পঞ্চম অধ্যায়- হিরণ্যকশিপুর মহান পুত্র প্রহ্লাদ

দেবর্ষি নারদ বললেন- “হিরণ্যকশিপু আদি অসুরেরা শুক্রাচার্যকে আনুষ্ঠানিক কার্যকলাপ সম্পাদন করার জন্য পৌরোহিত্যে বরণ করেছিল। শুক্রাচার্যের দুই পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক হিরণ্যকশিপুর গৃহের নিকটে বাস করত। প্রহ্লাদ মহারাজ পূর্বেই ভগবদ্ভক্তির শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর পিতা যখন শিক্ষা লাভের জন্য তাঁকে শুক্রাচার্যের দুই পুত্রের কাছে প্রেরণ করলেন, তখন তারা প্রহ্লাদকে তাদের পাঠশালায় অন্য অসুর-বালকদের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। শিক্ষকেরা রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে যে শিক্ষাদান করেছিল, প্রহ্লাদ অবশ্যই তা শ্রবণ করেছিলেন এবং পাঠ করেছিলেন, কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনীতিতে কাউকে বন্ধু এবং কাউকে শত্রু বলে বিবেচনা করা হয় এবং তা তিনি ভাল বলে মনে করেননি। হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, এক সময় দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু তার পুত্র প্রহ্লাদকে কোলে করে অত্যন্ত স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করেছিল- হে বৎস, তোমার শিক্ষকদের কাছে তুমি যে সমস্ত বিষয় পাঠ করেছ, তার মধ্যে কোন্ বিষয়টি তুমি শ্রেষ্ঠ বলে মনে কর, তা আমাকে বল।”
প্রহ্লাদ মহারাজ উত্তর দিলেন- “হে অসুরশ্রেষ্ঠ দৈত্যরাজ, আমার গুরুদেবের কাছে আমি জেনেছি যে, যারা তাদের অনিত্য দেহকে কেন্দ্র করে গৃহব্রতের জীবন যাপন করে, তারা জলশূণ্য অন্ধকূপে অবশ্যই দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে কেবল উদ্বেগ প্রাপ্ত হয়। মানুষের কর্তব্য সেই পরিস্থিতি পরিত্যাগ করে বনে গমন করা, বিশেষ করে বৃন্দাবনে এবং সেখানে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা অবলম্বন করে পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করা।”
নারদ মুনি বললেন- “প্রহ্লাদ মহারাজ যখন ভগবদ্ভক্তিরূপ আত্ম-উপলব্ধির পন্থা সম্বন্ধে বললেন, তখন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদের মুখে শত্রুপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বাক্য শ্রবণ করে হেসে বলেছিলেন, ‘বালকদের বুদ্ধি এইভাবেই শত্রুর বাণীর দ্বারা বিপর্যস্ত হয়।’ হিরণ্যকশিপু তার অনুচরদের আদেশ দিয়েছিল- হে দৈত্যগণ, তোমরা এই বালককে গুরুকুলে এমনভাবে রক্ষা কর, যাতে ছদ্মবেশী বৈষ্ণবেরা আর তার বুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে না পারে। হিরণ্যকশিপুর ভৃত্যেরা যখন প্রহ্লাদকে গুরুকুলে নিয়ে এসেছিল, তখন দৈত্যদের পুরোহিত ষণ্ড এবং অমর্ক তাঁকে প্রশংসাসূচক প্রেমময় কোমল বচনে জিজ্ঞাসা করেছিল। হে বৎস প্রহ্লাদ, তোমার মঙ্গল হোক। তুমি সত্য কথা বল, মিথ্যা বল না। এই সমস্ত বালকেরা তোমার মতো নয়, কারণ তারা তোমার মতো বিপরীতি বাণী বলছে না। এই শিক্ষা তুমি কিভাবে পেয়েছ? তোমার বুদ্ধি এইভাবে বিপর্যস্ত হল কি করে? হে কুলশ্রেষ্ঠ, তোমার এই বুদ্ধির বিপর্যয় তোমার নিজের দ্বারা হয়েছে, না শত্রুদের দ্বারা? আমরা তোমার গুরু এবং সেই কথা জানতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। আমাদের কাছে তুমি সত্যি কথা বল।”
প্রহ্লাদ মহারাজ উত্তর দিলেন- “যাঁর মায়া মানুষের বুদ্ধিকে বিমোহিত করে ‘আমার বন্ধু’ এবং ‘আমার শত্রু’ এই ভেদভাব সৃষ্টি করায়, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। যদিও আমি এই বিষয়ে পূর্বে প্রামাণিক সূত্রে শ্রবণ করেছি, কিন্তু এখন আমি তা বাস্তবিক উপলব্ধি করছি। ভগবান যখন কোন জীবের প্রতি তাঁর ভক্তির ফলে প্রসন্ন হন তখন তিনি পণ্ডিত হন এবং শত্রু, মিত্র ও নিজের মধ্যে কোন ভেদ দর্শন করেন না। তখন তিনি বুদ্ধিমত্তা সহকারে মনে করেন, ‘আমরা সকলেই ভগবানের নিত্যদাস এবং তাই আমরা পরস্পরের থেকে ভিন্ন নই।’ যারা সর্বদা ‘শত্রু’ এবং ‘মিত্র’ এর পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করে, তারা তাদের অন্তরে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের কি কথা, এমন কি ব্রহ্মার মতো বৈদিক শাস্ত্রবেত্তা মহান ব্যক্তিও কখনও কখনও ভগবদ্ভক্তির সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে গিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এই প্রকার পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যে ভগবান তিনি নিশ্চয়ই আমাকে আপনাদের তথাকথিত শত্রুর পক্ষ অবলম্বন করার বুদ্ধি প্রদান করেছেন। হে ব্রাহ্মণগণ (অধ্যাপকগণ), লোহা যেমন চুম্বকের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে আপনা থেকেই চুম্বকের প্রতি ধাবিত হয়, তেমনই আমার চেতনা ভগবান বিষ্ণুর দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে চক্রপাণির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তাই আমার আর কোন স্বাতন্ত্র্য নেই।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “শুক্রাচার্যের দুই পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ককে এই কথা বলে মহাত্মা প্রহ্লাদ মহারাজ নীরব হলেন। সেই তথাকথিত ব্রাহ্মণেরা তখন তাঁর প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিল। যেহেতু তারা ছিলেন হিরণ্যকশিপুর সেবক, তাই তারা অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিল এবং প্রহ্লাদ মহারাজকে তিরস্কার করে তারা বলেছিল- ওরে, বেত নিয়ে আয়! এই প্রহ্লাদ আমাদের অপযশের কারণ। তার দুর্বুদ্ধির ফলে সে দৈত্যকুলের অঙ্গারে পরিণত হয়েছে। তখন রাজনীতির চারটি নীতির চতুর্থটির দ্বারা একে শায়েস্তা করতে হবে। এই দুষ্ট প্রহ্লাদ দৈত্যবংশরূপ চন্দনবনে কন্টক বৃক্ষরূপে জন্মগ্রহণ করেছে। চন্দন বৃক্ষ ছেদন করার জন্য কুঠারের প্রয়োজন হয় এবং কন্টক বৃক্ষের কাঠ কুঠারের সংশ্লিষ্ট দণ্ডের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। দৈত্যবংশরূপ চন্দনবৃক্ষ ছেদনকারী কুঠার হচ্ছেন বিষ্ণু, আর এই প্রহ্লাদ হচ্ছে সেই কুঠারের সংশ্লিষ্ট দণ্ড।”
“প্রহ্লাদ মহারাজের শিক্ষক ষণ্ড এবং অমর্ক তর্জন, তিরস্কার ইত্যাদির দ্বারা তাঁকে ধর্ম, অর্থ, কাম- এই ত্রিবর্গ প্রতিপাদক শাস্ত্র অধ্যয়ন করাতে লাগল। এইভাবে তারা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিল। কিছুকাল পর প্রহ্লাদের শিক্ষক ষণ্ড এবং অমর্ক মনে করেছিল যে, প্রহ্লাদ মহারাজ সাম, দান, ভেদ এবং দণ্ডনীতি সম্বন্ধে যথাযথভাবে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছেন, তখন তারা একদিন প্রহ্লাদের মায়ের দ্বারা তাঁকে স্নান করিয়ে এবং অলঙ্কার আদির দ্বারা সুন্দরভাবে সাজিয়ে তাঁর পিতার কাছে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল। হিরণ্যকশিপু তার পুত্রকে তার চরণে পতিত হয়ে প্রণাম করতে দেখে স্নেহভরে আশীর্বাদ করেছিল এবং তাঁকে তার দুই বাহুর দ্বারা আঙ্গিন করেছিল। পিতা স্বভাবতই পুত্রকে আলিঙ্গন করে আনন্দ অনুভব করে। হিরণ্যকশিপুও তার ফলে পরম আনন্দ অনুভব করেছিল।”
নারদ মুনি বললেন- “হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদ মহারাজকে তার কোলে নিয়ে তাঁর মস্তক আঘ্রাণ করেছিল। তার স্নেহাশ্রু তার পুত্রের হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডলকে সিক্ত করেছিল। সে তার পুত্রকে এই প্রকার বলেছিল।”
হিরণ্যকশিপু বললেন- “হে প্রিয় প্রহ্লাদ, হে বৎস, হে আয়ুষ্মান্, তুমি এতকাল তোমার গুরুর কাছে যা কিছু শিখেছ, তার মধ্যে যা শ্রেষ্ঠ বলে তুমি মনে কর তা আমাকে বল।”
প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন- “ভগবানের দিব্য নাম, রূপ, গুণ, পরিকর এবং লীলাসমূহ শ্রবণ এবং কীর্তন, তাদের স্মরণ, ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবা, ষোড়শোপচারে শ্রদ্ধা সহকারে ভগবানের অর্চনা, ভগবানের বন্দন, তার দাস হওয়া, ভগবানকে প্রিয়তম বন্ধু বলে মনে করা এবং ভগবানের কাছে সর্বস্ব সমর্পণ করা ( অর্থাৎ, কায়মনোবাক্যে তাঁর সেবা করা)- এইগুলি শুদ্ধ ভক্তির নয়টি পন্থা। যিনি এই নবধা ভক্তির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের সেবায় তাঁর জীবন অর্পণ করেছেন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্বান, কারণ তিনি পূর্ণজ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন।”
“পুত্র প্রহ্লাদের মুখে ভগবদ্ভক্তির কথা শ্রবণ করে হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিল। তার অধরোষ্ঠ কম্পিত হয়েছিল এবং সে তার গুরু শুক্রাচার্যের পুত্র ষণ্ডকে এই কথাগুলি বলেছিল। হে ব্রাহ্মণের অত্যন্ত অযোগ্য এবং ঘৃণ্য পুত্র, তুমি আমাকে অবজ্ঞা করে আমার শত্রুর পক্ষ অবলম্বন করেছ। তুমি এই অবোধ বালককে অসার বিষ্ণুভক্তির শিক্ষা দিয়েছ! এ তুমি কি করেছ? কালক্রমে যেমন পাপীদের রোগ প্রকাশ পায়, তেমনই এই সংসারে অনেক ছদ্মবেশী প্রতারক বন্ধু হয়, কিন্তু কালক্রমে তাদের কপট আচরণের মাধ্যমে তাদের শত্রুতা প্রকাশ পায়।”
হিরণ্যকশিপুর গুরু শুক্রাচার্যের পুত্র বললেন- “হে ইন্দ্রশত্রু, হে রাজন্্, আপনার পুত্র প্রহ্লাদ যা বলেছে তা আমরা তাকে শিক্ষা দিইনি এবং অন্য কেউই দেয়নি। তার এই বিষ্ণুভক্তি স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। অতএব, আপনার ক্রোধ সম্বরণ করুন এবং অনর্থক আমাদের প্রতি দোষারোপ করবেন না। এইভাবে ব্রাহ্মণকে অপমান করা ভাল নয়।”
শ্রীনারদ মুনি বললেন- “শিক্ষকের এই উত্তর শুনে হিরণ্যকশিপু তার পুত্র প্রহ্লাদকে বলেছিল, “ওরে অভদ্র, ওরে কুলনাশক, তুই যদি এই শিক্ষা তোর গুরুর কাছ থেকে না পেয়ে থাকিস, তা হলে কোথা থেকে তা তুই পেয়েছিস?”
প্রহ্লাদ মহারাজ উত্তর দিলেন- “অসংযত ইন্দ্রিয় বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা অন্ধকার নরকে প্রবেশ করে বার বার চর্বিত বস্তু চর্বণ করে। তাদের মতি কখনও অন্যের উপদেশে, নিজেদের প্রচেষ্টায় অথবা উভয়ের সংযোগে কখনই কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হতে পারে না। যারা জড় জগৎকে ভোগ করার বাসনার দ্বারা আবদ্ধ এবং তাই যারা তাদেরই মতো বিষয়াসক্ত অন্ধ ব্যক্তিকে তাদের নেতা বা গুরুরূপে বরণ করেছে, তারা বুঝতে পারে না যে, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সেবায় যুক্ত হওয়া। অন্ধের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অন্ধরা যেমন প্রকৃত পথের সন্ধান না জেনে অন্ধকূপে পতিত হয়, তেমনই জড় বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা অন্য বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে সকাম কর্মরূপ অত্যন্ত দৃঢ় রজ্জুর বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সংসার-চক্রে বার বার আবর্তিত হয়ে ত্রিতাপ দুঃখ ভোগ করতে থাকে। জড় জগতের কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত বৈষ্ণবেরা শ্রীপাদপদ্মের ধুলিতে অবগাহন না করা পর্যন্ত বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা কখনও ভগবান উরুক্রমের (যিনি তাঁর অসাধারণ কার্যকলাপের জন্য যশস্বী তাঁর) শ্রীপাদপদ্মে আসক্ত হতে পারে না। কেবলমাত্র কৃষ্ণভক্ত হওয়ার ফলেই ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করে এইভাবে জড় জগতের কলুষ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।”
“এইভাবে বলে প্রহ্লাদ মহারাজ যখন নীরব হয়েছিলেন, তখন হিরণ্যকশিপু ক্রোধান্ধ হয়ে তার কোল থেকে তাঁকে ভূতলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। ঘৃণ্য এবং ক্রোধে আরক্ত লোচন হয়ে হিরণ্যকশিপু তার ভৃত্যদের বলল- হে অসুরগণ, এই বালককে এখান থেকে নিয়ে যাও! এ বধের যোগ্য, সুতরাং এক্ষুণি একে বধ কর! এই প্রহ্লাদই আমার ভাতৃঘাতী, কারণ সে তার সুহৃদ এবং আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যাগ করে ভৃত্যের মতো আমার শত্রু বিষ্ণুর পদযুগলের সেবায় যুক্ত হয়েছে। পাঁচ বছর বয়স্ক বালক হওয়া সত্ত্বেও সে তার পিতামাতার সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং সে নিশ্চয়ই অবিশ্বাসী। সে যে বিষ্ণুর প্রতিও সাধু ব্যবহার করবে, তাতেই বা বিশ্বাস কি? ঔষধ যদি হিতকারী হয় তা হলে বনে জাত হলেও যেমন তাকে যত্ন সহকারে রক্ষা করা হয়, তেমনই যদি পরও হিতকারী হয়, তা হলে তাকে পুত্রের মতো পালন করা যায়। পক্ষান্তরে, দেহের কোন অঙ্গ যদি রোগের ফলে বিষাক্ত হয়ে যায়, তা হলে অবশিষ্ট শরীরকে রক্ষা করার জন্য তা কেটে ফেলা হয়। তেমনই, নিজের পুত্রও যদি প্রতিকূল হয়, তা হলে স্বীয় দেহজাত হলেও তাকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য। অসংযত ইন্দ্রিয় যেমন পারমার্থিক জীবনে উন্নতি সাধনের প্রয়াসী যোগীদের শত্রু, সুহৃদের বেশধারী এই প্রহ্লাদও আমার শত্রু, কারণ আমি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তাই এই শত্রুকে ভোজন, আসন অথবা শয়নে, যে কোন উপায়েই হোক হত্যা করতে হবে। অত্যন্ত তীক্ষ্ম ও ভয়ঙ্কর দন্ত ও বদন-বিশিষ্ট এবং তাম্রবর্ণ শ্মশ্রু ও কেশ সমন্বিত ভয়ঙ্কর রাক্ষসেরা যারা ছিল হিরণ্যকশিপুর অনুচর, তারা ‘একে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেল!’ বলে ভয়ঙ্করভাবে শব্দ করতে করতে পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যানে মগ্ন প্রহ্লাদ মহারাজকে ত্রিশূল দ্বারা আঘাত করতে লাগল। পুণ্যহীন ব্যক্তি সৎকর্ম করলেও যেমন তা নিষ্ফল হয়, তেমনই রাক্ষদের অস্ত্রশস্ত্র প্রহ্লাদ মহারাজের উপর কোন রকম প্রভাব বিস্তার করতে পারল না, কারণ তিনি নির্বিকার, অনির্দেশ্য, জগতাত্মা পরমেশ্বর ভগবানের সেবার ধ্যানে সম্পূর্ণরূপে মগ্ন ঐকান্তিক ভক্ত।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, প্রহ্লাদ মহারাজকে বধ করতে দৈত্যদের সমস্ত প্রয়াস যখন ব্যর্থ হয়েছিল, তখন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ভীত হয়ে তাঁকে বধ করার অন্যান্য বিবিধ উপায় উদ্ভাবন করতে শুরু করেছিল। হিরণ্যকশিপু তার পুত্রকে বিশাল হস্তীর পায়ের নিচে ফেলে, বিশালকায় ভয়ঙ্কর সর্পদের মধ্যে নিক্ষেপ করে, ধ্বংসাত্মক যাদু প্রয়োগ করে, পর্বতশৃঙ্গ থেকে নিক্ষেপ করে, মায়াগর্তে নিরোধ করে, বিষ প্রয়োগ করে, উপবাস করিয়ে, প্রচণ্ড হিম, বায়ু, অগ্নি এবং জলের দ্বারা অথবা বিশাল পাথরের নিচে তাঁকে পেষণ করেও বধ করতে পারেনি। হিরণ্যকশিপু যখন দেখল যে সে কোন মতেই নিষ্পাপ প্রহ্লাদের অনিষ্ট করতে পারছে না, তখন সে অত্যন্ত চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ভাবতে লাগল তারপর সে কি করবে।”
হিরণ্যকশিপু ভাবতে লাগল- “আমি বালক প্রহ্লাদের প্রতি বহু কটুবাক্য প্রয়োগ করে তিরস্কার করেছি এবং তাকে হত্যা করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছি, কিন্তা তা সত্ত্বেও তাকে আমি বধ করতে পারিনি। নিঃসন্দেহে সে এই সমস্ত বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আচরণের দ্বারা এবং ঘৃণ্য কার্যকলাপের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তার নিজের তেজের দ্বারাই নিজেকে রক্ষা করেছে। যদিও সে আমার অতি নিকটে রয়েছে এবং সে একটি নিতান্ত শিশু, তবুও সে সম্পূর্ণরূপে নির্ভীক। কুকুরের লেজ যেমন তার স্বাভাবিক বক্রত্ব পরিত্যাগ করে না, এও তেমন আমার অন্যায় আচরণ এবং তার প্রভু বিষ্ণুকে কখনই বিস্মৃত হবে না। আমি দেখছি যে এই বালকের শক্তি অসীম, কারণ আমার কোন দণ্ডেই এর ভয় হয়নি। মনে হয় যেন সে অমর। তাই, তার প্রতি শত্রুতার ফলে আমার মৃত্যু হবে অথবা নাও হতে পারে।”
“এইভাবে চিন্তা করে দৈত্যরাজ বিষণ্ন এবং কান্তিহীন হয়ে, মুখ নিচু করে মৌনভাব অবলম্বন করেছিল। তখন শুক্রাচার্যের দুই পুত্র ষণ্ড এবং অমর্ক তাকে গোপনে এই কথাগুলি বলেছিল। হে প্রভু, আমরা জানি যে আপনার ভ্রূভঙ্গি মাত্র সমস্ত লোকপালেরা ভীত হয়। কারও সহায়তা ছাড়াই আপনি একলা ত্রিভুবন জয় করেছেন। অতএব আমরা আপনার বিষণ্ন হওয়ার অথবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোন কারণ দেখছি না। প্রহ্লাদ একটি শিশুমাত্র, অতএব সে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে না। বালকের ব্যবহার কোন দোষ অথবা গুণের বিষয় হতে পারে না। আমাদের গুরু শুক্রাচার্য ফিরে আসা পর্যন্ত আপনি এই শিশুকে বরুণপাশে আবদ্ধ করে রাখুন যাতে সে ভয় পেয়ে পালিয়ে না যায়। তার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে যখন আমাদের উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করবে অথবা আমাদের গুরুদেবের সেবা করবে, তখন আপনা থেকেই তার বুদ্ধির পরিবর্তন হবে। তাই চিন্তা করার কোন কারণ নেই। হিরণ্যকশিপু তার গুরুর পুত্র ষণ্ড এবং অমর্কের পরামর্শে সম্মত হয়েছিল এবং গৃহস্থ রাজাদের ধর্ম সম্বন্ধে প্রহ্লাদকে উপদেশ দিতে অনুরোধ করেছিল। তারপর ষণ্ড এবং অমর্ক অত্যন্ত বিনীত এবং নম্র প্রহ্লাদ মহারাজকে নিরন্তর ধর্ম, অর্থ ও কাম সম্বন্ধে বিশেষভাবে শিক্ষা দিতে লাগল। প্রহ্লাদ মহারাজের শিক্ষক ষণ্ড এবং অমর্ক তাঁকে ধর্ম, অর্থ ও কাম- এই ত্রিবর্গ সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিল। প্রহ্লাদ মহারাজ যেহেতু সেই উপদেশের অতীত ছিলেন, তাই তাঁর তা ভাল লাগেনি, কারণ সেই সমস্ত উপদেশ জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি ভিত্তিক সংসারের দ্বৈতভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। শিক্ষকেরা যখন তাদের গৃহস্থালির কার্যে তাদের গৃহে চলে যেত, তখন সেই উপযুক্ত অবসরে প্রহ্লাদ মহারাজকে তাঁর সমবয়স্ক ছাত্রেরা খেলা করার জন্য ডাকত। প্রহ্লাদ মহারাজ, যিনি ছিলের যথার্থই মহা জ্ঞানী, তিনি তার সহপাঠীদের অত্যন্ত মধুর বাক্যে সম্ভাষণ করে, হেসে জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে, তিনি তাদের নিম্নলিখিত উপদেশগুলি দিয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, সমস্ত বালকেরা প্রহ্লাদ মহারাজের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাদের অল্প বয়সের ফলে, দ্বৈতভাব এবং দেহসুখের প্রতি আসক্ত শিক্ষকদের উপদেশের দ্বারা তাদের অন্তঃকরণ দূষিত হয়নি। তারা তাদের খেলার সমস্ত উপকরণ পরিত্যাগ করে, প্রহ্লাদ মহারাজের কথা শ্রবণ করার জন্য তাঁকে ঘিরে বসেছিল। তাদের হৃদয় এবং নেত্র তাঁর উপর নিবদ্ধ ছিল এবং গভীর নিষ্ঠা সহকারে তাঁরা তার দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। অসুরকুলে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন একজন মহাভাগবত এবং তিনি তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন। তার ফলে তিনি তাদের জড়-জাগতিক জীবনের নিরর্থকতা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে শুরু করেছিলেন।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits