ত্রয়োদশ অধ্যায়- দেবরাজ ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যাজনিত পাপ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে প্রভূত দানশীল মহারাজ পরীক্ষিৎ, বৃত্রাসুর নিহত হলে, ইন্দ্র ব্যতীত লোকপালগণ সহ ত্রিভুবনের সকলেই তখন সন্তাপ রহিত হয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। তারপর, দেবতা, ঋষি, পিতৃ, ভূত, দৈত্য, দেবানুগগণ এবং ব্রহ্মা, শিব ও ইন্দ্রের অনুগামী দেবতারা সকলে তাঁদের স্বস্থানে প্রস্থান করেছিলেন। যাওয়ার সময় কিন্তু তাঁরা কেউই ইন্দ্রকে কোন সম্ভাষণ করেননি।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষে, ইন্দ্রের দুঃখের কি কারণ ছিল? আমি তা জানতে ইচ্ছা করি। তিনি যখন বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন, তখন সমস্ত দেবতারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। তা হলে ইন্দ্র কেন অসুখী ছিলেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিয়েছিলেন- “বৃত্রাসুরের বিক্রমে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে বধ করার জন্য সমস্ত ঋষি এবং দেবতাগণ যখন ইন্দ্রের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, তখন ইন্দ্র ব্রহ্মহত্যার ভয়ে ভীত হয়ে তাতে অস্বীকার করেছিলেন।”
দেবরাজ ইন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন- “বিশ্বরূপকে বধ করার ফলে আমার যে পাপ হয়েছিল তা স্ত্রী, ভূমি, বৃক্ষ এবং জল অনুগ্রহপূর্বক বিভক্ত করে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখন আর একজন ব্রাহ্মণ বৃত্রাসুরকে বধ করলে, সেই ব্রহ্মহত্যারূপ পাপ থেকে আমি কিভাবে মুক্ত হব?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “দেবরাজ ইন্দ্রের সেই বাক্য শ্রবণ করে মহান ঋষিগণ বলেছিলেন, ‘হে দেবরাজ, তোমার মঙ্গল হবে। তুমি সেই জন্য কোন ভয় করো না। আমরা তোমাকে দিয়ে অশ্বমেধ যজ্ঞ করাব, তার ফরে ব্রহ্মাহত্যাজনিত পাপ থেকে তুমি মুক্ত হবে।’ ”
ঋষিরা বললেন- “হে ইন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা পরম পুরুষ পরমাত্মা পরমেশ্বর নারায়ণের প্রসন্নতা বিধান করার ফলে, তুমি সমস্ত জগৎ বধজনিত পাপ থেকেও মুক্ত হতে পারবে, অতএব বৃত্রবধের আর কি কথা। ভগবান শ্রীনারায়ণের পবিত্র নাম কীর্তন করার ফলে ব্রাহ্মণ, গাভী, পিতা, মাতা অথবা গুরুহত্যার পাপ থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। শূদ্রাধম শ্বপচ এবং চণ্ডাল আদি পাপীরা পর্যন্ত এইভাবে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। আর তুমি ভক্তিমান এবং আমরা তোমাকে মহান অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে সাহায্য করব। তুমি যদি এইভাবে ভগবান নারায়ণের প্রসন্নতা বিধান কর, তা হলে তুমি ব্রাহ্মণ সহ সমস্ত প্রাণীহত্যা করলেও পাপে লিপ্ত হবে না, অতএব বৃত্রাসুরের মতো দুষ্ঠ অসুরহত্যা-জনিত পাপের আর কি কথা।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ঋষিদের বাক্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন, কিন্তু বৃত্রাসুর নিহত হলে, সেই ব্রহ্মহত্যার পাপ ইন্দ্রকে আশ্রয় করেছিল। দেবতাদের পরামর্শে ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন এবং সেই পাপের ফলে তাঁকে দুঃখ ভোগ করতে হয়েছিল। অন্যান্য দেবতারা যদিও তার ফলে সুখী হয়েছিলেন, কিন্তু ইন্দ্র সুখী হতে পারেননি। ঐশ্বর্য, ধৈর্য আদি অন্যান্য সদ্‌গুণ তাঁকে সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করেনি। ইন্দ্র দেখলেন, চণ্ডালীর মতো মূর্তিমতী ব্রহ্মহত্যা তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করে আসছে। তার দেহ জরাগ্রস্ত এবং তার ফলে তার অঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। সে যক্ষ্মারোগগ্রস্ত এবং তাই তার দেহ ও পরিধেয় বস্ত্র রক্তে রঞ্জিত। তার শ্বাসবায়ু মৎস্যের মতো অসহ্য দুর্গন্ধ ত্যাগ করছে এবং তাতে পথ পর্যন্ত দূষিত হয়ে গিয়েছে। সে ইন্দ্রকে “দাঁড়াও, দাঁড়াও” বলে পশ্চাদ্ধাবন করছে। হে রাজন্, ইন্দ্র প্রথমে আকাশে পলায়ন করেছিলেন, কিন্তু সেখানেও তিনি দেখলেন যে মূর্তিমতী ব্রহ্মহত্যা তাঁকে অনুসরণ করছে। তিনি যেখানেই গেলেন, সেখানেই সেই পিশাচী তাঁকে অনুসরণ করেছিল। অবশেষে তিনি দ্রুতবেগে উত্তর-পূর্ব কোণে মানস সরোবরে প্রবেশ করেছিলেন। ইন্দ্র সেই মানস সরোবরে অন্যের অলক্ষিতভাবে ব্রহ্মহত্যা-জনিত পাপ থেকে মুক্তির উপায় চিন্তা করতে করতে পদ্মনাল তন্তুতে এক হাজার বছর বাস করেছিলেন। অগ্নিদেব সমস্ত যজ্ঞের ভাগ তাঁর জন্য আনয়ন করতেন, কিন্তু জলে প্রবেশ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল বলে, এই দীর্ঘকাল দেবরাজ ইন্দ্র প্রায় অনাহারেই ছিলেন। যে পর্যন্ত ইন্দ্র জলে পদ্মনাল তন্তুতে বাস করেছিলেন, সেই সময় পর্যন্ত নহুষ তাঁর বিদ্যা, তপস্যা এবং যোগবলে স্বর্গলোক শাসন করার যোগ্যতা-সম্পন্ন হওয়ার ফলে, স্বর্গরাজ্য শাসন করেছিলেন। কিন্তু নহুষ সম্পদ ও ঐশ্বর্যগর্বে মদান্ধ হয়ে ইন্দ্রপত্নী শচীকে ভোগ করার অবৈধ বাসনা করেন। তার ফলে নহুষ ব্রহ্মশাপে সর্পযোনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। দিক দেবতা শ্রীরুদ্রের প্রভাবে ইন্দ্রের পাপ ক্ষীণ হয়েছিল। ইন্দ্র যেহেতু মানস-সরোবরের পদ্মবনস্থিত বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মীদেবীর দ্বারা সংরক্ষিত হয়েছিলেন, তাই তাঁর পাপ তাঁকে প্রভাবিত করতে পারেনি। চরমে ইন্দ্র নিষ্ঠা সহকারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করার ফলে, তাঁর সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তারপর তিনি ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণে পুনরায় স্বর্গলোকে ফিরে গিয়ে দেবরাজের পদে অধিষ্ঠিত হন।”
“হে রাজন্, দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গে ফিরে গেলে, ব্রহ্মর্ষিরা তাঁর কাছে এসে পরমেশ্বর ভগবানের প্রসন্নতা বিধানের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞে তাঁকে যথাযথভাবে দীক্ষিত করেছিলেন। ব্রহ্মর্ষিদের দ্বারা অনুষ্ঠিত অশ্বমেধ যজ্ঞ ইন্দ্রকে তাঁর সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করেছিল, কারণ তিনি সেই যজ্ঞে পরমেশ্বর ভগবানের অর্চনা করেছিলেন। হে রাজন্, তিনি যদিও মহাপাপ করেছিলেন, তবুও সূর্যের তেজে কুজ্ঝটিকা যেমন বিনষ্ট হয়ে যায়, ঠিক সেইভাবে তাঁর পাপ বিনষ্ট হয়েছিল। দেবরাজ ইন্দ্র মরীচি আদি মহর্ষিদের দ্বারা অনুগৃহীত হয়েছিলেন। তাঁরা পরমাত্মা পুরাণ পুরুষ ভগবানের আরাধনা করে যথাবিধি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। তার ফলে ইন্দ্র পাপমুক্ত হয়ে তাঁর মহান পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং সকলের পূজ্য হয়েছিলেন। এই আখ্যানটি অত্যন্ত মহৎ, এতে তীর্থপদ নারায়ণের মাহাত্ম, ভক্তির উৎকর্ষ প্রতিপাদন, ভক্তদের কথা, দেবরাজ ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্তি এবং অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর জয় লাভের বর্ণনা হয়েছে। এই ঘটনাটি হৃদয়ঙ্গম করার দ্বারা মানুষ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। সুতরাং, বিদ্বান ব্যক্তিদের সর্বদা এই আখ্যানটি পাঠ করার উপদেশ দেওয়া হয়। কেউ যদি তা করেন, তা হলে তিনি তাঁর ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপে দক্ষতা অর্জন করবেন। তাঁর ধন বৃদ্ধি হবে এবং তাঁর যশ বিস্তৃত হবে। তার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি তাঁর সমস্ত শত্রুদের পরাভূত করবেন এবং তাঁর আয়ু বৃদ্ধি হবে। যেহেতু এই আখ্যানটি সর্বতোভাবে কল্যাণকর, তাই বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা প্রতি শুভ উৎসবে তা শ্রবণ এবং কীর্তন করেন।”

Leave a Reply

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits