শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইন্দ্রকে এইভাবে আদেশ দিয়ে, সমগ্র জগতের পরম কারণ ভগবান শ্রীহরি দেবতাদের সম্মুখেই সেখান থেকে অন্তর্হিত হলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, ভগবানের উপদেশ অনুসারে দেবতারা অথর্বার পুত্র দধীচি মুনির কাছে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার চিত্ত এবং যখন দেবতারা তাঁর কাছে তাঁর শরীর ভিক্ষা করলেন, তখন তিনি আংশিকভাবে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু দেবতাদের কাছে ধর্ম-উপদেশ শ্রবণ করার জন্য ঈষৎ হেসে পরিহাস ছলে তিনি বলেছিলেন, “হে দেবগণ, দেহধারী জীবেদের মৃত্যুর সময় চেতনা অপহরণকারী যে অসহ্য যন্ত্রণা হয়, তা কি আপনারা জানেন না? এই জড় জগতে প্রতিটি জীবই তার জড় দেহের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত। চিরকাল বেঁচে থাকার বাসনায় প্রতিটি জীব সর্বতোভাবে, এমন কি তার সর্বস্ব উৎসর্গ করেও তার দেহ রক্ষা করার চেষ্টা করে। সুতরাং বিষ্ণুও যদি তা প্রার্থনা করেন, তা হলেও কে সেই দেহ দান করতে সম্মত হবে?’ ”
দেবতারা বললেন- “হে মহান ব্রাহ্মণ, আপনার মতো পুণ্যবান ব্যক্তিদের কার্যকলাপ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং তাঁরা সকলের প্রতি অত্যন্ত দয়াপরবশ। অন্যের মঙ্গলের জন্য এই প্রকার পুণ্যবান মহাত্মা কি না দান করতে পারেন? তাঁরা সব কিছু এমন কি তাঁদের দেহ পর্যন্ত দান করতে পারেন। অত্যন্ত স্বার্থপর ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই পরের ক্লেশ বুঝতে না পেরে তাদের কাছে ভিক্ষা করে। কিন্তু প্রার্থনাকারী যদি দাতার ক্লেশ বুঝতে পারে, তা হলে সে তার কাছে কোন কিছু ভিক্ষা করবে না। তেমনই প্রার্থনাকারীর ক্লেশ বুঝতে না পারার ফলেই দান করতে সমর্থ ব্যক্তি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তা না হলে তিনি প্রার্থনাকারীকে কোন কিছু দান করতে অস্বীকার করতে পারতেন না।”
মহর্ষি দধীচি বললেন- “আপনাদের কাছে ধর্মের তত্ত্ব শ্রবণ করার জন্যই আমি আমার দেহ আপনাদের দান করতে অস্বীকার করেছিলাম। এখন, তা অতি প্রিয় হলেও যে দেহ একদিন না একদিন আমাকে ত্যাগ করতেই হবে, তা আপনাদের উপকারের জন্য প্রদান করছি। হে দেবতাগণ, যে পুরুষ জীবেদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে এই অনিত্য দেহের দ্বারা ধর্ম এবং যশ অর্জনের চেষ্টা করে না, সেই ব্যক্তি স্থাবর প্রাণীদের চেয়েও শোচনীয়। কেউ যদি অন্য জীবের দুঃখ দর্শন করে দুঃখিত হন এবং তাদের সুখ দর্শন করে সুখী হন, তাঁর ধর্মই পুণ্যশ্লোক মহাত্মাগণ অক্ষয় ধর্ম বলে উপাসনা করেন। এই ক্ষণস্থায়ী দেহ যা কুকুর শিয়ালের ভক্ষ্য এবং যার দ্বারা নিজের আত্মার কিছুমাত্র উপকার হয় না, সেই দেহের ধন-সম্পদ এবং তার আত্মীয়স্বজন দিয়ে যদি পরের উপকার করা না যায়, তা হলে সেই সকল কেবল দুঃখ-দুর্দশা ভোগেরই কারণ হয়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “অথর্বানন্দন দধীচি মুনি এইভাবে দেবতাদের সেবায় তাঁর দেহ উৎসর্গ করতে মনস্থ করলেন। তারপর পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর আত্মাকে স্থাপন করে তাঁর পাঞ্চভৌতিক দেহ ত্যাগ করেছিলেন। দধীচি মুনি তাঁর ইন্দ্রিয়, প্রাণবায়ু, মন এবং বুদ্ধিকে সংযত করে সমাধিমগ্ন হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর সমস্ত জড় বন্ধন ছিন্ন করেছিলেন। তার ফলে তাঁর আত্মা যে তাঁর দেহ থেকে পৃথক হয়ে গেছে, তা তিনি অনুভব করতে পারেননি। তারপর দেবরাজ ইন্দ্র দধীচি মুনির অস্থির দ্বারা বিশ্বকর্মার নির্মিত বজ্র ধারণ করেছিলেন। দধীচি মুনির শক্তির দ্বারা শক্তিমান ও ভগবানের তেজে তেজীয়ান হয়ে এবং সমস্ত দেবতাদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে ইন্দ্র যখন ঐরাবতে আরোহণ করেছিলেন, তখন মুনিরা তাঁর স্তব করছিলেন। এইভাবে তিনি যেন ত্রিলোকের হর্ষ উৎপাদন করে বৃত্রাসুরকে বধ করতে যাচ্ছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, রুদ্র যেমন অন্তকের প্রতি (যমরাজের প্রতি) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে সংহার করার জন্য তাঁর প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন, তেমনি ইন্দ্র অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে অসুর সেনাপতি পরিবৃত বৃত্রাসুরের দিকে বেগে ধাবিত হয়েছিলেন। তারপর সত্যযুগের অবসানে এবং ত্রেতাযুগের প্রারম্ভে নর্মদা নদীর তীরে দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছিল।”
“হে রাজন্, বৃত্রাসুরের নেতৃত্বে সমস্ত অসুরেরা যুদ্ধক্ষেত্রে এসে রুদ্রগণ, বসুগণ, আদিত্যগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, পিতৃগণ, বহ্নিগণ, মরুৎগণ, ঋভুগণ, সাধ্যগণ ও বিশ্বদেবগণ পরিবৃত বজ্রধর ইন্দ্রকে দেখে তাঁর তেজ সহ্য করতে পারল না। স্বর্ণ পরিচ্ছদে ভূষিত নমুচি, শম্বর, অনর্বা, দ্বিমূর্ধা, ঋষভ, অসুর, হয়গ্রীব, শঙ্কুশিরা, বিপ্রচিত্তি, অয়োমুখ, পুলোমা, বৃষপর্বা, প্রহেতি, হেতি, উৎকল এবং অন্যান্য স্বর্ণময় পরিচ্ছদে বিভূষিত হাজার হাজার দৈত্য; দানব, যক্ষ, রাক্ষস এবং সুমালি, মালি প্রমুখ দুর্দান্ত অসুরেরা সিংহের মতো গর্জন করতে করতে গদা, পরিঘ, বাণ, প্রাস, মুদ্গর, তোমর প্রভৃতি অস্ত্রের দ্বারা দেবতাদের নিপীড়িত করতে লাগল। শূল, কুঠার, খ্ড়্গ, শতঘ্নী, ভুশুণ্ডি প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা অসুরেরা বিভিন্ন দেবতাদের আক্রমণ করেছিল এবং দেবতাদের মধ্যে যাঁরা শ্রেষ্ঠ, তাঁদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল। আকাশে ঘন মেঘের দ্বারা আচ্ছাদিত তারকারাজি যেমন দেখা যায় না, তেমনই চতুর্দিকে একের পর এক নিক্ষিপ্ত শরের জালে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত হওয়ার ফলে দেবতাদের দেখা যাচ্ছিল না। দেবসৈন্যদের সংহার করার উদ্দেশ্যে অসুরদের সেই সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র দেবতাদের অঙ্গ স্পর্শ করতে পারেনি, কারণ দেবতারা ক্ষিপ্রহস্তে আকাশমার্গেই সেই সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র সহস্র খণ্ডে ছেদন করেছিলেন। অসুরদের মন্ত্র এবং অস্ত্রশস্ত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায়, তারা পর্বতশৃঙ্গ, বৃক্ষ এবং পাথর দেবসৈন্যদের উপর বর্ষণ করতে লাগল, কিন্তু দেবতারা এতই শক্তিশালী এবং দক্ষ ছিলেন যে, তাঁরা সেগুলি অকাশমার্গেই পূর্বের মতো খণ্ড খন্ড করেছিলেন। বৃত্রাসুরের অসুর-সৈন্যেরা যখন দেখল যে, তাদের অস্ত্রশস্ত্রের প্রহার এবং বৃক্ষ, পর্বতশৃঙ্গ ও পাথর বর্ষণের ফলেও ইন্দ্রের সৈন্যরা অক্ষত রয়েছেন এবং সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন, তখন তারা অত্যন্ত ভীত হয়েছিল। নিচ ব্যক্তি যেমন মহৎ ব্যক্তির প্রতি কোধোদ্দীপক কোন রুক্ষ বাক্য প্রয়োগ করলে তা মহৎ ব্যক্তিকে বিচলিত করে না, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সুরক্ষিত দেবতাদের বিরুদ্ধে অসুরদের সমস্ত প্রয়াস নিষ্ফল হয়েছিল। ভগবদ্বিমুখ অসুরেরা যখন দেখল যে, তাদের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাদের যুদ্ধ করার গর্ব খর্ব হয়েছিল। যুদ্ধের আরম্ভেই তাদের সেনাপতিকে পরিত্যাগ করে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে মনস্থ করেছিল, কারণ তাদের শত্রুরা তাদের সমস্ত বল অপহরণ করে নিয়েছিল। নিজ সেনাবাহিনী ভগ্ন হতে দেখে, এমন কি যারা বীর বলে প্রসিদ্ধ সেই সমস্ত সৈন্যরাও ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করছে দেখে, উদার চিত্ত মহাবীর বৃত্রাসুর হেসে এই কথাগুলি বলেছিলেন। স্থান, কাল এবং পরিস্থিতি অনুসারে পুরুষপ্রবীর বৃত্রাসুর মনস্বীদের মনোজ্ঞ এই কথাগুলি বলেছিলেন। তিনি অসুরবীরদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘হে বিপ্রচিত্তি! হে নমুচি! হে পুলোমা! হে ময়, অনর্বা এবং শম্বর! তোমরা আমার কথা শ্রবণ কর এবং পলায়ন করো না।’ ”
বৃত্রাসুর বললেন- “যে সমস্ত জীব এই জগতে জন্মগ্রহণ করেছে তাদের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যুর প্রতিকারের কোন উপায় এই জড় জগতে কেউ খুঁজে পায়নি। এমন কি বিধাতাও তার প্রতিকারের উপায় বিধান করেননি। সেই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু থেকে যদি ইহকালে যশ এবং পরকালে স্বর্গলাভের সম্ভাবনা থাকে, তা হলে কোন্ ব্যক্তি সেই মহিমান্বিত মৃত্যুকে বরণ করবে না? দুই প্রকার মহিমান্বিত মৃত্যু রয়েছে এবং সেই দুটি অত্যন্ত দুর্লভ। একটি যোগ অনুষ্ঠান করে বিশেষ করে ভক্তিযোগ, যার দ্বারা মন এবং প্রাণবায়ু সংযত করে ভগবানের ধ্যানে মগ্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করা। অন্যটি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের নেতৃত্ব প্রদান করে এবং পৃষ্ঠ-প্রদর্শন না করে মৃত্যুবরণ করা।”
দশম অধ্যায়- দেবতা এবং বৃত্রাসুরের মধ্যে যুদ্ধ
10 Dec 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম