শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “যেদিকে ভগবান অনন্তদেব অন্তর্হিত হয়েছিলেন, সেই দিকে প্রণতি নিবেদন করে রাজা চিত্রকেতু বিদ্যাধর-পতিরূপে বিচরণ করতে শুরু করেছিলেন। মুনি, সিদ্ধ ও চারণদের দ্বারা সংস্তুত হয়ে মহাযোগী চিত্রকেতু লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভ্রমণ করতে লাগলেন। তাতে তাঁর বল ও ইন্দ্রিয অক্ষুণ্ন ছিল। তিনি বিবিধ যোগশক্তির সিদ্ধিস্থল সুমেরু পর্বতের উপত্যকায় ভ্রমণ করেছিলেন। সেখানে বিদ্যাধর-রমণীদের দ্বারা হরিনাম কীর্তন করিয়ে তিনি আনন্দ অনুভব করেছিলেন। এক সময় রাজা চিত্রকেতু যখন বিষ্ণু প্রদত্ত দীপ্তিমান বিমানে অন্তরীক্ষে বিচরণ করছিলেন, তখন তিনি সিদ্ধ এবং চারণগণ পরিবেষ্টিত মহাদেবকে দর্শন করেছিলেন। মহাদেব মহর্ষিদের সভায় পার্বতীকে অঙ্কে ধারণ করে তাঁর বাহুর দ্বারা তাঁকে আলিঙ্গন করে ছিলেন। তা দেখে চিত্রকেতু উচ্চস্বরে হাস্য করে যাতে পার্বতীর শ্রুতিগোচর হয়, এইভাবে বলেছিলেন- মহাদেব সাক্ষাৎ লোকগুরু, দেহধারী জীবদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও ধর্মের বক্তা। কিন্তু কী আশ্চর্য, তিনি মহর্ষিদের সভায় তাঁর ভার্যা পার্বতীকে আলিঙ্গন করে অবস্থান করছেন! জটাধারী মহা-তপস্বী শিব ব্রহ্মবাদী ঋষিদের সভার সভাপতি, অথচ তিনি একজন নির্লজ্জ সাধারণ মানুষের মতো তাঁর স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে সভার মধ্যে অবস্থান করছেন। সাধারণ মানুষেরাও নির্জন স্থানে তাদের পত্নীকে আলিঙ্গন করে তাদের সঙ্গসুখ উপভোগ করে। কিন্তু মহাদেব মহা-তপস্বী হওয়া সত্ত্বেও মহর্ষিদের সভায় তাঁর পত্নীকে আলিঙ্গন করছেন, এটি বড় আশ্চর্যের বিষয়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, চিত্রকেতুর উক্তি শ্রবণ করে, অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন মহাদেব ঈষৎ হেসে নীরব রইলেন এবং তাঁর অনুচর সভাসদেরাও কিছু না বলে তাঁর অনুসরণ করলেন। শিব এবং পার্বতীর প্রভাব সম্বন্ধে অজ্ঞ চিত্রকেতু কঠোর বাক্যে তাঁদের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর উক্তি মোটেই শ্রুতিমধুর ছিল না এবং তাই পার্বতী দেবী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে সেই জিতাত্মা-অভিমানী চিত্রকেতুকে বলেছিলেন, ‘আহা, এই ভুঁইফোড় ব্যক্তি এখন আমাদের মতো নির্লজ্জ ব্যক্তিদের দণ্ডদাতার পদ প্রাপ্ত হয়েছে নাকি? এ কি শাসনকর্তা রূপে দণ্ডধারী হয়েছে? এ কি সব কিছুর একমাত্র প্রভু? আহা, পদ্মযোনি ব্রহ্মা, ভৃগু, নারদ, সনৎকুমার প্রমুখ চতুঃসন, এঁদের কারোরই ধর্মজ্ঞান নেই। মনু এবং কপিলও ধর্মতত্ত্ব ভুলে গেছেন। আমার মন হয় সেই জন্যই তাঁরা দেবাদিদেব মহাদেবকে এই প্রকার অশোভন আচরণ থেকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেননি। এই ক্ষত্রিয়াধম চিত্রকেতু ধৃষ্টতাপূর্বক ব্রহ্মা আদি দেবতাদেরও অতিক্রম করে, তাঁরা যাঁর চরণকমল-যুগল ধ্যান করেন, সেই জগদ্পূজ্য পরম ধর্মমূর্তি শিবকে শাসন করেছে, অতএব তাকে অবশ্যই দণ্ড দেওয়া উচিত। এই ব্যক্তি তার সাফল্যের গর্বে গর্বিত হয়ে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করছে। সে সাধুদের দ্বারা পূজিত ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় লাভের অযোগ্য, কারণ সে দুর্বিনীত এবং অহঙ্কারে মত্ত। হে উদ্ধত পুত্র, এখন তুমি পাপপূর্ণ অসুরকুলে জন্মগ্রহণ কর, যাতে ভবিষ্যতে আর এই সংসারে সাধুদের প্রতি এই প্রকার অপরাধ না কর।’ ”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, এইভাবে পার্বতী কর্তৃক অভিশপ্ত হয়ে মহারাজ চিত্রকেতু তাঁর বিমান থেকে অবতরণ করে অত্যন্ত বিনীতভাবে পার্বতীকে প্রণাম করেছিলেন এবং তার ফলে পাবর্তী দেবী পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।”
চিত্রকেতু বললেন- “হে মাতঃ, আপনি যে আমাকে অভিশাপ প্রদান করলেন, তা আমি আমার অঞ্জলির দ্বারা গ্রহণ করছি। এই অভিশাপে আমি বিচলিত নই, কারণ মানুষকে তার পূর্বজন্মের কর্মফল অনুসারে দেবতারা সুখ বা দুঃখ প্রদান করেন। অবিদ্যার প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন জীব সংসাররূপ অরণ্যে, তার পূর্বকৃত কর্মের ফলে সর্বত্র সর্বদা সুখ এবং দুঃখ ভোগ করে। (অতএব, হে মাতঃ, এই শাপ প্রদান সম্বন্ধে আমার বা আপনার কোন দোষ নেই।) এই সংসারে স্বয়ং বা শত্রু-মিত্র প্রভৃতি অন্য কেউই সুখ-দুঃখের কর্তা নয়। কিন্তু যারা অজ্ঞ তারা নিজেকে এবং অন্যকে এই সুখ-দুঃখের কর্তা বলে মনে করে। এই সংসার মায়াময় গুণপ্রবাহ-স্বরূপ। সুতরাং শাপই বা কি আর অনুগ্রহই বা কি? স্বর্গই বা কি আর নরকই বা কি? প্রকৃত সুখই বা কি আর দুঃখই বা কি? কারণ তরঙ্গের মতো সেগুলি নিয়ত প্রবহমান। তাদের কোন বাস্তবিক সত্তা নেই। পরমেশ্বর ভগবান এক। জড়া প্রকৃতির পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তিনি তাঁর মায়ার দ্বারা প্রাণীদের সৃষ্টি করেন। মায়ার দ্বারা কলুষিত হওয়ার ফলে তারা অজ্ঞানাচ্ছন্ন হয় এবং বিভিন্ন প্রকার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কখনও কখনও জ্ঞানের প্রভাবে জীব মুক্ত হয়। সত্ত্বগুণে তারা সুখভোগ করে এবং রজোগুণে দুঃখভোগ করে। পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের প্রতি সমদৃষ্টি-সম্পন্ন। তাই কেউই তাঁর প্রিয় বা অপ্রিয়, জ্ঞাতি বা বন্ধু এবং পর বা আত্মীয় নয়। জড়া প্রকৃতির প্রতি আসক্তি-রহিত হওয়ার ফলে তাঁর তথাকথিত সুখের প্রতি অনুরাগ অথবা দুঃখের প্রতি রোষ নেই। সুখ এবং দুঃখ উভয়ই আপেক্ষিক। ভগবান যেহেতু সর্বদা আনন্দময়, তাই তাঁর দুঃখের কোন প্রশ্নই উঠে না। ভগবান যদিও আমাদের কর্মফল অনুসারে প্রাপ্ত সুখ-দুঃখের প্রতি অনাসক্ত এবং যদিও কেউই তাঁর শত্রু নয় অথবা বন্ধু নয়, তবু তিনি তাঁর মায়াশক্তির দ্বারা পাপ-পুণ্য প্রভৃতি কর্ম সৃষ্টি করে সুখ এবং দুঃখ, মঙ্গল এবং অমঙ্গল, বন্ধন এবং মুক্তি, জন্ম এবং মৃত্যুরূপ সংসারের কারণ হন। হে মাতঃ, আপনি আমার প্রতি অনর্থক ক্রুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু যেহেতু আমার সমস্ত সুখ এবং দুঃখ আমার পূর্বকৃত কর্মের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে, তাই আমি শাপমুক্তির জন্য আপনার কাছে অনুরোধ করছি না। আমার বাক্য সঙ্গত হলেও আপনি যে তা অসঙ্গত বলে মনে করছেন, সেই জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে অরিনিসূদন মহারাজ পরীক্ষিৎ, শিব এবং পার্বতীকে সন্তুষ্ট করে চিত্রকেতু তাঁর বিমানে আরোহনপূর্বক তাঁদের সমক্ষে সেখান থেকে চলে গেলেন। শিব এবং পার্বতী যখন দেখলেন যে, শাপ শ্রবণ করা সত্ত্বেও চিত্রকেতু ভীত হলেন না, তখন তাঁর আচরণে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাঁরা হেসেছিলেন। তারপর, দেবর্ষি নারদ, দৈত্য, সিদ্ধ এবং পার্ষদদের সমক্ষে পরম শক্তিমান শিব তাঁর পত্নী পার্বতীকে বলেছিলেন, ‘হে সুন্দরী পার্বতী, তুমি বৈষ্ণবের মাহাত্ম্য দর্শন করলে তো? ভগবান শ্রীহরির দাসানুদাস হওয়ার ফলে তাঁরা যথার্থ মহাত্মা এবং তাঁরা বিষয়সুখে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। ভগবান নারায়ণের সেবায় সর্বতোভাবে যুক্ত ভক্তেরা কখনও জীবনের কোন অবস্থা থেকেই ভীত হন না। তাঁদের কাছে স্বর্গ, মুক্তি এবং নরক সমান, কারণ এই প্রকার ভক্তেরা কেবল ভগবানের সেবাতেই আগ্রহশীল। ভগবানের মায়ার প্রভাবেই জীব জড় দেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, অভিশাপ-অনুগ্রহ, এই সমস্ত দ্বন্দ্বভাব জড় জগতের সঙ্গে সংস্পর্শের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ভ্রান্তিবশত যেমন একটি ফুলের মালাকে সর্প বলে মনে হয়, অথবা স্বপ্নে সুখ-দুঃখের অনুভব হয়, তেমনই, এই জড় জগতে অবিবেক-বশত সুখ এবং দুঃখকে ভাল এবং মন্দ বলে মনে করে তাদের মধ্যে পার্থক্য দর্শন করা হয়। যাঁরা ভক্তি সহকারে ভগবান শ্রীবাসুদেবের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই পূর্ণজ্ঞান লাভ করেন এবং এই জড় জগতের প্রতি বিরক্ত হন। তাই তাঁরা এই জগতের তথাকথিত সুখ বা দুঃখের প্রতি আগ্রহশীল হন না। আমি (শিব), ব্রহ্মা, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, নারদ আদি ব্রহ্মার পুত্র, ঋষিগণ এবং দেবতারা তাঁর অংশের অংশ হলেও, আমরা যদি স্বতন্ত্র ঈশ্বরাভিমান করি, তা হলে তাঁর স্বরূপ বুঝতে সমর্থ হব না। তিনি কাউকেই প্রিয় বা অপ্রিয় বলে মনে করেন না। কেউই তাঁর আপন বা পর নয়। তিনি প্রকৃতপক্ষে সমস্ত জীবের আত্মার আত্মা। তাই তিনি সমস্ত জীবের মঙ্গলময় বন্ধু এবং তাঁদের সকলের অত্যন্ত প্রিয়। এই উচারচিত্ত চিত্রকেতু ভগবানের অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত। তিনি সমস্ত জীবের প্রতি সমদর্শী এবং রাগ-দ্বেষশূন্য। তেমনই, আমিও ভগবান নারায়ণের অত্যন্ত প্রিয়। অতএব, এই সমস্ত মহাত্মা মহাপুরুষ, ভক্ত, রাগ-দ্বেষ রহিত, সর্বভূতে সমদর্শী পুরুষের কার্য দর্শন করে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, পতির বাক্য শ্রবণপূর্বক দেবী উমা চিত্রকেতুর আচরণে বিস্ময় পরিত্যাগ করে তাঁর বুদ্ধি স্থির করেছিলেন। পরম ভক্ত চিত্রকেতু পার্বতী দেবীক প্রতিশাপ দিতে সমর্থ হলেও তা দেননি; পক্ষান্তরে তিনি দেবী প্রদত্ত শাপই অবনত মস্তকে স্বীকার করেছিলেন এবং শিব ও পার্বতীকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। এটিই বৈষ্ণবের লক্ষণ বলে বুঝতে হবে। দুর্গামাতা (শিবপত্নী ভবানী) কর্তৃক অভিশপ্ত হয়ে, সেই চিত্রকেতুই অসুরযোনিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দিব্যজ্ঞান ও জীবনে তার ব্যবহারিক প্রয়োগে সংযুক্ত হয়েই তিনি ত্বষ্টার অনুষ্ঠিত যজ্ঞাগ্নি থেকে এক অসুর রূপে আবির্ভূত হন এবং তাই তিনি বৃত্রাসুর নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, আপনি যে মহান ভগবদ্ভক্ত বৃত্রের অসুর যোনি জন্মগ্রহণের কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তা আমি পূর্ণরূপে আপনাকে বলার চেষ্টা করেছি। চিত্রকেতু ছিলেন একজন মহান ভক্ত (মহাত্মা)। কেউ যদি শুদ্ধ ভক্তের শ্রীমুখ থেকে চিত্রকেতুর এই ইতিহাস শ্রবণ করেন, তা হলে তিনি সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত হন। যিনি প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করে তাঁর বাণী এবং মন সংযত করেন এবং ভগবানকে স্মরণ করে চিত্রকেতুর এই ইতিহাস পাঠ করেন, তিনি অনায়াসে ভগবদ্ধামে ফিরে যাবেন।”
সপ্তদশ অধ্যায়- চিত্রকেতুর প্রতি পার্বতীর অভিশাপ
06 Jan 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম