শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, প্রজাপতি দক্ষ বিষ্ণুমায়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পাঞ্চজনীর (অসিক্লীর) গর্ভে দশ হাজার পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। তাঁরা হর্ষশ্ব নামে পরিচিত।”
“হে রাজন্, প্রজাপতি দক্ষের সেই সমস্ত পুত্রদের স্বভাব ছিল অত্যন্ত নম্র এবং তাঁরা সকলেই ছিলেন তাঁদের পিতার অত্যন্ত বাধ্য। তাঁদের পিতা যখন তাঁদেরকে সন্তান উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা পশ্চিম দিকে গমন করেছিলেন। পশ্চিমে যেখানে সিন্ধুনদী সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেখানে নারায়ণসর নামক একটি তীর্থস্থান রয়েছে। বহু মুনি ঋষি এবং সিদ্ধগণ সেই স্থানে বাস করেন। হর্যশ্বরা সেই পবিত্র তীর্থের জল স্পর্শ করে ও তাতে স্নান করে বিশেষভাবে পবিত্র হয়েছিলেন এবং তাঁদের পারমহংস-ধর্মে মতি হয়েছিল। কিন্তু, যেহেতু তাঁদের পিতা তাঁদের প্রজাবৃদ্ধির আদেশ দিয়েছিলেন, তাই তাঁরা তাঁর বাসনা পূর্ণ করার জন্য কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। একদিন দেবর্ষি নারদ প্রজাসৃষ্টির জন্য তপস্যারত হর্যশ্বদের দেখতে পেয়ে তাঁদের কাছে এসেছিলেন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে হর্যশ্বগণ, তোমরা পৃথিবীর অন্ত দর্শন করনি। সেখানে একটি রাজ্য রয়েছে, যেখানে কেবল একজন মানুষ বিরাজ করেন। সেখানে একটি গর্ত রয়েছে, সেখানে প্রবেশ করলে কেউ বেরিয়ে আসে না। সেখানে একটি স্ত্রী রয়েছে যে অত্যন্ত অসতী এবং সে বিভিন্ন মনোহর বসনের দ্বারা নিজেকে সাজায়, আর সেখানে এক পুরুষ আছে যে তার পতি। সেই রাজ্যে একটি নদী আছে যা উভয় দিকে প্রবাহিত। সেখানে একটি আশ্চর্য গৃহ রয়েছে, যা পঁচিশটি উপাদানের দ্বারা নির্মিত, একটি হংস রয়েছে, যে বহুবিধ শব্দ করে এবং একটি বস্তু আছে যা ক্ষুর ও বজ্রের দ্বারা নির্মিত এবং স্বয়ং ভ্রমণশীল। তোমরা সেই সব দর্শন করনি; সুতরাং তোমরা উন্নত-জ্ঞানহীন অনভিজ্ঞ বালক। অতএব তোমরা প্রজা সৃষ্টি করবে কি করে? হায়, তোমাদের পিতা সর্বজ্ঞ, কিন্তু তোমরা তাঁর প্রকৃত আদেশ জান না। সুতরাং তোমাদের পিতার প্রকৃত উদ্দেশ্য না জেনে, তোমরা কিভাবে প্রজা সৃষ্টি করবে?
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নারদ মুনির সেই হেঁয়ালিপূর্ণ বাক্য শ্রবণ করে, হর্যশ্বেরা তাঁদের স্বাভাবিক বিচারশক্তি-সম্পন্ন বুদ্ধির দ্বারা নিজেরাই তা বিচার করতে লাগলেন।”
“(হর্যশ্বরা নারদ মুনির বাণীর অর্থ এইভাবে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন-) ‘ভূ’ (‘পৃথিবী’) শব্দের অর্থ কর্মক্ষেত্র। কর্মের ফলস্বরূপ উৎপন্ন যে জড় শরীর, তা হচ্ছে জীবের কর্মক্ষেত্র এবং তা তাকে ভ্রান্ত উপাধি প্রদান করে। জীব স্মরণাতীত কাল থেকে বিভিন্ন প্রকার জড় শরীর প্রাপ্ত হয়েছে, যা তার ভববন্ধনের মূলস্বরূপ। কেউ যদি মূর্খতাবশত এই অনিত্য সকাম কর্মে লিপ্ত হয় এবং এই বন্ধন-মুক্তির চেষ্টা না করে, তা হলে তার অনিত্য কর্মের অনুষ্ঠানে কি লাভ হবে?”
“(নারদ মুনি বলেছেন যে, একটি রাজ্য রয়েছে যেখানে একজন মাত্র পুরুষ রয়েছেন। হর্যশ্বেরা তাঁর এই উক্তির তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন।) একমাত্র ভোক্তা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান যিনি সর্বত্র সব কিছুর পর্যবেক্ষক। তিনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ এবং সর্বতোভাবে স্বতন্ত্র। তিনি কখনও জড়া প্রকৃতির গুণের অধীন নন, কারণ তিনি সর্বদা এই জড় সৃষ্টির অতীত। মানব-সমাজ যদি তাদের উন্নত জ্ঞান এবং কার্যকলাপের দ্বারা সেই পরমেশ্বরকে না জেনে, কেবল তাদের অনিত্য সুখভোগের জন্য দিন-রাত কুকুর-বেড়ালের মতো পরিশ্রম করে, তা হলে তাদের সেই কার্যকলাপে কি লাভ?”
“(নারদ মুনি বলেছিলেন যে, একটি বিল বা ছিদ্র রয়েছে যেখানে প্রবেশ করলে, সেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না। হর্যশ্বরা সেই রূপকের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন।) পাতালে প্রবেশ করলে যেমন সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসা যায় না, তেমনি বৈকুন্ঠ নামে (প্রত্যগ্-ধাম) প্রবেশ করলে, সেখান থেকে আর এই জড় জগতে কেউ ফিরে আসে না। এমন কোন স্থান যদি থাকে, যেখানে গেলে আর এই দুঃখময় জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না, তা হলে সেই স্থানটি দর্শন না করে বা জানবার চেষ্টা না করে, কেবল বানরের মতো এই জড় জগতে লাফালাফি করলে কি লাভ হবে?”
“(নারদ মুনি এক বেশ্যা রমণীর বর্ণনা করেছেন। হর্যশ্বেরা সেই রমণীকে চিনতে পেরেছেন।) রজোগুণ সমন্বিত জীবের অস্থির বুদ্ধি একটি বেশ্যার মতো জীবের মোহ উৎপাদনের জন্য তার বেশ পরিবর্তন করে। তা বুঝতে না পেরে মানুষ যদি অনিত্য সকাম কর্মে লিপ্ত হয়, তাতে তার কি লাভ হবে?”
“(নারদ মুনি এক বেশ্যাপতি পুরুষের কথাও বলেছেন। হর্যশ্বেরা সেই বর্ণনাটি এইভাবে বুঝেছিলেন-) কেউ যদি বেশ্যার পতি হয়, তা হলে সে তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে। তেমনই, কলুষিত বুদ্ধিমত্তা সমন্বিত ব্যক্তি তার জড়-জাগতিক জীবনকে বর্ধিত করে। জড়া প্রকৃতির দ্বারা নিরাশ হয়ে সে তার বুদ্ধির গতি অনুসরণ করে, যার ফলে সে বিভিন্ন সুখ এবং দুঃখময় অবস্থা প্রাপ্ত হয়। এইভাবে কেউ যদি সকাম কর্ম অনুষ্ঠান করে, তার ফলে কি লাভ হয়?”
“(নারদ মুনি বলেছিলেন যে, একটি নদী আছে যা উভয় দিকে প্রবাহিত। হর্যশ্বেরা সেই বর্ণনার তাৎপর্য উপলব্ধি করেছিলেন।) সৃষ্টি এবং প্রলয়কারিণী মায়াই সেই নদী। তাই সেই নদীটি উভয় দিকে প্রবাহিত। কেউ যদি অজ্ঞানতাবশত সেই নদীতে পতিত হয়, তা হলে সে তার তরঙ্গে নিমজ্জিত হয় এবং যেহেতু তটের নিকটে সেই নদীর বেগ অত্যন্ত প্রবল, তা সে সেখান থেকে উঠে আসতে পারে না। মায়ারূপ, সেই নদীতে সকাম কর্ম অনুষ্ঠান করে কি লাভ হবে।”
“(নারদ মুনি পঁচিশটি উপাদানের দ্বারা নির্মিত একটি গৃহের কথা বলেছিলেন হর্যশ্বেরা সেই রূপকের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন।) পরমেশ্বর ভগবান পঞ্চবিংশতি তত্ত্বের আশ্রয় এবং পরম পুরুষরূপে তিনি কার্য ও কারণের পরিচালক এবং প্রকাশক। কেউ যদি সেই পরম পুরুষকে না জেনে অনিত্য সকাম কর্মে যুক্ত হয়, তা হলে তা কি লাভ হবে?”
“(নারদ মুনি একটি হংসের কথা বলেছেন। এই ভাবে সেই হংসটির তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে।) বৈদিক শাস্ত্রে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে সমস্ত জড় এবং চিন্ময় শক্তির উৎস ভগবানকে জানা যায়। প্রকৃতপক্ষে, এই দুটি শক্তি সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হংস হচ্ছেন তিনি যিনি জড় এবং চেতনের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারেন, যিনি সব কিছুর সার গ্রহণ কনে এবং বন্ধনের কারণ ও মুক্তির উপায় বিশ্লেষণ করেন। শাস্ত্রের বাণী বিবিধ শব্দ-তরঙ্গ সমন্বিত। কোন মূর্খ যদি এই সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন ত্যাগ করে অনিত্য কার্যকলাপে যুক্ত হয়, তা হলে তার পরিণাম কি হবে?”
“(নারদ মুনি ক্ষুর এবং বজ্রের দ্বারা নির্মিত একটি বস্তুর উল্লেখ করেছিলেন। হর্যশ্বেরা সেই রূপকটির অর্থ এইভাবে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন।) কালের গতি অত্যন্ত সুতীক্ষ্ম, যেন তা ক্ষুর এবং বজ্রের দ্বারা নির্মিত। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং অপ্রতিহতভাবে কাল সারা জগতের সমস্ত কার্যকলাপ পরিচালিত করে। কেউ যদি এই কালচক্রকে জানার চেষ্টা না করে অনিত্য সকাম কর্মের অনুষ্ঠানে মগ্ন হয়, তা হলে তার কি লাভ হবে?”
“(নারদ মুনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন মূর্খতাবশত মানুষ কিভাবে তার পিতার আদেশ অমান্য করতে পারে। এই প্রশ্নের অর্থ হর্যশ্বেরা হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন।) শাস্ত্রনির্দেশ পালন করা অবশ্য কর্তব্য। বৈদিক সংস্কৃতিতে উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমে দ্বিতীয় জন্ম লাভ হয়। সদ্গুরুর কাছ থেকে শাস্ত্রের উপদেশ শিক্ষা লাভের ফলে এই দ্বিতীয় জন্ম লাভ হয়। তাই, শাস্ত্র হচ্ছেন প্রকৃত পিতা। সমস্ত শাস্ত্রে জড়-জাগতিক জীবনের সমাপ্তি সাধনের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি তার পিতা বা শাস্ত্রের উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করতে না পারে, তা হলে সে মূর্খ। জড় দেহের পিতার যে আদেশ পুত্রকে জড়-জাগতিক কার্যকলাপে প্রবৃত্ত করে, তা প্রকৃত পিতার উপদেশ নয়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, নারদ মুনির উপদেশ শ্রবণ করে, প্রজাপতি দক্ষের পুত্রেরা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই তাঁর উপদেশ পূর্ণরূপে বিশ্বাস করেছিলেন এবং একমত হয়েছিলেন। সেই মহর্ষিকে তাঁদের গুরুদেবরূপে বরণ করে তাঁরা তাঁকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন এবং যে পথে গেলে আর এই জগতে ফিরে আসতে হয় না, তাঁরা সেই পথে গমন করেছিলেন। সপ্ত স্বর- ষা, ঋ, গা, মা, পা, ধা এবং নি সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মূলত সেগুলি এসেছে সামবেদ থেকে। দেবর্ষি নারদ ভগবানের লীলা বর্ণনা করে গান করেন। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে- এই আদি চিন্ময় মহামন্ত্রের কীর্তনের প্রভাবে মন ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে একাগ্র হয়। তখন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর হৃষীকেশকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করা যায়। হর্যশ্বদের উদ্ধার করার পর, নারদ মুনি ভগবান শ্রীহৃষীকেশের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর চিত্ত একাগ্র করে সমস্ত গ্রহলোকে ভ্রমণ করতে লাগলেন।”
“প্রজাপতি দক্ষের পুত্র হর্যশ্বেরা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত সুশীল এবং সংস্কৃতি-সম্পন্ন পুত্র, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, নারদ মুনির উপদেশে তাঁরা তাঁদের পিতার আদেশের প্রতি বিমুখ হন। দক্ষ যখন সেই সংবাদ পান, যা নারদ মুনিই তাঁর কাছে বহন করে এনেছিলেন, তখন তিনি শোক করতে শুরু করেন। এই প্রকার সুসন্তানদের পিতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁদের সকলকে হারিয়ে ছিলেন। অবশ্য এটি শোচনীয় বিষয়ই ছিল।”
“প্রজাপতি দক্ষ যখন তাঁর পুত্রদের হারিয়ে শোক করেছিলেন, তখন ব্রহ্মা তাঁকে উপদেশ দিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তাঁরপর দক্ষ তাঁর পত্নী পাঞ্চজনীর গর্ভে আরও এক হাজার পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। তাঁর এই পুত্রেরা সবলাশ্ব নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের পিতার আদেশ অনুসারে সন্তান উৎপাদনের জন্য সবলাশ্বেরাও নারায়ণ সরোবরে গিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারা নারদ মুনির উপদেশ পালন করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তপস্যা করার দৃঢ়ব্রত ধারণ করে সবলাশ্বেরা সেই তীর্থে অবস্থান করেছিলেন। দক্ষের দ্বিতীয় সন্তানের দলটি নারায়ণ সরোবরে তাঁদের অগ্রজদের মতই তপস্যা করেছিলেন। তাঁরা পবিত্র তীর্থের জলে স্নান করে হৃদয়ের সমস্ত জড় বাসনারূপ কলুষ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তাঁরা ওঁকার সমন্বিত মন্ত্র জপ করে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। প্রজাপতি দক্ষের পুত্রেরা কয়েক মাস কেবল জল পান এবং বায়ু ভক্ষণ করেছিলেন। এইভাবে কঠোর তপস্যা করে তাঁরা এই মন্ত্রটি উচ্চারণ করেছিলেন “ওঁ” নমো নারায়ণায় পুরুষায় মহাত্মনে/বিশুদ্ধসত্ত্বধিষ্ণ্যায় মহাহংসায় ধীমহি (আমরা পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যিনি সর্বদা তাঁর চিন্ময় ধামে বিরাজ করেন। যেহেতু তিনি পরম পুরুষ (পরমহংস), তাই আমরা তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।)”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, নারদ মুনি প্রজাসৃষ্টি কামনায় তপস্যারত দক্ষ-পুত্রদের কাছে এসে, পূর্বে তিনি তাঁর জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতাদের যেভাবে গূঢ় অর্থ সমন্বিত উপদেশ দিয়েছিলেন, সেই উপদেশ তাঁদেরও দিলেন। হে দক্ষপুত্রগণ, তোমরা মনোযোগ সহকারে আমার উপদেশ শ্রবণ কর। তোমরা সকলেই তোমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হর্যশ্বদের প্রতি অত্যন্ত প্রীতিপরায়ণ, অতএব তাদের মার্গ অনুসরণ করাই তোমাদের কর্তব্য। যে ভ্রাতা ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত, তিনি তাঁর অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। অতি উন্নত সেই সমস্ত পুণ্যবান ভ্রাতারা মরুৎ ইত্যাদি ভ্রাতৃবৎসল দেবতাদের সঙ্গে জীবন উপভোগ করার সুযোগ পান।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে আর্য, যাঁর দর্শন কখনও ব্যর্থ হয় না, সেই নারদ মুনি প্রজাপতি দক্ষের পুত্রদের এই উপদেশ দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন। দক্ষের পুত্ররা তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। সন্তান উৎপাদনের চেষ্টা না করে তাঁরা কৃষ্ণভক্তিতে যুক্ত হয়েছিলেন। সবলাশ্বরা ভগবদ্ভক্তির দ্বারা অথবা পরমেশ্বর ভগবানের কৃপার দ্বারা লভ্য সর্বতোভাবে সমীচীন পথ অবলম্বন করেছিলেন। তাই পশ্চিম দিকে চলে গেছে যে রাত্রি, তার মতো তাঁরা আজও ফিরে আসেননি। এই সময়ে প্রজাপতি দক্ষ বহু অমঙ্গল চিহ্ন দর্শন করেছিলেন এবং তিনি শ্রবণ করেছিলেন যে, সবলাশ্ব নামক তাঁর পুত্রদের দ্বিতীয় দলটিও নারদ মুনির উপদেশ অনুসারে তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। দক্ষ যখন শুনলেন যে, সবলাশ্বরাও ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন, তখন তিনি নারদ মুনির প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং শোকে মূর্ছিতপ্রায় হয়েছিলেন। নারদ মুনির সঙ্গে যখন দক্ষের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তখন ক্রোধে দক্ষের অধর কম্পিত হয়েছিল এবং তিনি তাঁকে বলেছিলেন, ‘হায়, নারদ মুনি, আপনি কেবল সাধুর বেশই ধারণ করেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনি সাধু নন। আমি গৃহস্থ আশ্রমে থাকলেও আমিই সাধু। আমার পুত্রদের ত্যাগের পথ প্রদর্শন করে আপনি অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ করেছেন।’ ”
“আমার পুত্রেরা ত্রিবিধ ঋণ থেকে মুক্ত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কর্তব্য সম্বন্ধেও বিবেচনা করেনি। হে নারদ মুনি, হে মূর্তিমান পাপ, আপনি তাদের ইহলোক এবং পরলোকে মঙ্গল প্রাপ্তির বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন, কারণ তারা এখনও ঋষি, দেবতা এবং পিতৃদের কাছে ঋণী।”
“এইভাবে আপনি জীবেদের প্রতি হিংসা করছেন এবং তা সত্ত্বেও নিজেকে একজন ভগবৎ-পার্ষদ বলে দাবি করে আপন ভগবানের যশ নাশ করছেন। আপনি অনভিজ্ঞ বালকদের চিত্তে অনর্থক সন্ন্যাসের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন এবং তাই আপনি নির্লজ্জ ও নিষ্ঠুর। আপনি কিভাবে ভগবৎ-পার্ষদদের মধ্যে বিচরণ করতে পারেন? আপনি ছাড়া ভগবানের অন্য সমস্ত ভক্তেরা বদ্ধ জীবদের প্রতি অতন্ত সদয় এবং তাদের মঙ্গল সাধনে অত্যন্ত উৎসুক। যদিও আপনি ভগবদ্ভক্তের বেশ পরিধান করেন, তবুও আপনার প্রতি যাঁরা শত্রুভাবাপন্ন নয়, তাদের সঙ্গেও আপনি শত্রুতা সৃষ্টি করেন। আপনি বন্ধুত্ব ভঙ্গকারী এবং বন্ধদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টিকারী। ভক্ত হওয়ার ভান করে এই সমস্ত জঘন্য কার্য করতে আপনার লজ্জা হয় না?”
“আপনি যদি মনে করেন যে, কেবল বৈরাগ্য সাধনের দ্বারা আপনি জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন, তা হলে আমি বলব যে, পূর্ণ জ্ঞানের উদয় না হলে কেবল আপনার মতো বেশ পরিবর্তনের দ্বারা কখনও বৈরাগ্য উৎপন্ন হতে পারে না। জড় সুখভোগই যে সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার কারণ, তা বিষয়ভোগ না করে জানা যায় না। নিজে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ না করলে ভোগবাসনা ত্যাগ করা যায় না। সুতরাং বিষয়ভোগ করতে করতে যখন বোঝা যায় এই জড় জগৎ কত দুঃখময়, তখন অন্যদের সাহায্য ব্যতীতই জড় সুখভোগের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায়। যাদের মন অন্যদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে, তাদের বৈরাগ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ ব্যক্তিদের মতো হতে পারে না। আমি যদিও স্ত্রী-পুত্র সহ গৃহস্থ আশ্রমে বাস করি, তবুও আমি সৎভাবে বৈদিক নির্দেশ অনুসারে পাপহীন জীবনের আনন্দ উপভোগ করি। আমি দেববজ্ঞ, ঋষিযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ এবং নৃযজ্ঞ আদি সমস্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছি। যেহেতু এই সমস্ত যজ্ঞগুলিকে বলা হয় ব্রত, তাই আমি গৃহব্রত নামে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত, আপনি অকারণে আমার পুত্রদের সন্ন্যাসমার্গে পরিচালিত করে পথভ্রষ্ঠ করেছেন, তাই আপনি আমাকে অশেষ দুঃখ দিয়েছেন। যা কেবল একবার মাত্র সহ্য করা যায়। আপনি একবার আমার পুত্রদের আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন এবং এখন আপনি আবার সেই অশুভ কার্য করেছেন। তাই আপনি মূঢ় এবং অন্যদের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করতে হয় তা জানেন না। তাই আমি আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি যে, আপনাকে সারা ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করতে হবে এবং আপনি কোথাও স্থান পাবেন না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, নারদ মুনি যেহেতু একজন সর্বসম্মত সাধু, তাই প্রজাপতি দক্ষ যখন তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, তদ্ বাঢ়ম্- ‘হ্যাঁ, আপনি ভাল কথাই বলেছেন। আমি এই অভিশাপ গ্রহণ করছি।’ নারদ মুনিও দক্ষকে প্রতিশাপ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে অভিশাপ সহ্য করেছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন একজন সহিষ্ণু এবং উদার সাধু।”
পঞ্চম অধ্যায়- নারদ মুনির প্রতি প্রজাপতি দক্ষের অভিশাপ
26 Nov 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, ষষ্ঠ স্কন্ধ- মনুষ্যজাতির কর্তব্য কর্ম