নবম অধ্যায়- বৃত্রাসুরের আবির্ভাব

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, আমি পরম্পরা সূত্রে শুনেছি যে, সেই দেব-পুরোহিত বিশ্বরূপের তিনটি মস্তক ছিল। একটির দ্বারা তিনি সোমরস পান করতেন, অন্যটির দ্বারা তিনি সুরা পান করতেন এবং অপরটির দ্বারা তিনি অন্ন আহার করতেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, বিশ্বরূপ তাঁর পিতার দিক থেকে দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং তাই তিনি প্রকাশ্যভাবে বিনয়ের সঙ্গে, “ইন্দ্রায় ইদং স্বাহা” (“এটি দেবরাজ ইন্দ্রের জন্য”) এবং “ইদম্ অগ্নয়ে” (“এটি অগ্নিদেবের জন্য”), ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে অগ্নিতে দেবতাদের উদ্দেশ্যে হবি প্রদান করেছিলেন। যদিও তিনি দেবতাদের নামে যজ্ঞে ঘি আহুতি দিচ্ছিলেন, তবুও দেবতাদের অজ্ঞাতসারে তিনি অসুরদেরও যজ্ঞভাগ নিবেদন করছিলেন, কারণ তাঁর মাতৃ সম্বন্ধে তিনি তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। কিন্তু এক সময় দেবরাজ ইন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশ্বরূপ গোপনে দেবতাদের প্রতারণা করে অসুরদের যজ্ঞভাগ নিবেদন করছিলেন। তখন তিনি অসুরদের কাছে পরাজিত হওয়ার ভয়ে এবং বিশ্বরূপের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁর তিনটি মস্তক ছেদন করেছিলেন। তখন যে মস্তকটি দিয়ে তিনি সোমরস পান করতেন, সেটি কপিঞ্জল পক্ষীতে (চাতক) রূপান্তরিত হয়েছিল। যে মস্তকটি দিয়ে সুরা পান করতেন, সেটি কলবিঙ্ক পক্ষী (চটক); এবং যে মস্তকটি দিয়ে অন্ন ভোজন করতেন, সেটি তিত্তিরি পক্ষী হয়েছিল। ইন্দ্র যদিও ব্রহ্মাহত্যা জনিত পাপ স্খালন করতে সমর্থ ছিলেন, তবুও তিনি কৃতাঞ্জলি হয়ে অনুতাপ সহকারে সেই পাপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এক বছর যাতনা ভোগ করার পর, নিজের বিশুদ্ধিকরণের জন্য সেই পাপের ফল পৃথিবী, জল, বৃক্ষ এবং স্ত্রীজাতির মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। ভূমির খাদ (গর্ত) আপনা থেকেই পূর্ণ হয়ে যাবে, ইন্দ্রের কাছে এই বর পেয়ে ভূমি ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যা জনিত পাপের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছিল। সেই পাপের ফলস্বরূপ আমরা ভূপৃষ্ঠে মরুভূমি দেখতে পাই। বৃক্ষেরা ইন্দ্রের কাছে বর লাভ করেছিল যে, তাদের কাটা হলেও তাদের ডালপালা আবার বর্ধিত হবে; সেই বর লাভ করে বৃক্ষেরা ইন্দ্রের ব্রহ্মাহত্যা জনিত পাপের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছিল। সেই পাপের ফল বৃক্ষের নির্যাসরূপে দৃষ্ট হয়। (সেই জন্যই বৃক্ষের নির্যাস পান করা নিষিদ্ধ)। নারীগণ ইন্দ্রের কাছে বর লাভ করেছিল যে, তারা সর্বকালে মৈথুন সম্ভোগ করতে পারবে, এমন কি গর্ভ অবস্থায়ও সম্ভোগ যদি গর্ভের পক্ষে ক্ষতিকারক না হয়, তা হলে সম্ভোগ করতে পারবে। সেই বর লাভ করার ফলে, তারা ইন্দ্রের পাপের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছিল। তাই প্রতি মাসে ঋতুকালে রজোরূপে সেই পাপ দৃষ্ট হয়। ইন্দ্রের কাছ থেকে জল বর লাভ করেছিল যে, অন্য দ্রব্যের সঙ্গে তার মিশ্রণের ফলে, সেই বস্তুরই আধিক্য ঘটবে। সেই বর লাভ করে জল ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যা জানিত পাপের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছিল। সেই পাপ জলে বুদ্বুদ এবং ফেনারূপে দেখা যায়। যখন জল আহরণ করা হয়, তখন বুদ্বুদ ও ফেনা বাদ দিয়েই তা আহরণ করতে হয়।”
“বিশ্বরূপের মৃত্যুর পর তাঁর পিতা ত্বষ্টা ইন্দ্রকে হত্যা করার জন্য এক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। ‘হে ইন্দ্রশত্রু, তোমার শত্রুকে অচিরে বধ করার জন্য তুমি বর্ধিত হও।’ এই বলে যজ্ঞে তিনি আহুতি নিবেদন করেছিলেন। তারপর অন্বহার্য নামক যজ্ঞের দক্ষিণ দিগস্থ অগ্নি থেকে প্রলয়কালীন কৃতান্তের মতো অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দর্শন এক অসুর উৎপন্ন হয়েছিল। চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত বাণের মতো দ্রুত গতিতে সেই অসুরের শরীর দিন দিন বর্ধিত হতে লাগল। তার শরীর দগ্ধ পর্বতের মতো প্রকাণ্ড ও কৃষ্ণবর্ণ ছিল। তার অঙ্গের দীপ্তি সন্ধ্যাকালীন মেঘসমূহের মতো ছিল। তার শিখা শ্মশ্রু উত্তপ্ত তাম্রের মতো পিঙ্গল বর্ণ এবং নেত্রদ্বয় মধ্যাহ্নকালীন সূর্যের মতো অত্যন্ত উগ্র ছিল। সে ছিল দুর্জয় এবং মনে হচ্ছিল যেন সে তার জ্বলন্ত ত্রিশূলের উপর ত্রিলোক ধারণ করেছে। সে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে করতে যখন নৃত্য করছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন সারা পৃথিবী ভূমিকম্পের ফলে কম্পিত হচ্ছে। সে যখন বার বার জৃম্ভণ করছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন সে তার পর্বত গহ্বরের মতো গভীর মুখের দ্বারা সমগ্র আকাশ গ্রাস করার চেষ্টা করছে। তাকে মনে হচ্ছিল যেন সে তার জিহ্বার দ্বারা আকাশের নক্ষত্রগুলিকে লেহন করছে এবং তার দীর্ঘ, তীক্ষ্ম দন্তের দ্বারা ত্রিভুবনকে গ্রাস করছে। সেই ভয়ঙ্কর অসুরকে দর্শন করে মানুষেরা ভীত হয়ে দশ দিকে পলায়ন করতে শুরু করেছিল। ত্বষ্টার পুত্র অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দর্শন সেই অসুর তার তপস্যার প্রভাবে সমগ্র লোক আবৃত করেছিল। তাই তার নাম হয়েছিল বৃত্র অর্থাৎ যে সব কিছু আবৃত করে। ইন্দ্র প্রমুখ দেবতারা সসৈন্যে তার প্রতি ধাবিত হয়ে, তাঁদের দিব্য অস্ত্রের দ্বারা তাকে আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু বৃত্রাসুর তাঁদের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র গ্রাস করেছিল। অসুরের এই প্রকার প্রভাব দর্শন করে দেবতারা অত্যন্ত বিষণ্ন এবং আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। দেবতারা তখন নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁরা সকলে একত্রে মিলিত হয়ে অন্তর্যামী ভগবান নারায়ণের প্রসন্নতা বিধানের জন্য তাঁর পূজা করতে শুরু করেছিলেন।”
দেবতারা বললেন- “বায়ু, আকাশ, অগ্নি, জল ও মাটি- এই পঞ্চ মহাভূত থেকে ত্রিলোক সৃষ্টি হয়েছে, যা ব্রহ্মা আদি দেবতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কাল আমাদের বিনাশ করবে এই ভয়ে ভীত হয়ে আমরা কাল কর্তৃক নির্দেশিত কর্ম অনুষ্ঠানের দ্বারা সেই কালকে উপহার প্রদান করি। কিন্তু সেই কালও ভগবানের ভয়ে ভীত। অতএব এখন আমরা সেই পরমেশ্বর ভগবানের পূজা করি, যিনি আমাদের পূর্ণরূপে রক্ষা করতে সক্ষম। ভগবান সম্পূর্ণরূপে নিরহঙ্কার এবং তিনি কোন কিছুর দ্বারাই আশ্চর্যান্বিত হন না। তাঁর চিন্ময় পূর্ণতার ফলে তিনি সর্বদা আনন্দময় এবং সর্বতোভাবে সন্তুষ্ট। তাঁর কোন জড় উপাধি নেই এবং তাই তিনি স্থির এবং অনাসক্ত। সেই পরমেশ্বর ভগবান সকলের পরম আশ্রয়। যে ব্যক্তি অন্যের দ্বারা নিজের রক্ষা কামনা করে, সে অবশ্যই অত্যন্ত মূর্খ, যে কুকুরের লেজ ধরে সমুদ্র পার হওয়ার বাসনা করে। পূর্বে মহারাজ সত্যব্রত নামক মনু পৃথিবীরূপা ক্ষুত্র নৌকাটি মৎস্য অবতারের শৃঙ্গে বেঁধে প্রলয়ের মহা সঙ্কট থেকে ত্রান পেয়েছিলেন, ত্বষ্টার পুত্রের ভয়ঙ্কর ভয় থেকে সেই মৎস্যমূর্তি ভগবান আমাদের রক্ষা করুন। সৃষ্টির আদিতে ভয়ঙ্কর প্রলয়-সলিলে প্রচণ্ড বাযু ভয়ঙ্কর তরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল। সেই মহা তরঙ্গ থেকে যে ভয়ঙ্কর শব্দ হয়েছিল, তার ফলে ব্রহ্মা তাঁর কমলাসন থেকে প্রলয়-সলিলে পতনোন্মুখ হয়েছিলেন। তখন তাঁকে যিনি রক্ষা করেছিলেন, সেই পরমেশ্বর ভগবান আমাদেরও এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রক্ষা করুন। যে পরমেশ্বর ভগবান তাঁর বহিরঙ্গা মায়াশক্তির দ্বারা আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং যাঁর কৃপায় আমরা ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি বিস্তার করি, তিনি সর্বদা আমাদের সম্মুখে পরমাত্মারূপে বিরাজমান, কিন্তু আমরা তাঁর রূপ দর্শন করতে পারি না। আমরা তাঁকে দর্শন করতে অক্ষম, কারণ আমরা নিজেদের এক-একজন স্বতন্ত্র ঈশ্বর বলে মনে করি। ভগবান তাঁর অচিন্ত্য অন্তরঙ্গা শক্তির প্রভাবে বহু দিব্য শরীরে নিজেকে বিস্তার করেন, যেমন দেবতাদের মধ্যে বামনদেব রূপে, ঋষিদের মধ্যে পরশুরাম রূপে, পশুদের মধ্যে নৃসিংহ, বরাহ আদি রূপে, জলচরদের মধ্যে মৎস্য, কূর্মরূপে এবং মানুষের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরামচন্দ্র রূপে তিনি আবির্ভূত হন। তাঁর অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে তিনি সর্বদা অসুরদের দ্বারা উৎপীড়িত দেবতাদের রক্ষা করেন। তিনি সমস্ত জীবের পরম আরাধ্য, পরম কারণ, প্রকৃতি ও পুরুষরূপে তিনি সমস্ত সৃষ্টির মূল। এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিরাটরূপে এই ব্রহ্মাণ্ডে বিরাজ করেন। আমাদের ভয়ার্ত অবস্থায় আমরা তাঁর শরণাগত হই, কারণ আমরা নিশ্চিতরূপে জানি যে, সেই পরম ঈশ্বর, পরম আত্মা আমাদের রক্ষা করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, দেবতারা এইভাবে স্তব করলে, শঙ্খ-চক্র-গদাধর হরি প্রথমে তাঁদের হৃদয়ে এবং তারপর তাঁদের সম্মৃখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হে রাজন্, শ্রীবৎস চিহ্ন এবং কৌস্তুভ মণি ব্যতীত অন্যান্য অলঙ্কারে বিভূষিত হয়ে ভগবানেরই সমতুল্য ষোড়শ সংখ্যক পার্ষদ দ্বারা চতুর্দিকে সেব্যমান, শরৎকালীন বিকশিত পদ্মফুলের মতো নেত্রসমন্বিত ভগবানকে দর্শন করে, দেবতারা আনন্দে বিহ্বল হয়ে ভূমিতে দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁরা পুনরায় প্রার্থনা করতে শুরু করেছিলেন।”
দেবতারা বললেন- “হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনি যজ্ঞের ফল প্রদানকারী এবং আপনি যজ্ঞের ফল বিনাশকারী কালস্বরূপ। আপনি অসুরদের বিনাশের জন্য চক্র বিক্ষেপকারী এবং আপনি বহু নামধারী। হে ভগবান, আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা সহকারে নমস্কার করি। হে পরম নিয়ন্তা, আপনি ত্রিবিধ গতির (স্বর্গলোকে উন্নতি, মনুষ্যজন্ম এবং নরক-যন্ত্রণা) নিয়ন্তা, তবু আপনার পরম ধাম হচ্ছে বৈকুন্ঠলোক। যেহেতু অপনি এই জগৎ সৃষ্টি করার পর আমরা এসেছি, তাই আপনার কার্যকলাপ অবগত হওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। অতএব আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি ব্যতীত অন্য আর কিছুই নিবেদন করার নেই। হে ভগবান! হে নারায়ণ! হে বাসুদেব! হে আদিপুরুষ! হে মহাপুরুষ! হে মহানুভব! হে পরম মঙ্গল! হে পরম কল্যাণ! হে পরম করুণাময়! হে নির্বিকার! হে জগদাধার! হে লোকনাথ! হে সর্বেশ্বর! হে লক্ষ্মীনাথ! পরমহংস পরিব্রাজক সন্ন্যাসীরা যাঁরা কৃষ্ণভক্তি প্রচার করার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র ভ্রমণ করেন, ভক্তিযোগে পূর্ণরূপে সমাধিমগ্ন হয়ে তাঁরা আপনাকে উপলব্ধি করতে পারেন। যেহেতু তাঁদের মন আপনাতে একাগ্রীভূত, তাই তাঁরা তাঁদের শুদ্ধ অন্তঃকরণে আপনার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। যখন তাঁদের হৃদয়ের অন্ধকার সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয় এবং আপনি তাঁদের কাছে প্রকাশিত হন, তখন তাঁরা আপনার চিন্ময় স্বরূপের দিব্য আনন্দ আস্বাদন করতে পারেন। তাঁরা ছাড়া আর কেউই আপনাকে উপলব্ধি করতে পারে না। তাই আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, আপনার কোন অবলম্বনের প্রয়োজন হয় না এবং যদিও আপনার কোন জড় শরীর নেই, তবু আপনার আমাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হয় না। যেহেতু আপনি সমস্ত জড় সৃষ্টির কারণ, আপনি বিকার প্রাপ্ত না হয়ে সমস্ত জড় উপাদানগুলি সরবরাহ করেন এবং স্বয়ং এই জড় জগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহার-কার্য সম্পাদন করেন। যদিও মনে হয় যে আপনি জড় কার্যকলাপে যুক্ত, তবু আপনি সমস্ত জড় গুণের অতীত। তাই আপনার এই সমস্ত দিব্য কার্যকলাপ হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের দুটি প্রশ্ন। সাধারণ বদ্ধ জীব জড়া প্রকৃতির নিয়মের অধীন এবং তার ফলে তাকে তার কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। আপনিও কি একজন সাধারণ মানুষের মতো জড়া প্রকৃতির গুণ থেকে উৎপন্ন একটি শরীরে অবস্থান করেন? আপনি কি কাল, কর্ম আদির অধীনে স্বকৃত শুভ এবং অশুভ ফল ভোগ করেন? নতুবা আপনি কি আত্মারাম, জড়া বাসনামুক্ত এবং নিত্য-চিৎশক্তিযুক্ত নিরপেক্ষ সাক্ষীরূপে কেবল বিরাজ করেন? আমরা আপনার প্রকৃত স্থিতি বুঝতে পারি না।”
হে ভগবান, আপনাতে সমস্ত বিরোধের সমন্বয় হয়। যেহেতু আপনি পরম পুরুষ, অনন্ত দিব্য গুণের আধার, পরম ঈশ্বর, তাই আপনার অনন্ত মহিমা বদ্ধ জীবদের কল্পনার অতীত। আধুনিক সিদ্ধান্তবাদীরা প্রকৃত সত্য যে কি তা না জেনে, কোন্‌টি সত্য এবং কোন্‌টি মিথ্যা তা নিয়ে তর্ক করে। তাদের তর্ক সর্বদাই ভ্রান্ত এবং তাদের বিচার অমীমাংসিত, কারণ, আপনার সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করার প্রকৃত প্ন্থা তারা জানে না। যেহেতু তাদের মন অপসিদ্ধান্তপূর্ণ তথাকথিত শাস্ত্রের দ্বারা বিক্ষুব্ধ, তাই তারা পরম সত্য আপনাকে জানতে অক্ষম। অধিকন্তু সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কলুষিত আগ্রহবশত তাদের মতবাদগুলি তাদের জড় ধারণার অতীত অধোক্ষজ আপনাকে প্রকাশ করতে পারে না। আপনি এক এবং অদ্বিতীয় এবং তাই আপনার কাছে কর্তব্য-অকর্তব্য, সুখ-দুঃখ ইত্যাদির বিরোধ নেই। আপনার শক্তি এমনই মহান যে, আপনার ইচ্ছা অনুসারে আপনি যে কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন এবং ধ্বংস করতে পারেন। এই শক্তির প্রভাবে আপনার পক্ষে অসম্ভব কি হতে পারে? আপনার স্বরূপে যেহেতু কোন দ্বৈত ভাব নেই, তাই আপনি আপনার শক্তির প্রভাবে সব কিছুই করতে পারেন। একটি রজ্জু মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তির কাছে সর্পের মতো প্রতিভাত হয়ে ভয় উৎপাদন করে, কিন্তু যথার্থ বুদ্ধি সমন্বিত ব্যক্তি জানেন যে, তা কেবল একটি রজ্জু। তেমনই, আপনি, সকলের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে তাদের বুদ্ধি অনুসারে ভয় এবং অভয় উৎপাদন করেন, কিন্তু আপনার মধ্যে কোন দ্বৈতভাব নেই। বিচার করলে দেখা যায় যে, যিনি নানারূপে প্রতীত হন, সেই পরমাত্মাই প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর মূলতত্ত্ব। মহত্তত্ত্ব জড় জগতের কারণ, কিন্তু সেই মহত্তত্ত্বের কারণও হচ্ছেন তিনি। তাই তিনি হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ। তিনি বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক। তিনি অন্তর্যামীরূপে উপলক্ষিত হন। তাঁর অভাবে সব কিছুই মৃত। সেই পরমাত্মা, পরম ঈশ্বর, আপনি ভিন্ন আর কেউই নন। অতএব, হে মধুসূদন যাঁরা আপনার মহিমা সমুদ্রের এক বিন্দু অমৃত আস্বাদন করেছেন, তাঁদের মনে নিরন্তর আনন্দের ধারা প্রবাহিত হতে তাকে। এই প্রকার মহান ভক্তি মায়িক দৃষ্টি এবং শ্রুতিজাত বিষয় সুখের আভাস বিস্মৃত হন। সমস্ত বিষয়-বাসনা থেকে মুক্ত এই মহাভাগবতেরা সমস্ত জীবের প্রকৃত সুহৃদ। তাঁদের মন সর্বতোভাবে আপনাতে নিবেদন করে এবং চিন্ময় আনন্দ আস্বাদন করে তাঁরা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনে নিপুণ। হে ভগবান, আপনি এই ভক্তদের পরম আত্মা এবং পরম সুহৃদ, যাঁরা কখনও এই জড় জগতে ফিরে আসেন না। তাঁরা কিভাবে আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবা পরিত্যাগ করতে পারেন?”
“হে ভগবান, হে ত্রিভুবন-স্বরূপ, ত্রিভুবনের জনক! হে বামন রূপধারী ত্রিবিক্রম! হে নৃসিংহদেবরূপী ত্রিনয়ন! হে ত্রিলোক মনোহর! মনুষ্য, দৈত্য, দানব সকলেই আপনার শক্তির প্রকাশ। হে পরম শক্তিমান, অসুরেরা যখন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন তাদের দণ্ড দান করার জন্য আপনি বিভিন্নরূপে সর্বদা অবতরণ করেন। আপনি বামনদেব, রামচন্দ্র ও কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি কখনও কখনও বরাহ আদি পশুরুপে আবির্ভূত হন, কখনও নৃসিংহদেব এবং হয়গ্রীব- এই মিশ্ররূপে আবির্ভূত হন এবং কখনও মৎস্য, কূর্ম আদি জলচররূপে আবির্ভূত হন। এইভাবে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে আপনি সর্বদা অসুর এবং দানবদের দণ্ড দান করেন। আমরা তাই আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আপনি পুনরায় আবির্ভূত হন এবং যদি উপযুক্ত মনে করেন, তা হলে বৃত্রাসুরকে সংহার করুন।”
“হে পরম রক্ষক, হি পিতামহ, হে পরম পবিত্র ভগবান! আমরা সকলে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত আত্মা। আপনার চরণারবিন্দ-যুগলের ধ্যানে আমাদের চিত্ত প্রেমরূপ শৃঙ্খলের দ্বারা শৃঙ্খলিত। আপনি কৃপাপূর্বক অবতাররূপে নিজেকে প্রকাশিত করুন। আমাদের আপনার নিত্য দাস এবং ভক্ত বলে গ্রহণ করে, আমাদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে আমাদেরকে অনুকম্পা প্রদর্শন করুন। আপনার প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিপাতের দ্বারা, শতীল করুণাঘন হাসির দ্বারা এবং আপনার সুন্দর মুখ থেকে নিঃসৃত অমৃত মধুর বাণীর দ্বারা আমাদের বৃত্রভয়জনিত হৃদয়ের সমস্ত বেদনা প্রশমিত করুন।”
“হে ভগবান, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যেমন সমগ্র অগ্নির কার্য করতে পারে না, তেমনই আপনার অংশস্বরূপ আমরা আপনাকে আমাদের জীবনের আবশ্যকতাগুলি জানাতে অক্ষম। আপনি পূর্ণ ব্রহ্ম। তাই আপনাকে আমরা কি জানাতে পারি? আপনি সব কিছুই জানেন, কারণ আপনি সর্বকারণের পরম কারণ, সমগ্র জগতের পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা। আপনি সর্বদা আপনার চিৎশক্তিতে এবং জড়শক্তিতে লীলা-বিলাস করেন, কারণ আপনিই এই সমস্ত শক্তির নিয়ন্তা। আপনি সমস্ত জীবের এবং জড় জগতের অন্তরে বিরাজ করেন এবং বাইরেও বিরাজ করেন। আপনি অন্তরে পরব্রহ্মরূপে এবং বাইরে জড় সৃষ্টির উপাদানরূপে বিরাজ করেন। তাই যদিও আপনি বিভিন্ন অবস্থায়, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন শরীরে প্রকট হন, তবু আপনি সর্বকারণের পরম কারণ পরমেশ্বর ভগবান। বস্তুতপক্ষে আপনিই মূলতত্ত্ব। আপনি সমস্ত কার্যকলাপের সাক্ষী, কিন্তু আপনি যেহেতু আকাশের মতো সর্বব্যাপ্ত, তাই কেউই আপনাকে স্পর্শ করতে পারে না। পরব্রহ্ম এবং পরমাত্মারূপে আপনিই সব কিছুর সাক্ষী। হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনার অজ্ঞাত কিছুই নেই। হে ভগবান, আপনি সর্বজ্ঞ, তাই আপনি ভালভাবেই জানেন, কেন আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেছি, যে পাদপদ্মের ছায়া সমস্ত জড়-জাগতিক ক্লেশের উপশম করে। যেহেতু আপনি পরম গুরু এবং আপনি সব কিছুই জানেন, তাই আমরা আপনার উপদেশের জন্য আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছি। দয়া করে আপনি আমাদের দুঃখ-দুর্দশা নিবৃত্তি সাধন করে আমাদের শান্তি প্রদান করুন। আপনার শ্রীপাদপদ্মেই শরণাগত ভক্তের একমাত্র আশ্রয় এবং এই জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি সাধনের একমাত্র উপায়। অতএব, হে পরমেশ্বর, হে শ্রীকৃষ্ণ ত্বষ্টানন্দন এই ভয়ঙ্কর বৃত্রাসুরকে আপনি সংহার করুন, যে আমাদের অস্ত্র, আয়ুধ এবং তেজরাশি গ্রাস করেছে।”
“হে ভগবান, হে পরম পবিত্র, আপনি সকলের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে বিরাজ করে বদ্ধ জীবেদের সমস্ত বাসনা এবং কার্যকলাপ নিরীক্ষিণ করেন। হে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, আপনার যশ অত্যন্ত উজ্জ্বল। আপনার আদি নেই, কারণ আপনি সব কিছুর আদি। শুদ্ধ ভক্তেরা সেই কথা জানেন, কারণ যাঁরা শুদ্ধ এবং সত্যনিষ্ঠ, তাঁরা অনায়াসে আপনাকে লাভ করতে পারেন। বদ্ধ জীবেরা যখন কোটি কোটি বছর ধরে এই জড় জগতে ভ্রমণ করার পর মুক্ত হয়ে আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেন, তখন তাঁরা জীবনের পরম সাফল্য লাভ করেন। তাই, হে ভগবান, আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দেবতারা যখন ভগবানকে এইভাবে ঐকান্তিক প্রার্থনা নিবেদন করেছিলেন, তখন ভগবান তাঁর অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে তা শ্রবণ করেছিলেন। প্রসন্ন হয়ে তিনি তখন দেবতাদের বলেছিলেন- হে প্রিয় দেবতাগণ, তোমরা যে আমার উদ্দেশ্যে জ্ঞানগর্ভ স্তুতি নিবেদন করেছ, তাতে আমি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। এই জ্ঞানের প্রভাবেই মুক্তি লাভ হয় এবং আমার প্রতি ঐশ্বর্যময় স্মৃতির উদয় হয়। তখন সে জড় জগতের অতীত আমার দিব্য পদ উপলব্ধি করতে পারে। এই প্রকার ভক্ত পূর্ণ জ্ঞানে আমার স্তব করার ফলে পূর্ণরূপে পবিত্র হয়। এটি আমার ভক্তির উৎস।”
“হে বিবুধ শ্রেষ্ঠগণ, এই কথা যদিও সত্য যে, আমি প্রসন্ন হলে কোন বস্তুই দুর্লভ থাকে না, তবু আমার অনন্য ভক্ত যার মন সর্বতোভাবে আমাতে একনিষ্ঠ হয়েছে, সে আমার প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ ব্যতীত অন্য কিছুই আমার কাছে প্রার্থনা করে না। যারা জড় সম্পদকেই সব কিছু বলে মনে করে অথবা তাদের জীবনের পরম লক্ষ্য বলে মনে করে, তাদের বলা হয় কৃপণ। আত্মার পরম প্রয়োজন যে কি তা তারা জানে না। সেই প্রকার মূর্খদের যা বাঞ্ছিত, তা যদি কেউ তাদের দান করে, তা হলে বুঝতে হবে যে, সেও তাদেরই মতো মূর্খ। ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে পূর্ণরূপে অভিজ্ঞ শুদ্ধ ভক্ত কখনও মূর্খ ব্যক্তিকে জড় সুখভোগের জন্য সকাম কর্মে যুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেন না, আর তাকে সেই কর্মে সাহায্য করা তো দূরের কথা। রোগী চাইলেও অভিজ্ঞ বৈদ্য তাকে অপথ্য খেতে দেন না, এই প্রকার ভক্তও অজ্ঞ ব্যক্তিদের সকাম কর্মে প্রবৃত্ত হতে দেন না।”
“হে মঘবন্ (ইন্দ্র), তোমাদের মঙ্গল হোক। তোমরা ঋষিশ্রেষ্ঠ দধীচির কাছে যাও। বিদ্যা, ব্রত ও তপস্যার দ্বারা তাঁর শরীর অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে। অবিলম্বে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর ঐ দেহ প্রার্থনা কর। সেই দধ্যঞ্চ ঋষি, যিনি দধীচি নামেও পরিচিত, স্বয়ং ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করে সেই ব্রহ্মজ্ঞান অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে দান করেছিলেন। কথিত আছে যে, দধ্যঞ্চ অশ্বশির ধারণ করে তাঁদের সেই মন্ত্র দান করেছিলেন। তাই সেই মন্ত্রকে বলা হয় অশ্বশির। দধীচির কাছ থেকে সেই মন্ত্র লাভ করে, অশ্বিনীকুমারদ্বয় জীবন্মুক্ত হয়েছেন। দধ্যঞ্চ নারায়ণ-কবচ নামক দুর্ভেদ্য বর্ম ত্বষ্টাকে দিয়েছিলেন, ত্বষ্টা তাঁর পুত্র বিশ্বরূপকে তা দান করেন এবং বিশ্বরূপের কাছ থেকে তোমরা তা প্রাপ্ত হয়েছ। সেই নারায়ণ-কবচের বলে দধীচির শরীর অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে। তোমরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর সেই দেহটি প্রার্থনা কর। অশ্বিনীকুমারদ্বয় যখন তোমাদের জন্য তাঁর শরীর প্রার্থনা করবেন, তখন তোমাদের প্রতি স্নেহবশত তিনি অবশ্যই তা দান করবেন। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ করো না। কারণ দধ্যঞ্চ অতিশয় ধর্মজ্ঞ। দধ্যঞ্চ তাঁর শরীর দান করলে তাঁর অস্থি দিয়ে বিশ্বকর্মা বজ্র নির্মাণ করবে। সেই বজ্রের দ্বারা বৃত্রাসুরকে সংহার করা সম্ভব হবে, কারণ আমার শক্তির দ্বারা বজ্রের তেজ বর্ধিত হবে। আমার শক্তির প্রভাবে বৃত্রাসুর নিহত হলে, তোমরা তোমাদের তেজ, অস্ত্র, আয়ুধ এবং সম্পদ ফিরে পাবে। এইভাবে তোমাদের সকলের মঙ্গল হবে। বৃত্রাসুর ত্রিভুবন ধ্বংস করতে পারলেও তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সেই জন্য ভয় করো না। সেও আমার ভক্ত, তাই তোমাদের প্রতি সে কখনো হিংসা করবে না।”

Leave a Reply

December 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits