ঊনবিংশতি অধ্যায়- পুংসবন-ব্রত অনুষ্ঠান বিধি

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে প্রভু, আপনি যে পুংসবন-ব্রত সম্বন্ধে বলেছেন, সেই বিষয়ে আমি বিস্তারিতভাবে শুনতে চাই, কারণ আমি বুঝতে পেরেছি যে, এই ব্রত অনুষ্ঠানের ফলে ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে প্রসন্ন করা যায়।”
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “অগ্রহায়ণ মাসের শুক্ল পক্ষের প্রথম দিনে পতির আজ্ঞা অনুসারে স্ত্রী সর্বকামনা পূরণকারী এই ব্রত আরম্ভ করবেন। ব্রত আরম্ভের পূর্বে মরুৎদের জন্ম-বিবরণ শ্রবণ করবেন। তারপর ব্রাহ্মণদের জিজ্ঞাসা করে, দন্তধাবন-পূর্বক স্নান করে শুক্ল বস্ত্র পরিধান করবেন এবং অলঙ্কৃতা হয়ে প্রাতরাশের পূর্বে লক্ষ্মীদেবী সহ বিষ্ণুকে পূজা করবেন। (তারপর তিনি এইভাবে ভগবানের প্রার্থনা করবেন-) হে পূর্ণকাম, আপনি সর্ব ঐশ্বর্য সমন্বিত, কিন্তু আমি আপনার কাছে কোন ঐশ্বর্য প্রার্থনা করি না। আমি কেবল আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনি মহাবিভূতি স্বরূপিণী লক্ষ্মীদেবীর পতি। তাই আপনি সমস্ত সিদ্ধির ঈশ্বর। আমি কেবল আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, আপনি কৃপা, ঐশ্বর্য, তেজ, মহিমা, বল এবং অন্যান্য সমস্ত দিব্য গুণে বিভূষিত, তাই আপনি ভগবান ও সকলের প্রভু। (ভগবান বিষ্ণুকে উত্তমরূপে প্রণতি নিবেদন করবার পরে, ভক্ত লক্ষ্মীদেবীকে প্রণতি নিবেদন করে এইভাবে প্রার্থনা করবেন।) হে বিষ্ণুপত্নী, হে বিষ্ণুশক্তি স্বরূপিণী, আপনি বিষ্ণুরই তুল্য, কারণ আপনি তাঁরই সমান গুণ এবং ঐশ্বর্যশালিনী। হে লক্ষ্মীদেবী, দয়া করে আমার প্রতি প্রসন্ন হোন। হে জগন্মাতা, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। ‘হে ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান বিষ্ণু, আপনি পুরুষোত্তম এবং পরম শক্তিমান। হে লক্ষ্মীপতি, বিশ্বক্সেন আদি পার্ষদগণ সহ সর্বদা বিরাজমান আপনাকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আমি আপনাকে সমস্ত পূজোপহার সমর্পণ করি।’ প্রতিদিন সমাহিত চিত্তে এই মন্ত্রের দ্বারা পা ধোয়ার জল, হাত এবং মুখ ধোয়ার জল, স্নানের জল, বস্ত্র, উপবীত, অলঙ্কার, গন্ধ, পুষ্প, দীপ আদি উপহার নিবেদন করে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “উপরোক্ত উপচার সহকারে ভগবানের পূজা করার পর, ‘ওঁ নমো ভগবতে মহাপুরুষায় মহাবিভূতিপতয়ে স্বাহা’ এই মন্ত্রে অগ্নিতে দ্বাদশটি আহুতি প্রদান করবেন। যদি কেউ সমস্ত সম্পদ কামনা করেন, তা হলে তিনি প্রতিদিন ভক্তি সহকারে লক্ষ্মী ও নারায়ণের পূজা করবেন। উপরোক্ত মন্ত্রে পরম ভক্তি সহকারে তাঁর পূজা করা উচিত। লক্ষ্মী এবং নারায়ণ একত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী সংযোগ। তাঁরা সমস্ত বর প্রদান করেন এবং সমস্ত সৌভাগ্যের উৎস। তাই সকলের কর্তব্য লক্ষ্মী-নারায়ণের পূজা করা। ভক্তিনম্র বিত্তে ভূমিতে দণ্ডবৎ প্রণাম করে দশবার সেই জপ করতে হবে এবং তারপর নিম্নলিখিত স্তোত্রটি পাঠ করা উচিত।”
“হে নারায়ণ, হে লক্ষ্মী, আপনারা উভয়েই বিশ্বের অধিপতি এবং এই জগতের মূখ্য কারণ। লক্ষ্মীদেবীকে জানা অত্যন্ত কঠিন, কারণ তিনি এতই শক্তিশালিনী যে, তাঁর শক্তি অতিক্রম করা দুষ্কর। তিনি এই জড় জগতে বহিরঙ্গা শক্তিরূপে প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি সর্বদই ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি। হে ভগবান, আপনি প্রকৃতির অধীশ্বর এবং তাই আপনিই সাক্ষাৎ পরম পুরুষ। আপনি যজ্ঞমূর্তি। চিন্ময় কার্যকলাপের প্রতিমূর্তি লক্ষ্মীদেবী আপনার উপাসনার আদি রূপ, কিন্তু আপনি সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা। এই লক্ষ্মীদেবী সমস্ত চিন্ময় গুণের উৎস, আর আপনি গুণের প্রকাশক এবং ভোক্তা। প্রকৃতপক্ষে আপনিই সবকিছুর পরম ভোক্তা। আপনিই সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং লক্ষ্মীদেবী তাঁদের শরীর, ইন্দ্রয় এবং মনরূপা। তিনি নাম ও রূপযুক্তা এবং আপনি সেই নাম এবং রূপের আশ্রয় এবং তাঁদের প্রকাশের কারণ। আপনারা উভয়েই ত্রিলোকের বরদাতা এবং পরমেশ্বর, অতএব, হে উত্তমশ্লোক ভগবান, আপনার কৃপায় আমার মহান অভিলাষসমূহ পূর্ণ হোক।”
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে শ্রীনিবাস ও লক্ষ্মীদেবীকে প্রার্থনা নিবেদন করে, পূজার উপকরণ সরিয়ে আচমন দান করে, পুনরায় তাঁদের পূজা করবেন। তারপর ভক্তিবিনম্র চিত্তে পুনরায় লক্ষ্মী-নরায়ণের স্তব করবেন এবং যজ্ঞোচ্ছিষ্টের ঘ্রাণ গ্রহণ করে পুনরায় লক্ষ্মী সহ ভগবানের পূজা করবেন। ভগবানের প্রতিনিধিরূপে পতিকে প্রসাদ নিবেদনপূর্বক পত্নী থেকে ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে পূজা করবেন। পতিও তাঁর পত্নীর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে পারিবারিক কর্মে যুক্ত হবেন। পতি ও পত্নীর মধ্যে একজন এই ভক্তিপরায়ণ ব্রত অনুষ্ঠান করলেই যথেষ্ট। কারণ তাঁদের পরস্পরের প্রীতির সম্পর্কের ফলে, তাঁরা উভয়েই তার ফল ভোগ করতে পারবেন। তাই পত্নী যদি এই ব্রত অনুষ্ঠানে অসমর্থা হন, তা হলে পতি নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত অনুষ্ঠান করতে পারেন এবং পতিপরায়ণা পত্নী তা হলে তার ফলভোগী হবেন। ভগবদ্ভক্তি-পরায়ণ এই বিষ্ণুব্রত ধারণ করা উচিত এবং কখনও অন্য কোন কার্যবশত এই ব্রত থেকে বিচলিত হওয়া উচিত নয়। প্রসাদ, ফুলের মালা, চন্দন এবং অলঙ্কার আদির দ্বারা প্রতিদিন ব্রাহ্মণ এবং পতি-পুত্রবতী স্ত্রীদের পূজা করবেন। পত্নীর কর্তব্য অত্যন্ত ভক্তি সহকারে বিধিপূর্বক প্রত্যহ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পূজা করা। তারপর, বিষ্ণুকে স্বধামে স্থাপনপূর্বক তাঁকে নিবেদিত বস্তুর অগ্রভাগ অন্যদের মধ্যে বিতরণ করে স্বয়ং ভক্ষণ করবেন। তার ফলে পতি এবং পত্নী শুদ্ধ হবেন এবং তাঁদের সমস্ত অভিলাষ পূর্ণ হবে। সাধ্বী স্ত্রী এইভাবে এক বছর এই পূজাবিধি অনুষ্ঠান করবেন। এক বছর অতিক্রম হওয়ার পর, তিনি কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উপবাস করবেন। পরের দিন সকালে স্নান এবং আচমন করে পূর্ববৎ শ্রীকৃষ্ণের অর্চনা করার পর, গৃহ্যসূত্রে উক্ত পার্বণের পাকবিধান অনুসারে ঘৃতের সঙ্গে পক্ক পায়স দ্বারা পতি অগ্নিতে বারোটি আহুদি দেবেন। তারপর ব্রাহ্মণদের প্রসন্নতা বিধান করবেন। ব্রাহ্মণেরা যখন প্রীত হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করবেন, তখন তা মস্তক দ্বারা গ্রহণপূর্বক ভক্তি সহকারে অবনত মস্তকে তাঁদের প্রণাম করে, তাঁদের অনুমতি অনুসারে স্বয়ং প্রসাদ গ্রহণ করবেন। ভোজন করার পূর্বে পতি প্রথমে আচার্যকে সুখাসনে উপবেশন করিয়ে, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব সহ বাকসংযত হয়ে শ্রীগুরুদেবকে প্রসাদ নিবেদন করবেন। তারপর ঘৃতপক্ক পায়েসের অবশেস পত্নী ভোজন করবেন। এই যজ্ঞাবশেষ সৎপুত্র প্রদানকারী এবং সৌভাগ্যজনক। এই ব্রত যদি শাস্ত্রবিধি অনুসারে পালন করা হয়, তা হলে মানুষ এই জীবনেই ভগবানের কাছ থেকে বাঞ্ছিত অর্থ লাভ করতে পারে। এই ব্রত পালনকারিণী স্ত্রী নিশ্চিতভাবে সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য, পুত্র, দীর্ঘজীবী পতি, যশ, গৃহ ইত্যাদি লাভ করবে। অবিবাহিতা কন্যা যদি এই ব্রত পালন করে, তা হলে সে সমস্ত সদ্‌গুণযুক্ত পতি লাভ করতে পারে। অবীরা রমণী অর্থাৎ পতি-পুত্রহীনা রমণী যদি এই ব্রত পালন করেন, তা হলে তিনি বৈকুন্ঠলোকে উন্নীত হতে পারেন। মৃতবৎসা রমণী আয়ুষ্মান পুত্র লাভ করতে পারেন এবং বহু ধন ও সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন। দুর্ভাগা রমণী সৌভাগ্যবতী হতে পারেন এবং কুরূপা রমণী অত্যন্ত সুন্দরী হতে পারেন। এই ব্রত পালনের ফলে রোগী রোগমুক্ত হয়ে কর্মক্ষম দেহ লাভ করতে পারে। কেউ যদি পিতৃ এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে তর্পন করার সময়, বিশেষ করে শ্রাদ্ধের সময় এই আখ্যায়িকা পাঠ করেন, তা হলে দেবতা এবং পিতৃগণ তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁর সমস্ত বাসনা পূূর্ণ করেন। এই যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পর বিষ্ণু ও লক্ষ্মীদেবী যজ্ঞ অনুষ্ঠানকারীর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দিতি কিভাবে এই ব্রত অনুষ্ঠানপূর্বক পুণ্যবান পুত্র মরুৎদের লাভ করেছিলেন এবং সুখী হয়েছিলেন, তা আমি পূর্ণরূপে আপনার কাছে বর্ণনা করলাম। যতখানি বিস্তারিতভাবে সম্ভব আমি তা আপনার কাছে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits