অষ্টাদশ অধ্যায়- দেবরাজ ইন্দ্রকে বধ করার জন্য দিতির ব্রত

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “অদিতির দ্বাদশ পুত্রের মধ্যে পঞ্চম পুত্র সবিতার পত্নী পৃশ্নির গর্ভে সাবিত্রী, ব্যাহৃতি ও ত্রয়ী, এই তিন কন্যা এবং পাঁচজন মহাযজ্ঞ, অগ্নিহোত্র, পশু, সোম ও চাতুর্মাস্য নামক পুত্র সকলের জন্ম হয়। হে রাজন্, অদিতির ভগ নামক ষষ্ঠ পুত্রের পত্নী সিদ্ধির গর্ভে মহিমা, বিভু এবং প্রভু নামক তিন পুত্র এবং আশী নাম্নী এক অতি সুশীলা পরমা সুন্দরী কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। অদিতির সপ্তম পুত্র ধাতার কুহূ, সিনীবালী, রাকা ও অনুমতি নাম্নী চার পত্নী ছিলেন। তাঁরা যথাক্রমে সায়ম্, দর্শ, প্রাতঃ ও পূর্ণমাস নামক চার পুত্র প্রসব করেছিলেন। অদিতির অষ্টম পুত্র বিধাতার ক্রিয়া নাম্নী ভার্যার গর্ভে পুরীষ্য নামক পাঁচজন অগ্নিদেবের জন্ম হয়। অদিতির নবম পুত্র বরুণের পত্নীর নাম ছিল চর্ষণী। ব্রহ্মার পুত্র ভৃগু তাঁর গর্ভে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন। বরুণের বীর্যে একটি বল্মীক থেকে মহাযোগী বাল্মীকি জন্মগ্রহণ করেন। ভৃগু ও বাল্মীকি বরুণের বিশিষ্ট পুত্র, কিন্তু অগস্ত্য ও বসিষ্ঠ ঋষি ছিলেন মিত্র (অদিতির দশম পুত্র) এবং বরুণের সাধারণ পুত্র। স্বর্গের অপ্সরা উর্বশীকে দর্শন করে মিত্র এবং বরুণের বীর্ষ স্খলিত হলে, তাঁরা সেই বীর্য একটি কুম্ভের মধ্যে স্থাপন করেন। এই কুম্ভ থেকে অগস্ত্য এবং বসিষ্ঠ- এই দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তাই তাঁরা মিত্র এবং বরুণের সাধারণ পুত্র। মিত্র তাঁর পত্নী রেবতীর গর্ভে উৎসর্গ, অরিষ্ট এবং পিপ্পল নামক তিন পুত্র উৎপাদন করেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, অদিতির একাদশতম পুত্র দেবরাজ ইন্দ্রের পৌলোমী নাম্নী পত্নীর গর্ভে জয়ন্ত, ঋষভ, মীঢুষ- এই তিন পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন। সেই কথা আমরা শুনেছি। অনন্ত শক্তি সমন্বিত ভগবান তাঁর স্বীয় শক্তির প্রভাবে বামনরূপে অদিতির দ্বাদশতম পুত্র উরুক্রম নামে আবির্ভূত হন। তাঁর পত্নী কীর্তির গর্ভে বৃহৎশ্লোক নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। বৃহৎশ্লোকের সৌভগ আদি বহু পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। পরে (শ্রীমদ্ভাগবতের অষ্টম স্কন্ধে) আমি বর্ণনা করব উরুক্রম বা ভগবান বামনদেব কিভাবে মহর্ষি কশ্যপের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং কিভাবে তিন পদ-বিক্ষেপের দ্বারা তিনি ত্রিভুবন আচ্ছাদিত করেছিলেন। তাঁর অসাধারণ কার্যকলাপ, তাঁর গুণাবলী, তাঁর শক্তি এবং কিভাবে তিনি অদিতির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা আমি বর্ণনা করব। এখন আমি দিতির গর্ভজাত এবং কশ্যপের পুত্র দৈত্যদের সম্বন্ধে তোমার কাছে বর্ণনা করব। এই দৈত্যবংশে পরম ভাগবত প্রহ্লাদ মহারাজ এবং বলি মহারাজও আবির্ভূত হন। দিতির গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করার ফলে অসুরদের দৈত্য বলা হয়। প্রথমে দিতির গর্ভে হিরণকশিপু এবং হিরণ্যাক্ষ নামক দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। তারা উভয়েই অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং দৈত্য ও দানবদের দ্বারা পূজিত হয়েছিল। হিরণ্যকশিপুর পত্নীর নাম ছিল কয়াধু। তিনি ছিলেন জম্ভ দানবের কন্যা। তাঁর গর্ভে যথাক্রমে সংহ্লাদ, অনুহ্লাদ, হ্লাদ এবং প্রহ্লাদ নামক চার পুত্রের জন্ম হয়। এই চার পুত্রের ভগ্নীর নাম সিংহিকা। তার সঙ্গে বিপ্রচিৎ দানবের বিবাহ হয় এবং রাহু নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। রাহু যখন ছদ্মবেশ ধারণ করে দেবতাদের মধ্যে অমৃত পান করছিল, তভন ভগবান শ্রীহরি তার শিরশ্ছেদ করেন। সংহ্লাদের পত্নী কৃতির গর্ভে পঞ্চজন নামক পুত্রের জন্ম হয়। হ্লাদের পত্নী ধমনী। তার দুই পুত্রের নাম বাতাপি এবং ইল্বল। ইল্বল মেষরূপী বাতাপিকে পাক করে অতিথি অগস্ত্যকে ভোজন করতে দিয়েছিল। অনুহ্লাদের পত্নীর নাম সূর্যা। তার গর্ভে বাষ্কল এবং মহিষ নামক দুই পুত্রের জন্ম হয়। প্রহ্লাদের পুত্র বিরোচন, তাঁর পত্নী দেবীর গর্ভে বলি মহারাজের জন্ম হয়। তারপর বলি মহারাজ অশনার গর্ভে এক শত পুত্র উৎপাদন করেন। তাদের মধ্যে বাণ ছিল সর্বজ্যেষ্ঠ। বলি মহারাজের প্রশংসনীয় কার্যকলাপ পরে (অষ্টম স্কন্ধে) বর্ণিত হবে। বাণ শিবের আরাধনা করে তাঁর শ্রেষ্ঠ পার্ষদ্দের অন্যতম হয়েছিলেন। এখনও শিব বাণের রাজধানী রক্ষা করেন এবং সর্বদা তার পাশে থাকেন। ঊনপঞ্চাশজন মরুতেরাও দিতির পুত্র। তাঁরা অপুত্রক ছিলেন। দিতির পুত্র হওয়া সত্ত্বেও ইন্দ্র তাঁদের দেবত্ব দান করেছিলেন।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন- “হে গুরুদেব, সেই ঊনপঞ্চাশজন মরুৎ তাঁদের জন্মের ফলে নিশ্চয়ই আসুরিক-ভাবাপন্ন ছিল। দেবরাজ ইন্দ্র কেন তাঁদের অসুরভাব পরিত্যাগ করিয়ে দেবত্ব প্রদান করেছিলেন? তাঁরা কি কোন পুণ্যকর্ম অনুষ্ঠান করেছিলেন? হে ব্রাহ্মণ, আমি এবং আমার সঙ্গে এখানে উপস্থিত সমস্ত ঋষিরা এই বিষয়ে জানবার জন্য উৎসুক। অতএব, হে মহাত্মন্, দয়া করে আমাদের তার কারণ বিশ্লেষণ করুন।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “হে মহর্ষি শৌনক, মহারাজ পরীক্ষিতের শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ বচন শ্রবণপূর্বক সর্বজ্ঞ শ্রীল শুকদেব গোস্বামী সানন্দে তাঁর প্রশংসা করে উত্তর দিয়েছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইন্দ্রকে সাহায্য করার জন্যই ভগবান শ্রীবিষ্ণু হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু নামক দুই ভ্রাতাকে হত্যা করেছিলেন। তাদের মৃত্যুতে তাদের মাতা দিতি শোকপ্রদীপ্ত ক্রোধে প্রজ্বলিত হয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। ইন্দ্রিয়সুখ-পরায়ণ ইন্দ্র তাঁর দুই ভাই হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুকে বিষ্ণুর দ্বারা বধ করিয়েছে। অতএব ইন্দ্র অত্যন্ত নিষ্ঠুর, কঠিন হৃদয় এবং পাপিষ্ঠ। কবে আমি তাকে হত্যা করে সুখে নিদ্রা যাব? রাজা বা অধীশ্বর নামে খ্যাত ব্যক্তিদের দেহ মৃত্যুর পর কৃমি, বিষ্ঠা অথবা ভস্মে পরিণত হবে। সেই দেহ রক্ষার জন্য কেউ যদি হিংসা-পরায়ণ হয়ে অন্যদের হত্যা করে, সে কি জীবনের প্রকৃত স্বার্থ সম্বন্ধে অবগত? অবশ্যই নয়, কারণ জীব-হিংসার ফলে তাকে নিশ্চিতভাবে নরকে যেতে হবে।”
দিতি চিন্তা করেছিলেন- “ইন্দ্র মনে করে যে তার শরীর নিত্য এবং তার ফলে যে উচ্ছৃঙ্খল হয়েছে। তাই আমি এমন এক পুত্র কামনা করি যে ইন্দ্রের মদমত্ততা দূর করবে। সেই জন্য আমাকে কোন উপায় স্থির করতে হবে। এই ভেবে (ইন্দ্রহন্তা পুত্র কামনা করে), দিতি নিরন্তর তাঁর মনোহর আচরণের দ্বারা কশ্যপের প্রসন্নতা বিধান করতে লাগলেন। হে রাজন্, দিতি সর্বদা কশ্যপের সমস্ত বাসনা অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে পূর্ণ করতে লাগলেন। তাঁর সেবা, প্রেম, বিনয়, আত্মসংযম, মৃত্যুহাস্য এবং মনোমুগ্ধকর দৃষ্টিপাতের দ্বারা তাঁর পতির মন আকৃষ্ট করে তাঁকে তাঁর বশীভূত করেছিলেন। কশ্যপ যদিও ছিলেন অত্যন্ত বিদ্বান, তবু তিনি কপটাচার-নিপুণা স্ত্রীর শুশ্রূষায় মোহিত হয়ে তাঁর বশীভূত হয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর পত্নীকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তাঁর মনোবাঞ্ছা তিনি পূর্ণ করবেন। দিতির প্রতি তাঁর এই উক্তি কিছুই আশ্চর্যের বিষয় নয়। সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি ব্রহ্মা দেখেছিলেন যে, সমস্ত জীবেরা অনাসক্ত। তাই প্রজাবৃদ্ধির জন্য তিনি পুরুষের দেহের অর্ধাঙ্গ দিয়ে স্ত্রী সৃষ্টি করেছিলেন। সেই স্ত্রীদের দ্বারাই পুরুষের চিত্ত অপহৃত হয়। হে প্রিয়, অত্যন্ত শক্তিশালী ঋষি কশ্যপ তাঁর পত্নী দিতির মধুর আচরণে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, মৃদু হেসে বলেছিলেন- হে সুন্দরী, হে অনিন্দিতে, আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি, অতএব তুমি যে কোন বর প্রার্থনা করতে পার। পতি যদি প্রসন্ন হন, তা হলে স্ত্রীর ইহকালে অথবা পরকালে কোন্ কামনা দুর্লভ হতে পারে? নারীদের পতিই পরম দেবতা। লক্ষ্মীপতি ভগবান বাসুদেব যেমন সকলের অন্তঃকরণে অবস্থান করে ভিন্ন ভিন্ন নাম এবং রূপের দ্বারা বিভিন্ন দেবমূর্তিতে কর্মীদের পূজার পাত্র হন, তেমনই, সেই ভগবানই পতিরূপে স্ত্রীদের পূজার বিষয় হন। হে সুমধ্যমে, বিবেকবতী পত্নীর কর্তব্য পতিব্রতা হয়ে পতির আদেশ পালন করা। পতিকে বাসুদেবের প্রতিনিধিরূপে জেনে, পরম ভক্তি সহকারে পতির পূজা করাই স্ত্রীর কর্তব্য। হে ভদ্রে, যেহেতু তুমি আমাকে ভগবানের প্রতিনিধি বলে মনে করে পরম ভক্তি সহকারে পূজা করেছ, তাই আমি তোমার বাসনা পূর্ণ করে তোমাকে পুরস্কৃত করব, যা অসতী পত্নীদের পক্ষে দুর্লভ।”
দিতি উত্তর দিলেন- “হে মহাত্মা পতিদেব, আমি আমার পুত্রদের হারিয়েছি। আপনি যদি আমাকে বর দিতে চান, তা হলে এক অমর পুত্র প্রার্থনা করি, যে ইন্দ্রকে হত্যা করতে পারবে। কারণ বিষ্ণুর সাহায্যে ইন্দ্র আমার দুই পুত্র হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেছে। দিতির অনুরোধ শুনে কশ্যপ মুনি অত্যন্ত বিষণ্ন হয়ে অনুতাপ করেছিলেন, ‘আহা, আজ আমার ইন্দ্রহত্যারূপ মহা অধর্ম উপস্থিত হয়েছে।’ ”
কশ্যপ মুনি ভাবলেন- “হায়, আমি এখন জড় সুখের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়েছি। তাই আমার মন স্ত্রীরূপিনী ভগবানের মায়ার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছে। হতভাগ্য আমি নিশ্চয় নরকে পতিত হব। আমার এই পত্নী তার স্বভাব অনুসারেই উপায় উদ্ভাবন করেছে এবং তাই তাকে দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু আমি পুরুষ। তাই আমাকেই ধিক্! যেহেতু আমি অজিতেন্দ্রিয়, তাই আমার প্রকৃত হিত সম্বন্ধে আমি অনভিজ্ঞ। স্ত্রীলোকের মুখ শরৎকালের প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো সুন্দর, তাদের বাণী অত্যন্ত মধুর এবং তা কর্ণকে আনন্দ প্রদান করে, কিন্তু তাদের হৃদয় ক্ষুরধারার মতো তীক্ষ্ম, অতএব তাদের আচরণ কে বুঝতে পারে? স্ত্রীলোকেরা তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুরুষদের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করে যে, পুরুষেরা যেন তাদের সব চাইতে প্রিয়, কিন্তু কেউই তাদের প্রিয় নয়। মনে হয় যেন স্ত্রীলোকেরা অত্যন্ত সাধু প্রকৃতির, কিন্তু তাদের অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য তারা তাদের পতি, পুত্র অথবা ভ্রাতাকে পর্যন্ত হত্যা করতে পারে অথবা অন্যদের দিয়ে হত্যা করাতে পারে। আমি তাকে বরদান করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং তা উল্লঙ্ঘন করা যাবে না, কিন্তু ইন্দ্রের বিনাশও উচিত নয়। এই প্রসঙ্গে আমি যে উপায় স্থির করেছি, তাই উপযুক্ত।”
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরুনন্দন মহারাজ পরীক্ষিৎ, এইভাবে চিন্তা করে কশ্যপ মুনি কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেকে নিন্দা করে দিতিকে বলেছিলেন- হে ভদ্রে, তুমি যদি এক বছর ধরে আমার উপদিষ্ট এই ব্রত পালন কর, তা হলে তুমি অবশ্যই এক পুত্র লাভ করবে যে ইন্দ্রকে হত্যা করতে সক্ষম হবে। কিন্তু, এই বৈষ্ণবব্রত পালনে যদি তোমার কোন ত্রুটি হয়, তা হরে তুমি ইন্দ্রের পক্ষপাতী এক পুত্র লাভ করবে।”
দিতি বললেন- “হে ব্রহ্মন্, আমি অবশ্যই আপনার উপদেশ অনুসারে সেই ব্রত পালন করব। এখন আপনি আমাকে বলুন আমার কি করা কর্তব্য, কি করা অনুচিত এবং কি করলে ব্রত ভঙ্গ হবে না। দয়া করে আমাকে স্পষ্টভাবে সেই সমস্ত বলুন।”
কশ্যপ মুনি বললেন- “হে প্রিয়ে, এই ব্রত পালন করার সময় জীবহিংসা করো না, কাউকে অভিশাপ দিয়ো না, মিথ্যা কথা বলো না, নখ ও লোম কেটো না এবং খুলি ও অস্থি আদি অশুভ বস্তু স্পর্শ করো না।”
“হে ভদ্রে, কখনও জলের মধ্যে প্রবেশ করে স্নান করো না, কখনও ক্রুদ্ধ হয়ো না, দুর্জনের সঙ্গে সম্ভাষণ করো না, অধৌত বস্ত্র পরিধান করো না, পূর্বধৃত মালা কখনও পুনরায় ধারণ করো না। কখনও উচ্ছিষ্ট অন্ন ভোজন করবে না, ভদ্রকালী প্রভৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত অন্ন অথবা মাংস বা মাছযুক্ত অপবিত্র অন্ন, কিংবা শূদ্রের দ্বারা আনীত অন্ন অথবা রজঃস্বলা রমণীদৃষ্ট অন্ন ভোজন করবে না এবং অঞ্জলির দ্বারা জলপান করবে না। আহারের পর মুখ, হাত এবং পা না ধুয়ে, সন্ধ্যাবেলা কেশ মুক্ত করে, অলঙ্কার রহিত হয়ে, বাকসংযত না হয়ে এবং সর্বাঙ্গ আবৃত না করে কখনও বাইরে যাওয়া উচিত নয়। পা না ধুয়ে অথবা ভিজা পায়ে, উত্তর দিকে বা পশ্চিম দিকে মাথা রেখে অথবা অন্ন স্ত্রীলোকের সঙ্গে কিংবা নগ্ন অবস্থায়, অথবা সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় কখনও শয়ন করবে না। ধৌত বস্ত্র পরিধান করে, সর্বদা পবিত্র এবং হরিদ্রা-চন্দন আদি মঙ্গল দ্রব্যযুক্ত হয়ে, প্রাতঃরাশের পূর্বে গো, বিপ্র, লক্ষ্মী ও অচ্যুতের পূজা করবে। পতি-পুত্রবতী স্ত্রীদের মালা, চন্দন, উপহার ও অলঙ্কার দ্বারা পূজা করবে, আর পতিকে সম্যক্‌রূপে অর্চনা করে তার স্তব করবে এবং পতিকে গর্ভে অবস্থিত মনে করে ধ্যান করবে।”
“তুমি যদি এক বছর ধরে পুংসবন নামক এই ব্রত নির্বিঘ্নে শ্রদ্ধা সহকারে ধারণ করতে পার, তবে তোমার ইন্দ্রঘাতী একটি পুত্র উৎপন্ন হবে। কিন্তু এই ব্রত ধারণে যদি কোন বিঘ্ন হয়, তা হলে সেই পুত্র ইন্দ্রের বন্ধু হবে। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, কশ্যপের পত্নী দিতি পুংসবন নামক সংস্কার অনুষ্ঠান করতে সম্মত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ, আপনার উপদেশ অনুসারে আমি তাই করব।” তারপর তিনি প্রফুল্লচিত্তে কশ্যপ থেকে গর্ভ ধারণ করেছিলেন এবং যত্ন সহকারে ব্রত পালন করতে শুরু করেছিলেন। হে মানদ রাজন্, দিতির অভিপ্রায় ইন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাই তিনি নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য, আত্মরক্ষাই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ নিয়ম, এই নীতি অনুসারে দিতির ব্রত ভঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। এইভাবে তিনি স্বয়ং তার মাতৃষ্বসা আশ্রমবাসিনী দিতির সেবা করতে লাগলেন। ইন্দ্র প্রতিদিন বন থেকে ফুল, ফল, মূল, যজ্ঞকাষ্ঠ, কুশ, পত্র, অঙ্কুর, মৃত্তিকা ও জল ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে এসে তাঁর মাতৃষ্বসার সেবা করতে লাগলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মৃগহন্তা ব্যাধ যেমন মৃগচর্মের দ্বারা তার শরীর আচ্ছাদনপূর্বক মৃগরূপ ধারণ করে মৃগের সেবা করে, তেমনই ইন্দ্র অন্তরে দিতিপুত্রের শত্রু হওয়া সত্ত্বেও বাইরে বন্ধুভাব প্রদর্শন করে দিতির সেবা করেছিলেন। ইন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল দিতির ব্রত পালনে কোন ত্রুটি পাওয়া মাত্রই দিতিকে প্রতারণা করা। কিন্তু তিনি সেই ভাব গোপন রেখে, অত্যন্ত সাবধানতা সহকারে তাঁর সেবা করে যেতে লাগলেন।”
“হে মহীপতে, এইভাবে ইন্দ্র যখন দিতির ব্রত পালনে কোন ত্রুটি খুঁজে পেলেন না, তখন তিনি ভাবতে লাগলেন, “কিভাবে আমার মঙ্গল হবে?” এইভাবে তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়েছিলেন। কঠোর ব্রত পালন করার ফলে দুর্বল এবং ক্ষীণ হয়ে, দিতি এক সময় আহারের পর দুর্ভাগ্যবশত মুখ, হাত এবং পা না ধুয়ে সন্ধ্যাবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এই ছিদ্র পেয়ে (অণিমা, লঘিমা আদি) যোগসিদ্ধির অধীশ্বর ইন্দ্র যোগবলে গভীর নিদ্রায় অচেতন দিতির উদরে প্রবেশ করলেন। দিতির গর্ভে প্রবেশ করে ইন্দ্র স্বর্ণের মতো প্রভাবশালী সেই গর্ভকে বজ্রের দ্বারা সাত খণ্ডে কেটেছিলেন। সাতটি খণ্ডে সাতটি জীব রোদন করতে থাকলে, ইন্দ্র তাদের “রোদন করো না” বলে আশ্বাস দিয়ে পুনরায় প্রতিটি খণ্ডকে সাত ভাগে কেটেছিলেন। হে রাজন্, এইভাবে পীড়িত হয়ে তাঁরা কৃতাঞ্জলিপূর্বক ইন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘হে ইন্দ্র, আমরা মরুৎ, তোমারই ভ্রাতা, অতএব কেন তুমি আমাদের হত্যা করার চেষ্টা করছ?’ ইন্দ্র যখন দেখলেন যে, তাঁরা তাঁর অনুগত ভক্ত, তখন তিনি তাঁদের বললেন, ‘যদি তোমরা আমার ভ্রাতা হও, তা হলে তোমাদের আর কোন ভয় নেই।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, আপনি যেমন অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রের দ্বারা দগ্ধ হলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাতৃগর্ভে আপনাকে রক্ষা করেছিলেন, তেমনই দিতির গর্ভও ইন্দ্রের বজ্রের দ্বারা ঊনপঞ্চাশ ভাগে খণ্ড-বিখণ্ড হলেও শ্রীনিবাসের কৃপায় তা বিনষ্ট হয়নি। যে আদি পুরুষ ভগবানকে একবার মাত্র পূজা করলে জীব তাঁর সমান রূপতা লাভ করে, মহান ব্রতপরায়ণ হয়ে দিতি প্রায় এক বছর ধরে সেই ভগবানকে পূজা করেছিলেন। তার ফলে ঊনপঞ্চাশ মরুতের জন্ম হয়েছিল। পরমেশ্বর ভগবানের কৃপায় দিতির গর্ভে জন্ম হওয়া সত্ত্বেও মরুতেরা যে দেবতাদের সমকক্ষ হয়েছিলেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? ভগবানের আরাধনার করার ফলে দিতি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়েছিলেন। তিনি যখন শয্যা থেকে গাত্রোত্থান করলেন, তখন তিনি ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ঊনপঞ্চাশজন পুত্রকে দেখতে পেলেন। তাঁর সেই ঊনপঞ্চাশজন পুত্র অগ্নির মতো উজ্জ্বল এবং ইন্দ্রের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন; তা দেখে তিনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন।”
তারপর দিতি ইন্দ্রকে বলেছিলেন- “হে বৎস, তোমাদের দ্বাদশ আদিত্যদের বধ করার জন্য একটি পুত্র লাভের উদ্দেশ্যে আমি এই অতি দুষ্কর ব্রত পালন করেছিলাম। আমি কেবল এক পুত্র প্রার্থনা করেছিলাম, কিন্তু ঊনপঞ্চাশ জন পুত্র কিভাবে হল? হে বৎস ইন্দ্র, তুমি যদি তা জান, তা হলে সত্যি করে বল। মিথ্যা বলার চেষ্টা করো না।”
ইন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন- “হে মাতঃ, আমি স্বার্থান্ধ হয়ে ধর্মদৃষ্টি হারিয়েছিলাম। আমি যখন জানতে পেরেছিলাম যে আপনি মহান ব্রত পালন করছিলেন, তখন আমি আপনার ত্রুটি অন্বেষণ করছিলাম। সেই ত্রুটি পেয়ে আমি আপনার উদরে প্রবেশ করে গর্ভ ছেদন করেছি। প্রথমে আমি গর্ভস্থ শিশুটিকে সাত খণ্ডে কেটেছিলাম। তার ফলে সাতজন কুমার হয়। তারপর আমি এই প্রত্যেকটি শিশুকে সাত খণ্ডে আবার কাটি। কিন্তু ভগবানের কৃপায় তাদের কারও মৃত্যু হয়নি। হে মাতঃ আমি যখন ঊনপঞ্চাশটি পুত্রকেই জীবিত দেখলাম, তখন আমি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম। তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এটি নিশ্চয়ই আপনার ভক্তি সহকারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনার আনুষঙ্গিক ফল। যাঁরা কেবল ভগবানের আরাধনার অভিলাষী তাঁরা ভগবানের কাছ জড় বিষয় কামনা করেন না, এমন কি তাঁরা মুক্তিও কামনা করেন না, কিন্তু ভগবান তাঁদের সমস্ত বাসনা পূর্ণ করেন। সমস্ত অভিলাষের চরম লক্ষ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সেবক হওয়া। বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি পরম প্রিয ভগবানের সেবা করেন, যিনি তাঁর ভক্তের কাছে নিজেকে পর্যন্ত দান করেন, তা হলে যে জড় সুখ নরকেও লাভ হয়, তা কেন তিনি বাসনা করবেন?
“হে মহীয়সী মাতঃ আমি মূর্খ। দয়া করে আমার সমস্ত অপরাধ আপনি ক্ষমা করুন। আপনার ভগবদ্ভক্তির বলে আপনার ঊনপঞ্চাশজন পুত্রই অক্ষত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছে। শত্রুরূপে আমি তাদের খণ্ড খণ্ড করেছিলাম, কিন্তু আপনার মহান ভক্তির বলে তাদের মৃত্যু হয়নি।”
“শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইন্দ্রের এই উত্তম আচরণে দিতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। তারপর ইন্দ্র তাঁর মাতৃষ্বসাকে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে, তাঁর অনুমতিক্রমে ভ্রাতা মরুৎগণ সহ স্বর্গে গমন করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, আপনি আমাকে যা জিজ্ঞাসা করেছিলেন বিশেষ করে এই শুদ্ধ মরুৎদের সম্বন্ধে তা আমি যথাসাধ্য আপনার কাছে বর্ণনা করলাম। এখন আপনার আর কি প্রশ্ন আছে তা জিজ্ঞাসা করুন, তা হলে আমি তা বর্ণনা করব।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits