চতুর্থ অধ্যায়- ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রজাপতি দক্ষের হংসগুহ্য প্রার্থনা

মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে বললেন- “হে ভগবন, স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে দেবতা, অসুর, নর, নাগ, পশু ও পক্ষীদের সৃষ্টির বৃত্তান্ত আপনি (তৃতীয় স্কন্ধে) সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। এখন আমি তা সবিস্তারে জানতে ইচ্ছা করি। পরমেশ্বর ভগবান যে শক্তির দ্বারা পরবর্তী সৃষ্টি সম্পাদন করেছিলেন, সেই সম্বন্ধেও আমি জানতে চাই।”
সূত গোস্বামী বললেন- (নৈমিষারণ্যে সমবেত) “হে মহর্ষিগণ, মহারাজ পরীক্ষিতের প্রশ্ন শুনে, মহাযোগী শুকদেব গোস্বামী তাঁর প্রশংসা করে এইভাবে উত্তর দিয়েছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “প্রাচীনবর্হির দশজন পুত্র তপস্যা সমাপন করে যখন সমুদ্রের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন তাঁরা দেখলেন যে, সারা পৃথিবী বৃক্ষের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। সমুদ্রের মধ্যে দীর্ঘকাল তপস্যা করার ফলে, বৃক্ষসমূহের প্রতি প্রচেতাদের ক্রোধ উদ্দীপ্ত হয়েছিল এবং তাঁরা সেই বৃক্ষসমূহ দগ্ধ করার বাসনায় তাঁদের মুখ থেকে বায়ু ও অগ্নি সৃষ্টি করেছিলেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, সেই অগ্নি ও বাযুর দ্বারা বৃক্ষসমূহকে দগ্ধ হতে দেখে, বনস্পতিদের রাজা চন্দ্রদেব প্রচেতাদের ক্রোধ শান্ত করার জন্য বললেন। হে মহা ভাগ্যবানগণ, এই দীন বৃক্ষরাজিকে দগ্ধ করা আপনাদের উচিত নয়। আপনাদের কর্তব্য প্রজাদের সমৃদ্ধি সাধন করা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি সমস্ত জীবদের পতি, এমন কি তিনি ব্রহ্মা আদি প্রজাপতিদেরও পতি। সেই সর্বব্যাপক এবং অব্যয় প্রভু সমস্ত জীবদের ভক্ষ্য অন্নরূপে এই সমস্ত বনস্পতি এবং ওষধি সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে ফল ও ফুল পতঙ্গ এবং পক্ষীদের খাদ্য; ঘাস আদি পদহীন জীবেরা গো-মহিষ আদি চতুষ্পদ প্রাণীদের খাদ্য; যে সমস্ত প্রাণী তাদের সামনে পা দুটিকে হাতের মতো ব্যবহার করতে পারে না, তারা থাবাযুক্ত ব্যাঘ্র আদি পশুর খাদ্য; এবং হরিণ, ছাগল আদি চতুষ্পদ প্রাণী ও শস্য ইত্যাদি মানুষদের খাদ্য।”
“হে নির্মল আত্মাগণ, আপনাদের পিতা প্রাচীনবর্হি এবং পরমেশ্বর ভগবান আপনাদের প্রজা সৃষ্টি করার আদেশ দিয়েছেন। অতএব কিভাবে আপনারা এই সমস্ত বৃক্ষ এবং ওষধি ভস্মীভূত করছেন, যা প্রজাদের জীবন ধারণের উপযোগী? আপনাদের পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ প্রমুখ মহাত্মারা যে সৎ মার্গ অনুসরণ করেছেন, মানুষ, পশু এবং বৃক্ষরূপ প্রজাদের রক্ষাণাবেক্ষণ করার সেই মার্গ আপনারাও অনুসরণ করুন। ক্রোধ প্রদর্শন করা আপনাদের পক্ষে সংগত নয়। তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা আপনাদের ক্রোধ সংবরণ করুন। পিতা-মাতা যেমন শিশুদের বন্ধু এবং রক্ষক, পলক যেমন চক্ষুর রক্ষক, পতি যেমন স্ত্রীর পালক এবং রক্ষক, গৃহস্থ যেমন ভিক্ষুকদের পালক এবং জ্ঞানী যেমন অজ্ঞানীর বন্ধু, তেমনই রাজা প্রজাদের রক্ষক এবং প্রাণদাতা। বৃক্ষও রাজার প্রজা। তাই তাদের রক্ষা করা রাজার কর্তব্য। পরমেশ্বর ভগবান মানুষ-পশু-পক্ষী-বৃক্ষ আদি স্থাবর এবং জঙ্গম, সমস্ত জীবের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজমান। তাই আপনারা প্রতিটি প্রাণীকেই সেই ভগবানের অধিষ্ঠান ভূমি বা মন্দির বলে দর্শন করুন। এই প্রকার দর্শনের দ্বারা আপনারা ভগবানকে সন্তুষ্ট করবেন। বৃক্ষরূপী এই সমস্ত জীবদের প্রতি ক্রদ্ধ হয়ে তাদের হত্যা করা আপনাদের উচিত নয়। যে ব্যক্তি আত্ম-উপলব্ধির অনুসন্ধানের দ্বারা তাঁর বলবান ক্রোধ যা আকাশ থেকে পড়ার মতো হঠাৎ দেহে জেগে ওঠে, তা সংযত করেন, তিনি জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেন। এই দীন বৃক্ষগুলিকে দহন করার কোন প্রয়োজন নেই। যে সমস্ত বৃক্ষ অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের মঙ্গল হোক। আপনাদেরও মঙ্গল হোক। এখন আপনারা বৃক্ষদের দ্বারা পালিতা ‘মারিষা’ নাম্নী অতি সুন্দরী এবং গুণান্বিতা এই কন্যাটিকে আপনাদের পত্নীরূপে গ্রহণ করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এইভাবে প্রচেতাদের শান্ত করে, চন্দ্রাধিপতি সোমদেব প্রম্লোচা নাম্নী অপ্সরার অতি সুন্দরী কন্যাটিকে তাঁদের প্রদান করেছিলেন। প্রচেতারা প্রম্লোচার সেই অতি সুন্দরী গুরুনিতম্বিনী কন্যাটিকে ধর্ম অনুসারে বিবাহ করেছিলেন। সেই কন্যার গর্ভে প্রচেতারা দক্ষ নামক একটি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন, যিনি প্রজাসমূহের দ্বারা ত্রিলোক পূর্ণ করেছিলেন।”
“দুহিতৃবৎসল প্রজাপতি দক্ষ যেভাবে বীর্য ও মনের দ্বারা প্রজাসমূহ সৃষ্টি করেছিলেন, তা আমার কাছে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন। প্রজাপতি দক্ষ তাঁর মনের দ্বারা প্রথমে দেবতা, অসুর, মানুষ, পক্ষী, পশু, জলচর প্রভৃতি প্রজাবর্গ সৃষ্টি করেন। কিন্তু প্রজাপতি দক্ষ যখন দেখলেন যে, তাঁর সৃষ্ট প্রজাসমূহের যথাযথভাবে বৃদ্ধি হচ্ছে না, তখন তিনি বিন্ধ্য পর্বতের নিকটবর্তী কোন একটি পর্বতে গিয়ে দুষ্কর তপস্যা করেছিলেন। সেই পর্বতের নিকটে অঘমর্ষণ নামক একটি অতি পবিত্র তীর্থস্থান ছিল। সেখানে প্রজাপতি দক্ষ ত্রিসন্ধ্যা স্নান-আচমনাদি করে তপস্যার দ্বারা শ্রীহরির সন্তুষ্টি বিধান করেছিলেন। হে রাজন, প্রজাপতি দক্ষ যে হংসগুহ্য নামক স্তোত্রের দ্বারা অধোক্ষজ শ্রহিরির সন্তুষ্টি বিধান করেছিলেন এবং সেই স্তুতির ফলে ভগবান শ্রীহরি যেভাবে দক্ষের প্রতি তুষ্ট হয়েছিলেন, তা আমি আপনার কাছে কীর্তন করব।”
প্রজাপতি দক্ষ বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান মায়া ও মায়ার দ্বারা উৎপন্ন সমস্ত জড় পদার্থের অতীত। তিনি অব্যভিচারী জ্ঞান ও পরম ইচ্ছাশক্তি সমন্বিত এবং তিনি জীব ও মায়াশক্তির নিয়ন্তা। বদ্ধ জীবেরা, যারা এই জড় জগৎকে সব কিছু বলে মনে করে, তারা তাঁকে দর্শন করতে পারে না, কারণ তিনি প্রত্যক্ষ আদি প্রমাণের অতীত। তাই তিনি স্বতঃপ্রমাণ ও স্বয়ংসম্পূণ এবং তিনি কোন কারণ থেকে উৎপন্ন হননি। তাঁকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। (রূপ, রস, স্পর্শ, গন্ধ এবং শব্দ) ইন্দ্রিয়ের এই বিষয়গুলি যেমন জানতে পারে না যে, ইন্দ্রিয়গুলি কিভাবে তাদের অনুভব করে, তেমনি বদ্ধ জীব পরমাত্মার সঙ্গে দেহে নিবাস করলেও বুঝতে পারে না, সমগ্র জড় সৃষ্টির ঈশ্বর কিভাবে সেই পরম পুরুষ জীবের ইন্দ্রিয়গুলি পরিচালনা করেন। সেই পরম নিয়ন্তা পরম পুরুষকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। যেহেতু দেহ, প্রাণ, অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত ও তন্মাত্র (রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ) হচ্ছে জড় তত্ত্ব, তাই তারা তাদের স্বীয় প্রকৃতি জানতে পারে না এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় ও তাদের নিয়ন্তাদের প্রকৃতিও জানতে পারে না। কিন্তু জীব চিন্ময় হওয়ার ফলে, তা দেহ, প্রাণবায়ু, ইন্দ্রিয়, মহাভূত ও ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহকে জানতে পারে এবং তাদের মূল স্বরূপ তিন গুণকেও জানতে পারে। জীব যদিও সম্পূর্ণরূপে সেগুলি সম্বন্ধে অবগত, তবুও সে সর্বজ্ঞ অসীম পরম পুরুষকে জানতে পারে না। আমি তাই তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। কারও চেতনা যখন স্থূল এবং সূক্ষ্ম জড় অস্তিত্বের কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়, জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থায় যাঁর চিত্ত-বিক্ষেপ হয় না এবং সুযুপ্তিতে যাঁর চিত্তের লয় হয় না, তিনি সমাধি স্তর প্রাপ্ত হন। জড় দর্শন ও মনের স্মৃতি, যা নাম ও রূপ প্রকাশ করে, তা তখন বিনাশপ্রাপ্ত হয়। এইরূপ সমাধিতে কেবল ভগবান তাঁর সচ্চিদানন্দময় স্বরূপে প্রকাশিত হন। শুদ্ধ চিন্ময় অন্তঃকরণে যাঁকে দর্শন করা যায়, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রনতি নিবেদন করি। বৈদিক কর্মকাণ্ডে এবং যজ্ঞ অনুষ্ঠানে দক্ষ বিদগ্ধ পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণের যেমন পঞ্চদশ সামিধেনী মন্ত্রের দ্বারা কাষ্ঠের অন্তঃপ্রদেশে গূঢ়ভাবে অবস্থিত অগ্নিকে প্রকাশ করে বৈদিক মন্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করেন, তেমনই যাঁরা প্রকৃতপক্ষে উন্নত চেতনা সন্বিত, অর্থাৎ কৃষ্ণভাবনাসমন্বিত, তাঁরা হৃদয় অভ্যন্তরে বিরাজমান পরমাত্মাকে লাভ করতে পারেন। হৃদয় জড়া প্রকৃতির তিন গুণ এবং নয়টি উপাদানের দ্বারা (প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার, মন ও পঞ্চ তন্মাত্র) এবং পঞ্চ মহাভূত ও দশ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আচ্ছাদিত। ভগবানের বহিরঙ্গা প্রকৃতি এই সপ্তবিংশতি উপাদানের দ্বারা গঠিত। মহান যোগীরা পরমাত্মারূপে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে বিরাজমান ভগবানের ধ্যান করেন। সেই পরমাত্মা আমার প্রতি প্রসন্ন হোন। কেউ যখন জড়া প্রকৃতির অন্তহীন বৈচিত্র্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হন, তখনই তিনি পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন। কেউ যখন ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হন তখনি তিনি প্রকৃতপক্ষে এই মুক্তি লাভ করতে পারেন এবং তাঁর সেবাবৃত্তির প্রভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারেন। সেই ভগবানকে জড় ইন্দ্রিয়ের অগোচর বিবিধ চিন্ময় নামের দ্বারা সম্বোধন করা যায়। সেই পরমেশ্বর ভগবান কখন আমার প্রতি প্রসন্ন হবেন? জড় শব্দের দ্বারা যা কিছু ব্যক্ত হয়, বুদ্ধির দ্বারা যা কিছু নিরূপিত হয় এবং ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা যা কিছু গ্রাহ্য হয় অথবা মনের দ্বারা যা সংকল্পিত হয়, তা সবই জড়া প্রকৃতির গুণের কার্য বলে ভগবানের প্রকৃত স্বরূপের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। পরমেশ্বর ভগবান এই জড় জগতের সৃষ্টির অতীত, কারণ তিনি সমস্ত জড় গুণ এবং সৃষ্টির উৎস। সর্বকারণের পরম কারণরূপে তিনি সৃষ্টির পূর্বে ছিলেন এবং প্রলয়ের পরেও থাকবেন। আমি তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ সব কিছুরই পরম আশ্রয় এবং উৎস। সব কিছুই তাঁর দ্বারা সম্পাদিত, সব কিছুই তাঁর এবং সব কিছুই তাঁকে নিবেদন করা হয়। তিনি হচ্ছেন পরম লক্ষ্য, তিনি নিজেই করুন অথবা অন্যদের দিয়েই করান, তিনিই হচ্ছেন পরম কর্তা। উচ্চাবচ বহু কারণ রয়েছে, কিন্তু যেহেতু তিনিই সর্বকারণের পরম কারণ, তাই তিনি পরমব্রহ্ম নামে প্রসিদ্ধ, যিনি সমস্ত কার্য-কারণের পূর্বে বর্তমান ছিলেন। তিনি এক এবং অদ্বিতীয় এবং তাঁর কোন কারণ নেই। আমি তাই তাঁকে আমর সশ্রদ্ধ প্রনতি নিবেদন করি। আমি সর্বব্যাপ্ত পরমেশ্বর ভগবানকে আমার প্রণতি নিবেদন করি, যিনি অনন্ত চিন্ময় গুণ সমন্বিত। সমস্ত দার্শনিকদের হৃদয়-অভ্যন্তর থেকে যিনি বিভিন্ন মতবাদ সৃষ্টি করেন, তাঁরই প্রভাবে তারা তাদের নিজেদের আত্মাকে ভুলে যায় এবং তার ফলে কখনও তাদের মধ্যে বিবাদ হয় আবার কখনও ঐক্য হয়। এইভাবে তিনি এই জড় জগতে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যার ফলে তারা কোন সিদ্ধান্তের উপনীত হতে পারে না। আমি তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। দুটি পক্ষ রয়েছে- আস্তিক এবং নাস্তিক। আস্তিকেরা, যারা পরমাত্মাকে বিশ্বাস করে, তারা যোগের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক কারণের অনুসন্ধান করে। কিন্তু সাংখ্যবাদীরা, যারা কেবল জড় উপাদানের বিশ্লেষণ করে, তারা নির্বিশেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে ভগবান, পরমাত্মা এমনকি ব্রহ্মকেও পরম কারণরূপে স্বীকার করে না। পক্ষান্তরে, তারা জড়া প্রকৃতির অনাবশ্যক বহিরঙ্গা ক্রিয়াকলাপে মগ্ন থাকে। কিন্তু, চরমে উভয় পক্ষই এক পরম সত্যকে স্বীকার করে, কারণ বিরুদ্ধ মতবাদ পোষণ করলেও তাদের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই পরম কারণ। তারা উভয়েই সেই পরমব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয়। সেই পরমব্রহ্মকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। অচিন্ত ঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবান জড় নাম, রূপ এবং কার্যকলাপ রহিত। তিনি সর্বব্যাপ্ত এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মের সেবারত ভক্তদের প্রতি বিশেষভাবে কৃপাময়। তাই তিনি তাঁর ভক্তদের কাছে তাঁর বিবিধ লীলার মাধ্যমে তাঁর চিন্ময় নাম এবং রূপ প্রকাশ করেন। সেই সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ পরমেশ্বর ভগবান আমার প্রতি প্রসন্ন হন। বায়ু যেমন ফুলের গন্ধ গ্রহণ করে সেই গন্ধবিশিষ্ট হয় অথবা ধূলি মিশ্রিত হয়ে সেই বর্ণবিশিষ্ট হয়, তেমনই ভগবানও জীবের বাসনা অনুসারে নিম্ন স্তরের উপাসনা মার্গে, তাঁর আদি রূপে প্রকাশিত না হয়ে দেবতারূপে প্রকাশিত হন। সেই সমস্ত অন্য রূপের কি প্রয়োজন? আদি পুরুষ ভগবান কৃপাপূর্বক আমার বাসনা পূর্ণ করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে কুরুশ্রেষ্ঠ, মহারাজ পরীক্ষিৎ দক্ষের প্রার্থনায় ভক্তবৎসল ভগবান অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং অঘমর্ষণ নামক পবিত্র স্থানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর শ্রীপাদপদ্ম তাঁর বাহন গরুড়ের স্কন্ধে বিন্যস্ত এবং তাঁর অষ্ট মহাভূজ, আজানুলম্বিত। সেই আট হাতে তাঁর শঙ্খ, চক্র, অসি, চর্ম, বাণ, ধনুক, পাশ এবং গদা- এই আটটি অস্ত্র উজ্জ্বলভাবে শোভা পাচ্ছিল। তাঁর পরনে ছিল পীত বসন এবং অঙ্গকান্তি ঘনশ্যাম তাঁর নয়ন ও বদন অত্যন্ত প্রসন্ন এবং তাঁর কন্ঠে আপাদ-বিলম্বিত বনমালা। তাঁর বক্ষ কৌস্তুভ মণি এবং শ্রীবৎস চিহ্নের দ্বারা অলঙ্কৃত। তাঁর মস্তকে মহা উজ্জ্বল কিরীটমণ্ডল এবং তাঁর কর্ণযুগল মকর-কুণ্ডলের দ্বারা অলঙ্কৃত। এই সমস্ত অলঙ্কার অলৌকিক সৌন্দর্য সমন্বিত ছিল। তাঁর কটিদেশে ছিল স্বর্ণমেখলা, মণিবন্ধে বলয়, বাহুতে অঙ্গদ, অঙ্গুলিতে অঙ্গরীয় এবং চরণযুগলে নূপুর। এইভাবে অলঙ্কারে বিভূষিত অখিল জগতের প্রভু শ্রীহরি ত্রিলোক বিমোহনকারী পুরুষোত্তমরূপে নারদ ও নন্দ আদি পার্ষদসমূহ, ইন্দ্র আদি শ্রেষ্ঠ দেবতাগণ এবং সিদ্ধ, গন্ধর্ব ও চারনদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই তাঁর উভয় পার্শ্বে ও পশ্চাতে থেকে স্তব পাঠ এবং তাঁর মহিমা কীর্তন করছিলেন। ভগবানের সেই পরম আশ্চর্য জ্যোতির্ময় রূপ দর্শন করে প্রজাপতি দক্ষ প্রথমে একটু ভীত হয়েছিলেন, কিন্তু তারপর অত্যন্ত প্রফুল্ল হয়ে ভূমিতে দণ্ডবৎ প্রণাম করেছিলেন। ঝর্ণার জলপ্রবাহে নদী যেমন পূর্ণ হয়, তেমনই অত্যন্ত আনন্দে দক্ষের ইন্দ্রিয়গুলি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তার ফলে দক্ষ কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি কেবল ভূমিতে দণ্ডবৎ পড়ে রইলেন। প্রজাপতি দক্ষ কিছু না বলতে পারলেও, সর্বভূতের অন্তর্যামী ভগবান তাঁর ভক্তকে প্রজাবৃদ্ধির বাসনায় তাঁর সম্মুখে সেইভাবে প্রণত দেখে, তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেন- হে মহাভাগ্যবান প্রাচেতস, যেহেতু তুমি আমার প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ, তাই আমার প্রতি তুমি পরম ভক্তি লাভ করেছ। প্রকৃতপক্ষে, তোমার পরম ভক্তিযুক্ত তপস্যার প্রভাবে তোমার জীবন এখন পূর্ণরূপে সফল হয়েছে। তুমি পূর্ণ সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছ।”
“হে প্রজাপতি দক্ষ, তুমি বিশ্ব সংসারের মঙ্গল এবং বৃদ্ধি সাধনের জন্য কঠোর তপস্যা করেছ। আমিও চাই যে, এই জগতের সকলেই সুখী হোক। তুমি যেহেতু সারা জগতের মঙ্গল সাধন করে আমার বাসনা পূর্ণ করার চেষ্টা করছ, তাই আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। ব্রহ্মা, শিব, মনু, সমস্ত দেবতা এবং তোমরা প্রজাপতিরা সকলেই সমস্ত জীবদের কল্যাণ সাধনের জন্য কার্য করছ। তোমরা সকলে আমারই বিভূতি অর্থাৎ গুণাবতার বিশেষ।”
“হে ব্রাহ্মণ, ধ্যানরূপ তপস্যা আমার হৃদয়, মন্ত্ররূপে বৈদিক জ্ঞান আমার দেহ, আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ এবং ভক্তিভাব আমার আকৃতি, সুনিষ্পন্ন যজ্ঞ আমার অঙ্গ, পুণ্যকর্ম অথবা সুকৃতি আমার মন এবং প্রকৃতির বিভিন্ন বিভাগে আমার আদেশ পালনকারী দেবতারা আমার প্রাণ। এই জড় সৃষ্টির পূর্বে, আমার বিশেষ চিন্ময় শক্তিসহ আমিই কেবল ছিলাম। চেতনা তখন অপ্রকাশিত ছিল, ঠিক যেমন নিদ্রিত অবস্থায় কারও চেতনা অপ্রকাশিত থাকে। আমি অনন্ত গুণের উৎস এবং তাই আমি অনন্ত অথবা সর্বব্যাপ্ত নামে পরিচিত। আমার মায়াশক্তি থেকে আমারই মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, সেই ব্রহ্মাণ্ডেই তোমার উৎসস্বরূপ অযোনিজ ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছেন। আমারই শক্তির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দেবশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা (স্বয়ম্ভূ) যখন সৃষ্টিকার্যে উদ্যত হয়ে নিজেকে অসমর্থ বলে মনে করেছিলেন, তখন আমি তাঁকে উপদেশ প্রদান করেছিলাম। সেই উপদেশ অনুসারে ব্রহ্মা অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করেছিলেন। সেই তপস্যার প্রভাবেই বিভু ব্রহ্মা তাঁর সৃষ্টিকার্যে তাঁকে সাহায্য করার জন্য তোমাদের নয়জন বিশ্বস্রষ্টাকে সৃষ্টি করেন।”
“হে বৎস দক্ষ, প্রজাপতি পঞ্চজনের অসিক্লী নামক একটি কন্যা রয়েছে। তাকে আমি তোমায় প্রদান করছি, তুমি তাকে তোমার পত্নীরূপে গ্রহণ কর। তুমি স্ত্রী-পুরুষের রতিরূপ ধর্ম অবলম্বন করে, প্রজাবৃদ্ধির জন্য এই কন্যার গর্ভে বহু সন্তান উৎপাদন করতে পারবে। তুমি যে শত-সহস্র সন্তান উৎপাদন করবে, তারা আমার মায়ার দ্বারা মোহিত হয়ে তোমার মতো মৈথুনভাবে অবলম্বন করবে। কিন্তু তোমার এবং তাদের উপর আমার কৃপার প্রভাবে, তারা আমার পূজার সামগ্রী সংগ্রহ করে ভক্তি সহকারে তা আমাকে উপহার দেবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি প্রজাপতি দক্ষের সমক্ষে এইভাবে বলে, স্বপ্নে উপলব্ধ বস্তুর মতো সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন।”

Leave a Reply

November 2025
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Blog Stats

  • 140,959 hits