মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষে, দেবগুরু বৃহস্পতি তার শিষ্য দেবতাদের কেন পরিত্যাগ করেছিলেন? দেবতারা তাঁর চরণে কি অপরাধ করেছিলেন? দয়া করে তা আমার কাছে বর্ণনা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এক সময় দেবরাজ ইন্দ্র ত্রিভুবনের ঐশ্বর্য লাভে মদমত্ত হয়ে বৈদিক সদাচার লঙ্ঘন করেছিলেন। তিনি মরুদগণ, বসুগণ, রুদ্রগণ, আদিত্যগণ, ঋভুগণ, বিশ্বদেবগণ, সাধ্যগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব এবং ব্রহ্মবাদী মুনিগণ কর্তৃক পরিবৃত হয়ে সভামণ্ডলে সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। বিদ্যাধর, অপ্সরা, কিন্নর, পতগ ও উরগেরা তাঁর সেবা এবং স্তব করছিলেন এবং অপ্সরা ও গন্ধর্বেরা তাঁর সম্মুখে অতি মধুর স্বরে গান করছিলেন। পূর্ণ চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল শ্বেত ছত্র ইন্দ্রের মস্তকের উপর শোভা পাচ্ছিল এবং চামর, ব্যজন প্রভৃতি মহারাজ চক্রবর্তীর চিহ্নসমূহ সমন্বিত হয়ে ইন্দ্র তাঁর পত্নী শচীদেবী সহ সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন; তখন মহর্ষি বৃহস্পতি সেই সভায় এসে উপস্থিত হন। মুনিশ্রেষ্ঠ বৃহস্পতি ইন্দ্র এবং দেবতাদের গুরুদেব এবং তিনি সুর ও অসুর সকলেরই সম্মানিত। কিন্তু ইন্দ্র তাঁর গুরুদেবকে দর্শন করা সত্ত্বেও তাঁর আসন থেকে উঠে অভ্যর্থনা করলেন না অথবা তাঁর গুরুদেবকে আসন প্রদান করলেন না। এইভাবে ইন্দ্র তাঁকে কোন প্রকার সম্মান প্রদর্শন করলেন না।”
“ভবিষ্যতে কি হবে বৃহস্পতি তা সবই জানতেন। ইন্দ্রের এই অসদ্ব্যবহার দর্শন করে তিনি বুঝতে পারলেন যে, ইন্দ্র তার ঐশ্বর্য মদে মত্ত হয়েছে। যদিও তিনি ইন্দ্রকে অভিশাপ দিতে সমর্থ ছিলেন তবুও তিনি তা করেননি। তিনি মৌনভাবে সভা ত্যাগ করে তাঁর নিজের গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।”
“দেবরাজ ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি যে তাঁর গুরুদেবের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন সেই কথা বুঝতে পেরে, তিনি সেই সভায় উপস্থিত সকলের সামনেই নিজের নিন্দা করতে লাগলেন। হায়, জড় ঐশ্বর্যের গর্বে গর্বিত হয়ে, অল্পবুদ্ধিবশত আমি কি শোচনীয় অন্যায় করেছি। সভায় সমাগত গুরুদেবকে অভ্যর্থনা না করে, আমি তাঁকে অপমান করেছি। যদিও আমি সাত্ত্বিক প্রকৃতি দেবতাদের রাজা, তবুও আমি সামান্য ধনমদে মত্ত হয়ে অহঙ্কারের দ্বারা কলুষিত হয়েছি। এই জগতে এই ধন-ঐশ্বর্য কে গ্রহণ করতে চায়, যার ফলে অধঃপতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে? হায়! আমার এই ঐশ্বর্যকে ধিক্। যদি কেউ বলে, ‘রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে অন্য রাজা অথবা ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার জন্য সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে না,’ বুঝতে হবে যে, সেই ব্যক্তি ধর্মের নীতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। যে সমস্ত নেতারা অজ্ঞানের অন্ধকারে পতিত হয়েছে এবং যারা ধ্বংসের পথ প্রদর্শন করে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে, তারা প্রকৃতপক্ষে পাথরের তৈরী নৌকায় করে সমুদ্র পার হওয়ার চেষ্টা করেছ। যারা অন্ধের মতো তাদের অনুসরণ করে, তারাও অচিরেই তাদের সঙ্গে নিমজ্জিত হবে, তেমনি যারা মানুষকে কুপথে পরিচালিত করে, তারা নরকগামী হয়, তাদের অনুগামীরাও তাদের সঙ্গে নরকে যায়।”
দেবরাজ ইন্দ্র বললেন- “তাই আমি এখন সরলভাবে নিষ্কপটে দেবগুরু বৃহস্পতির চরণকমলে আমার মস্তক অবনত করব, কারণ তিনি সমস্ত জ্ঞান পূর্ণরূপে আহরণ করেছেন এবং তিনি হচ্ছেন সর্বতোভাবে সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত ব্রাহ্মণ। আমি আমার মস্তকের দ্বারা তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করে তাঁর প্রসন্নতা বিধানের চেষ্টা করব। দেবরাজ ইন্দ্র যখন এইভাবে তাঁর নিজের সভায় চিন্তা করছিলেন এবং অনুতাপ করছিলেন, তখন পরম শক্তিমান গুরু বৃহস্পতি তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে, তাঁর গৃহ ত্যাগ করে তাঁর আত্মমায়ার দ্বারা অদৃশ্য হয়েছিলেন, কারণ বৃহস্পতি আধ্যাত্মিক চেতনায় দেবরাজ ইন্দ্রের থেকে অনেক উন্নত ছিলেন। ইন্দ্র যদিও অন্য দেবতাগণ সহ সর্বত্র বৃহস্পতিকে খুঁজলেন, কিন্তু কোথাও তাঁকে খুঁজে পেলেন না। তখন ইন্দ্র ভাবলেন, ‘হায়, আমার গুরুদেব আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এখন আমার সৌভাগ্য লাভের আর কোন উপায় নেই।’ ইন্দ্র যদিও দেবতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন, তবুও তিনি মানসিক শান্তি পেলেন না।”
“ইন্দ্রের এই দুর্দশার কথা শুনে, দুষ্টমতি অসুরেরা তাদের গুরু শুক্রাচার্যের নির্দেশ অনুসারে, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। অসুরদের তীক্ষ্ম বাণের আঘাতে দেবতাদের মস্তক, ঊরু, বাহু প্রভৃতি অঙ্গ-সমূহ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। তখন ইন্দ্রাদি দেবতারা উপায়ন্তর না দেখে অবনত মস্তকে ব্রহ্মাণ শরণাপন্ন হয়েছিলেন।”
পরম শক্তিমান ব্রহ্মা যখন দেখলেন যে, অসুরদের বাণের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত দেহে দেবতারা তাঁর কাছে আসছেন, তখন তিনি অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে তাঁদের সান্ত্বনা প্রদান করে বলতে লাগলেন- “হে সুরশ্রেষ্ঠগণ, দুর্ভাগ্যবশত ঐশ্বর্যমদে মত্ত হয়ে তোমরা তোমাদের সভায় সমাগত বৃহস্পতিকে যথাযথভাবে অভ্যর্থনা করনি। যেহেতু তিনি পরমব্রহ্ম সম্বন্ধে অবগত এবং সর্বতোভাবে ইন্দ্রিয়-দমনশীল, তাই তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ। অতএব এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, তোমরা তাঁর প্রতি এই প্রকার দুর্ব্যবহার করেছ। হে দেবতাগণ, বৃহস্পতির প্রতি তোমাদের অন্যায় আচরণের ফলেই তোমরা অসুরদের দ্বারা পরাজিত হয়েছ। অসুরেরা তোমাদের থেকে দুর্বল, পূর্বে তারা কয়েকবার তোমাদের কাছে পরাজিত হয়েছ, তা হলে তোমরা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছে পরাজিত হলে কেন? যে ইন্দ্র, পূর্বে তোমার শত্রু দৈত্যরা তাদের গুরু শুক্রাচার্যের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করার ফলে দুর্বল হয়েছিল, কিন্তু এখন গভীর ভক্তি সহকারে শুক্রাচার্যের আরাধনা করার ফলে, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে। শুক্রাচার্যের প্রতি তাদের ভক্তি বলে তারা এতই শক্তিশালী হয়েছে যে, এখন তারা আমার ধামও অনায়াসে অধিকার করে নিতে পারে। শুক্রাচার্যের শিষ্য অসুরেরা তাদের গুরুর নির্দেশ পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়ার ফলে, দেবতাদের গণনাই করছে না। প্রকৃতপক্ষে, রাজা অথবা অন্যান্য যে সমস্ত ব্যক্তিরা ব্রাহ্মণ, গাভী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপার প্রতি দৃঢ় শ্রদ্ধাপরায়ণ এবং যাঁরা সর্বদা এই তিনের পূজা করেন, তাঁদের কখনও অমঙ্গল হয় না। হে দেবতাগণ, ত্বষ্টার পুত্র বিশ্বরূপকে তোমাদের গুরুরূপে বরণ কর। তিনি একজন শুদ্ধ, তপস্বী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ব্রাহ্মণ। তোমরা যদি অসুরদের প্রতি তাঁর পক্ষপাত সহ্য করে তাঁর ভজনা কর, তা হলে তিনি তোমাদের বাসনা পূর্ণ করবেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে ব্রহ্মা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে এবং তাঁদের উৎকন্ঠা থেকে মুক্ত হয়ে, সমস্ত দেবতারা ত্বষ্টার পুত্র বিশ্বরূপের কাছে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, হে বিশ্বরূপ, তোমার মঙ্গল হোক। আমরা দেবতারা তোমার আশ্রমে অতিথিরূপে এসেছি। আমরা তোমার পিতৃতুল্য, তাই আমাদের সময়োচিত বাসনা পূর্ণ কর। হে ব্রাহ্মণ, পুত্রবান হলেও পিতার সেবা করাই পুত্রের পরম ধর্ম, যাঁরা ব্রহ্মচারী, তাঁদের কথা আর কি বলব? যিনি উপনয়ন প্রদান করে বৈদিক জ্ঞান শিক্ষা দান করেন, সেই আচার্য হচ্ছেন বেদের মূর্তি। তেমনই, পিতা ব্রহ্মার মূর্তি, ভ্রাতা ইন্দ্রের মূর্তি, মাতা সাক্ষাৎ পৃথিবীর মূর্তি, ভগিনী দয়ার মূর্তি, অতিথি স্বয়ং ধর্মের মূর্তি, অভ্যাগত অগ্নিদেবের মূর্তি এবং সমস্ত জীবেরা হচ্ছেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মূর্তি। হে পুত্র, আমরা শত্রুদের কাছে পরাজিত হয়ে অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছি। তুমি তোমার তপোবলের দ্বারা আমাদের সেই দুঃখ দূর কর। আমাদের এই প্রার্থনা তুমি পূর্ণ কর। তুমি যেহেতু পূর্ণরূপে পরব্রহ্মকে জেনেছ, তাই তুমি একজন আদর্শ ব্রাহ্মণ এবং সমস্ত বর্ণের গুরু। আমরা তোমাকে আমাদের গুরু এবং পরিচালক রূপে বরণ করছি, যাতে তোমার তপোবলের প্রভাবে আমরা অনায়াসে শত্রুদের পরাজিত করতে পারি।”
“আমাদের কনিষ্ঠ বলে তুমি মনে কোন নিন্দা আশঙ্কা করো না, বৈদিক মন্ত্রের ক্ষেত্রে এই শিষ্টাচার প্রযোজ্য নয়। বৈদিক মন্ত্র ব্যতীত অন্য সমস্ত ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় বয়সের পরিপ্রেক্ষিতে, কিন্তু বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে অধিক উন্নত হলে কনিষ্ঠও জ্যেষ্ঠের প্রণম্য। অতএব যদিও সম্পর্কের দিক দিয়ে তুমি আমাদের কনিষ্ঠ তবুও তুমিই আমাদের পুরোহিত হবে, সেই জন্য কোন সংকোচ করো না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সমস্ত দেবতারা যখন মহা তপস্বী বিশ্বরূপকে তাঁদের পুরোহিত হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন, তখন তিনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন- হে দেবতাগণ, পৌরোহিত্য পূর্বলব্ধ ব্রহ্মতেজের ক্ষয়কারক বলে যদিও ধর্মশীল মুনিরা তার নিন্দা করেন, তবুও আমি কিভাবে আপনাদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করতে পারি? আপনারা ব্রহ্মাণ্ডের মহান অধ্যক্ষ। আমি আপনাদের শিষ্যসদৃশ এবং আপনাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাই আমার কতর্ব্য। আমি আপনাদের প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। তাই আমার নিজের মঙ্গলের জন্য আমি অবশ্যই আপনাদের অনুরোধ রক্ষা করব। হে বিভিন্ন লোকের অধীশ্বরগণ, শস্যক্ষেত্রে পরিত্যক্ত শস্যকণিকা গ্রহণ করে এবং হাটে পতিত শস্য গ্রহণ করে শিলোঞ্ছন বৃত্তির দ্বারাই আদর্শ অকিঞ্চন ব্রাহ্মণেরা দেহ ধারণ করেন। এইভাবে গৃহস্থ ব্রাহ্মণ তপস্যা করে নিজের এবং পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন এবং সর্বপ্রকার বাঞ্ছনীয় পুণ্যকর্ম অনুষ্ঠান করেন। যে ব্রাহ্মণ পৌরোহিত্য কর্মের দ্বারা ধন উপার্জন করে সুখভোগ করতে চান, তিনি অত্যন্ত নিচ মনোবৃত্তি সম্পন্ন। সেই প্রকার পৌরোহিত্য আমি কিভাবে গ্রহণ করব। আপনারা সকলে আমার গুরুজন। তাই পৌরোহিত্য নিন্দনীয় হলেও, আমি আপনাদের স্বল্পমাত্র প্রার্থনাও প্রত্যাখ্যান করতে পারি না। আমি আমার ধন ও প্রাণ দিয়ে আপনাদের অনুরোধ সাধন করব।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এইভাবে দেবতাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহাতপা বিশ্বরূপ দেবতাগণ পরিবৃত হয়ে পরম উদ্যম এবং মনোযোগ সহকারে পৌরোহিত্য-কার্য সম্পাদন করেছিলেন। শুক্রাচার্যের বিদ্যার দ্বারা যদিও দেবতাদের শত্রু দৈত্যদের ঐশ্বর্য রক্ষিত হয়েছিল, তবুও অত্যন্ত শক্তিমান বিশ্বরূপ নারায়ণ-কবচ নামক এক সুরক্ষাত্মক স্তোত্র রচনা পূর্বক সেই মন্ত্রের দ্বারা দৈত্যদের ঐশ্বর্য আহরণ করে তা মহেন্দ্রকে প্রদান করেছিলেন। অত্যন্ত উদারমতি বিশ্বরূপ সহস্রাক্ষ ইন্দ্রকে যে গুহ্য মন্ত্র প্রদান করেছিলেন, তা ইন্দ্রকে রক্ষা করেছিল এবং দৈত্য সৈন্যদের জয় করেছিল।”
সপ্তম অধ্যায়- দেবগুরু বৃহস্পতিকে ইন্দ্রের অপমান
01 Dec 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম