মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষে, জীবকে কেন এই জড় জগতে বিভিন্ন জড় পরিস্থিতি ভোগ করতে হয়? দয়া করে সেই আপনি বর্ণনা করুন।”
মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এই জড় জগতে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক- এই তিন প্রকার কর্ম রয়েছে। যেহেতু সকলেই জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত, তার ফলে তাদের কার্যকলাপও তিন প্রকার। যারা সত্ত্বগুণে কর্ম করে তারা ধার্মিক এবং সুখী হয়, যারা রজোগুণে কর্ম করে তারা সুখ এবং দুঃখ দুই-ই ভোগ করে, আর যারা তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত তারা সর্বদাই দুঃখী এবং তারা পশুর মতো জীবন যাপন করে। বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ফলে জীবের গতির তারতম্য হয়। পুণ্যকর্মের ফলে যেমন স্বর্গভোগ হয়, তেমনই পাপকর্মের ফলে নরক ভোগ হয়। তমোগুণের প্রভাবে মানুষ পাপকর্মে লিপ্ত হয় এবং তাদের অজ্ঞানের মাত্রা অনুসারে তাদের নারকীয় জীবনের বিভিন্ন স্তর প্রাপ্তি হয়। কেউ যদি প্রমাদবশত তামসিক আচরণ করে, তা হলে তাকে অল্প কষ্ট ভোগ করতে হয়। কেউ যদি জ্ঞানবশত পাপকর্ম করে, তা হলে তাকে আরও বেশি নরক-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। আর যারা নাস্তিকতাবশত পাপকর্ম করে, তাদের সব চাইতে বেশি নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। অনাদি কাল ধরে অবিদ্যাজনিত কামনার পরিমাণস্বরূপ জীব যে সহস্র সহস্র নরক-গতি প্রাপ্ত হয়, আমি তা এখন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করব।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে প্রভু, এই নরকসমূহ কি ব্রহ্মাণ্ডের বাইরে, ব্রহ্মাণ্ডের আবরণের মধ্যে, নাকি এই পৃথিবীরই কোন স্থানে অবস্থিত?”
মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী বললেন- “সমস্ত নরক ত্রিলোকের অন্তরালে অবস্থিত। দক্ষিণ দিকে ভূমণ্ডলের অধঃভাগে এবং গর্ভোদক সমুদ্রের উপরিভাগে নরকের অবস্থান। পিতৃলোকও সেই প্রদেশে অর্থাৎ গর্ভোদক সমুদ্র এবং নিম্নলোকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। অগ্নিষ্বাত্তা আদি পিতৃগণ পরম সমাধিযোগে ভগবানের ধ্যান করেন এবং তাঁদের গ্রোত্রভূত ব্যক্তিদের মঙ্গল কামনা করেন। সূর্যদেবের অত্যন্ত শক্তিশালী পুত্র যমরাজ পিতৃদের রাজা। তিনি স্বপার্ষদ পিতৃলোকে বাস করেন এবং ভগবানের আজ্ঞা উল্লঙ্ঘন না করে, মৃত্যুর পর তাঁর দূতদের দ্বারা তাঁর অধিকারের মধ্যে আনীত প্রাণীদের পাপকর্ম অনুসারে যথাযথভাবে বিচার করে নরকে দণ্ডদান করেন। কেউ কেউ বলেন যে, ২১টি নরক রয়েছে এবং অন্য কেউ বলেন ২৮টি। হে রাজন, আমি তাদের নাম, রূপ এবং লক্ষণ অনুসারে বর্ণনা করব। সেগুলি হচ্ছে- তামিস্র, অন্ধ তামিস্র, রৌরব, মহারৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, অসিপত্রবন, সূকরমুখ, অন্ধকূপ, কৃমিভোজন, সন্দংশ, তপ্তসূর্মি, বজ্রকণ্টক-শাল্মলী, বৈতরণী, পূয়োদ, প্রাণরোধ, বিশসন, লালাভক্ষ, সারমেয়াদন, অবীচি, অয়ঃপান, ক্ষারকর্দম, রক্ষোগণ-ভোজন, শূলপ্রোত, দন্দশূক, অবটনিরোধন, পর্যাবর্তন এবং সূচীমুখ। এইগুলি জীবের দণ্ডভোগের স্থান।”
“হে রাজন্, যে ব্যক্তি অপরের ধন, স্ত্রী ও পুত্র অপহরণ করে, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর যমদূতেরা তাকে কালপাশে বেঁধে বলপূর্বক তামিস্র নরকে নিক্ষেপ করে। এই তামিস্র নরক ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন, সেখানে যমদূতেরা পাপীকে ভীষণভাবে প্রহার, তাড়ন এবং তর্জন করে। সেখানে তাকে অনশনে রাখা হয় এবং জল পান করতে দেওয়া হয় না। এইভাবে ক্রদ্ধ হয়ে যমদূতদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সে মূর্ছিত হয়। যে ব্যক্তি পতিকে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র উপভোগ করে, সে অন্ধতামিস্র নরকে পতিত হয়। বৃক্ষকে ভূপাতিত করার পূর্বে যেমন তার মূল ছেদন করা হয়, তেমনই সেই পাপীকে ঐ নরকে নিক্ষেপ করার পূর্বে যমদূতেরা নানা প্রকার যন্ত্রণা প্রদান করে। এই যন্ত্রণা এতই প্রচণ্ড যে, তার ফলে তার বুদ্ধি এবং দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। সেই জন্যই সেই নরককে পণ্ডিতেরা অন্ধতামিস্র বলেন। যে ব্যক্তি তার জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে, তার নিজের দেহ এবং দেহের সম্পর্কে সম্পর্কিত আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ-পোষণের জন্য দিনের পর দিন অপর প্রাণীর হিংসা করে, সেই ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার দেহ এবং আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যাগ করে, প্রাণী হিংসাজনিত পাপের ফলে রৌরব নরকে নিপতিত হয়। এই জীবনে যে হিংসা-পরায়ণ ব্যক্তি অন্য প্রাণীদের যন্ত্রণা দেয়, মৃত্যুর পর যখন সে তার কৃত কর্মের ফলে যম-যাতনা প্রাপ্ত হয়, তখন সেই সমস্ত প্রাণীসমূহ, যাদের হিংসা করা হয়েছে, তারা ‘রুরু’ হয়ে তাকে পীড়া দেয়। এই জন্য পণ্ডিতেরা সেই নরককে রৌরব নরক বলে। রুরু প্রাণীকে এই পৃথিবীতে দেখা যায় না, তারা সর্পের থেকেও হিংস্র। যারা অন্যদের কষ্ট দিয়ে নিজেদের দেহ ধারণ করে, তাদের মহারৌরব নরকে দণ্ডভোগ করতে হয়। সেই নরকে ক্রব্যাদ নাম রুরু পশুরা তাদের যন্ত্রণা দিয়ে মাংস আহার করে। যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, সেই প্রকার ব্যক্তিরা নর-মাংসভোজী রাক্ষদেরও ঘৃণিত। মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুম্ভীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে। ব্রহ্মঘাতীকে কালসূত্র নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, যার পরিধি ৮০,০০০ মাইল এবং যা তাম্রনির্মিত। নীচ থেকে অগ্নি এবং উপর থেকে প্রখর সূর্যের তাপে সেই তাম্রময় ভূমি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়। সেখানে ব্রহ্মঘাতীকে অন্তরে ও বাইরে দগ্ধ করা হয়। অন্তরে সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় দগ্ধ হয় এবং বাইরে সে প্রখর সূর্যকিরণ ও তপ্ত তাম্রে দদ্ধ হতে থাকে। তাই সে কখনও শয়ন করে, কখনও উপবেশন করে, কখনও উঠে দাঁড়ায় এবং কখনও ইতস্তত ছুটাছুটি করে। এইভাবে একটি পশুর শরীরে যত লোম রয়েছে, তত হাজার বছর ধরে তাকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। আপৎকাল উপস্থিত না হলেও যে ব্যক্তি স্বীয় বেদমার্গ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পাষণ্ড ধর্ম অবলম্বন করে, যমদূতেরা তাকে অসিপত্রবন নামক নরকে নিক্ষেপ করে বেত্রাঘাত করতে থাকে। প্রহারের যন্ত্রণায় সে যখন সেই নরকে ইতস্তত ধাবিত হয়, তখন উভয় পার্শ্বের অসিতুল্য তালপত্রের ধারে তার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়। তখন সে ‘হায়, আমি এখন কি করব! আমি এখন কিভাবে রক্ষা পাব!’ এই বলে আর্তনাদ করতে করতে পদে পদে মূর্ছিত হয়ে পড়তে থাকে। স্বধর্ম ত্যাগ করে পাষণ্ড মত অবলম্বনের ফল এইভাবে ভোগ করতে হয়। ইহলোকে যে রাজা বা রাজপুরুষ দণ্ডদানের অযোগ্য ব্যক্তিকে দণ্ড প্রদান করে, কিংবা অদণ্ডনীয় ব্রাহ্মণকে শরীরদণ্ড প্রদান করে, সেই পাপীকে যমদূতেরা সূকরমুখ নরকে নিয়ে যায়। সেখানে অত্যন্ত বলশালী যমদূতেরা তাকে ইক্ষুদণ্ডের মতো নিষ্পেষণ করে। তখন সে আর্তস্বরে রোদন করতে থাকে এবং নির্দোষ ব্যক্তি দণ্ডিত হলে যেমন মোহগ্রস্ত হয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত হয়, সেও সেইভাবে মূর্ছিত হয়। নির্দোষ ব্যক্তিকে দণ্ডদান করার এই ফল। ভগবানের আয়োজনে ছারপোকা, মশা ইত্যাদি নিম্নস্তরের প্রাণীরা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের রক্ত পান করে। এই প্রকার নগণ্য প্রাণীদের কোন ধারণা নেই যে, তাদের দংশনের ফলে মানুষের কষ্ট হয়। কিন্তু, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ইত্যাদি উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের চেতনা উন্নত এবং তাই তারা জানে মৃত্যু কত বেদনাদায়ক। বিবেক সমন্বিত মানুষ যদি বিবেকহীন তুচ্ছ প্রাণীদের হত্যা করে অথবা যন্ত্রণা দেয়, তার নিশ্চয়ই পাপ হয়। সেই প্রকার মানুষকে ভগবান অন্ধকূপ নামক নরকে নিক্ষেপ করে দণ্ডদান করেন এবং সে যে-সমস্ত পশু, পক্ষী, সরীসৃপ, মশক, উকুন, কীট মাছি ইত্যাদি প্রাণীদের যন্ত্রণা দিয়েছিল, তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। তারা তাকে সবদিক থেকে আক্রমণ করে এবং তার ফলে তার নিদ্রা-সুখ একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে কোথাও বিশ্রাম করতে না পেরে অন্ধকারে নিরন্তর ছুটাছুটি করতে থাকে। এইভাবে অন্ধকূপে সে একটি নিম্নস্তরের প্রাণীর মতো যন্ত্রণা ভোগ করে। যে ব্যক্তি কোন ভক্ষ্যদ্রব্য প্রাপ্ত হলে অতিথি, বালক বা বৃদ্ধদের তা যথাযথ অংশ না দিয়ে নিজেই ভোজন করে, অথবা যে ব্যক্তি পঞ্চবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে না, সে কাকতুল্য বলে বর্ণিত হয়। তার মৃত্যুর পর তাকে কৃমিভোজন নামক একটি নিকৃষ্ট নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেই নরকের বিস্তার ১,০০,০০০ যোজন এবং তা কৃমিতে পূর্ণ। সেখানে সেই কৃমিকুণ্ডে একটি কৃমি হয়ে সে কৃমি ভক্ষণ করে এবং সেখানকার কৃমিরা তাকে ভক্ষণ করে। তার মৃত্যুর পূর্বে সে যদি তার অপকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্ত না করে, তা হলে সেই পাপীকে সেই কুণ্ডের বিস্তার যত যোজন তত বছর সেখানে থাকতে হয়।”
“হে রাজন্, যে ব্যক্তি সঙ্কট উপস্থিত না হলেও ব্রাহ্মাণ অথবা ন্য কোন ব্যক্তির স্বর্ণ-রত্ন ইত্যাদি ধন চৌর্যবৃত্তির দ্বারা অথবা বল প্রয়োগের দ্বারা অপহরণ করে, তাকে সন্দংশ নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে লৌহময় অগ্নিপিন্ড এবং সাঁড়াশির দ্বারা তাঁর ত্বক ছিন্নভিন্ন করা হয়। এইভাবে তার সারা শরীর কেটে টুকরো টুকরো করা হয়। যে ব্যক্তি অগম্যা স্ত্রীতে এবং যে স্ত্রী অগম্য পুরুষে অভিগমন করে, পরলোকে যমদূতেরা তদের তপ্তসূর্মি নামক নরকে নিয়ে গিয়ে চাবুক দিয়ে প্রহার করে এবং তারপর পুরুষকে তপ্ত লৌহময় স্ত্রীমূর্তি এবং স্ত্রীকে সেই প্রকার পুরুষ-মূর্তির দ্বারা আলিঙ্গন করায়। এটিই অবৈধ যৌন সঙ্গের দণ্ড। যে ব্যক্তি পশুতেও অভিগমন করে, তার মৃত্যুর পর তাকে বজ্রকন্টক-শাল্মলী নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেই নরকে একটি শাল্মলী বৃক্ষ রয়েছে, যার কাঁটা বজ্রের মতো। যমদূতেরা সেই পাপীকে তার উপর চড়িয়ে টানতে টানতে এবং তার ফলে সেই কাঁটার দ্বারা তার সারা দেহ ছিন্নভিন্ন হয়। যে সমস্ত রাজন্য বা রাজপুরুষ ক্ষত্রিয় আদি দায়িত্বশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও ধর্মনীতির অবহেলা করে এবং তার ফলে অধঃপতিত হয়, তারা মৃত্যুর পর বৈতরণী নামক নরকের নদীতে পতিত হয়। নরক বেষ্টনকারী পরিখাসদৃশ এই নদীটি ভয়ঙ্কর জলচর প্রাণীতে পূর্ণ। পাপী ব্যক্তি যখন এই বৈতরণী নদীতে নিক্ষিপ্ত হয়, তখন সেখানকার হিংস্র জলচলেরা তাকে ভক্ষণ করতে শুরু করে। কিন্তু তার ভয়ঙ্কর পাপকর্মের ফলে তার প্রাণ বহির্গত হয় না। সে তার পাপকর্মের কথা স্মরণ করতে করতে বিষ্ঠা, মূত্র, পূঁজ, রক্ত, কেশ, নখ, অস্থি, মেদ, মাংস এবং চর্বিপূর্ণ সেই নদীতে যন্ত্রণাভোগ করতে থাকে। শূদ্রা-রমণীদের নির্লজ্জ পতিরা ঠিক একটি পশুর মতো জীবন যাপন করে এবং তাই তাদের জীবন সদাচার, শৌচ এবং নিয়মবিহীন। মৃত্যুর পর তাদের পূয়োদ নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, যা পূঁজ, মূত্র, শ্লেষ্মা, লালা ইত্যাদি ঘৃণিত বস্তুতে পূর্ণ একটি সমুদ্র। সেখানে তারা এই সমস্ত অতি ঘৃণিত পদার্থ ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়। উচ্চ বর্ণের মানুষ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য) যদি কুকুর, গর্দভ ইত্যাদি পশু পালনে আসক্ত হয় এবং অনর্থক মৃগয়ায় গিয়ে পশু হত্যা করে, তা হলে মৃত্যুর পর তাকে প্রাণরোধ নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে যমদূতেরা তাকে তাদের লক্ষ্য বানিয়ে বাণের দ্বারা বিদ্ধ করে। যে ব্যক্তি ইহলোকে ধন এবং প্রতিষ্ঠার গর্বে গর্বিত হয়ে, দম্ভ প্রকাশ করার জন্য যজ্ঞে পশু বলি দেয়, তাকে মৃত্যুর পর বিশসন নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে যমদূতেরা তাকে অশেষ যন্ত্রণা দিয়ে বধ করে। যে মূর্খ দ্বিজ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য) তার সবর্ণা পত্নীকে বশে রাখার জন্য নিজের শুক্র পান করায়, পরলোকে যমদূতেরা তাকে লালাভক্ষ নামক নরকে নিক্ষেপ করে এবং সেখানে শুক্রনদীর মধ্যে তাকে শুক্র পান করায়। ইহলোকে যে সমস্ত ব্যক্তি দস্যুবৃত্তি করে পরগৃহে অগ্নি দেয় অথবা বিষ প্রদান করে, অথবা যে সমস্ত রাজা বা রাজপুরুষ আয়কর আদায়ের নামে অথবা অন্যান্য উপায়ে বর্ণিক সম্প্রদায়কে লুন্ঠন করে, মৃত্যুর পর সেই সমস্ত অসুরদের সারমেয়াদন নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে ৭২০টি বজ্রের মতো দন্ত সমন্বিত কুকুর রয়েছে। যমদূতের নির্দেশে সেই কুকুরগুলি অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে সেই সমস্ত প্রাপীদের ভক্ষণ করে। যে ব্যক্তি ইহলোকে সাক্ষ্য প্রদান করার সময়, ক্রয়-বিক্রয় করার সময় অথবা দান করার সময় কোন প্রকার মিথ্যা কথা বলে, পরলোকে যমদূতেরা তাকে শত যোজন উন্নত পর্বত শিখর থেকে মাথা নীচের দিকে করে অবীচিমৎ নামক নরকে নিক্ষেপ করে। সেই নরকের কোন অবলম্বন স্থান নেই এবং প্রস্তর নির্মিত পৃষ্টস্থল জলের মতো প্রতীত হয়। কিন্তু সেখানে কোন জল নেই, তাই তাকে বলে অবীচিমৎ (জলহীন)। সেই পাপীদের বার বার পাহাড়ের উপর থেকে নিক্ষেপ করা হলেও এবং তাদের দেহ তিল তিল করে বিদীর্ণ হলেও, তাদের মৃত্যু হয় না এবং তারা নিরন্তর সেই যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে। যে ব্রাহ্মণ অথবা ব্রাহ্মণী সুরাপান করে, কিংবা যে ক্ষত্রিয় কিংবা বৈশ্য ব্রতপরায়ণ হয়ে প্রমাদবশত সোমরস পান করে, যমদূতেরা তাদের অয়ঃপান নরকে নিয়ে যায়। অয়ঃপান নরকে যমদূতেরা তাদের পা দিয়ে পাপীদের বক্ষঃস্থল চেপে ধরে তাদের মুখে অত্যন্ত উত্তপ্ত তরল লোহা ঢেলে দেয়। যে নীচ কুলোদ্ভুত এবং অধম হওয়া সত্ত্বেও ‘আমি বড়’ বলে মিথ্যা অহঙ্কারপূর্বক জন্ম, তপস্যা, বিদ্যা, আচার, বর্ণ অথবা আশ্রমে তার থেকে শেষ্ঠ ব্যক্তিকে যথাযথভাবে সম্মান প্রদর্শন করে না, সে জীবিত অবস্থাতেই মৃত এবং মৃত্যুর পর তাকে ক্ষারকর্দম নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে সে যমদূতদের দ্বারা প্রচণ্ডভাবে নির্যাতিত হয়ে অত্যন্ত দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। এই পৃথিবীতের অনেক পুরুষ এবং স্ত্রী রয়েছে, যারা ভৈরব অথবা ভদ্রকালীর কাছে নরবলি দিয়ে তাদের মাংস খায়। যারা এই ধরনের যজ্ঞ করে, তাদের মৃত্যুর পর যমালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারা যাদের বলি দিয়েছিল তারা রাক্ষস হয়ে সুতীক্ষ্ম অস্ত্রের দ্বারা সেখানে তাদের খণ্ড খণ্ড করে কাটে। ইহলোকে যজ্ঞকারী ব্যক্তি যেভাবে নরবলি দিয়ে তার রক্ত পান করে আনন্দে নৃত্য-গীত করে, হিংসিত ব্যক্তিরাও তেমন পরলোকে যজ্ঞকারীর রক্ত পান করে আনন্দে নৃত্য-গীত করে। যে সমস্ত মানুষ ইহলোকে গ্রাম বা অরণ্যে জীবন রক্ষার্থে আগত পশু-পাখিদের আশ্রয় দান পূর্বক বিশ্বাস জন্মিয়ে শূল অথবা সূত্রের দ্বারা তাদের বিদ্ধ করে এবং তারপর ক্রীড়ানকের মতো ক্রীড়া করে প্রবল যন্ত্রণা দেয়, তারা মৃত্যুর পর যমদূতদের দ্বারা শূলপ্রোত নামক নরকে নীত হয় এবং তাদের শরীর তীক্ষ্ম শূল ইত্যাদির দ্বারা বিদ্ধ করা হয়। সেখানে তারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় পীড়িত হয় এবং চতুর্দিক থেকে বক, শকুন প্রভৃতি তীক্ষ্ম-চঞ্চু পক্ষী এসে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করতে থাকে। এইভাবে যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তারা তখন তাদের পূর্বকৃত পাপকর্মের কথা স্মরণ করতে থাকে। যারা ইহলোকে সর্পের মতো ক্রোধপরায়ণ হয়ে অন্য প্রাণীদের যন্ত্রণা দেয়, তারা পরলোকে দন্দশূক নামক নরকে পতিত হয়। হে রাজন্, সেই নরকে পঞ্চমুখ ও সপ্তমুখ সর্পেরা তাদের মূষিকের মতো গ্রাস করে। যারা ইহলোকে অন্য প্রাণীদের অন্ধকূপে, গোলায় বা পাহাড়ের গুহায় রুদ্ধ করে কষ্ট দেয়, মৃত্যুর পর তাদের অবটনিরোধন নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে অন্ধকূপ আদিতে বিষাক্ত ধূম এবং বহ্নির দ্বারা শ্বাসরোধ করে তাদের কঠোরভাবে যন্ত্রণা দেওয়া হয়। যে গৃহপতি অতিথি অভ্যাগত দেখলে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং পাপকুটিল দৃষ্টি দ্বারা যেন তাদের ভস্মীভূত করতে উদ্যত হয়, তাকে পর্যাবর্তন নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, যেখানে বজ্রের মতো কঠিন চক্ষুবিশিষ্ট শকুন, বক, কাক ইত্যাদি পক্ষীরা সেই পাপদৃষ্টি ব্যক্তির চক্ষু সহসা বলপূর্বক উৎপাটন করে। যে ব্যক্তি ইহলোকে তার ধনের গর্বে গর্বিত, সে মনে করে ‘আমি কত ধনী। কে আমার সমকক্ষ হতে পারে?’ এইভাবে অহঙ্কারে বক্রদৃষ্টি হয়ে সে সব সময় শঙ্কিত থাকে যে, অন্যেরা তার ধন অপহরণ করে নেবে। এমনকি সে তার গুরুজনদেরও সন্দেহ করে। এইভাবে ধন হারানোর ভয়ে তার হৃদয় ও বদন শুষ্ক হয়ে যায় এবং তার ফলে তাকে ঠিক একটি পিশাচের মতো দেখতে লাগে। সে কখনই সুখ পায় না এবং দুশ্চিন্তাহীন জীবন বলতে যে কি বোঝায়, তা সে জানতে পারে না। ধন উপার্জন, বর্ধন ও রক্ষণের জন্য যেহেতু তাকে পাপকর্ম করতে হয়, তার ফরে তাকে সূচীমুখ নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, সেখানে যমদূতেরা তার সর্বাঙ্গে তাঁতীর মতো সূত্র বয়ন করে।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, যমালয়ে এই প্রকার শত সহস্র নরক রয়েছে। যে সমস্ত পাপীদের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যাদের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তারা সকলেই তাদের পাপকর্মের মাত্রা অনুসারে বিভিন্ন প্রকার নরকে প্রবেশ করবে। আর যারা পুণ্যবান, তারা স্বর্গ আদি পুণ্যময় লোকে গমন করে। কিন্তু, পাপী এবং পুণ্যবান উভয়কেই তাদের কর্মফল শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। শুরুতে (শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্কন্ধে) আমি বর্ণনা করেছি কিভাবে মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া যায়। পুরাণে ব্রহ্মাণ্ডের চতুর্দশ ভুবনের বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিরাট রূপটি ভগবানের শক্তি এবং গুণের দ্বারা সৃষ্ট বাহ্য শরীর বলে মনে করা হয়। সাধারণত একে বলা হয় বিরাটরূপ। কেউ যদি শ্রদ্ধা সহকারে ভগবানের এই বাহ্য শরীরের বর্ণনা পাঠ করেন, শ্রবণ করেন অথবা অন্যদের কাছে ব্যাখ্যা করে ভাগবদ্ধর্ম বা কৃষ্ণভক্তির প্রচার করেন, তা হলে তাঁর শ্রদ্ধা এবং কৃষ্ণভক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। এই চেতনার বিকাশ করা যদিও অত্যন্ত কঠিন, তবুও এই পন্থায় নিজেকে পবিত্র করে ধীরে ধীরে পরম সত্য পরমেশ্বর ভগবানের পরম চেতনা লাভ করা যায়। যিনি মুক্তির পথে অবলম্বন করেছেন এবং বদ্ধ জীবনের প্রতি যাঁর কোন আসক্তি নেই, তাঁকে বলা হয় যতি বা ভক্ত। তাঁর কর্তব্য প্রথমে ভগবানের বিরাটরূপের চিন্তার দ্বারা মনকে বশীভূত করে, তারপর ধীরে ধীরে মনকে শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় স্বরূপের (সচ্চিদানন্দ বিগ্রহের) চিন্তায় মগ্ন করা। এইভাবে মন সমাধিস্থ হয়। ভক্তির দ্বারা ভগবানের চিন্ময় স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করা যায়, যা ভক্তের চরম লক্ষ্য। এইভাবে তাঁর জীবন সার্থক হয়। হে রাজন্, আমি আপনার কাছে এই পৃথিবী, অন্যান্য লোক, বর্ষ, নদী, পর্বত, আকাশ, সমুদ্র, পাতাল, দিক, নরক ও নক্ষত্রমণ্ডল বর্ণনা করলাম। সেগুলি সমস্ত প্রাণীর আশ্রয়স্বরূপ ভগবানের বিরাটরূপ। এইভাবে আমি ভগবানের পরম অদ্ভুত বাহ্য শরীরের ব্যাখ্যা করলাম।”
ষড়বিংশতি অধ্যায়- নরকের বর্ণনা
09 Nov 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা