শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, তারপর ব্রহ্মার অনুরোধে প্রাচেতস নামে পরিচিত প্রজাপতি দক্ষ, তাঁর পত্নী অসিক্লীর গর্ভে ষাটটি কন্যাসন্তান উৎপাদন করেছিলেন। সেই কন্যারা সকলেই তাঁদের পিতার প্রতি অত্যন্ত প্রীতিপরায়ণা ছিলেন। তিনি দশটি কন্যা ধর্মরাজকে, তেরটি কশ্যপকে (প্রথমে বারোটি এবং তারপর একটি), সাতাশটি চন্দ্রদেবকে এবং অঙ্গিরা, কৃশাশ্ব ও ভূতকে দুটি দুটি করে কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন। অন্য চারটি কন্যা তিনি কশ্যপকে সম্প্রদান করেছিলেন। (এইভাবে কশ্যপ সর্বসমেত সতেরটি কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন।) এখন আপনি আমার কাছে এই সমস্ত কন্যা এবং তাঁদের বংশধরদের নাম শ্রবণ করুন, যাঁরা ত্রিভুবন পূর্ণ করেছেন।”
“যমরাজকে যে দশটি কন্যা সম্প্রদান করা হয়েছিল, তাঁদের নাম ভানু, লম্বা, ককুদ্, যামি, বিশ্বা, সাধ্যা, মরুত্বতী, বসু, মুহূর্তা এবং সঙ্কল্পা। এখন তাঁদের পুত্রদের নাম শ্রবণ করুন। হে রাজন্, ভানুর গর্ভে দেবঋষভ নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং তাঁর থেকে ইন্দ্রসেন নামক একটি পুত্রের জন্ম হয়। লম্বার গর্ভে বিদ্যোত নামক একটি পুত্রের জন্ম হয়, বিদ্যোত থেকে মেঘসমূহ জন্মগ্রহণ করে। ককুদের গর্ভে সঙ্কট নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং সঙ্কট থেকে কীকট নামক পুত্রের জন্ম হয়। কীকট থেকে দুর্গা নামক দেবতাদের জন্ম হয়। যামির থেকে স্বর্গ নামক পুত্রের জন্ম হয় এবং স্বর্গ থেকে নন্দির জন্ম হয়। বিশ্বার পুত্রেরা হচ্ছে বিশ্বদেবগণ, তাঁদের কোন সন্তান নেই। সাধ্যার গর্ভে সাধ্যগণের জন্ম হয় এবং সাধ্যগণ থেকে অর্থসিদ্ধি জন্মগ্রহণ করে। মরুত্বতীর গর্ভে মরুত্বান্ এবং জয়ন্ত জন্মগ্রহণ করে। জয়ন্ত ভগবান বাসুদেবের অংশ; তিনি উপেন্দ্র নামে পরিচিত। মুহূর্তার গর্ভে মৌহূর্তিক নামক দেবতাগণ জন্মগ্রহণ করেন। এই দেবতারা জীবদের স্ব-স্ব কালজাত কর্মফল প্রদান করেন। সঙ্কল্পার পুত্র সঙ্কল্প এবং সঙ্কল্প থেকে কামের জন্ম হয়। বসুর পুত্র অষ্টবসু। তাঁদের নাম আমার কাছে শ্রবণ করুন- দ্রোণ, প্রাণ, ধ্রুব, অর্ক, অগ্নি, দোষ, বাস্তু ও বিভাবসু। এঁরাই অষ্টবসু নামে বিখ্যাত। দ্রোণ নামক বসুর পত্নী অভিমতির গর্ভে হর্ষ, শোক, ভয় আদি নামক পুত্রদের জন্ম হয়। প্রাণের পত্নী ঊর্জস্বতীর গর্ভে সহ, আয়ু ও পুরোজব নামক তিন পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ধ্রুবের পত্নী ধরণির গর্ভ থেকে বিবিধ পুরসমূহ উৎপন্ন হয়। অর্কের পত্নী বাসনার গর্ভে তর্ষ আদি বহু পুত্রের জন্ম হয়। অগ্নি নামক বসুর ভার্যা ধারা দ্রবিণক আদি বহু পুত্র প্রসব করেন। অগ্নির আর এক পত্নী কৃত্তিকার গর্ভে স্কন্দ বা কার্তিকেয়র জন্ম হয়। স্কন্দ থেকে বিশাখ আদি পুত্রের জন্ম হয়। দোষ নামক বসুর ভার্যা শর্বরীর গর্ভে ভগবান শ্রীহরির অংশসম্ভুত শিশুমার নামক পুত্রের জন্ম হয়। বাস্তু নামক বসুর পত্নী আঙ্গিরসীর গর্ভে শিল্পাচার্য বিশ্বকর্মা জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বকর্মা হচ্ছেন আকৃতীর পতি। তাঁদের থেকে চাক্ষুষ মনুর জন্ম হয়। বিশ্বদেব এবং সাধ্যগণ এই মনুর পুত্র। বিভাবসুর পত্নী ঊষা, ব্যুষ্ট, রোচিষ এবং আতপ নামক তিনটি পুত্র প্রসব করেন। আতপ থেকে পঞ্চযাম বা দিবসের উৎপত্তি হয়, যিনি জীবদের স্বীয় কর্মে অনুপ্রাণিত করেন। ভূতের পত্নী সরূপার গর্ভে যে কোটি সংখ্যক রুদ্রের জন্ম হয়, তাদের মধ্যে এগার জন প্রধান। সেই একাদশ রুদ্রের নাম রৈবত, অজ, ভব, ভীম, বাস, উগ্র, বৃষাকপি, অজৈকপাৎ, অর্হির্ব্রধ্ন, বহুরূপ এবং মহান্। ভূতের অপর পত্নীর গর্ভে একাদশ রুদ্রের সহচর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর প্রেত, বিনায়ক প্রভৃতির জন্ম হয়। প্রজাপতি অঙ্গিরার স্বধা এবং সতী নামক দুই পত্নী। স্বধা নাম্নী পত্নী সমস্ত পিতৃদের তাঁর পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন এবং সতী অথর্বাঙ্গিরস বেদকে তাঁর পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। কৃশশ্বের অর্চস্ এবং ধিষণা নামক দুই পত্নী। অর্চিস্ নামক পত্নীর গর্ভে তিনি ধুমকেতু এবং ধিষণার গর্ভে দেবশিরা, দেবল, বয়ুন এবং মনু নামক চার পুত্র উৎপাদন করেন। তার্ক্ষ্য অর্থাৎ কশ্যপের চার পত্নী- বিনতা (সুপর্ণা), কদ্রূ, পতঙ্গী এবং যামিনী। পতঙ্গী নানা প্রকার পক্ষীদের প্রসব করেন এবং যামিনী শলভগণকে প্রসব করেন। বিনতা (সুপর্ণা) ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বাহন গরুড় এবং সূর্যের রথের সারথি অনূরু বা অরুণ- এই দুটি পুত্র প্রসব করেছেন। কদ্রূর গর্ভে বিভিন্ন প্রকার নাগদের জন্ম হয়।”
“হে ভারতশ্রেষ্ঠ মহারাজ পরীক্ষিৎ, কৃত্তিকা আদি নক্ষত্রগণ চন্দ্রদেবের পত্নী ছিলেন। প্রজাপতি দক্ষ চন্দ্রকে ‘যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হও’ বলে অভিশাপ প্রদান করেন। তাই তাঁর কোন পত্নীর গর্ভের সন্তান উৎপন্ন হয়নি। তারপর চন্দ্রদেব বিবিধ বিনয় বাক্যের দ্বারা প্রজাপতি দক্ষকে প্রসন্ন করে কলাসমূহকে লাভ করেছিলেন, কিন্তু তিনি সন্তান লাভ করতে পারেননি। এই কলাসমূহ কৃষ্ণপক্ষে ক্ষয় হয় এবং শুক্লপক্ষে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, এখন কশ্যপের পত্নীদের নাম শ্রবণ করুন, যাঁদের গর্ভে এই ব্রহ্মাণ্ড পূর্ণকারী সমস্ত প্রাণীদের জন্ম হয়েছিল। তাঁদের নাম শ্রবণ করলে পরম মঙ্গল লাভ হয়। তাঁরা হচ্ছেন- অদিতি, দিতি, দনু, কাষ্ঠা, অরিষ্টা, সুরসা, ইলা, মুনি, ক্রোধবশা, তাম্রা, সুরভি, সরমা এবং তিমি। তিমির গর্ভে সমস্ত জলচর প্রাণীর জন্ম হয় এবং সরমার গর্ভে সিংহ, ব্যাঘ্র আদি সমস্ত হিংস্র জন্তুদের জন্ম হয়।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, সুরভির গর্ভ থেকে মহিষ, গাভী এবং দুই খুরবিশিষ্ট অন্যান্য জন্তুরা জন্মগ্রহণ করে। তাম্রার গর্ভ থেকে শ্যেন, শকুনি প্রভৃতি বিশাল শিকারী পক্ষীদের জন্ম হয় এবং মুনির গর্ভ থেকে অপ্সরাদের জন্ম হয়। ক্রোধবশার গর্ভ থেকে দন্দশূক নামক সরীসৃপ, অন্যান্য সর্প এবং মশার জন্ম হয়। সমস্ত বৃক্ষ-লতার জন্ম হয় ইলার গর্ভ থেকে। সুরসার গর্ভে রাক্ষসদের জন্ম হয়। অরিষ্টার গর্ভে গন্ধর্বদের জন্ম হয় এবং অশ্ব আদি পশু, যাদের খুর বিভক্ত নয়, তাদের জন্ম হয়েছে কাষ্ঠার গর্ভে। হে রাজন্, দনুর গর্ভে একষট্টিটি পুত্রের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে আঠারো জন প্রধান। তাদের নাম- দ্বিমূর্ধা, শম্বর, অরিষ্ট, হয়গ্রীব, বিভাবসু, অয়োমুখ শঙ্কশিরা, স্বর্ভানু, কপিল, অরুণ, পুলোমা, বৃষপর্বা, একচক্র, অনুতাপন, ধূম্রকেশ, বিরূপাক্ষ, বিপ্রচিত্তি এবং দুর্জয়। স্বর্ভানুর সুপ্রভা নামক এক কন্যা ছিল, নমুচির সঙ্গে তার বিবাহ হয়। বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠাকে নহুষের পুত্র অত্যন্ত বলবান মহারাজ যযাতি বিবাহ করেন। দনুর পুত্র বৈশ্বানরের উপদানবী, হয়শিরা, পুলোমা এবং কালকা নামক চারটি অতি সুন্দরী কন্যা ছিল। উপদানবীর সঙ্গে হিরণ্যাক্ষের এবং ক্রতুর সঙ্গে হয়শিরার বিবাহ হয়। তারপর ব্রহ্মার অনুরোধে প্রজাপতি কশ্যপ বৈশ্বানরের অপর দুই কন্যা পুলোমা এবং কালকাকে বিবাহ করেন। এই দুই পত্নীর গর্ভে কশ্যপ নিবাতকবচ আদি ষাট হাজার পুত্র উৎপন্ন করেন, যারা পৌলোমা এবং কালকেয় নামে পরিচিত। তারা অত্যন্ত বলবান ও যুদ্ধপ্রিয় ছিল ও তারা সর্বদা মুনি-ঋষিদের যজ্ঞের ব্যাঘাত সৃষ্টি করত। হে রাজন্, আপনার পিতামহ অর্জুন যখন স্বর্গলোকে গিয়েছিলেন, তখন তিনি একাকী সেই সমস্ত দানবদের সংহার করেন এবং তার ফলে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রিয়পাত্র হয়েছিলেন। সিংহিকার গর্ভে বিপ্রচিত্তির এক শত এক পুত্রের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে রাহু জ্যেষ্ঠ এবং অন্য এক শত কেতু। তারা সকলেই প্রভাবশালী গ্রহে স্থান লাভ করেছে।”
“এখন আমি ক্রমানুসারে অদিতির বংশ বর্ণনা করছি, আপনি তা শ্রবণ করুন। এই বংশে পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণ তাঁর অংশে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অদিতির পুত্রদের নাম- বিবস্বান, অর্যমা, পূষা, ত্বষ্টা, সবিতা, ভগ, ধাতা, বিধাতা, বরুণ, মিত্র, শত্রু এবং উরুক্রম। সূর্যদেব বিবস্বানের পত্নী সংজ্ঞার গর্ভে শ্রাদ্ধদেব নামক মনুর জন্ম হয়। সেই মহাভাগ্যবতী সংজ্ঞাই যমদেবকে ও যমুনাকে যমজ সন্তানরূপে প্রসব করেন। তারপর যমী অশ্বিনীরূপ ধারণ করে যখন পৃথিবীতে বিচরণ করছিলেন, তখন তিনি অশ্বিনীকুমাদ্বয়কে প্রসব করেন। সূর্যের অপর পত্নী ছায়া শনৈশ্চর এবং সাবর্ণি মনু- এই দুই পুত্র ও তপতী নাম্নী একটি কন্যা প্রসব করেন। তপতী সংবরণকে পতিরূপে বরণ করেন। অর্যমার পত্নী মাতৃকার গর্ভে বহু জ্ঞানবান পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা আত্ম অনুসন্ধানের প্রবৃত্তি সমন্বিত, ব্রহ্মা তাঁদের মধ্যে থেকে মনুষ্য জাতি সৃষ্টি করেন। পূষার কোন সন্তান ছিল না। শিব যখন দক্ষের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, পূষা তখন তাঁর দন্ত বিকশিত করে শিবকে দেখে হেসেছিলেন। তার ফলে তাঁর দন্ত-সমূহ ভগ্ন হয়েছে এবং তাই তাঁকে পিষ্টক ভক্ষণ করে জীবন ধারণ করতে হয়। দৈত্যকন্যা রচনা ছিলেন প্রজাপতি ত্বষ্টার পত্নী। তাঁর গর্ভে সন্নিবেশ এবং বিশ্বরূপ নামক দুটি অত্যন্ত বীর্যবান পুত্রের জন্ম হয়। বিশ্বরূপ যদিও তাঁদের চিরশত্রু দৈত্যদের ভাগিনেয় ছিল, তবুও দেবতারা তাঁদের গুরু বৃহস্পতিকে অপমান করার ফলে এবং তাঁর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে ব্রহ্মার আদেশে বিশ্বরূপকে পৌরহিত্যে বরণ করেছিলেন।”
ষষ্ঠ অধ্যায়- দক্ষকন্যাদের বংশ
30 Nov 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম