দ্বিতীয় অধ্যায়- দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু

শ্রীনারদ মুনি বললেন- “হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, ভগবান বিষ্ণু যখন বরাহরূপে হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন, তখন হিরণ্যাক্ষের ভ্রাতা হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্রোধাভিভূত হয়ে পরিতাপ করেছিল। ক্রোধে ওষ্ঠাধর দংশন করতে করতে হিরণ্যকশিপু কোপোদ্দীপ্ত চক্ষুতে রোষাগ্নির ধূমে ধুম্রবর্ণ আকাশ-মণ্ডল অবলোকন করতে করতে বলল, করাল দন্তবিশিষ্ট, উগ্রদৃষ্টি এবং ভয়ানক দর্শন ভ্রুকুটিযুক্ত মুখে তার শূল উত্তোলন করে সমবেত দানবদের বলেছিল, ‘হে দৈত্য এবং দানবেরা! হে দ্বিমূর্ধ, ত্র্যক্ষ, শম্বর এবং শহবাহু! হে হয়গ্রীব, নমুচি, পাক এবং ইল্বল! হে বিপ্রচিত্তি, পুলোমন, শকুন এবং অন্য সমস্ত অসুরেরা! তোমরা সকলে আমার কথা শ্রবণ কর এবং বিলম্ব না করে সেই অনুসারে কার্য কর। আমার নগণ্য শত্রু দেবতারা আমার পরম প্রিয় এবং অনুগত শুভাকাঙ্ক্ষী ভ্রাতা হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছে। ভগবান বিষ্ণু যদিও দেবতা এবং অসুরদের প্রতি সমভাবাপন্ন, কিন্তু এখন দেবতাদের দ্বারা নিষ্ঠা সহকারে পূজিত হওয়ার ফলে, তাদের পক্ষ অবলম্বন করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করতে তাদের সহায়তা করেছে। ভগবান অসুর এবং দেবতাদের প্রতি সমদর্শী হওয়ার স্বভাব পরিত্যাগ করেছে। যদিও সে পরম পুরুষ, তবুও এখন, সে মায়ার বশে একটি অস্থির বালকের মতো সেবা প্রলোভনে মুগ্ধ হয়ে, দেবতাদের প্রসন্নতা বিধানের জন্য বরাহরূপ ধারণ করেছে। আমি তাই আমার শূলের দ্বারা সেই বিষ্ণুর ধড় থেকে তার মুণ্ড ছিন্ন করে, তার রক্তের দ্বারা আমার রক্তপিপাসু ভ্রাতা হিরণ্যাক্ষের তর্পণ করব। তা হলেই আমার শান্তি হবে। বৃক্ষের মূল ছেদন করা হলে যেমন তার শাখা- প্রশাখা আপনা থেকেই শুকিয়ে যায়, তেমনই আমি যখন সেই কপট-স্বভাব বিষ্ণুকে হত্যা করব, তখন বিষ্ণুপ্রাণ দেবতারাও বিনষ্ট হবে। যখন আমি বিষ্ণুর সংহারকার্যে যুক্ত থাকব, তখন তোমরা ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতি এবং ক্ষত্রিয়-শাসনের দ্বারা সমৃদ্ধ পৃথিবীতে গিয়ে তপস্যা, যজ্ঞ, বেদ অধ্যয়ন, ব্রত এবং দান কার্যে যুক্ত মানুষদের সংহার করো! ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির মূল হচ্ছে যজ্ঞরূপী ধর্মময় পুরুষ শ্রীবিষ্ণুর প্রসন্নতা বিধান করা। ভগবান শ্রীবিষ্ণুই সমস্ত ধর্মের মূর্তিমান উৎস এবং তিনি সমস্ত দেবতা, ঋষি, পিতৃ এবং জনসাধারণের পরম আশ্রয়। যখন ব্রাহ্মণদের বধ করা হবে, তখন ক্ষত্রিয়দের যজ্ঞ অনুষ্ঠানে অনুপ্রাণিত করার জন্য কেউ থাকবে না এবং তার ফলে দেবতারা যজ্ঞের দ্বারা প্রসন্ন না হওয়ার ফলে, আপনা থেকেই মরে যাবে। যেখানে যেখানে গাভী, ব্রাহ্মণ, বেদ ও বেদবিহিত বর্ণাশ্রম-ধর্মের অনুষ্ঠান দেখবে, সেই স্থানে গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দাও এবং উপজীব্য বৃক্ষসমূহ কেটে ফেল।’ তখন সংহারপ্রিয় দানবেরা হিরণ্যকশিপুর আদেশ শ্রদ্ধা সহকারে শিরোধার্য করে এবং তাকে প্রণাম করে, তার আদেশ অনুসারে জীবহিংসায় প্রবৃত্ত হয়েছিল। দৈত্যেরা নগর, গ্রাম, গোচারণ ক্ষেত্র, উদ্যান, কৃষিক্ষেত্র, প্রাকৃতিক অরণ্য, ঋষিদের আশ্রম, মূল্যবান ধাতুর খনি, কৃষকাবাস, উপত্যকাস্থ গ্রাম এবং গোপপল্লী দগ্ধ করেছিল। তারা রাজধানী-সমূহও দগ্ধ করেছিল। কোন কোন দানব খনিত্র দ্বারা সেতু, প্রাচীর, পুরদ্বারসমূহ ভেঙ্গে ফেলেছিল। কেউ কেউ কুঠার হাতে আম, কাঁঠাল প্রভৃতি উপজীব্য বৃক্ষসমূহ কেটে ফেলেছিল। কোন কোন দৈত্য জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে প্রজাদের বাসস্থান দগ্ধ করেছিল। এইভাবে হিরণ্যকশিপুর অনুচরদের দ্বারা বার বার অস্বাভাবিকভাবে উপদ্রুত হওয়ায়, মানুষেরা বৈদিক কার্যকলাপ বন্ধ করেছিল। তার ফলে যজ্ঞভাগ না পেয়ে দেবতারাও অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিলেন। তাঁরা তখন স্বর্গলোক পরিত্যাগ করে দৈত্যদের অলক্ষিতভাবে, তাদের উপদ্রবের ক্ষয়ক্ষতি দর্শন করার জন্য পৃথিবীতে বিচরণ করতে লাগলেন। ভ্রাতার মৃত্যুতে অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে, হিরণ্যকশিপু তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান করে ভ্রাতুষ্পুত্রদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।”
“হে রাজন্, হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিল, কিন্তু যেহেতু সে ছিল একজন মস্ত বড় রাজনীতিজ্ঞ, তাই সে জানত কিভাবে স্থান এবং কাল অনুসারে আচরণ করতে হয়। মধুর বাক্যে সে শকুনি, শম্বর, ধৃষ্টি, ভূতসন্তাপন, বৃক, কালনাভ, মহানাভ, হরিশ্মশ্রু এবং উৎকচ নামক তার ভ্রাতুষ্পুত্রদের এবং তাদের মাতা, তার ভাতৃবধূ রুষাভানু এবং তার নিজ মাতা দিতিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, হে মাতঃ হে ভাতৃবধূ, হে ভ্রাতাষ্পুত্রগণ, মহান বীরের মৃত্যুতে তোমরা শোক করো না, কারণ শত্রুর সম্মুখে বীরের মৃত্যৃ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং বাঞ্ছনীয়। হে মাতঃ, ভোজনশালায় অথবা পানশালায় যেমন পথিকেরা একত্রে মিলিত হয় এবং জলপান করার পর তারা তাদের গন্তব্যস্থল অভিমুখে গমন করে, তেমনই জীবেরা কোন পরিবারে একত্রে মিলিত হয় এবং তারপর তাদের কর্মফল অনুসারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে যার নিজের গন্তব্যস্থল অভিমুখে গমন করে। জীবাত্মার মৃত্যু নেই, কারণ সে নিত্য এবং অব্যয়। জড় কলুষ থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে, সে জড় জগৎ অথবা চিৎ-জগতের যে কোন স্থানে যেতে পারে। সে পূর্ণ জ্ঞানময় এবং সর্বতোভাবে জড় দেহ থেকে ভিন্ন, কিন্তু তার ক্ষুদ্র স্বাধীনতার অপব্যবহার করার ফলে, তাকে জড়া প্রকৃতির সৃষ্ট সূক্ষ্ম এবং স্থূল শরীর ধারণ করতে বাধ্য হতে হয় এবং তার ফলে তাকে তথাকথিত সুখ এবং দুঃখ ভোগ করতে হয়। তাই আত্মার দেহত্যাগে শোক করা উচিত নয়। জল চঞ্চল হলে যেমন তীরস্থিত জলে প্রতিবিম্বিত বৃক্ষগুলিও চঞ্চল বলে মনে হয়, তেমনই মানসিক বিকারের ফলে যখন চক্ষু ঘূর্ণিত হয়, তখন ভূমিও ঘুরছে বলে মনে হয়। হে মাতঃ তেমনই, মন যখন জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা বিচলিত হয়, তখন জীব যদিও সূক্ষ্ম এবং স্থূল শরীরের বিভিন্ন অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তবুও মনে করে যে, সে এক অবস্থা থেকে আর এক অবস্থায় পরিবর্তিত হচ্ছে। জীব মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় তার দেহ এবং মনকে আত্মা বলে মনে করে, কোন ব্যক্তিকে তার আপন এবং অন্য কোন ব্যক্তি পর বলে মনে করে। এই ভ্রান্তির ফলে সে দুঃখভোগ করে। প্রকৃতপক্ষে তার এই মনোভাবই এই জড় জগতে তথাকথিত সুখ এবং দুঃখের কারণ। এইভাবে অবস্থিত হওয়ার ফলে বদ্ধ জীবকে বিভিন্ন যোনিতে জন্মগ্রহণ করে বিভিন্ন চেতনায় কার্য করতে হয় এবং তার ফলে নতুন দেহের সৃষ্টি হয়। এই নিরন্তর জড়-জাগতিক জীবনকে বলা হয় সংসার। এই সংসারের ফলেই জন্ম, মৃত্যু, শোক, মোহ ও চিন্তার উদয় হয়। এইভাবে কখনও আমাদের বিবেকের উদয় হয় এবং কখনও আমরা অজ্ঞানের অন্ধকারে পতিত হই। এই বিষয়ে একটি প্রাচীন ইতিহাসের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এতে যমরাজ এবং মৃত ব্যক্তির বান্ধবদের আলোচনা বর্ণনা করা হয়েছে। দয়া করে তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।”
“উশীনর নামক রাজ্যে সুযজ্ঞ নামক এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি যুদ্ধে শত্রুদের হস্তে নিহত হলে, তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা তাঁর মৃতদেহের চারদিকে বেষ্টন করে শোক করছিলেন। তাঁর রত্নময় কবচ বিশীর্ণ হয়েছিল এবং আভরণ ও মালা স্থানচ্যুত হয়েছিল, তাঁর কেশপাশ বিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং চক্ষুদ্বয় নিষ্প্রভ হয়েছিল, এইভাবে শত্রুর বাণের দ্বারা হৃদয় নির্ভিন্ন হয়ে নিহত সেই রাজার রুধিরাপ্লুত কলেবর যুদ্ধক্ষেত্রে শায়িত ছিল। মৃত্যুর সময় রাজা তাঁর বীরত্ব প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন এবং তার ফলে তিনি তাঁর অধর দংশন করেছিলেন এবং তাঁর দাঁত সেইভাবেই ছিল। তাঁর পদ্মের মতো সুন্দর মুখমণ্ডল এখন কালো হয়ে গেছে এবং তা যুদ্ধক্ষেত্রের ধুলায় ধূসরিত। তাঁর বাহু এবং অস্ত্রশস্ত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মহারাজ উশীনরের মহিষীরা তাঁদের স্বামীর মৃতদেহ দর্শন করে ক্রন্দন করতে করতে বলেছিলেন, ‘হে নাথ, তুমি নিহত হয়েছ, আমরাও হত হয়েছি।’ বার বার এইভাবে আক্ষেপ করে তাঁরা তাঁদের বক্ষে আঘাত করতে করতে তাঁর পায়ে পতিত হয়েছিলেন। মহিষীরা যখন উচ্চস্বরে ক্রন্দন করছিলেন, তখন তাঁদের অশ্রুধারা তাঁদের কুচ-কুমকুমে রঞ্জিত হয়ে তাঁদের পতিত পাদপদ্মে পতিত হয়েছিল। তাঁদের কেশপাশ বিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং অলঙ্কার খসে পড়েছিল। এইভাবে তাঁরা সকলের অন্তরে শোক উৎপাদন করে তাঁদের পতির মৃত্যুতে বিলাপ করেছিলেন। হে প্রভু, নিষ্ঠুর বিধাতা আপনাকে আমাদের চক্ষুর অগোচরে নিয়ে গেছে। পূর্বে আপনি উশীনর বাসীদের বৃত্তি প্রদান করে পালন করতেন এবং তার ফলে তারা সুখী ছিল, কিন্তু এখন আপনার এই অবস্থা তাদের শোকের কারণ হয়েছে। হে রাজন্, হে বীর, আপনি আমাদের অত্যন্ত কৃতজ্ঞ পতি এবং পরম সুহৃদ ছিলেন। আপনাকে ছাড়া আমরা কিভাবে প্রাণ ধারণ করব? হে বীর, আপনি যেখানে যাচ্ছেন আমাদেরও সেই স্থানে অনুগমন করতে আদেশ করুন। আমরা সেখানে গিয়ে আপনার পদদ্বয়ের সেবা করব। আমাদের আপনি আপনার সঙ্গে নিয়ে চলুন! যদিও মৃতদেহ দাহ করার জন্য সময় উপযুক্ত ছিল, কিন্তু মহিষীরা তা নিয়ে যেতে না দিয়ে, তাঁদের মৃত পতিকে কোলে করে বিলাপ করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে সূর্য পশ্চিম দিকে অস্তাচলে গমন করলেন। রানীরা যখন রাজার মৃত শরীরের জন্য বিলাপ করে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করছিলেন, তখন যমালয় থেকেও যমরাজ তা শুনতে পেয়েছিলেন। একটি বালকের রূপ ধারণ করে, যমরাজ স্বয়ং মৃত রাজার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে এসে এই উপদেশ দিয়েছিলেন।”
শ্রীযমরাজ বললেন- “আহা, কি আশ্চর্য! এরা যদিও আমার থেকে বয়সে অনেক বড়, এরা ভালভাবেই জানে যে, শত-সহস্র জীবদের জন্ম হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে। তাই তাদের বোঝা উচিত যে তাদেরও মৃত্যু হবে, কিন্তু তবুও তারা মোহাচ্ছন্ন। বদ্ধ জীবাত্মা এক অজ্ঞাত স্থান থেকে আসে এবং মৃত্যুর পর সেই অপরিচিত স্থানে পুনরায় ফিরে যায়। প্রকৃতির এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয় না। কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও এরা কেন বৃথা শোক করছে? এই বয়স্কা রমণীদের যে আমাদের মতো জ্ঞানও নেই তা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। আমরা অবশ্যই ভাগ্যবান, কারণ আমরা আমাদের পিতামাতা কর্তৃক পরিত্যক্ত অসহায় শিশু হলেও ব্যাঘ্র আদি হিংস্র পশুরা আমাদের খেয়ে ফেলেনি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, যিনি আমাদের মাতৃগর্ভে রক্ষা করেছিলেন, তিনিই সর্বত্র আমাদের রক্ষা করবেন।”
বালকটি সেই রমণীদের সম্বোধন করে বললেন- “হে অবলাগণ! অব্যয় পরমেশ্বরের ইচ্ছার দ্বারাই এই বিশ্ব সংসারের সৃষ্টি, পালন এবং সংহার হয়। এটিই বেদের বাণী। চরাচরাত্মক এই বিশ্ব ঠিক তাঁর খেলনার মতো। তিনি পরমেশ্বর, তাই সৃষ্টি ও সংসার উভয় কার্যেই তিনি পূর্ণরূপে সমর্থ। কখনও কখনও মানুষের ধন রাস্তায় যেখানে সকলে দেখতে পায় সেইখানে হারিয়ে গেলেও, ভাগ্যের ফলে রক্ষিত হয় এবং অন্য কেউ তা দেখতে পায় না। এইভাবে সে তার হারিযে যাওয়া ধন ফিরে পায়। পক্ষান্তরে, ভগবান যদি রক্ষা না করেন, তা হলে ঘরে অত্যন্ত সুন্দরভাবে রক্ষিত ধনও হারিয়ে যায়। ভগবান যদি রক্ষা করেন, তা হলে বনের মধ্যে অসহায় ব্যক্তিও জীবিত থাকে, আবার গৃহে আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারা অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যক্তিরও মৃত্যু হয় এবং কেউ তাকে রক্ষা করতে পারে না। প্রতিটি বদ্ধ জীবই তার কর্ম অনুসারে বিভিন্ন প্রকার দেহ প্রাপ্ত হয় এবং কর্ম সমাপ্ত হলে তার শরীরও বিনষ্ট হয়। আত্মা ঐ সমস্ত স্থূল এবং সূক্ষ্ম দেহে অবস্থিত হলেও দেহের ধর্মে যুক্ত হয় না; কারণ আত্মা দেহ থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। গৃহস্বামী যেমন গৃহ থেকে পৃথক হওয়া সত্ত্বেও তার গৃহটিকে তার থেকে অভিন্ন বলে মনে করে, তেমনই বদ্ধ জীব অজ্ঞানতাবশত তার শরীরটিকে তার আত্মা বলে মনে করে, যদিও প্রকৃতপক্ষে তার দেহটি তার আত্মা থেকে ভিন্ন। মাটি, জল এবং আগুনের অংশ থেকে জীব তার দেহ লাভ করে এবং যখন সেই মাটি, জল এবং আগুন কালক্রমে বিকার প্রাপ্ত হয়, তখন সেই দেহ বিনষ্ট হয়ে যায়। দেহের সৃষ্টি এবং বিনাশের সঙ্গে আত্মার কোন সম্পর্ক নেই। অগ্নি যেমন কাষ্ঠে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তা থেকে পৃথক্ বলে প্রতীত হয়, বায়ু যেমন মুখ এবং নাসিকার অভ্যন্তরে থাকলেও দেহ থেকে ভিন্ন বলে বোধ হয় এবং আকাশ যেমন সর্বগত হওয়া সত্ত্বেও কোন কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত হয় না, তেমনই জড় দেহের বন্ধনে আবদ্ধ জীব প্রকৃতপক্ষে জড় দেহের উৎস এবং তা থেকে পৃথক।”
“হে শোকার্তাগণ, তোমরা সকলেই নিতান্ত মূর্খ! সুযজ্ঞ নামক যে ব্যক্তির জন্য তোমরা শোক করছ, তিনি তো তোমাদের সম্মুখেই শায়িত রয়েছেন। অতএব তোমরা শোক করছ কেন? পূর্বে তিনি তোমাদের কথা শুনেছেন এবং তার উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু এখন তাঁকে না পেয়ে তোমরা শোক করছ। এই আচরণ তো অসঙ্গত, কারণ দেহ অভ্যন্তরস্থ যে ব্যক্তি তোমাদের কথা শ্রবণ করেছেন এবং উত্তর দিয়েছেন তাঁকে তো তোমরা কখনও দেখনি। অতএব তোমাদের শোক করার তো কোন কারণ নেই। কেননা যে দেহকে তোমরা সর্বদা দেখেছ, সেই দেহ তো এখানেই শায়িত রয়েছে। এই দেহে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রাণবায়ু, কিন্তু তাও শ্রোতা বা বক্তা নয়। প্রাণ থেকে শ্রেষ্ঠ যে আত্মা সেও স্বতন্ত্রভাবে কিছু করতে পারে না, কারণ পরমাত্মাই হচ্ছে প্রকৃত নির্দেশক, যিনি আত্মার সঙ্গে সহযোগিতা করেন। শরীরের কার্যকলাপ পরিচালনাকারী পরমাত্মা দেহ এবং প্রাণ থেকে ভিন্ন। পঞ্চভূত, দশেন্দ্রিয় এবং মনের সমন্বয়ে স্থূল এবং সূক্ষ্ম দেহের বিভিন্ন অংশ গঠিত হয়। জীব উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট তার এই সমস্ত জড় দেহের সংস্পর্শে আসে এবং পরে তার স্বীয় শক্তিবলে সেগুলিকে ত্যাগ করে। জীবের বিভিন্ন প্রকার শরীর লাভের ক্ষমতা থেকে এই বল উপলব্ধি করা যায়। আত্মা যতক্ষণ মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার সমন্বিত সূক্ষ্ম দেহের দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, ততক্ষণ সে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এই আবরণের ফলে আত্মা জড়া প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে এবং জন্ম-জন্মান্তরে অবিদ্যাবশত বিপর্যয়রূপ ক্লেশ ভোগ করে।”
“প্রকৃতির গুণ এবং তা থেকে উৎপন্ন তথাকথিত সুখ এবং দুঃখকে বাস্তব বস্তুরূপে দর্শন করা এবং ব্যাখ্যা করা নিষ্ফল। জাগ্রত অবস্থায় মন যখন বিচরণ করে এবং মানুষ নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, অথবা রাত্রে নিদ্রিত অবস্থায় সে যখন সুন্দরী রমণীকে সম্ভোগ করছে বলে দর্শন করে, তা সবই নিছক স্বপ্ন মাত্র। তেমনই, ইন্দ্রিয়জাত সুখ এবং দুঃখকে অর্থহীন বলে জানা উচিত। আত্মজ্ঞ ব্যক্তিরা আত্মাকে নিত্য এবং দেহকে অনিত্য বলে জানার ফলে, কখনও শোকের বশীভূত হন না। কিন্তু যারা স্বরূপ জ্ঞান রহিত, শোক করাই তাদের স্বভাব। তাই মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তিকে শিক্ষাদান করা অত্যন্ত কঠিন। এক সময়ে একটি ব্যাধ ছিল যে আহারের প্রলোভন দেখিয়ে পাখিদের তার জাল দিয়ে ধরত। সে যেন মৃত্যুর দ্বারা প্রেরিত পক্ষী-ঘাতকরূপে নিযুক্ত হয়েছিল। বনে বিচরণ করতে করতে সেই ব্যাধ একজোড়া কুলিঙ্গ পক্ষী দেখতে পেল। সেই পক্ষীযুগলের মধ্যে পক্ষিণী সেই ব্যাধ কর্তৃক প্রলুব্ধা হয়ে তার জালে আবদ্ধ হয়েছিল। হে সযজ্ঞের মহিষীগণ, কুলিঙ্গ তার ভার্যাকে বিধিবশে মহা বিপদগ্রস্ত দর্শন করে অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিল। সেই অসহায় পক্ষীটি তাকে মুক্ত করতে অসমর্থ হয়ে, স্নেহবশত দীনভাবে বিলাপ করতে লাগল। হায়, বিধাতা কি নির্দয়! আমার বিপন্না পত্নী অসহায় হয়ে আমার জন্য শোক করছে। এই দীন পক্ষীটিকে নিয়ে বিধিাতার কি লাভ হবে? তাঁর কি প্রয়োজন সিদ্ধ হবে? নির্দয় বিধাতা যদি আমার অর্ধ দেহরূপ ভার্যাকে নিয়ে যান, তবে তিনি আমাকেও নিয়ে যান না কেন? পত্নীর বিরহে দুঃখ-ভারাক্রান্ত অর্ধ দেহ নিয়ে জীবিত থেকে আমার কি লাভ? দুর্ভাগা মাতৃহীন পক্ষীশাবকগুলি কুলায়ে তাদের মা তাদের খেতে দেবে বলে প্রতীক্ষা করছে। তাদের এখনও পাখা গজায়নি। আমি কিভাবে তাদের পালন করব? তার পত্নীর বিয়োগে ব্যাকুল হয়ে কুলিঙ্গ পক্ষীটি অশ্রুপূর্ণ নয়নে বিলাপ করছিল, তখন সেই কাল প্রেরিত ব্যাধ গোপনে দূর থেকে সেই কুলিঙ্গ পক্ষীটিকে বাণে বিদ্ধ করে হত্যা করেছিল।”
বালকরূপী যমরাজ মহিষীদের বললেন- “তোমরা সকলে এতই মূর্খ যে, তোমরা নিজেদের মৃত্যুকেও দর্শন করতে পারছ না। অজ্ঞানতাবশত তোমরা বুঝতে পারছ না যে, তোমাদের পতির জন্য একশ বছর ধরে শোক করলেও তোমরা আর তাকে ফিরে পাবে না এবং ইতিমধ্যে তোমাদের আয়ুও শেষ হয়ে যাবে।”
হিরণ্যকশিপু বলল- “যমরাজ যখন বালকরূপে সুযজ্ঞের মৃতদেহকে ঘিরে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের এইভাবে উপদেশ দিয়েছিলেন, তখন তারা তার সেই দার্শনিক বাণী শ্রবণ করে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই জড় জগতে সব কিছুই অনিত্য এবং কোন কিছুই চিরকাল থাকবে না। সুযজ্ঞের মূর্খ আত্মীয়-স্বজনদের এইভাবে উপদেশ দিয়ে বালকরূপী যমরাজ সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। তখন রাজা সুযজ্ঞের আত্মীয়-স্বজনেরা রাজার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেছিল। অতএব তোমাদের দেহের জন্য শোক করা উচিত নয়- তা সে নিজেরই হোক বা পরেরই হোক। অজ্ঞানতাবশতই মানুষ “আমি কে? অন্যেরা কে? কি আমার? কি অন্যের?” এইভাবে দেহজনিত ভেদভাব সৃষ্টি করে।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “হিরণ্যকশিপু এবং হিরণ্যাক্ষের মাতা দিতি তাঁর পুত্রবধূ অর্থাৎ হিরণ্যাক্ষের পত্নী রুষাভানু সহ হিরণ্যকশিপুর সেই উপদেশ শ্রবণ করেছিলেন। তখন তিনি তাঁর পুত্রের মৃত্যুজনিত শোক বিস্মৃত হয়েছিলেন এবং জীবনের প্রকৃত দর্শনে মনোনিবেশ করেছিলেন।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits