দেবতারা তাঁদের নিজ নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। হিরণ্যকশিপুর কঠোর তপস্যার ফলে তার মস্তক থেকে অগ্নি বিচ্ছুরিত হয়েছিল এবং সেই অগ্নি ও তার ধুম সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার তাপে সমস্ত গ্রহলোক অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তার কঠোর তপস্যার প্রভাবে নদী এবং সমুদ্রগুলি ক্ষুব্ধ হয়েছিল, পর্বত এবং দ্বীপ সহ ভূপৃষ্ট কম্পিত হয়েছিল এবং গ্রহ-নক্ষত্রগুলি বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। দশ দিক প্রজ্বলিত হয়েছিল। হিরণ্যকশিপুর কঠোর তপস্যার ফলে সন্তপ্ত এবং অত্যন্ত বিচলিত হয়ে, সমস্ত দেবতারা স্বর্গলোক পরিত্যাগ করে ব্রহ্মলোকে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা বিধাতাকে বলেছিলেন- ‘হে দেবদেব, হে জগৎপতে, দৈত্যপতি হিরণ্যকশিপুর কঠোর তপস্যার প্রভাবে তার মস্তক থেকে উদ্গত অগ্নির তাপে আমরা এতই সন্তপ্ত হয়েছি যে, আমরা আর স্বর্গলোকে থাকতে পারছি না। তাই আমরা আপনার কাছে এসেছি। হে মহাপুরুষ, হে ব্রহ্মাণ্ডাধিপতি, আপনি যদি উপযুক্ত মনে করেন, তা হলে আপনার সমস্ত অনুগত ব্যক্তিদের বিনাশের পূর্বেই এই সর্বলোক-ক্ষয়কারী উপদ্রব নিবারণ করুন।’ হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত দুষ্কর তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়েছে। যদিও তার পরিকল্পনা আপনার অজ্ঞাত নয়, তবুও আমরা তার অভিপ্রায় বর্ণনা করছি, দয়া করে আপনি তা শ্রবণ করুন।”
“এই ব্রহ্মাণ্ডের পরম পুরুষ ব্রহ্মা তপস্যা, যোগশক্তি এবং সমাধির দ্বারা তাঁর অতি উচ্চপদ প্রাপ্ত হয়েছেন। তার ফরে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর তিনি সর্বাধিক পূজ্য দেবতা হয়েছেন। যেহেতু আমি নিত্য এবং কালও নিত্য, তাই আমিও বহু জন্ম তপস্যা, যোগ এবং সমাধির প্রভাবে ব্রহ্মার মতো পদ অধিকার করব। আমার কঠোর তপস্যার প্রভাবে আমি পুণ্য এবং পাপের ফল উল্টে দেব। আমি জগতের সমস্ত প্রতিষ্ঠিত প্রথা পাল্টে দেব। কল্পান্তে ধ্রুবলোকও বিনষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং তাতে আমার কি প্রয়োজন? আমি ব্রহ্মার পদ প্রাপ্ত হওয়াই শ্রেয় বলে মনে করি।”
“হে প্রভু, আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছি যে, আপনার পদ লাভের উদ্দেশ্যে হিরণ্যকশিপু এখন কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়েছে। আপনি ত্রিভুবনের ঈশ্বর, দয়া করে আপনি অচিরেই উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করুন। হে ব্রহ্মা, এই ব্রহ্মাণ্ডে আপনার পদ সকলের জন্যই পরম কল্যাণকর, বিশেষ করে গাভী এবং ব্রাহ্মণদের জন্য। তার ফলে ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতি এবং গোরক্ষা অধিক থেকে অধিকতর মহিমান্বিত হবে এবং এইভাবে সর্বপ্রকার সুখ, ঐশ্বর্য এবং সৌভাগ্য আপনা থেকেই বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হিরণ্যকশিপু যদি আপনার পদ অধিকার করে, তা হলে সব কিছু বিনষ্ট হবে।”
“হে রাজন্, পরম শক্তিমান ব্রহ্মা এইভাবে দেবতাদের দ্বারা বিজ্ঞাপিত হয়ে ভুগু, দক্ষ আদি মহর্ষিগণ সহ তৎক্ষণাৎ হিরণ্যকশিপু যেখানে তপস্যা করছিল সেখানে গিয়েছিলেন। হংসবাহন ব্রহ্মা প্রথমে হিরণ্যকশিপুকে দেখতে পাননি, কারণ হিরণ্যকশিপুর দেহ একটি উইয়ের ঢিপি, তৃণ, বাঁশ প্রভৃতির দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। হিরণ্যকশিপু দীর্ঘকাল সেখানে নিশ্চিলভাবে দাঁড়িয়ে তপস্যা করছিল বলে, অসংখ্য পিপীলিকা তার ত্বক, মেদ, মাংস এবং রক্ত খেয়ে ফেলেছিল। তারপর ব্রহ্মা এবং দেবতারা তাকে তার তপস্যার দ্বারা সমস্ত জগৎকে তাপ প্রদানকারী মেঘাচ্ছন্ন সূর্যের মতো দেখতে পেয়েছিলেন। ব্রহ্মা বিস্মিত চিত্তে হাসতে হাসতে তাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন- হে কশ্যপ মুনির পুত্র, তুমি ওঠ, ওঠ। তোমার মঙ্গল হোক। তুমি তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছ এবং তাই আমি তোমাকে বর দিতে এসেছি। তুমি তোমার বাসনা অনুসারে বর প্রার্থনা কর। আমি তোমার বাসনা পূর্ণ করতে চেষ্টা করব। আমি তোমার সহনশক্তি দর্শন করে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছি। কীট এবং পিপীলিকারা যদিও তোমার সারা শরীর খেয়ে ফেলেছে, তবুও তুমি তোমার অস্থিতে তোমার প্রাণবায়ু ধারণ করে আছ। এটি অবশ্যই অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। তোমার পূর্বতন ভৃগু প্রভৃতি ঋষিরাও এই প্রকার কঠোর তপস্যা করতে পারেননি এবং ভবিষ্যতেও কেউ পারবে না। এই ত্রিভুবনে এমন কে আছে যে, এক শত দিব্য বর্ষ ধরে জল পান না করে প্রাণ ধারণ করতে পারে? হে দিতিনন্দন, দৃঢ়সংকল্প সহকারে তুমি যে কঠোর তপস্যা করেছ তা মহান ঋষিদের পক্ষেও অসম্ভব। তোমার এই তপস্যার দ্বারা তুমি আমাকে নিশ্চিতভাবে জয় করেছ। হে অসুরশ্রেষ্ঠ, এই কারণে আমি তোমাকে তোমার বাসনা অনুসারে সমস্ত বর দিতে প্রস্তুত। আমি অমর দেবতা, মানুষের মতো যাঁদের মৃত্যু হয় না। তাই তুমি মরণশীল হলেও আমার দর্শন তোমার বিফল হবে না।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “হিরণ্যকশিপুকে এই কথা বলে, এই ব্রহ্মাণ্ডের আদিদেব ব্রহ্মা তাঁর কমণ্ডলু থেকে অব্যর্থ দিব্য জল দিয়ে পিপীলিকা কর্তৃক ভক্ষিত হিরণ্যকশিপুর দেহের উপর সিঞ্চন করেছিলেন। তার ফলে হিরণ্যকশিপুর শরীর পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। ব্রহ্মার কমণ্ডলুর জলে সিক্ত হওয়া মাত্র হিরণ্যকশিপু বজ্রসদৃশ সর্ব অবয়ব সমন্বিত হয়ে উত্থিত হয়েছিল। তার দেহ শক্তিসম্পন্ন এবং অঙ্গের কান্তি তপ্তকাঞ্চনের মতো হয়েছিল এবং কাষ্ঠ থেকে যেভাবে অগ্নি উত্থিত হয়, ঠিক সেইভাবে সে বাল্মীকের মধ্যে থেকে পূর্ণযৌবন-সম্পন্ন রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। হংসবাহন ব্রহ্মাকে আকাশ-পথে তার সম্মুখে উপস্থিত দেখে, হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল। সে তৎক্ষণাৎ ভূমিতে মস্তক অবনত করে ব্রহ্মার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগল। তারপর ব্রহ্মাকে তার সম্মুখে উপস্থিত দেখে, দৈত্যপতি আনন্দে বিহ্বল হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। ব্রহ্মার প্রসন্নতা বিধানের জন্য সে তখন অশ্রপূর্ণ নয়নে, কম্পিত কলেবরে এবং কৃতাঞ্জলিপুটে অত্যন্ত বিনীতভাবে গদ্গদ বাক্যে প্রার্থনা করতে শুরু করেছিল।”
“আমি এই ব্রহ্মাণ্ডের পরম ঈশ্বরকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। তাঁর জীবনের প্রতি দিনের অন্তে এই ব্রহ্মাণ্ড কালের প্রভাবে ঘন অন্ধকারের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে যায় এবং তার পরের দিন পুনরায় সেই স্বয়ং প্রকাশ প্রভু তাঁর নিজের জ্যোতির দ্বারা ত্রিগুণাত্মিকা জড়া প্রকৃতির মাধ্যমে সমগ্র জগৎ প্রকাশ করেন, পালন করেন এবং বিনাশ করেন। সেই ব্রহ্মাই সত্ত্বগুণ, রজোগুণ এবং তমোগুণের আশ্রয়। আমি এই ব্রহ্মাণ্ডের আদি পুরুষ ব্রহ্মাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি, যিনি জ্ঞানবান এবং যিনি বিরাট জগৎ সৃষ্টির কার্যে তার মন ও বুদ্ধির উপযোগ করতে পারেন। তাঁরই কার্যকলাপের ফলে এই ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু প্রকাশিত হয়েছে। তাই তিনিই হচ্ছেন সমস্ত জগতের কারণ। হে প্রভু, আপনি এই জড় জগতে জীবনের উৎস, স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীবের প্রভু ও নিয়ন্তা এবং আপনি তাদের চেতনাকে অনুপ্রাণিত করেন। আপনি মন, কর্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পালক। অতএব আপনি সমস্ত জড় উপাদান ও তাদের গুণাবলীর পরম নিয়ন্তা এবং আপনি সমস্ত বাসনারও নিয়ন্তা। হে প্রভু, মূর্তিমান বেদরূপে এবং সমস্ত যাজ্ঞিক ব্রাহ্মাণদের কার্যকলাপের জ্ঞানের দ্বারা আপনি অগ্নিষ্টোম আদি সাত প্রকার যজ্ঞ অনুষ্ঠান বিস্তার করেন। বস্তুতপক্ষে আপনি তিন বেদে বর্ণিত যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণদের অনুপ্রাণিত করেন। পরমাত্মারূপে আপনি সমস্ত জীবের অন্তর্যামী, আপনি অনাদি, অনন্ত এবং সর্বজ্ঞ। আপনি স্থান এবং কালের সীমার অতীত। হে প্রভু, আপনি নিত্য জাগ্রত হযে সর্বদ্রষ্টা নিত্য কালরূপে লব, পল, মুহূর্ত আদি বিভিন্ন অংশ দ্বারা আপনি সমস্ত জীবের আয়ু হরণ করেন। অথচ আপনি অপরিবর্তনীয়, পরমাত্মারূপে আপনি কূটস্থ, সাক্ষী, পরম নিয়ন্তা, জন্মরহিত, সর্বব্যাপ্ত এবং সমস্ত জীবের কারণ এবং নিয়ন্তা। আপনার থেকে পৃথক কিছুই নেই, তা সে উৎকৃষ্টই হোক অথবা নিকৃষ্টই হোক, স্থাবর হোক বা জঙ্গম হোক। উপনিষদ আদি বৈদিক শাস্ত্র এবং বেদের অনুগামী শাস্ত্রের জ্ঞানই হচ্ছে আপনার বাহ্য শরীরের রূপ। আপনি হিরণ্যগর্ভ, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের আধার, কিন্তু তা সত্ত্বেও পরম নিয়ন্তারূপে আপনি ত্রিগুণাত্মিকা জড়া প্রকৃতির অতীত। হে প্রভু, আপনি অবিকৃতভাবে আপনার ধামে অবস্থিত হয়ে, এই জগতে আপনার বিশ্বরূপ বিস্তার করেন, তার ফলে মনে হয় যেন আপনি জড় জগতের রস আস্বাদন করছেন। আপনি ব্রহ্ম, পরমাত্মা, পুরাণ পুরুষ ভগবান। আমি সেই পরম পুরুষকে সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যিনি অনন্ত এবং অব্যক্তরূপে এই অখিল জগতে পরিব্যাপ্ত। তিনি অন্তরঙ্গা, বহিরঙ্গা এবং তটস্থা শক্তি নামক মিশ্রা শক্তি সমন্বিত। জীবেরা ভগবানের তটস্থা শক্তি। হে প্রভু, হে শ্রেষ্ঠ বরদাতা, আপনি যদি আমার অভীষ্ট বরই দান করেন, তা হলে যেন আপনার সৃষ্ট কোন প্রাণী থেকে আমার মৃত্যু না হয়। আপনি আমাকে বর দিন যেন গৃহে অভ্যন্তরে অথবা বাইরে, দিনের বেলা অথবা রাত্রে, ভূমিতে অথবা আকাশে যেন আমার মৃত্যু না হয়। আপনি আমাকে বর দিন যাতে আপনার সৃষ্ট জীব ছাড়াও অন্য কারোর দ্বারা, কোন অস্ত্রের দ্বারা, কোন মানুষের দ্বারা অথবা পশুর দ্বারা যেন আমার মৃত্যু না হয়। আপনি আমাকে বরদান করুন যাতে প্রাণী, অপ্রাণী কারও থেকে আমার মৃত্যু না হয়। আপনি আমাকে বরদান করুন যাতে দেবতা, দৈত্য, অধঃলোকবাসী মহাসর্প থেকে আমার মৃত্যু না হয়। যেহেতু কেউই আপনাকে যুদ্ধে হত্যা করতে পারে না, তাই আপনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আপনি আমাকে বর দিন যাতে আমারও কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে। আপনি আমাকে সমস্ত জীবদের ও লোকপালদের একাধিপত্য প্রদান করুন এবং সেই পদের সমস্ত মহিমা প্রদান করুন। অধিকন্তু, আমাকে তপস্যা এবং যোগ অভ্যাসের ফলে লব্ধ সমস্ত যোগসিদ্ধি প্রদান করুন, যা কখনও বিনষ্ট হয় না।”
তৃতীয় অধ্যায়- হিরণ্যকশিপুর অমর হওয়ার পরিকল্পনা
18 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান