মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন- “হে ব্রাহ্মণ, ভগবান শ্রীবিষ্ণু সকলের প্রতি সমদর্শী, সুহৃদ্ এবং পরম প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও কেন দেবরাজ ইন্দ্রের জন্য অসমদর্শীর মতো ইন্দ্রশত্রু দৈত্যদের বধ করেছিলেন? সর্বভূতে সমদর্শী ব্যক্তি কিভাবে কারও প্রতি পক্ষপাত এবং অন্য কারও প্রতি বৈরীভাব প্রদর্শন করতে পারেন? ভগবান শ্রীবিষ্ণু সাক্ষাৎ পরমানন্দ আত্মস্বরূপ। অতএব দেবতাদের পক্ষাপাতিত্ব করে তাঁর কি লাভ? তার ফলে তাঁর কোন্ স্বার্থ সিদ্ধ হবে? ভগবান যেহেতু নির্গুণ, তাই অসুরদের কাছ থেকে তাঁর ভয়ের কি কারণ থাকতে পারে? অতএব অসুরদের প্রতি তিনি বিদ্বেষ-পরায়ণ হলেন কেন? হে মহাভাগ, ভগবান নারায়ণ পক্ষাপাতপূর্ণ না নিরপেক্ষ সেই সম্বন্ধে আমার অত্যন্ত সংশয় জন্মেছে। দয়া করে, নারায়ণ যে সর্বদা নিরপেক্ষ এবং সকলের প্রতি সমদর্শী তা প্রমাণ করে আমার সেই সংশয় দূর করুন।”
মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ, আপনি অতি উত্তম প্রশ্ন করেছেন। ভগবানের কার্যকলাপের বর্ণনায় তাঁর ভক্তের মহিমাও কীর্তিত হয় এবং তা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক। এই অতি অদ্ভুত বিষয়টি সর্বদা সংসার-দুঃখ দূর করে। তাই নারদ আদি মহর্ষিরা সর্বদা শ্রীমদ্ভাগবত কীর্তন করেন, কারণ তার ফলে ভগবানের অতি অদ্ভুত চরিত্র শ্রবণ এবং কীর্তন করার সুযোগ লাভ হয়। মহর্ষি ব্যাসদেবকে প্রণাম করে আমি ভগবান শ্রীহরির কার্যকলাপ বর্ণনা করব।”
“ভগবান শ্রীবিষ্ণু সর্বদাই জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত এবং তাই তাঁকে বলা হয় নির্গুণ। যেহেতু তিনি অজ, তাই তাঁর রাগ এবং দ্বেষের দ্বারা প্রভাবিত জড় শরীর নেই। যদিও ভগবান সর্বদাই জড়াতীত, তবুও তাঁর স্বরূপ শক্তির প্রভাবে তিনি একজন সাধারণ মানুষের মতো আবির্ভূত হয়ে, আপাতদৃষ্টিতে একজন বদ্ধ জীবের মতো কর্তব্য এবং দায়িত্ব স্বীকার করেছেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ ! সত্ত্ব, রজ এবং তম- এই তিনটি গুণ জড়া প্রকৃতিজাত এবং সেগুলি ভগবান স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে না। এই তিনটি গুণ একই সময়ে হ্রাস অথবা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে কার্য করতে পারে না। যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি পায়, তখন ঋষি এবং দেবতারা সেই গুণের প্রভাবে প্রাধান্য লাভ করে এবং তাঁরা ভগবানের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। তেমনই যখন রজোগুণের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, তখন অসুরেরা উন্নতি সাধন করে এবং যখন তমোগুণের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, তখন যক্ষ এবং রাক্ষসেরা উন্নতি সাধন করে। ভগবান সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করে সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণের প্রতিক্রিয়াকে ফলপ্রসূ করেন। সর্বব্যাপ্ত ভগবান প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ উপলব্ধি করতে পারেন কিভাবে তিনি ন্যূনাধিকরূপে প্রকাশিত হন। ঠিক যেমন কাঠের মধ্যে অগ্নি, পাত্রের মধ্যে জল বা ঘটের মধ্যে আকাশ অনুভব করা যায়, তেমনই জীবের ভক্তিযুক্ত কার্যকলাপের মাত্রা অনুসারে বোঝা যায় যে কে অসুর এবং কে দেবতা। মানুষের কার্যকলাপ দর্শন করে, চিন্তাশীল ব্যক্তি বুঝতে পারেন কে কতটা ভগবানের কৃপা লাভ করতে পেরেছেন। ভগবান যখন জীবের চরিত্র এবং কার্য অনুসারে বিশেষ প্রকার শরীর প্রদান করার জন্য বিভিন্ন প্রকার শরীর সৃষ্টি করেন, তখ্ন তিনি সত্ত্ব, রজ এবং তম- প্রকৃতির এই তিনটি গুণকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তারপর পরমাত্মারূপে তিনি প্রতিটি শরীরে প্রবেশ করেন এবং রজোগুণের দ্বারা সৃষ্টি, সত্ত্বগুণের দ্বারা পালন এবং তমোগুণের দ্বারা সংহার করেন। হে মহারাজ, জড়া এবং পরা প্রকৃতির নিয়ন্তা ভগবান, যিনি সমগ্র জগতের স্রষ্টা, তিনি জড়া প্রকৃতি এবং জীবকে কালের সীমার মধ্যে সক্রিয় হওয়ার জন্য কালের সৃষ্টি করেন। ভগবানই প্রকৃতি এবং কালের স্রষ্টা, অতএব তিনি কখনও তাদের অধীন নন। হে রাজন্, এই কাল সত্ত্বগুণকে বর্ধিত করে। এইভাবে যদিও ভগবান পরম নিয়ন্তা, তিনি সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত দেবতাদের অনুগ্রহ করেন এবং তমোগুণ বিশিষ্ট অসুরদের সংহার করেন। ভগবান কালের দ্বারা বিভিন্নভাবে কার্য সম্পাদন করেন, কিন্তু তিনি কখনও পক্ষপাতিত্ব করেন না। পক্ষান্তরে তাঁর কার্যকলাপ মহিমান্বিত, তাই তাঁকে বলা হয় উরুশ্রবা। হে রাজন্, পূর্বে মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন রাজসূয় যজ্ঞ অনুষ্ঠান করছিলেন, তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর প্রশ্নের উত্তরে একটি ঐতিহাসিক তথ্য বর্ণনা করেছিলেন, যা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ভগবান সর্বদা নিরপেক্ষ, এমন কি যখন তিনি অসুরদের বধ করেন তখনও। হে রাজন্, পাণ্ডুপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞে শিশুপালকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দেহে লীন হয়ে যেতে দেখেছিলেন। তাই অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে, তিনি অন্যান্য ঋষিদের সমক্ষে যজ্ঞসভায় উপবিষ্ট দেবর্ষি নারদকে সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।”
মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করেছিলেন- “ভগবানের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও অসুর শিশুপাল যে ভগবানের দেহে লীন হয়েছিল তা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। মহান পরমার্থবাদীদের পক্ষেও এই সাযুজ্য মুক্তি দুর্লভ। তা হলে ভগবদ্বিদ্বেষী শিশুপাল তা লাভ করল কি করে? হে মহামুনি, ভগবানের এই কৃপার কারণ জানতে আমরা সকলে অত্যন্ত উৎসুক। আমি শুনেছি যে, পূর্বে বেন নামক এক রাজা ভগবানের নিন্দা করেছিল এবং তার ফলে সমস্ত ব্রাহ্মণেরা তাকে নরকে নিক্ষেপ করেছিলেন। শিশুপালেরও নরকে পতিত হওয়ার কথা ছিল। তা হলে সে ভগবানের দেহে লীন হল কি করে? দমঘোষের পুত্র পাপী শিশুপাল বাল্যকালের সেই অস্ফুট ভাষণ থেকে শুরু করে তার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন করে তাঁর নিন্দা করেছে। তেমনই তার ভ্রাতা দুর্মতি দন্তবক্রও চিরকাল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এই প্রকার দ্বেষ প্রদর্শন করেছে। যদিও শিশুপাল এবং দন্তবক্র বার বার অব্যয় পরমব্রহ্ম শ্রীবিষ্ণুর নিন্দা করেছে, তবুও তাদের জিহ্বায় শ্বেত কুষ্ঠ হয়নি এবং তারা অন্ধকার নরকে প্রবেশ করেনি। তাতে আমরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছি। অত্যন্ত দুর্লভ সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরীরে শিশুপাল এবং দন্তবক্র বহু মহান ব্যক্তিদের সমক্ষে অনায়াসে লীন হয়েছিল। তা কি করে সম্ভব হয়েছিল? এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। বায়ুর দ্বারা দীপশিখা যেভাবে অস্থির হয়, সেইভাবে আমার বুদ্ধি বিচলিত হয়েছে। হে নারদ মুনি, আপনি সর্বজ্ঞ, এই আশ্চর্য বিষয়ের কারণ কি? তা আপনি দয়া করে আমাকে বলুন?
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “যুধিষ্ঠির মহারাজের অনুরোধ শ্রবণ করে, সর্বজ্ঞ, পরম শক্তিশালী গুরুদেব শ্রীনারদ মুনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং সেই যজ্ঞে অংশগ্রহণকারী সকলের সমক্ষে উত্তর দিয়েছিলেন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে রাজন্, নিন্দা এবং প্রশংসা, অপমান এবং সম্মান অজ্ঞানের ফলে অনুভূত হয়। বহিরঙ্গা প্রকৃতির মাধ্যমে এই জড় জগতে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার জন্য ভগবান বদ্ধ জীবের শরীর সৃষ্টি করেছেন। হে রাজন্, বদ্ধ জীব দেহাভিমানের ফলে তার শরীরকে তার আত্মা বলে মনে করে এবং তার দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত বস্তুকে তার নিজের বলে মনে করে। তার এই ভ্রান্ত ধারণার ফলে, সে প্রশংসা এবং নিন্দা আদি দ্বৈত-ভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়। দেহাত্মবুদ্ধির ফলে, দেহের নাশ হলে বদ্ধ জীব মনে করে তারও নাশ হয়। ভগবান শ্রীবিষ্ণু পরম নিয়ন্তা এবং সমস্ত জীবের পরমাত্মা। যেহেতু তাঁর জড় শরীর নেই, তাই তাঁর ‘আমি’ এবং ‘আমার’, এই প্রকার ভ্রান্ত ধারণাও নেই। অতএব তিনি নিন্দা অথবা প্রশংসায় বিষণ্ন বা হরষিত হবেন বলে মনে করা ভুল। তাঁর পক্ষে এই দ্বৈতভাবের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া অসম্ভব। তাই কেউ তাঁর শত্রু নন অথবা বন্ধু নন। তিনি যখন অসুরদের দণ্ড দেন তা তাদের মঙ্গলেরই জন্য এবং যখন তিনি তাঁর ভক্তদের স্তুতি অঙ্গীকার করেন তাও তাঁদের মঙ্গলের জন্য। তিনি স্বয়ং নিন্দা বা প্রশংসার দ্বারা প্রভাবিত হন না। অতএব বৈরীভাব অথবা ভক্তিযোগ, ভয়, স্নেহ অথবা কাম- এর যে কোন একটি উপায়ের দ্বারা কোন না কোও ভাবে বদ্ধ জীব যদি তার মনকে ভগবানে একাগ্র করে তা হলে তার ফল একই হবে, কারণ ভগবান আনন্দময় হওয়ার ফলে শত্রুতা বা মিত্রতার দ্বারা তিনি কখনও প্রভাবিত হন না।’
“ভগবানের প্রতি বৈরাভাবাপন্ন হয়ে যেভাবে তাঁর চিন্তায় তন্ময় হওয়া যায়, ভক্তিযোগের দ্বারা তা লাভ করা যায় না। সেটিই আমার নিশ্চিত বিচার। ভ্রমর কর্তৃক দেয়ালের গর্তে অবরুদ্ধ হয়ে কীট যেমন ভয় এবং দ্বেষবশত কেবল ভ্রমরের স্মরণ করতে করতে ভ্রমর হয়ে যায়, তেমনই, বদ্ধ জীবেরা যদি কোন না কোনও মতে কেবল সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করেন, তা হলে তাঁরাও তাঁদের সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন। আরাধ্য ভগবানরূপেই হোক অথবা শত্রুভাবেই হোক, নিরন্তর তাঁর চিন্তা করার ফলে তাঁরা তাঁদের চিন্ময় দেহ প্রাপ্ত হবেন। বহু ব্যক্তি পাপকর্ম পরিত্যাগ করে গভীর মনোনিবেশ সহকারে কেবল শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করার ফলে মুক্তি লাভ করেছেন। এই মনোনিবেশ কাম থেকে, দ্বেষ থেকে, ভয় থেকে, স্নেহ থেকে, ভক্তি থেকে হয়ে থাকতে পারে। কেবর শ্রীকৃষ্ণে মনোনিবেশ করার ফলে যে কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ করা যায় তা এখন আমি বর্ণনা করব।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, গোপীগণ কামবশত, কংস ভয়বশত, শিশুপাল প্রভৃতি রাজাগণ শত্রুতাবশত, যদুগণ সম্বন্ধবশত, তোমরা পাণ্ডবগণ স্নেহবশত এবং আমরা ভক্তিবশত শ্রীকৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হয়েছি। কোন না কোন উপায়ে শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ গভীর নিষ্ঠা সহকারে চিন্তা করতে হয়। তারপর, পূর্বোল্লিখিত পাঁচটি পন্থার যে কোন একটির দ্বারা ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া সম্ভব। রাজা বেণের মতো নাস্তিকেরা কিন্তু একই পাঁচটি চিন্তার মধ্যে কোন একটির দ্বারাও শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করতে পারেনি, তাই তাদের মুক্তি লাভ হয়নি। অতএব যে কোন উপায়েই হোক, বন্ধুভাবেই হোক অথবা শত্রুভাবেই হোক, শ্রীকৃষ্ণে মনোনিবেশ করা কর্তব্য।”
“হে পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, তোমার মাতৃষ্বসার দুই পুত্র শিশুপাল এবং দন্তবক্র পূর্বে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দুইজন প্রধান পার্ষদ ছিলেন। ব্রাহ্মণের অভিশাপের ফলে তাঁরা বৈকুন্ঠ থেকে এই জড় জগতে পতিত হয়েছেন।”
“মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন- “কি প্রকার সেই মহা অভিশাপ, যা নিত্য মুক্ত বিষ্ণুভক্তদেরও অভিভূত করতে সমর্থ হয়েছিল এবং কে সেই শাপ দিয়েছিল? ভগবানের ঐকান্তিক ভক্তের এই জড় জগতে পুনরায় অধঃপতন তো অসম্ভব। তাই, সেই কথা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। বৈকুন্ঠবাসীদের দেহ সম্পূর্ণরূপে চিন্ময়। তাঁদের প্রাকৃত দেহ, ইন্দ্রিয় অথবা প্রাণের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। সুতরাং, তাঁরা কিভাবে অভিশপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের মতো প্রাকৃত দেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই কথা আপনি দয়া করে বলুন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “এক সময় ব্রহ্মার চার পুত্র সনক, সনন্দন, সনাতন এবং সনৎকুমার ত্রিভুবন পরিভ্রমণ করতে করতে ঘটনাক্রমে বিষ্ণুলোকে উপস্থিত হয়েছিলেন। যদিও সেই চারজন মহর্ষি মরীচি আদি ব্রহ্মার অন্যান্য পুত্রদের থেকেও জ্যেষ্ঠ ছিলেন, তবু তাঁরা ছিলেন উলঙ্গ ও দেখতে পাঁচ বা ছয় বছর বয়সের বালকের মতো। জয় এবং বিজয় নামক বৈকুন্ঠের দুই দ্বারপাল যখন দেখলেন যে, তাঁরা বৈকুন্ঠলোকে প্রবেশ করার চেষ্টা করছেন, তখন তাঁদের সাধারণ বালক বলে মনে করে, তাঁরা তাদের প্রবেশ করতে নিষেধ করলেন। এইভাবে জয় এবং বিজয় নামক দ্বারপালদের দ্বারা প্রতিহত হয়ে, সনন্দন আদি মহর্ষিগণ অত্যন্ত ক্রোধের সঙ্গে তাঁদের অভিশাপ দিলেন- “হে মূর্খ দ্বারপালদ্বয়, তোমরা রজ এবং তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত, তাই তোমরা নির্গুণ ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয়ে থাকার অযোগ্য। তোমরা এক্ষুণি জড় জগতে পাপিষ্ঠা আসুরী যোনিতে জন্মগ্রহণ কর।’ এইভাবে মহর্ষিদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে জড় এবং বিজয় যখন জড় জগতে পতিত হচ্ছিলেন, তখন তাঁদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ঋষিরা বলেছিলেন- ‘হে দ্বারপালগণ, তিন জন্মের পরে তোমরা আবার বৈকুন্ঠলোকে তোমাদের পদে ফিরে আসবে। তখন তোমাদের শাপের কাল সমাপ্ত হবে।’ ভগবানের এই দুই পার্ষদ জয় এবং বিজয় দিতির পুত্ররূপে এই জড় জগতে জন্মগ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে হিরণ্যকশিপু জ্যেষ্ঠ এবং হিরণ্যাক্ষ কনিষ্ঠ ছিল। তাঁরা দৈত্য এবং দানবদের দ্বারা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে পূজিত ছিল। ভগবান শ্রীহরি নৃসিংহদেব রূপে আবির্ভূত হয়ে হিরণ্যকশিপুকে সংহার করেছিলেন। ভগবান যখন বরাহরূপ ধারণ করে গর্ভোদক সমুদ্র থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, তখন হিরণ্যাক্ষ তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং ভগবান বরাহদেব তখন তাকে সংহার করেন। হিরণ্যকশিপু তার পুত্র বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে বধ করার জন্য তাঁকে নানাভাবে যাতনা দিয়েছিল। ভগবান সর্বভূতের পরমাত্মা, প্রশান্ত এবং সমদর্শী। মহান ভক্ত প্রহ্লাদ যেহেতু ভগবানের শক্তির দ্বারা সুরক্ষিত ছিলেন, তাই হিরণ্যকশিপু নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাঁকে বধ করতে পারেনি। তারপর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দুই দ্বারপাল জয় এবং বিজয় কেশিনীর গর্ভে বিশ্রবার পুত্ররূপে রাবণ এবং কুম্ভকর্ণরূপে জন্মগ্রহণ করেছিল। তারা ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত লোকের প্রবল দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়েছিল।”
“হে রাজন্, ব্রাহ্মণদের অভিশাপ থেকে জয় এবং বিজয়কে মুক্ত করতে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র রাবণ এবং কুম্ভকর্ণকে বধ করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। তুমি মার্কণ্ডেয় ঋষির মুখে শ্রীরামচন্দ্রের বলবীর্যের কাহিনী শ্রবণ করবে। জয় এবং বিজয় তাদের তৃতীয় জন্মে তোমার মাতৃষ্বসার পুত্ররূপে ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন-চক্রের আঘাতে তাদের সমস্ত পাপ বিনষ্ট হওয়ায় তারা এখন শাপমুক্ত হয়েছে। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর এই দুই পার্ষদ জয় এবং বিজয় দীর্ঘকাল ধরে ভগবানের প্রতি বৈরীভাব পোষণ করেছিলেন। এইভাবে নিরন্তর ভগবানের চিন্তা করার ফলে, তাঁরা পুনরায় ভগবানের আশ্রয় প্রাপ্ত হয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়েছিলেন।”
মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন- “হে প্রভু নারদ মুনি, প্রিয় পুত্র প্রহ্লাদ মহারাজের প্রতি হিরণ্যকশিপু কেন এই প্রকার বিদ্বেষী ছিলেন? প্রহ্লাদ মহারাজ কিভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই প্রকার মহান ভক্ত হয়েছিলেন? দয়া করে আপনি তা আমাকে বলুন।”
প্রথম অধ্যায়- ভগবান সকলের প্রতি সমদর্শী
12 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, সপ্তম স্কন্ধ- ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান