চতুর্দশ অধ্যায়- মহারাজ চিত্রকেতুর শোক

মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে তত্ত্বজ্ঞানী ব্রাহ্মণ, সাধারণত অসুরেরা রজ এবং তম স্বভাবসম্পন্ন পাপাত্মা। কিন্তু বৃত্রাসুর কিভাবে ভগবান নারায়ণে এই প্রকার দৃঢ় ভক্তি লাভ করেছিলেন? শুদ্ধ সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত দেবতারা এবং ভোগবাসনারূপ কলুষরহিত ঋষিরাও প্রায়ই মুকুন্দের শ্রীপাদপদ্মে ভক্তি লাভ করেন না। (অতএব বৃত্রাসুর কিভাবে এই প্রকার মহান ভক্ত হলেন?) এই জড় জগতে পরমাণুসমূহ যেমন অসংখ্য, জীবও তেমন অসংখ্য। সেই সমস্ত জীবের মধ্যে মনুষ্যজাতি অতি অল্প সংখ্যক এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কেবল ধর্ম অনুষ্ঠান করেন। হে দ্বিজোত্তম শুকদেব গোস্বামী, সেই ধর্ম অনুষ্ঠানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে অল্প কয়েকজন কেবল জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা করেন। হাজার হাজার মুক্তিকামীদের মধ্যে কদাচিৎ একজন জড় জগতের স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ইত্যাদির আসক্তি পরিত্যাগ করে মুক্ত হন এবং এই প্রকার হাজার হাজার মুক্তদের মধ্যে কদাচিৎ কোন ব্যক্তি প্রকৃত তত্ত্ব জানতে পারেন। হে মহর্ষে, এই প্রকার কোটি কোটি মুক্ত ও সিদ্ধদের মধ্যেও প্রশান্তাত্মা নারায়ণ-পরায়ণ ভক্ত অত্যন্ত দুর্লভ। ভয়ঙ্কর যুদ্ধস্থলে উপস্থিত হয়েও সেই কুখ্যাত পাপাত্মা অসুর যে সর্বদা অন্যদের দুঃখ-দুর্দশা এবং উৎকন্ঠার কারণ ছিল, সে কিভাবে এই প্রকার মহান কৃষ্ণভক্ত হয়েছিল? হে প্রভু শুকদেব গোস্বামী, বৃত্র পাপাত্মা অসুর হলেও যুদ্ধে শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়োচিত পৌরুষ প্রদর্শন করেছিলেন এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। এই প্রকার অসুর কিভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহান ভক্ত হয়েছিলেন? এই বিষয়ে আমার অত্যন্ত সন্দেহ উপস্থিত হয়েছে এবং আপনার কাছে তার কারণ শ্রবণ করতে অত্যন্ত কৌতুহল জন্মেছে।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “শ্রদ্ধাবান মহারাজ পরীক্ষিতের যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন শ্রবণ করে, মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী গভীর স্নেহ সহকারে তাঁর শিষ্যকে বলেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, ব্যাসদেব, নারদ এবং দেবল ঋষির শ্রীমুখ থেকে যে ইতিহাস আমি শ্রবণ করেছি, সেই কথাই আমি তোমাকে বলব। মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, শূরসেন দেশে চিত্রকেতু নামক একজন রাজা ছিলেন, যিনি সারা পৃথিবীর একছত্র সম্রাট ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে পৃথিবী কামধুক্ ছিলেন অর্থাৎ জীবনের সমস্ত আবশ্যকতাগুলি পূর্ণ করতেন। এই চিত্রকেতুর এক কোটি পত্নী ছিল, তিনি সন্তান উৎপাদনের সমর্থ হলেও তাদের থেকে তিনি একটি সন্তানও লাভ করতে পারেননি। দৈবযোগে তারা সকলেই বন্ধ্যা ছিল। এক কোটি বন্ধ্যা পত্নীর পতি চিত্রকেতু রূপবান, উদার এবং তরুণ ছিলেন। তাঁর অতি উচ্চকুলে জন্ম হয়েছিল। তিনি পূর্ণ শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ঐশ্বর্যবান ছিলেন। কিন্তু এই সমস্ত গুণে গুণান্বিত হওযা সত্ত্বেও, কোন পুত্র না থাকায় তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন। তাঁর অতি সুন্দরী চারুনয়না মহিষীগণ, সম্পদ, ভূমি- এই সব কিছুই সেই সার্বভৌম নরপতির প্রীতিজনক হয়নি। এক সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী অঙ্গিরা ঋষি ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণ করতে করতে মহারাজ চিত্রকেতুর প্রাসাদে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। চিত্রকেতু তৎক্ষণাৎ তাঁর সিংহাসন থেকে উঠে তাঁর পূজা করেছিলেন। তাঁকে আহার্য এবং পানীয় প্রদান করে তিনি সেই মহান অতিথির সৎকার করেছিলেন। ঋষি যখন সুখে উপবিষ্ট ছিলেন, তখন মহারাজ তাঁর মন এবং ইন্দ্রিয় সংযত করে সেই ঋষির পায়ের কাছে ভূমিতে উপবেশন করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, চিত্রকেতু যখন বিনয়াবনতভাবে মহর্ষির শ্রীপাদপদ্মের পাশে মাটিতে বসেছিলেন, তখন ঋষি অঙ্গিরা তাঁকে তাঁর বিনয় এবং আতিথেয়তার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে তাঁকে বলেছিলেন- ‘হে রাজন্, আমি আশা করি আপনার দেহ, মন এবং রাজকীয় পার্ষদ ও সামগ্রী সবই কুশলে রয়েছে। প্রকৃতির সাতটি তত্ত্ব (মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার এবং পঞ্চ তন্মাত্র) যখন যথাযথভাবে থাকে, তখন জড় তত্ত্বের মধ্যে জীব সুখী থাকে। এই সাতটি তত্ত্ব ব্যতীত জীবের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তেমনই রাজাও সর্বদা সাতটি তত্ত্বের দ্বারা রক্ষিত- তাঁর উপদেষ্টা (স্বামী বা গুরু), তাঁর মন্ত্রীবর্গ, রাজ্য, দুর্গ, কোষ, দণ্ড এবং মিত্র। হে নরদেব, রাজা যখন সাক্ষাৎভাবে এই সপ্ত প্রকৃতির অনুবর্তী হন, তখন তিনি সুখী হন। তেমনই তাঁরাও যখন তাঁদের ধন-সম্পদ এবং কর্মক্ষমতা রাজাকে নিবেদন করে রাজার আদেশ পালন করেন, তেমন তাঁরাও সুখী হন। হে রাজন্, তোমার পত্নী, প্রজা, অমাত্য, ভৃত্য, তেল মসলা আদি সরবরাহকারী বণিকগণ, মন্ত্রিবৃন্দ, পুরবাসীগণ, রাজ্যপালগণ, পুত্রগণ সকলে তোমার বশবর্তী আছে তো? যদি রাজার মন সম্পূর্ণরূপে সংযত থাকে, তা হলে তাঁর পরিবারের সমস্ত সদস্য এবং রাজকর্মচারীগণ সকলেই তাঁর অধীন থাকেন। তাঁর রাজ্যপালগণ তাঁকে যথাসমযে অবাধে কর প্রদান করেন, অতএব নিম্নতর ভৃত্যদের আর কি কথা? হে মহারাজ চিত্রকেতু, আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমার মন প্রসন্ন নয়। তোমার মনোবাসনা পূর্ণ হয়নি বলে মনে হচ্ছে। তা কি তোমার নিজের থেকেই হয়েছে না অন্য কারও কারণে হয়েছে? তোমার বিবর্ণ মুখমণ্ডলই তোমার গভীর দুশ্চিন্তা প্রতিফলিত করছে।’
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মহর্ষি অঙ্গিরা যদিও সব কিছুই জানতেন, তবু তিনি রাজাকে এইভাবে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন পুত্রার্থী রাজা চিত্রকেতু মহর্ষি অঙ্গিরাকে বলেছিলেন- “হে মহাত্মন্, তপস্যা, জ্ঞান এবং সমাধির বলে আপনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন। তাই আপনার মতো একজন সিদ্ধ যোগী আমার মতো একজন বদ্ধ জীবের অন্তরের এবং বাইরের সব কথা জানেন। হে মহাত্মন, আপনি যদিও সব কিছু জানেন, তবুও আপনি আমার দুশ্চিন্তার কারণ জিজ্ঞাসা করেছেন। তাই আপনার আদেশ অনুসারে আমি তার কারণ বিশ্লেষণ করছি। ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় কাতর ব্যক্তিকে যেমন মালা অথবা চন্দন আদি সুখপ্রদ বিষয় সুখ দিতে পারে না, তেমনই স্বর্গের দেবতাদেরও অভিলষিত সাম্রাজ্য, ঐশ্বর্য, সম্পদ আমাকে সুখ দিতে পারে না, কারণ আমি অপুত্রক। হে মহর্ষি, যাতে আমি পুত্র লাভ করে আমার পূর্বপুরুষগণ সহ অন্ধকার নরক থেকে উদ্ধার পেতে পারি, সেই উপায় বিধান করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহারাজ চিত্রকেতুর অনুরোধে ব্রহ্মার মানসপুত্র অঙ্গিরা ঋষি তাঁর প্রতি কৃপাপরবশ হয়েছিলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন একজন মহা শক্তিশালী ব্যক্তি, তাই তিনি ত্বষ্টার উদ্দেশ্যে পায়স নিবেদন করে এক যজ্ঞ করেছিলেন। হে ভারতশ্রেষ্ঠ মহারাজ পরীক্ষিৎ, চিত্রকেতুর এক কোটি রাণীর মধ্যে যিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠা, কৃতদ্যুতি নামক সেই প্রথম বিবাহিতা মহিষীকে মহর্ষি অঙ্গিরা যজ্ঞাবশেষ প্রদান করেছিলেন। তারপর, মহর্ষি অীঙ্গরা রাজাকে বলেছিলেন, “হে মহারাজন্, এখন তুমি একটি পুত্র লাভ করবে যে তোমার হর্ষ এবং শোক উভয়েরই কারণ হবে।” এই কথা বলে, চিত্রকেতুর উত্তরের অপেক্ষা না করে সেই ঋষি প্রস্থান করেছিলেন। কৃত্তিকাদেবী যেমন অগ্নির কাছ থেকে মহাদেবের বীর্য গ্রহণ করে স্কন্দ (কার্তিকেয়) নামক পুত্রকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, কৃতদ্যুতিও তেমন অঙ্গিরার অনুষ্ঠিত যজ্ঞের প্রসাদ ভক্ষণপূর্বক চিত্রকেতুর বীর্য ধারণ করে গর্ভবতী হয়েছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, শুরসেন দেশের অধিপতি রাজা চিত্রকেতুর বীর্য ধারণ করে, রাজমহিষী কৃতদ্যুতির যে গর্ভ হয়েছিল, তা শুক্লপক্ষের চন্দ্রের মতো দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগল। তারপর, যথাসময়ে রাজার একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল। সেই সংবাদ শ্রবণ করে শূরসেন দেশবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। মহারাজ চিত্রকেতু এই সংবাদ শ্রবণে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং স্নান করে শুচি হয়ে অলঙ্কার ধারণপূর্বক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দ্বারা কুমারের আশীর্বাদ বাণী পাঠ এবং জাতকর্ম সম্পন্ন করিয়েছিলেন। রাজা সেই অনুষ্ঠানে যোগদানকারী ব্রাহ্মণদের স্বর্ণ, রজত, বসন, অলঙ্কার, গ্রাম, অশ্ব, হস্তী প্রভৃতি এবং ছয় অর্বুদ (ষাট কোটি) গাভী দান করেছিলেন। মেঘ যেভাবে অকাতরে জল বর্ষণ করে, মহামতি রাজাও সেইভাবে কুমারের যশ, ধন ও আযু বৃদ্ধির জন্য সকলকে তাঁদের অভিলষিত বস্তু দান করেছিলেন। দরিদ্র ব্যক্তির যেমন কষ্টলব্ধ ধনের প্রতি দিন দিন স্নেহ বর্ধিত হয়, তেমনই, মহারাজ চিত্রকেতু বহু কষ্টে সেই পুত্র লাভ করার ফলে, তার প্রতি তাঁর স্নেহ দিন দিন বর্ধিত হতে লাগল। পিতার মতো মাতা কৃতদ্যুতিরও পুত্রের প্রতি অত্যধিক স্নেহ ক্রমশ বর্ধিত হয়েছিল। কৃতদ্যুতির সন্তান দর্শন করে তাঁর সপত্নীদেরও পুত্র কামনায় পরিতাপ উপস্থিত হয়েছিল। পুত্রের লালন পালন করতে করতে পুত্রবতী ভার্যা কৃতদ্যুতির প্রতি চিত্রকেতুর প্রীতি যেমন বর্ধিত হয়েছিল, তেমনই তাঁর অন্যান্য পত্নী যাঁদের পুত্র ছিল না, তাঁদের প্রতি তাঁর প্রীতি ক্রমশ হ্রাস পেয়েছিল। অন্য মহিষীরা পুত্রহীনা হওয়ার ফলে অত্যন্ত অসুখী হয়েছিলেন। রাজা তাঁদের প্রতি উপেক্ষা করার ফলে, তাঁরা ঈর্ষায় নিজেদের ধিক্কার দিতে দিতে অনুতাপ করেছিলেন। পুত্রহীনা স্ত্রীকে তার গৃহে তার পতি অনাদর করে এবং সপত্নীরা তাকে দাসীর মতো অসম্মান করে। সেই প্রকার স্ত্রী তার পাপের জন্য সর্বতোভাবে নিন্দনীয়। দাসীরাও নিরন্তর স্বামীর পরিচর্যা করে স্বামীর কাছ থেকে সম্মান পায় এবং তাই তাদের কোন সন্তাপ থাকে না। কিন্তু আমাদের অবস্থা দাসীরও দাসীর মতো। অতএব, আমরা অত্যন্ত দুর্ভাগা।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বলতে লাগলেন- “এইভাবে পতির দ্বারা উপেক্ষিত হয়ে এবং কৃতদ্যুতির পুত্রসম্পদ দর্শন করে, কৃতদ্যুতির সপত্নীরা সর্বক্ষণ ঈর্ষায় দগ্ধ হতে লাগলেন, যা অত্যন্ত প্রবল হয়ে উঠেছিল। ক্রমশ তাদের বিদ্বেষ বৃদ্ধি পেয়ে তাদের বুদ্ধি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অত্যন্ত কঠোর হৃদয় হয়ে এবং তাদের প্রতি রাজার অনাদর সহ্য করতে না পেরে, তারা অবশেষে কুমারকে বিষ প্রদান করেছিল। তাঁর সপত্নীরা যে তাঁর পুত্রকে বিষ প্রদান করেছে মহারাণী কৃতদ্যুতি সেই কথা জানতে পারেননি। তাঁর পুত্রকে গভীর নিদ্রায় মগ্ন বলে মনে করে, তিনি গৃহে বিচরণ করছিলেন। তাঁর পুত্রের যে মৃত্যু হয়েছে, সেই কথা তিনি বুঝতে পারেননি। পুত্র বহুক্ষণ ধরে নিদ্রিত আছে বলে মনে করে, অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মহারাণী কৃতদ্যুতি ধাত্রীকে আদেশ দিয়েছিলেন, ‘হে ভদ্রে, আমার পুত্রকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ ধাত্রী শায়িত বালকের কাছে গিয়ে দেখল যে, তার চক্ষু ঊর্ধ্বগত হয়ে আছে। তার দেহে জীবনের লক্ষণ নেই এবং তার ইন্দ্রিয়গুলি স্তব্ধ হয়ে গেছে। তখন সে বুঝতে পারে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তা দেখে ‘হায়, আমার সর্বনাশ হয়েছে’ এই বলে আর্তনাদ করে সে ভূমিতে নিপতিত হয়েছিল। ধাত্রী অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে তার করযুগলের দ্বারা বক্ষে আঘাত করতে করতে উচ্চস্বরে চিৎকার করছিল। তার সেই চিৎকার শুনে রাণী তৎক্ষণাৎ তাঁর পুত্রের কাছে এসে সহসা তাকে মৃত দেখতে পেলেন। গভীর শোকে তখন রাণীর কেশ এবং বসন বিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং তিনি মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পতিত হয়েছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, সেই উচ্চ ক্রন্দন ধ্বনি শ্রবণ করে পুরবাসী স্ত্রী-পুরুষ সকলেই সেখানে এসেছিল এবং তাঁদের মতো দুঃখিত হয়ে ক্রন্দন করতে শুরু করেছিল। বিষ প্রদানকারী রাণীরাও তাদের অপরাধ ভালভাবে জেনে কপটভাবে ক্রন্দন করেছিল। রাজা চিত্রকেতু যখন শুনলেন যে, অজ্ঞাত কারণে তাঁর পুত্রের মৃত্যু হয়েছে, তখন তিনি শোকে প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর পুত্রের প্রতি গভীর স্নেহের ফলে, তাঁর শোক জ্বলন্ত অগ্নির মতো বর্ধিত হয়েছিল। তাকে দেখতে গিয়ে তিনি বার বার ভূমিতে স্খলিত এবং পতিত হতে লাগলেন। মন্ত্রী আদি রাজকর্মচারী এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তিনি বিকীর্ণ কেশ এবং বিক্ষিপ্ত বসনে মৃত বালকের পাদমূলে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। রাজা যখন তাঁর চেতনা ফিরে পেয়েছিলেন, তখন তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করছিলেন এবং তাঁর চক্ষু অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং তিনি কিছুই বলতে সমর্থ হলেন না। পতিকে নিদারুণ শোকসন্তপ্ত এবং বংশের একমাত্র পুত্রকে মৃত দেখে, রাণী নানাভাবে বিলাপ করেছিলেন। তা শুনে অন্তঃপুরবাসী, অমাত্যবর্গ এবং ব্রাহ্মণদের হৃদয়ের বেদনা বর্ধিত হয়েছিল। রাণীর উন্মুক্ত কেশপাশ থেকে ফুলের মালাগুলি পড়ে গিয়েছিল। তাঁর অশ্রু চোখের কাজল বিগলিত করে তাঁর কুমকুম-রঞ্জিত স্তনযুগলকে সিক্ত করেছিল। পুত্রশোকে তাঁর উচ্চ ক্রন্দন কুররী পাখির মধুর স্বরের মতো শোনাচ্ছিল।”
“হে বিধাতা, তুমি সৃষ্টির বিষয়ে নিশ্চয় অত্যন্ত অনভিজ্ঞ, কারণ তুমি পিতার জীবিত অবস্থায় পুত্রের মৃত্যুরূপ নিজ সৃষ্টির নিয়মের বিপরীত কার্য করেছ। তুমি যদি এইভাবে বিপরীত আচরণই করতে চাও, তা হলে তুমি নিশ্চয় তাদের প্রতি কৃপালু নও, তুমি তাদের শত্রু। হে ভগবান, তুমি বলতে পার যে, পুত্র জীবিত থাকতেই পিতার মৃত্যু হবে এবং পিতা জীবিত থাকতেই পুত্রের জন্ম হবে, এই রকম কোন নিয়ম নেই, কারণ সকলেরই কর্ম অনুসারে জন্ম-মৃত্যু হয়। কিন্তু কর্ম যদি এতই প্রবল হয় যে, জন্ম এবং মৃত্যু তার উপর নির্ভর করে, তা হলে নিয়ন্তা বা ভগবানেরই কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি তুমি বল যে, নিয়ন্তার প্রয়োজন রয়েছে, কারণ জড়া প্রকৃতির নিজে থেকে সক্রিয় হওয়ার ক্ষমতা নেই, তার উত্তরে তা হলে বলা যায় যে, তুমি যে স্নেহের বন্ধন সৃষ্টি করেছ তা তুমি কর্মের দ্বারা ছিন্ন কর এবং তা হলে স্নেহের ফলে এই প্রকার দুঃখ দর্শন করে কেউই আর সন্তানদের প্রতি স্নেহ করবে না; পক্ষান্তরে তারা তাদের সন্তানদের নিষ্ঠুরভাবে অবহেলা করবে। যে স্নেহের বশে পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের প্রতিপালন করতে বাধ্য হয়, যেহেতু তুমি সেই স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করেছ, তাই তুমি অনভিজ্ঞ এবং নির্বোধ।”
“হে বৎস, আমি অসহায় এবং অত্যন্ত কাতরা। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। তোমার শোকসন্তপ্ত পিতাকে দেখ। আমরা অসহায়, কারণ পুত্র না থাকলে আমাদের ঘোর নরক-যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। সেই অন্ধকার নরক থেকে উদ্ধারের তুমিই একমাত্র ভরসা। তাই তুমি নির্দয় যমের সঙ্গে আর অধিক দূরে যেও না। হে প্রিয় পুত্র, তুমি অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছ। এখন ওঠ। তোমার খেলার সাথীরা তোমাকে খেলতে ডাকছে। তুমি নিশ্চয়ই অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। উঠে স্তন পান কর এবং আমাদের শোক দূর কর। হে প্রিয় পুত্র, আমি অবশ্যই অত্যন্ত দুর্ভাগা, কারণ আমি আর তোমার সুন্দর মুখমণ্ডলে মধুর হাস্য দর্শন করতে পারব না। তা হলে কি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে গেলে আর কেউ ফিরে আসে না। হে প্রিয় পুত্র, আমি আর আমার অস্ফুট মধুর বাক্য শুনতে পাব না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে মৃত পুত্রের জন্য বিলাপকারিণী পত্নীর সঙ্গে রাজা চিত্রকেতু অতি উচ্চস্বরে রোদন করতে লাগলেন। এইভাবে রাজা ও রাণী ক্রন্দন করতে থাকলে, তাঁদের অনুগত নরনারী সকলেই রোদন করেছিল। এই আকস্মিক দূর্ঘটনায় সমস্ত নগরবাসী শোকে অচেতনপ্রায় হয়েছিল। মহর্ষি অঙ্গিরা যখন জানতে পারলেন যে, রাজা শোকসাগরে নিমজ্জিত হয়ে মৃতপ্রায় হয়েছেন, তখন তিনি নারদ মুনি সহ সেখানে গিয়েছিলেন।”

Leave a Reply

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits