পঞ্চদশ অধ্যায়- রাজা চিত্রকেতুকে নারদ ও অঙ্গিরার উপদেশ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “শোকসন্তপ্ত রাজা চিত্রকেতু তাঁর পুত্রের মৃতদেহের পাশে আর একটি মৃতদেহের মতো পড়ে ছিলেন। তখন মহর্ষি নারদ এবং অঙ্গিরা তাঁকে আধ্যাত্মিক চেতনা সম্বন্ধে এইভাবে উপদেশ দিয়েছিলেন। হে রাজেন্দ্র, যে মৃত বালকের জন্য তুমি এইভাবে শোক করছ, সে তোমার কে? তার সঙ্গে তোমার কি সম্পর্ক? তুমি বলতে পার এখন তুমি তার পিতা এবং সে তোমার পুত্র, কিন্তু, তুমি কি মনে কর তোমাদের এই সম্পর্ক পূর্বে ছিল? এখনও কি রয়েছে? ভবিষ্যতে কি তা থাকবে? হে রাজন্, স্রোতের বেগে বালুকারাশি কখনও একত্রিত হয় এবং কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তেমনই কালের প্রভাবে জড় দেহধারী জীবদের কখনও মিল হয় এবং কখনও বিচ্ছেদ হয়। জমিতে বীজ বপন করলে কখনও তা অঙ্কুরিত হয়, কখনও হয় না। কখনও জমি উর্বর না হওয়ার ফলে বীজ বপন নিরর্থক হয়। তেমনই কখনও সম্ভাব্য পিতা ভগবানের মায়ার দ্বারা প্রেরিত হয়ে সন্তান লাভ করে এবং কখনও করে না। তাই এই কৃত্রিম পিতৃত্বের সম্পর্কের জন্য শোক করা উচিত নয়, যা চরমে ভগবানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। হে রাজন্, তুমি এবং আমরা- তোমার উপদেষ্টাগণ, তোমার পত্নী এবং মন্ত্রীগণ এবং চরাচর সমস্ত জগৎ এই যে এক বর্তমান কালে রয়েছি, তা এক অনিত্য পরিস্থিতি। আমাদের জন্মের পূর্বে তা ছিল না এবং মৃত্যুর পরেও তা থাকবে না। তাই বর্তমানে আমাদের যে স্থিতি, তা মিথ্যা না হলেও অনিত্য। সমস্ত জীবের ঈশ্বর ভগবান অবশ্যই এই অনিত্য জড় জগতের সষ্টির ব্যাপারে নিরপেক্ষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও, সমুদ্রের তটে বালক যেমন খেলার ছলে কিছু তৈরী করে, ভগবানও তেমন সব কিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে রেখে সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহার-কার্য সম্পাদন করেন। পিতাদের সন্তান উৎপাদনের কার্যে ব্যাপৃত রেখে তিনি সৃষ্টি করেন, রাজাদের দ্বারা তিনি পালন করেন এবং সর্প আদি মৃত্যুদূতের মাধ্যমে সংহার করেন। সৃষ্টি, পালন এবং বিনাশের এই প্রতিনিধিদের কোন স্বাতন্ত্র্য নেই, কিন্তু মায়ার দ্বারা মোহিত হয়ে তারা নিজেদের স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা বলে মনে করে। হে রাজন্, একটি বীজ থেকে যেমন আর একটি বীজ উৎপন্ন হয়, তেমনই একটি দেহ (পিতার দেহ) থেকে অন্য একটি দেহের (মাতার দেহের) মাধ্যমে আর একটি দেহের (পুত্রের দেহের) জন্ম হয়। জড় দেহের উপাদানগুলি যেমন নিত্য, তেমনই এই সমস্ত উপাদানের মাধ্যমে প্রকট হয় যে জীব সেও নিত্য। যারা উন্নত জ্ঞান সম্পন্ন নয় তারাই জাতি এবং ব্যক্তি, এই ধরনের সমষ্টি ও ব্যষ্টির বিভেদ সৃষ্টি করে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে নারদ মুনি এবং অঙ্গিরা ঋষির উপদেশে জ্ঞান লাভ করে রাজা চিত্রকেতু আশ্বাসিত হয়েছিলেন। তখন তিনি তাঁর হস্তের দ্বারা তাঁর মলিন মুখ পরিমার্জন করে বলেছিলেন- হে মহাপুরুষদ্বয়! অবধূত বেশে আত্মগোপন করে এখানে সমাগত আপনারা দুজন কে? আমি দেখছি যে আপনারা মহাজ্ঞানী এবং মহৎ থেকেও অতিশয় মহৎ। বৈষ্ণবের পদ প্রাপ্ত হয়েছেন যে ব্রাহ্মণেরা তাঁরা ভগবানের অত্যন্ত প্রিয় সেবক। কখনও কখনও তাঁরা উন্মত্তের মতো বেশ গ্রহণ করে, আমাদের মতো বিষয়াসক্ত মূর্খদের অজ্ঞানতা দূর করার জন্য এই পৃথিবীতে যথেচ্ছাভাবে বিচরণ করেন। হে মহাত্মগণ, আমি শুনেছি অজ্ঞানাচ্ছন্ন জীবদের জ্ঞান উপদেশ করার জন্য যে সমস্ত সিদ্ধ মহাত্মগণ পৃথিবীতে বিচরণ করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সনৎকুমার, নারদ, ঋভু, অঙ্গিরা, দেবল, অসিত, অপান্তরতমা (ব্যাসদেব), মার্কেণ্ডেয়, গৌতম, বসিষ্ঠ, ভগবান পরশুরাম, কপিল, শুকদেব, দুর্বাসা, যাজ্ঞবল্ক্য, জাতুকর্ণ, অরুণি, রোমশ, চ্যবন, দত্তাত্রেয়, আসুরি, পতঞ্জলি, বেদশিরা, ঋষি, ধৌম্য, মুনি পঞ্চশিখ, হিরণ্যনাভ, কৌশল্য, শ্রুতদেব এবং ঋতধ্বজ। আপনারা নিশ্চয়ই তাঁদের মধ্যে কেউ হবেন। আপনারা দুজন মহাপুরুষ, তাই আপনারা আমাকে প্রকৃত জ্ঞান প্রদান করতে সমর্থ। আমি শূকর, কুকুর আদি গ্রামপশুর মতো মূঢ়বুদ্ধি এবং অজ্ঞানের অন্ধকারে নিমগ্ন। তাই দয়া করে জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করে আমাকে উদ্ধার করুন।”
অঙ্গিরা বললেন- “হে রাজন্, তুমি যখন পুত্র কামনা করেছিলে, তখন যে তোমাকে পুত্র প্রদান করেছিল, আমিই সেই অঙ্গিরা ঋষি। আর ইনি সাক্ষাৎ ব্রহ্মার পুত্র দেবর্ষি নারদ। হে রাজন্, তুমি ভগবানের পরম ভক্ত। তোমার মতো ব্যক্তির পক্ষে এইভাবে জড়-জাগতিক বিষয়ের ক্ষতিতে মোহাচ্ছন্ন হওয়া উচিত নয়। তাই অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকার ফলে তুমি যে শোক সাগরে নিমজ্জিত হয়েছ, তা থেকে উদ্ধার করার জন্য আমরা দুজন এসেছি। যাঁরা তত্ত্বজ্ঞানী তাঁদের জড়-জাগতিক লাভ অথবা ক্ষতিতে প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। আমি যখন পূর্বে তোমার গৃহে এসেছিলাম, তখনই আমি তোমাকে দিব্য জ্ঞান দান করতাম, কিন্তু আমি যখন দেখলাম তোমার মন অন্য বিষয়ে আসক্ত রয়েছে, তখন আমি তোমাকে কেবলমাত্র একটি পুত্র প্রদান করেছিলাম, যে তোমার হর্ষ ও বিষাদের কারণ হয়েছে। হে রাজন্, এখন তুমি নিজেই পুত্রবানদের দুঃখ অনুভব করছ। হে শূরসেন-পতি, স্ত্রী, গৃহ, ধন, রাজৈশ্বর্য, বিবিধ সম্পদ এবং ইন্দ্রিয়ের বিষয়- এ সবই অনিত্য। রাজ্য, সামরিক শক্তি, ধনাগার, ভৃত্য, অমাত্য, আত্মীয়-স্বজন- এরা সকলেই ভয়, মোহ, শোক এবং দুঃখের কারণ। এরা গন্ধর্ব-নগরের মতো, অর্থাৎ অরণ্যের মধ্যে কল্পনার দ্বারা সৃষ্ট এক বিশাল প্রাসাদের মতো। সেগুলি স্বপ্ন, মায়া এবং কল্পনার মতো ক্ষণস্থায়ী। স্ত্রী, সন্তান, সম্পত্তি- এই সমস্ত দৃশ্যমান বস্তুগুলি স্বপ্নের মতো এবং মনঃকল্পিত। প্রকৃতপক্ষে আমরা যা দেখি, তার কোন বাস্তব সত্তা নেই। কিছুক্ষণের জন্য তা দৃষ্ট হয় এবং তারপর তার আর অস্তিত্ব থাকে না। আমাদের পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে আমরা এই প্রকার কল্পনা সৃষ্টি করি এবং সেই অনুসারে পুনরায় কার্য করি। দেহাভিমানী জীব পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় এবং মন সমন্বিত দেহে মগ্ন থাকে। মনের মাধ্যমে জীব আধিভৌতিক, আধিদৈবিক এবং আধ্যাত্মিক- এই তিন প্রকার ক্লেশ ভোগ করে। তাই দেহ সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার উৎস। অতএব, হে রাজা চিত্রকেতু, সাবধানতা সহকারে আত্মতত্ত্ব বিচার কর। অর্থাৎ তুমি কি দেহ, মন না আত্মা, সেই কথা বোঝার চেষ্টা কর। বিচার করে দেখ তুমি কোথা হতে এসেছ এবং এই দেহ ত্যাগ করার পর তুমি কোথায় যাবে এবং কেন তুমি জড় শোকের বশীভূত হয়েছ। এইভাবে তুমি তোমার প্রকৃত স্থিতি জানার চেষ্টা কর, তা হলে তুমি তোমার অনর্থক আসক্তি পরিত্যাগ করতে পারবে। তখন এই জড় জগৎ এবং কৃষ্ণের সেবায় যুক্ত নয় যে সমস্ত বস্তু তাদের নিত্য বলে মনে করার যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসও তুমি পরিত্যাগ করতে পারবে। এইভাবে তুমি শান্তি লাভ করতে পারবে।”
মহর্ষি নারদ বললেন- “হে রাজন্, তুমি সংযত হয়ে আমার কাছ থেকে এই পরম শ্রেয়াস্পদ মন্ত্র গ্রহণ কর, যা গ্রহণ করলে সাত রাত্রির মধ্যে ভগবান সঙ্কর্ষণকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করতে পারবে। হে রাজন্, পুরাকালে ভগবান শিব এবং অন্যান্য দেবতারা সঙ্কর্ষণের শ্রীপাদপদ্মে শরণ গ্রহণ করেছিলেন। তার ফলে তাঁরা তৎক্ষণাৎ দ্বৈতভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে অতুলনীয় এবং অনতিক্রম্য মহিমা লাভ করেছিলেন। তুমিও শ্রীঘ্রই সেই পরম পদ লাভ করবে।”

Leave a Reply

January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits