একাদশ অধ্যায়- বৃত্রাসুরের দিব্য গুণাবলী

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, অসুর সেনাপতি বৃত্র এইভাবে তার সেনানায়কদের ধর্ম উপদেশ প্রদান করলেও সেই সমস্ত কাপুরুষ অসুর সেনানায়কেরা এতই ভয়ভীত হয়েছিল যে, তারা তার বাক্য গ্রহণ করতে পারল না। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দেবতারা সেই অনুকূল সুযোগ লাভ করে অসুর-সৈন্যদের পশ্চাতে ধাবিত হয়ে তাদের আক্রমণ করেছিলেন এবং তার ফলে অসুর-সৈন্যরা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং তাদের তখন কোন নেতা ছিল না। তাঁর সৈন্যদের এই প্রকার করুন অবস্থা দর্শন করে, অসুরশ্রেষ্ঠ এবং ইন্দ্রের শত্রু বৃত্রাসুর অত্যন্ত সন্তপ্ত হয়েছিলেন। এই প্রকার বিরূপ পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে, তিনি বলপূর্বক দেবতাদের নিবারিত করে, ক্রোধান্বিত হয়ে তাদের তিরস্কারপূর্বক বলেছিলেন, “হে দেবগণ, এই পলায়নরত অসুরেরা তাদের মাতৃজঠর থেকে বিষ্ঠার মতো বৃথাই জন্মগ্রহণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এদের জন্ম নিরর্থক। এই প্রকার শত্রুকে পিছন থেকে বধ করে তোমাদের লাভ কি? নিজেকে যারা বীর বলে অভিমান করে, তাদের প্রাণভয়ে ভীত শত্রুকে কখনও হত্যা করা উচিত নয়। এই প্রকার হত্যা প্রশংসনীয় নয় এবং তার ফলে স্বর্গও লাভ হয় না। হে তুচ্ছ দেবতাগণ, যদি তোমাদের যুদ্ধে যথার্থই শ্রদ্ধা থাকে ও হৃদয়ে ধৈর্য থাকে এবং বিষয়ভোগে অভিলাষ না থাকে, তবে ক্ষণিকের জন্য আমার সম্মুখে দাঁড়াও।”
“মহা বলশালী বৃত্রাসুর ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিশাল এবং ভয়ঙ্কর শরীর প্রদর্শনপূর্বক দেবতাদের ভীত করে এমনভাবে গর্জন করেছিলেন যে, তার ফলে সমস্ত প্রাণীবর্গ মূর্ছিত হয়েছিল। দেবতারা বৃত্রাসুরের সেই ভীষণ সিংহনাদ সদৃশ গর্জন শ্রবণে বজ্রাহত ব্যক্তির মতো মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পতিত হয়েছিলেন। দেবতারা যখন ভয়ে তাদের চক্ষু নিমীলিত করেছিলেন, তখন বৃত্রাসুর তাঁর ত্রিশূল উত্তোলন করে তাঁর নিজ বলে পৃথিবী কম্পিত করেছিলেন। মদমত্ত হস্তী যেমন নলবনকে পদদলিত করে, ঠিক সেইভাবে বৃত্রাসুর দেবতাদের পদদলিত করেছিলেন। বৃত্রাসুরের কার্যকলাপ দর্শন করে, দেবরাজ ইন্দ্র অত্যন্ত অসহিষ্ণু হয়ে তাঁর প্রতি এক মহাগদা নিক্ষেপ করেছিলেন। অপরের পক্ষে দুঃসহ হলেও বৃত্রাসুর তাঁর প্রতি নিক্ষিপ্ত সেই গদাটিকে অবলীলাক্রমে বাম হস্তে ধারন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, অত্যন্ত বিক্রমশালী ইন্দ্রশত্রু বৃত্রাসুর তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচণ্ড গর্জন করে ইন্দ্রের হস্তী ঐরাবতের মস্তকে সেই গদার দ্বারা আঘাত করেছিলেন। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ কার্যের জন্য উভয়পক্ষের সৈন্যেরাই তাঁর প্রশংসা করেছিল। বৃত্রাসুরের গদার আঘাতে ঐরাবতের মুখ বিদীর্ণ হয়েছিল, তার ফলে ঐরাবত অত্যন্ত পীড়িত হয়ে রক্ত বমন করতে করতে এবং বজ্রাহত পর্বতের মতো ঘুরতে ঘুরতে পিঠে ইন্দ্রকে নিয়ে সপ্ত ধনুক (চোদ্দ গজ) দূরে পতিত হয়। মহাত্মা বৃত্রাসুর ধর্মনীতি অনুসরণ করে, বাহন ঐরাবতকে আহত এবং অবসন্ন দেখে দুঃখিত চিত্ত ইন্দ্রের প্রতি পুনরায় গদা নিক্ষেপ করেননি। সেই অবসরে ইন্দ্র তার অমৃতস্রাবী হস্তের স্পর্শে ঐরাবতের ক্ষত ব্যথা অপনোদন করে, সেই স্থানে নীরবে অবস্থান করেছিলেন।”
“হে রাজন্, বৃত্রাসুর তার ভাতৃহন্তা শত্রু ইন্দ্রকে যুদ্ধ করার বাসনায় বজ্র ধারণ করে সম্মুখে অবস্থিত দেখে বৃত্রাসুরের মনে পড়েছিল, ইন্দ্র নিষ্ঠুরভাবে তাঁর ভ্রাতাকে হত্যা করেছে। ইন্দ্রের সেই পাপকর্মের কথা স্মরণ করে, তিনি শোকে ও মোহে বিভ্রান্ত হয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন- যে ব্যক্তি ব্রহ্মহত্যা, গুরুবধ এবং আমার ভ্রাতাকে বধ করেছে, সৌভাগ্যবশত সেই তুমি আজ শত্রুভাবে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছ। হে পাপিষ্ঠ, আমি যখন আমার ত্রিশূলের দ্বারা তোমার পাষাণতুল্য হৃদয় বিদীর্ণ করব, তখন আমি আমার ভ্রাতৃঋণ থেকে মুক্ত হব। কেবল স্বর্গকামনায় তুমি আত্মজ্ঞানী, নিষ্পাপ, তোমার যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত রূপে নিযুক্ত যোগ্য ব্রাহ্মণ আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে হত্যা করেছ। তিনি ছিলেন তোমার গুরু, কিন্তু তোমার যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দায়িত্বভার তাঁর উপর অর্পণ করা সত্ত্বেও তুমি নির্দয়ভাবে তোমার খ্ড়্‌গের দ্বারা একটি পশুর মতো তাঁর শিরশ্ছেদ করেছ। হে ইন্দ্র, তুমি লজ্জা, দয়া, কীর্তি এবং ঐশ্বর্য থেকে ভ্রষ্ট হয়েছ। নিজ কর্মবশে এই সমস্ত সদ্‌গুন থেকে বঞ্চিত হয়ে, তুমি রাক্ষসদেরও নিন্দনীয় হয়েছ। এখন আমি আমার ত্রিশূলের দ্বারা তোমার দেহ বিদীর্ণ করব, তার ফলে তোমাকে অতি কষ্টে মরতে হবে এবং তোমার মৃত্যুর পর অগ্নিও তোমাকে স্পর্শ করবে না; কেবল শকুনেরা তোমার দেহ ভক্ষণ করবে। যদি অন্যান্য দেবতারা আমার প্রভাব না জেনে, নিষ্ঠুর-প্রকৃতি তোমার অনুগামী হয়ে আমার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তাদের অস্ত্র উদ্যত করে, তা হলে আমি এই তীক্ষ্ম ত্রিশূলের দ্বারা তাদের মস্তক ছেদন করব এবং তাদের সেই মুণ্ডগুলি দিয়ে ভূত-প্রেত আদি সহ ভৈরব আদি ভূতনাথদের যজ্ঞ করব।”
“হে বীর ইন্দ্র! অথবা এই সংগ্রামে তুমিই যদি বজ্রের দ্বারা আমার শিরশ্ছেদ কর এবং আমার সৈন্যদের বিনাশ কর, তা হলে আমি আমার এই দেহ অন্য সমস্ত জীবেদের (যেমন শৃগাল এবং শকুনিদের) উপহার দিয়ে কর্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে নারদ মুনির মতো মহাভাগবতের শ্রীপাদপদ্মের ধূলিকনা লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করব। হে দেবরাজ! আমি তোমার শত্রুরূপে সম্মুখে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কি জন্য আমার প্রতি তোমার বজ্র নিক্ষেপ করছ না? যদিও আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত তোমার গদা কৃপণের কাছে ধন প্রার্থনা করার মতো নিষ্পল হয়েছে, কিন্তু এই বজ্র সেভাবে বিফল হবে না। এই বিষয়ে তুমি কোন সন্দেহ করো না। হে দেবরাজ ইন্দ্র? তুমি আমাকে বধ করার জন্য যে বজ্র ধারণ করেছ, তা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর তেজে এবং দধীচি মুনির তপস্যায় অত্যন্ত তেজোযুক্ত হয়েছে। তুমিও যেহেতু ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আদেশে আমাকে হত্যা করার জন্য এসেছ, সুতরাং তোমার বজ্রের আঘাতে যে আমার মৃত্যু হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ভগবান শ্রীবিষ্ণু তোমার পক্ষ অবলম্বন করেছেন। তাই তোমার বিজয়, সমৃদ্ধি এবং সমস্ত সদ্‌গুণ অবশ্যম্ভাবী। তোমার বজ্রের প্রভাবে আমি সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত হব এবং এই দেহ ও জড় বাসনা সমন্বিত এই জগৎ ত্যাগ করব। ভগবান সঙ্কর্ষণের শ্রীপাদপদ্মে আমার চিত্ত স্থির করে, আমি নারদ মুনি আদি মহান ঋষিদের গতি লাভ করব, যে কথা ভগবান সঙ্কর্ষণ স্বয়ং বলেছেন। যাঁরা ভগবানের শ্রীপাদপেদ্মে সম্পূর্ণরূপে শরণাগত এবং সর্বদা ঐকান্তিকভাবে তাঁর শ্রীপাদপদ্মের চিন্তায় মগ্ন, তাঁদের ভগবান তাঁর নিজ জন বা সেবকরূপে স্বীকার করেন। স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালে যে সম্পদ রয়েছে, তা তিনি তাদের দান করেন না। কারণ এই ত্রিভুবনের ঐশ্বর্যের ফলে শত্রুতা, উদ্বেগ, মনস্তাপ, গর্ব এবং কলহের সৃষ্টি হয়। তখন সেই সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য এবং সংরক্ষণের জন্য তাকে অধিক প্রয়াস করতে হয় এবং সেই সম্পদ হারালে তখন তার গভীর দুঃখ হয়।”
“হে ইন্দ্র! আমাদের প্রভু ভগবান তাঁর ভক্তদের ধর্ম, অর্থ এবং কামের প্রয়াস করতে নিষেধ করেন। তা থেকে বোঝা যায় ভগবান কত কৃপাময়। এই প্রকার কৃপা কেবল অন্য ভক্তদেরই লভ্য, বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা কখনও এই প্রকার কৃপা লাভ করতে পারে না। হে ভগবান, যাঁরা আপনার পাদমূলে আশ্রয় করেছেন, আমি কি আবার আপনার সেই দাসদের দাস হতে পারব? হে প্রাণপতি, আমি যেন পুনরায় তাঁদের দাস হতে পারি যাতে আমার মন সর্বদা আপনার দিব্য গুণাবলী স্মরণ করে, আমার বাণী যে সর্বদা আপনার মহিমা কীর্তন করে এবং আমার দেহ যেন সর্বদা আপনার সেবাকার্য সম্পাদন করতে পারে। হে সর্ব সৌভাগ্যের উৎস, আমি আপনার শ্রীপাদপদ্ম ত্যাগ করে ধ্রুবলোক, ব্রহ্মপদ, পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্য, অষ্ট যোগসিদ্ধি, এমন কি মোক্ষও লাভ করতে চাই না। হে অরবিন্দাক্ষ, অজাতপক্ষ পক্ষশাবক যেমন মাতার আগমনের প্রতীক্ষা করে, রজ্জুবদ্ধ গোবৎস যেমন ক্ষুধায় পীড়িত হয়ে কখন স্তন্য পান করবে তার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, বিষণ্না প্রেয়সী পত্নী যেভাবে প্রবাসী পতির দর্শনের অভিলাষ করে, আমার মনও সর্বদা সেইভাবে আপনার সেবা করার আকাঙ্ক্ষা করছে। হে নাথ, আমি আমার কর্মের ফলে সংসারচক্রে ভ্রমণ করছি। তাই আমি যেন আপনার পুণ্যকীর্তি ভক্তগণের সঙ্গে সখ্য লাভ করতে পারি। আপনার মায়ার প্রভাবে আমার চিত্ত যে দেহ, পুত্র, কলত্র, গৃহ প্রভৃতির প্রতি আসক্ত হয়েছে, তাতে যেন আর আসক্তি না থাকে। আমার মন, প্রাণ, সব কিছুই যেন আপনাতেই আসক্ত হয়।”

Leave a Reply

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits