শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দেহত্যাগ করতে ইচ্ছা করে বৃত্রাসুর জয় লাভের চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছিলেন। তখন তিনি তাঁর ত্রিশূল গ্রহণ করে ব্রহ্মাণ্ড যখন জলমগ্ন হয়েছিল তখন কৈটভ দৈত্য বিষ্ণুর প্রতি যেভাবে ধাবিত হয়েছিল, সেইভাবে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। তখন অসুরশ্রেষ্ঠ মহাবীর বৃত্র যুগান্তকালীন অগ্নিশিখার মতো তীক্ষ্মাগ্র শূল ঘূর্ণন করে, অতি বেগে ক্রোধের সঙ্গে ইন্দ্রের উপর নিক্ষেপপূর্বক গর্জন করে বলেছিলেন, ‘হে পাপাত্মা! এখন আমি তোকে হত্যা করব!’ বৃত্রাসুরের ত্রিশূল আকাশমার্গে উল্কার মতো উড়ে আসছিল। যদিও সেই অস্ত্রটি এত ভয়ঙ্কর উজ্জ্বল ছিল যে তার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, তবু নির্ভীক চিত্তে ইন্দ্র তাঁর বজ্রের দ্বারা সেই অস্ত্রটি খণ্ড খণ্ড করেন এবং সেই সঙ্গে বৃত্রাসুরের সর্পরাজ বাসুকির শরীরের মতো বিশালাকৃতি একটি বাহুও ছিন্ন করেন। যদিও তাঁর একটি হস্ত দেহ থেকে ছিন্ন হয়েছিল, তবু বৃত্রাসুর অপর হস্তে একটি লৌহ গদা নিয়ে ইন্দ্রের কাছে গিয়ে তাঁর চোয়ালে আঘাত করেছিলেন। তিনি ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতকেও আঘাত করেছিলেন। তার ফলে ইন্দ্রের হাত থেকে বজ্র পড়ে গিয়েছিল। বৃত্রাসুরের সেই অদ্ভুত কার্য দর্শন করে সুর, অসুর, চারণ ও সিদ্ধগণ সকলেই তাঁর বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন, কিন্তু ইন্দ্রের মহাবিপদ দর্শন করে দেবতাগণ হাহাকার করে বিলাপ করেছিলেন। শত্রুর সম্মুখে তাঁর হাত থেকে বজ্র পতিত হওয়ায়, ইন্দ্রের এক প্রকার পরাজয় হয়েছিল এবং তিনি সেই জন্য অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর অস্ত্র তুলে নিতে সাহস করেননি। বৃত্রাসুর কিন্তু তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, “বজ্র গ্রহণ করে তোমার শত্রুকে বিনাশ কর। এটি বিষাদের সময় নয়।”
বৃত্রাসুর বললেন- “হে ইন্দ্র, আদি ভোক্তা পরমেশ্বর ভগবান ব্যতীত অন্য কারোরই বিজয় নিশ্চিত নয়। সেই ভগবান সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের কারণ এবং তিনি সর্বজ্ঞ। পরতন্ত্র দেহধারী জীব যুদ্ধ করার ইচ্ছা করে কখনও বিজয়ী হয় এবং কখনও পরাজিত হয়। লোকপালগণ সহ এই ব্রহ্মাণ্ডে সমস্ত লোকের সমস্ত জীবেরা সর্বতোভাবে ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন। জালবদ্ধ পাখির মতো তাদের কোন স্বাধীনতা নেই। আমাদের ইন্দ্রিয়ের শক্তি মনের শক্তি, দেহের শক্তি, প্রাণ, অমরত্ব এবং মৃত্যু সবই ভগবানের নিয়ন্ত্রনাধীন। সেই কথা না জেনে, মূর্খেরা জড় দেহটিকেই তাদের কার্যকলাপের কারণ বলে মনে করে। হে ইন্দ্র, দারুময়ী নারী এবং পত্রময় মৃগ যেমন স্বেচ্ছায় চলাফেরা করতে পারে না অথবা নৃত্য করতে পারে না, কিন্তু নর্তকের ইচ্ছায় নৃত্য করে, তেমনই সব কিছুই ভগবানের অধীন। কেউই স্বতন্ত্র নয়। তিন পুরুষ- কারণোদকশায়ী বিষ্ণু, গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু এবং ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণু এবং জড়া প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার, পঞ্চ মহাভূত, জড় ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও চেতনা ভগবানের কৃপা ব্যতীত জড় জগৎ সৃষ্টি করতে পারে না। মূর্খ নির্বোধ মানুষেরা ভগবানকে জানতে পারে না। যদিও তারা সর্বদাই নির্ভরশীল, তবু তারা ভ্রান্তিবশত নিজেদের স্বতন্ত্র ঈশ্বর বলে মনে করে। কেউ যদি মনে করে যে, তার পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে তার দেহটি পিতা- মাতার দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই দেহটি অন্য কারও দ্বারা বিনষ্ট হবে, যেমন ব্যাঘ্র আদি পশু অন্য পশুকে গ্রাস করে, অর্থাৎ কেউ যদি পিতা- মাতাকে স্রষ্টা এবং ব্যাঘ্র আদি পশুদেরহ হন্তা বলে মনে করে, তা হলে তার সেই ধারণা যথার্থ নয়। কারণ প্রকৃতপক্ষে ভগবানই জীবেদের দ্বারা জীবেদের সৃষ্টি এবং জীবেদের দ্বারা জীবেদের বিনাশ করেন, অতএব তাতে জীবের কোন স্বতন্ত্রতা নেই- ভগবানই স্বতন্ত্র। মৃত্যুর সময় যেমন অনিচ্ছা সত্ত্বেও আয়ু, শ্রী, যশ প্রভৃতি ত্যাগ করতে হয়, তেমনই বিজয়ের সময়ও ভগবান যখন কৃপা করে সেইগুলি প্রদান করেন, তখন কোন রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই সেইগুলি লাভ হয়। যেহেতু সব কিছুই ভগবানের পরম ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই অকীর্তি এবং যশে, জয় এবং পরাজয়ে, মৃত্যু এবং জীবনে অবিচলিত থাকা উচিত। সেইগুলি কার্য, সুখ এবং দুঃখ প্রভৃতি সকল অবস্থাতেই সমভাবে অবস্থান করা উচিত। যিনি জানেন সত্ত্ব, রজ এবং তম- এই গুণ তিনটি আত্মার গুণ নয়, জড়া প্রকৃতির গুণ এবং যিনি জানেন শুদ্ধা আত্মা এই সমস্ত গুণের ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়ার সাক্ষী মাত্র, তিনি মুক্ত পুরুষ। তিনি এই সকল গুণের বন্ধনে আবদ্ধ নন। হে শত্রু, দেখ, যুদ্ধে আমার অস্ত্র এবং বাহু ছিন্ন হয়েছে। তুমি আমাকে ইতিমধ্যেই পরাজিত করেছ, তবু তোমার প্রাণ হরণের বাসনায় আমি যথাশক্তি যুদ্ধ করে চলেছি। এই প্রকার বিষম পরিস্থিতিতেও আমি একটুও বিষণ্ন হইনি। অতএব তুমিও তোমার বিষাদ ত্যাগ করে যুদ্ধ কর। হে শত্রু, এই যুদ্ধকে দ্যূতক্রীড়া বলে মনে কর, এতে প্রাণই পণ, বাণই অক্ষ (পাশা), হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি বানই তার ফলক। এতে যে কার জয় হবে আর কার পরাজয় হবে, তা কেউই বলতে পারে না। তা সবই নির্ভর করে ভবিতব্যের উপর।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বৃত্রাসুরের নিষ্কপট বাক্য শ্রবণ করে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর প্রশংসাপূর্বক পুনরায় বজ্র ধারণ করেছিলেন। বিস্ময় এবং কপটতা পরিত্যাগ করে তিনি হাসতে হাসতে বৃত্রাসুরকে বলেছিলেন- হে দানব, সঙ্কটকালেও যে তোমার বিবেক, ধৈর্য এবং ভক্তিযুক্ত মতি অবিচলিত রয়েছে, তা থেকে আমি বুঝে পারছি, তুমি সর্বাত্মা এবং সর্বসুহৃদ্ জগদীশ্বরকে অনন্যভাবে সেবা করেছ। তুমি ভগবানের মায়াকে অতিক্রম করেছ এবং এইভাবে মুক্ত হওয়ার ফলে, তুমি আসুরিক ভাব পরিত্যাগ করে মহান ভক্তের পদ প্রাপ্ত হয়েছ।”
“হে বৃত্রাসুর, অসুরেরা সাধারণত রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত। তাই, তুমি যে অসুর হওয়া সত্ত্বেও শুদ্ধ সত্ত্বে অবস্থিত পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবে সুদৃঢ় ভক্তিপরায়ণ হয়েছ, তা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। যে ব্যক্তি পরম মঙ্গলময় ভগবান শ্রীহরির প্রতি ভক্তিপরায়ণ, তিনি অমৃতের সাগরে ক্রীড়া করেন। ক্ষদ্র খাতোদকে তাঁর কি প্রয়োজন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বৃত্রাসুর এবং দেবরাজ ইন্দ্র যুদ্ধক্ষেত্রেও ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে এইভাবে বলতে বলতে, কর্তব্যবলে পুনরায় যুদ্ধ করতে শুরু করেছিলেন। হে রাজন্, তাঁরা উভয়েই ছিলেন মহান যোদ্ধা এবং সমান শক্তিশালী।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, শত্রু দমনে পূর্ণরূপে সক্ষম বৃত্রাসুর তাঁর লৌহনির্মিত পরিঘ বাম হস্তে ঘূর্ণনপূর্বক ইন্দ্রির প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন। ইন্দ্র শতপর্বন্ নামক তাঁর বজ্রের দ্বারা বৃত্রাসুরের পরিঘ এবং বাম হাত যুগপৎ ছেদন করেছিলেন। বৃত্রাসুরের মূল হতে ছিন্ন বাহুযুগল থেকে প্রবল ধারায় রক্ত ঝরে পড়ছিল, তাই তখন তাঁকে ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে আকাশ থেকে পতিত ছিন্নপক্ষ পর্বতের মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল। বৃত্রাসুর ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবসম্পন্ন এবং বলবান। তিনি তাঁর নিম্ন হনু ভূমিতে রেখে অপর হনু আকাশ পর্যন্ত বিস্তার করে, আকাশেরই মতো সুগভীর বদন, সর্পতুল্য ভয়ঙ্কর জিহ্বা এবং মৃত্যুতুল্য করাল দন্তসমূহের দ্বারা যেন ত্রিজগৎ গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এই প্রকার এক বিশাল শরীর ধারণ করে, মহান অসুর বৃত্র পর্বতসমূহকে বিচলিত করতে করতে এবং পায়ের দ্বারা পৃথিবীকে বিচূর্ণ করতে করতে পাদচারী গিরিরাজের মতো ইন্দ্র সমীপে আগত হয়ে মহা বলশালী অজগর সর্প যেভাবে হস্তীকে গ্রাস করে, সেইভাবে বাহন সহ ইন্দ্রকে গ্রাস করলেন। ব্রহ্মা, অন্যান্য প্রজাপতিগণ এবং মহর্ষিগণ সহ দেবতারা যখন দেখলেন যে বৃত্রাসুর ইন্দ্রকে গ্রাস করেছে, তখন তাঁরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে হাহাকার করে রোদন করতে শুরু করেছিলেন। ইন্দ্রের কাছে যে নারায়ণ-কবচ ছিল তা ভগবান নারায়ণ থেকে অভিন্ন। সেই কবচের দ্বারা তাঁর নিজের যোগশক্তির বলে ইন্দ্র বৃত্রাসুরের উদরে গিয়েও মৃত হননি। অত্যন্ত প্রভাবশালী ইন্দ্র বজ্রের দ্বারা বৃত্রাসুরের উদর বিদীর্ণ করে নির্গত হয়েছিলেন। বলাসুর সংহারকারী ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ গিরিশৃঙ্গতুল্য বৃত্রের মস্তক ছেদন করেছিলেন। বজ্র অতিশয় বেগমান হলেও বৃত্রাসুরের গলার চারদিকে ভ্রমণ করে ছেদন করতে করতে তার এক বৎসর সময় অতীত হয়েছিল। অর্থাৎ সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য জ্যোতিষ্কের উত্তর ও দক্ষিণ অয়নে ৩৬০ দিন অতীত হলে, বৃত্র হত্যার যোগ্য সময় উপস্থিত হয়। তখন বজ্রের দ্বারা বৃত্রাসুরের মস্তক ভূমিতে নিপতিত হয়। বৃত্রাসুর নিহত হলে স্বর্গে দুন্দুভি বেজে উঠেছিল। গন্ধর্ব, সিদ্ধ ও মহর্ষিরা বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা বৃত্রহন্তা ইন্দ্রের স্তুতি করে মহাহর্ষে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। হে অরিন্দম মহারাজ পরীক্ষিৎ, তখন বৃত্রের দেহ থেকে জ্যোতির্ময় আত্মা নিষ্ক্রান্ত হয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়েছিলেন। দেবতারা দেখলেন যে, ভগবান সঙ্কর্ষণের পার্ষদরূপে তিনি চিৎ-জগতে প্রবেশ করলেন।”
দ্বাদশ অধ্যায়- বৃত্রাসুরের মহিমান্বিত মৃত্যু
17 Dec 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম