প্রথম অধ্যায়- অজামিলের উপাখ্যান

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “হে প্রভু, হে শুকদেব গোস্বামী, আপনি পূর্বে (দ্বিতীয় স্কন্ধে) মুক্তির পথ (নিবৃত্তিমার্গ) বর্ণনা করেছেন। সেই পথ অনুসরণ করে অবশ্যই ক্রমে ক্রমে ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ লোক ব্রহ্মলোকে উন্নীত হওয়া যায় এবং সেখান থেকে ব্রহ্মার সঙ্গে চিৎ-জগতে উন্নীত হওয়া যায়। এইভাবে জীবের জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে নিষ্কৃতি লাভ হয়। হে মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী, জীব যতক্ষণ পর্যন্ত জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত না হয়, ততক্ষণ তাকে সুখ-দুঃখ ভোগ করার জন্য বিভিন্ন প্রকার শরীর ধারণ করতে হয় এবং সেই শরীর অনুসারে তার বিভিন্ন প্রকার প্রবৃত্তি হয়। এই প্রবৃত্তি অনুসরণ করে সে প্রবৃত্তিমার্গে ভ্রমণ করে এবং স্বর্গাদি লোক প্রাপ্ত হয়, যে কথা পূর্বেই (তৃতীয় স্কন্ধে) বর্ণিত হয়েছে। আপনি (পঞ্চম স্কন্ধের শেষে) অধর্মস্বরূপ যে নানাবিধ নরক রয়েছে, তারও বর্ণনা করেছেন এবং আপনি (চতুর্থ স্কন্ধে) প্রথম যে মন্বন্তরে ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু আবির্ভূত হন, সেই আদ্য মন্বন্তরের কথাও বর্ণনা করেছেন। হে প্রভু, আপনি প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদের বংশ এবং চরিত্র বর্ণনা করেছেন। পরমেশ্বর ভগবান যেভাবে বিভাগ, লক্ষণ এবং পরিমাণ নির্দেশ করে বিভিন্ন লোক, বর্ষ, নদী, উদ্যান, বনস্পতি প্রভৃতি সৃষ্টি করেছেন এবং যেভাবে ভূমণ্ডল, জ্যোতিষচক্র ও পাতাল আদি লোকের সংস্থান করেছেন, আপনি তাও বর্ণনা করেছেন। হে মহাভাগ শুকদেব গোস্বামী, যে উপায় অবলম্বন করলে মানুষকে নানা প্রকার অসহ্য যন্ত্রণাময় নরকে পতিত হতে হয় না, এখন আপনি আমার কাছে সেই উপায় কৃপাপূর্বক ব্যাখ্যা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন- “হে রাজন্, মৃত্যুর পূর্বে এই জীবনেই মন, বাক্য এবং শরীর দ্বারা যে পাপ আচরণ করা হয়েছে, মনুসংহিতা এবং অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে মানুষ যদি যথাযথভাবে তার প্রায়শ্চিত্ত না করে, তা হলে মৃত্যুর পরে তাকে নরকে অসহ্য যন্ত্রণাভোগ করতে হবে, যে কথা আমি পূর্বেই আপনার কাছে বর্ণনা করেছি। অতএব মৃত্যুর পূর্বেই, শরীর সুস্থ থাকতে থাকতে, শ্রীঘ্রই শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে প্রায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠানে যত্নবান হওয়া উচিত; তা না হলে সময় নষ্ট হয়ে যাবে এবং পাপের ফল বর্ধিত হবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন রোগের গুরুত্ব এবং লঘুত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসা করেন, তেমনই পাপের মহত্ত্ব এবং অল্পত্ব বিবেচনা করে সেই অনুসারে প্রায়শ্চিত্ত করা কর্তব্য।”
মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন- “মানুষ জানে যে, পাপকর্ম করা তার পক্ষে অকল্যাণকর, কারণ সে দেখতে পায় যে, রাষ্ট্রের আইনে পাপী দণ্ডিত হয়, সাধারণ মানুষেরা তাকে তিরস্কার নিন্দা করে এবং শাস্ত্র ও তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে সে জানতে পারে যে, পাপীকে পরবর্তী জীবনে নরকে যন্ত্রণাভোগ করতে হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ বার বার পাপকর্মে লিপ্ত হয়, এমন কি প্রায়শ্চিত্ত করার পরেও। অতএব, এই প্রকার প্রায়শ্চিত্তের কি মূল্য আছে? পাপকর্ম না করার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তিও কখনও কখনও পুনরায় পাপকর্মে লিপ্ত হয়, তাই আমি এই প্রায়শ্চিত্তের পন্থাকে হস্তীস্নানের মতো নিরর্থক বলে মনে করি। কারণ হস্তী স্নান করার পর ডাঙ্গায় উঠে এসেই তার মাথায় এবং গায়ে ধুলি নিক্ষেপ করে।”
বেদব্যাস-নন্দন শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন- “হে রাজন্, যেহেতু পাপকর্মের ফল নিষ্ক্রিয় করার এই পন্থাটিও সকাম কর্ম, তাই তার দ্বারা কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। যারা প্রায়শ্চিত্তের বিধি অনুসরণ করে, তারা মোটেই বুদ্ধিমান নয়। প্রকৃতপক্ষে, তারা তমোগুণের দ্বারা আচ্ছন্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তমোগুণের প্রভাব থেকে মুক্ত না হয়, ততক্ষণ একটি কর্মের দ্বারা অন্য কর্মের প্রতিকারের চেষ্টা সম্পুর্ণরূপে ব্যর্থ হয়, কেননা তার ফলে কর্মবাসনা সমূলে উৎপাটিত হয় না। আপাতদৃষ্টিতে এই সমস্ত ব্যক্তিদের পুণ্যবান বলে মনে হলেও তারা পুনরায় পাপকর্মে লিপ্ত হবে, সেই সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই। তাই প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে বেদান্তের পূর্ণজ্ঞান লাভ করা, যার দ্বারা পরম সত্য পরমেশ্বর ভগবানকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। হে রাজন্, রোগী যেমন চিকিৎসকের দেওয়া পথ্য আহারের ফলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাকে যেমন ব্যাধি আর আক্রমণ করতে পারে না, তেমনই, যিনি জ্ঞানের বিধি-নিষেধগুলি পালন করে চলেন, তিনি ক্রমে ক্রমে জড় কলুষ থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হন। মনকে একাগ্র করার জন্য ব্রহ্মচর্য পালন অবশ্য কর্তব্য এবং কখনও সেই স্তর থেকে পতিত হওয়া উচিত নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইন্দ্রিয়সুখ পরিত্যাগ করে তপশ্চর্যা করা উচিত। মন এবং ইন্দ্রিয় সংযত করা উচিত। দান করা উচিত, সত্যনিষ্ঠ হওয়া উচিত, শুচি এবং অহিংস হওয়া উচিত, বিধি-নিষেধ পালন করা উচিত এবং নিয়মিতভাবে ভগবানের দিব্য নাম জপ করা উচিত। এইভাবে ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত শ্রদ্ধা সমন্বিত ধীর ব্যক্তি তাঁর দেহ, বাণী এবং মনের দ্বারা কৃত সমস্ত পাপ থেকে সাময়িকভাবে পবিত্র হন। সেই পাপগুলি বাঁশঝাড়ের নীচে শুকনো লতার মতো, যেগুলি আগুনে পোড়ানো হলেও তাদের মূল থেকে প্রথম সুযোগেই আবার সেই লতাগুলি গজাতে থাকে। যাঁরা সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তির পন্থা অবলম্বন করেছেন, তাঁরাই কেবল পাপকর্মরূপ আগাছাকে সমূলে উৎপাটিত করতে পারেন এবং সেই আগাছাগুলির পুনরুদ্‌গমের আর কোন সম্ভাবনা থাকে না। ভগবদ্ভক্তির অনুশীলনের প্রভাবেই কেবল তা সম্ভব হয়, ঠিক যেমন সূর্য তার কিরণের দ্বারা অচিরেই কুয়াশা দূর করে দেয়।”
“হে রাজন্, কোন পাপী যদি ভগবদ্ভক্তের সেবায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করেন, তা হলে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হতে পারেন। আমি পূর্বেই বলেছি যে তপশ্চর্যা, ব্রহ্মচর্য এবং প্রায়শ্চিত্তের অন্যান্য পন্থার দ্বারা পবিত্র হওয়া যায় না। সুশীল এবং সদ্‌গুণ-সম্পন্ন শুদ্ধ ভক্ত যে পথ অনুসরণ করেন, সেটিই এই জগতে সব চাইতে মঙ্গলময় পথ। সেই পথ ভয়বিহীন এবং শাস্ত্রের দ্বারা স্বীকৃত। হে রাজন্, সুরাভাণ্ড যেমন বহু নদীর জলে ধৌত করলেও শুদ্ধ হয় না, তেমনই অতি সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত প্রায়শ্চিত্তের পন্থার দ্বারা অভক্ত পবিত্র হতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি না করলেও যাঁরা অন্তত একবার তাঁর শ্রীপাদপদ্মে শরণাগত হয়েছেন এবং তাঁর নাম, রূপ, গুন ও লীলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, তাঁরা সম্পূর্ণরূপে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত, কারণ তাঁরা প্রায়শ্চিত্তের প্রকৃত পন্থা অবলম্বন করেছেন। সেই শরণাগত ব্যক্তি স্বপ্নেও পাপীদের বন্ধন করার জন্য পাশ-বহনকারী যমদূতদের দর্শন করেন না। এই বিষয়ে পণ্ডিত এবং মহাত্মারা একটি পুরাতন ইতিহাস দৃষ্টান্তস্বরূপ বর্ণনা করেন। বিষ্ণুদূত ও যমদূতের আলোচনা সমন্বিত সেই ঘটনাটি আপনি আমার কাছে শ্রবণ করুন।”
“কান্যকুব্জ নগরে অজামিল নামক এক ব্রাহ্মণ বাস করত। সে এক বেশ্যা দাসীকে বিবাহ করে তার সঙ্গ প্রভাবে সমস্ত ব্রাহ্মণোচিত সদ্‌গুণ হারিয়েছিল। এই অধঃপতিত ব্রাহ্মণ অজামিল মানুষকে বন্দী করে, দ্যূতক্রীড়ায় প্রবঞ্চনা করে অথবা সরাসরিভাবে লুন্ঠন করে অন্যদের কষ্ট দিত। এইবাবে সে তার স্ত্রঅ-পুত্রদের ভরণ-পোষণ করার জন্য জীবিকা উপার্জন করত। হে রাজন্, বহু পুত্রসমন্বিত তার পরিবারের লালন-পালন করার জন্য নানা রকম জঘন্য পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে তার ৮৮ বৎসর দীর্ঘ আয়ু অতিক্রান্ত হয়েছিল। বৃদ্ধ অজামিলের দশটি পুত্র ছিল, তার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ পুত্রটির নাম ছিল নারায়ণ। যেহেতু নারায়ণ ছিল তার পুত্রদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, তাই সে পিতা-মাতার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বৃদ্ধ অজামিলের চিত্ত সেই অস্ফুট মধুরভাষী শিশুটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকত। সে সর্বদা সেই শিশুটিকে নিয়ে থাকত এবং শিশুসুলভ কার্যকলাপ দেখে আনন্দিত হত। অজামিল নিজে যখন কোন কিছু আহার করত, অথবা পান করত, তখন সে সেই শিশুটিকেও ভোজন করাত এবং পান করাত। এইভাবে শিশুটির লালন-পালন করে এবং তার নারায়ণ নাম উচ্চারণ করে অজামিল সর্বদা ব্যস্ত থাকত এবং সে বুঝতে পারেনি যে, এখন তার আয়ু সমাপ্ত হয়ে মৃত্যু আসন্ন হয়েছে। যখন মূর্খ অজামিলের মৃত্যুকাল উপস্থিত হল, তখন সে কেবল তার পুত্র নারায়ণের কথা চিন্তা করতে লাগল। অজামিল তখন দেখতে পেল যে, তিনজন পাশহস্ত, বক্রমুখ, ঊর্ধ্বরোমা, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দর্শন পুরুষ তাকে যমালয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছে। তাদের দেখে অজামিল অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং কিছু দূরে খেলায় মগ্ন তার পুত্রটির প্রতি আসক্তিবশত অজামিল উচ্চস্বরে তার নাম ধরে ডাকতে শুরু করে। এইভাবে অশ্রুপূর্ণ নয়নে সে নারায়নের নাম উচ্চারণ করেছিল। হে রাজন্, বিষ্ণুদূতেরা মরণোন্মুখ অজামিলের মুখ থেকে তাঁদের প্রভুর দিব্য নাম শ্রবণ করে তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। অজামিল নিশ্চয় নিরপরাধে সেই নাম উচ্চারণ করেছিল, কারণ সে অত্যন্ত ভয়ার্ত হয়ে সেই নাম করেছিল। যমদূতেরা যখন বেশ্যাপতি অজামিলের আত্মাকে তার হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে বলপূর্বক টেনে বার করছিল, তখন বিষ্ণুদূতেরা বজ্রনির্ঘোষ স্বরে তাদের নিবারণ করেছিলেন। সূর্যপুত্র যমরাজের দূতেরা এইভাবে নিবারিত হয়ে উত্তর দিয়েছিল, ‘যমরাজের শাসনের প্রতিষেধ করার দুঃসাহসকারী আপনারা কারা?’ আপনারা কার সেবক? কোথা থেকে আপনারা এসেছেন? এবং কেন আপনারা আমাদের অজামিলকে স্পর্শ করতে বাধা দিচ্ছেন? আপনার কি দেবতা, উপদেবতা অথবা শ্রেষ্ঠ ভক্ত? আপনাদের নয়ন পদ্মফুলের পাপড়ির মতো বিস্ফারিত। আপনারা পীত কৌশেয় বসনধারী, আপনাদের সকলের মাথাতেই কিরীট, কর্ণে কুণ্ডল, গলদেশে পদ্মফুলের মালা শোভা পাচ্ছে এবং আপনারা সকলেই নবযৌবন-সম্পন্ন। আপনাদের দীর্ঘ চতুর্ভুজ ধনুক, তূন, অসি, গদা, শঙ্খ, চক্র ও পদ্মের দ্বারা অলঙ্কৃত। আপনাদের দেহনির্গত রশ্চিচ্ছটা এক অপূর্ব জ্যোতির দ্বারা এই স্থানের অন্ধকার দূর করেছে। আপনারা কেন আমাদের বাধা দিচ্ছেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “যমদূতেরা এইভাবে বললে, বাসুদেবের সেবকেরা হেসে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তোমরা যদি সত্যিই যমরাজের সেবক হও, তা হলে আমাদের কাছে ধর্মের স্বরূপ এবং অধর্মের লক্ষণ বল। দণ্ডদানের বিধি কি? দণ্ডের উপযুক্ত কে? সমস্ত কর্মীরাই কি দণ্ডণীয় অথবা তাদের মধ্যে কয়েকজন মাত্র?’ ”
যমদূতেরা উত্তর দিল- “বেদে যা কিছু নির্ধারিত হয়েছে তাই ধর্ম এবং তার বিপরীত হচ্ছে অধর্ম। বেদ সাক্ষাৎ নারায়ণ এবং তা স্বয়ং উদ্ভুত হয়েছে। সেই কথা আমরা যমরাজের কাছে শুনেছি। সর্বকারণের পরম কারণ নারায়ণ তাঁর ধম চিৎ-জগতে বিরাজ করেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সত্ত্ব, রজ এবং তম- এই জড়া প্রকৃতির এই তিনটি গুণের দ্বারা সমগ্র জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এইভাবে সমস্ত জীব বিভিন্ন গুণ, বিভিন্ন নাম (যেমন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ইত্যাদি), বর্ণাশ্রম ধর্ম অনুসারে বিভিন্ন কর্তব্য এবং বিভিন্ন রূপ প্রাপ্ত হয়েছে। এইভাবে নারায়ণ হচ্ছেন সমগ্র জগতের কারণ। সূর্য, অগ্নি, আকাশ, বায়ু, দেবতা, চন্দ্র, সন্ধ্যা, দিন, রাত্রি, দিক, জল, পৃথিবী এবং পরমাত্মা স্বীয় জীবের সমস্ত কর্মের সাক্ষী। এই সমস্ত সাক্ষীদের দ্বারা বিজ্ঞাত অধর্ম আচরণকারীই দণ্ডের পাত্র। সকাম কর্মে লিপ্ত প্রতিটি ব্যক্তিই তাদের পাপকর্ম অনুসারে দণ্ডণীয়। হে বৈকুন্ঠবাসীগণ, আপনারা নিষ্পাপ, কিন্তু এই জড় জগতে পাপ অথবা পূণ্যকর্ম অনুষ্ঠানকারী সকলেই কর্মী। উভয় প্রকার কর্মই তাদের পক্ষে সম্ভব, কারণ তারা জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা কলুষিত এবং গুণের প্রভাব অনুসারে তারা কর্ম করতে বাধ্য হয়। দেহধারী জীব কখনও কর্ম না করে থাকতে পারে না এবং প্রকৃতির গুণ অনুসারে যারা কর্ম করে, তারা পাপকর্ম করতে বাধ্য। তাই এই জড় জগতে সমস্ত জীবই দণ্ডণীয়। এই জীবনে যে ব্যক্তি যে পরিমাণ ও যে প্রকার ধর্ম অথবা অধর্ম আচরণ করে, পরবর্তী জীবনে সেই ব্যক্তি সেই পরিমাণ ও সেই প্রকার কর্মফল ভোগ করে।”
“হে দেবশ্রেষ্ঠগণ, প্রকতির তিন গুণের প্রভাবের ফলে আমরা তিন প্রকার জীবন দেখতে পাই। তার ফলে জীবেদের শান্ত, চঞ্চল এবং মূঢ়; সুখী, অসুখী এবং তাদের মধ্যবর্তী; অথবা ধার্মিক, অধার্মিক এবং প্রায়-ধার্মিকরূপে দেখতে পাওয়া যায়। তা থেকে আমরা ঠিক করতে পারি যে, পরবর্তী জীবনেও জড়া প্রকৃতির এই তিন গুণ এইভাবে কার্য করবে। ঠিক যেমন বর্তমান বসন্ত ঋতু অতীতের এবং ভবিষ্যতের বসন্ত ঋতুর প্রকৃতির নির্দেশ করে, তেমনই এই জীবনের সুখ, দুঃখ অথবা তাদের মিশ্রণ পূর্ববর্তী জীবনের এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ধর্ম এবং অধর্ম আচরণের নিদর্শন-স্বরূপ হয়। সর্বশক্তিমান যমরাজ ব্রহ্মারই মতো। কারণ তাঁর নিজের ধামে অথবা পরমাত্মার মতো সকলের হৃদয়ে অবস্থান করে মনের দ্বারা তিনি জীবের পূর্বকৃত আচরণ দেখতে পান এবং এইভাবে তিনি বুঝতে পারেন জীব ভবিষ্যতে কিভাবে আচরণ করবে। নিদ্রাভিভূত ব্যক্তি যেমন তার স্বপ্নদৃষ্ট শরীরকে তার নিজের স্বরূপ বলে মনে করে, ঠিক তেমনই জীব তার পূর্বকৃত পুণ্য অথবা পাপকর্ম অনুসারে প্রাপ্ত বর্তমান শরীরটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে এবং তার অতীত অথবা ভবিষ্যৎ জীবন সমন্ধে কিছুই জানতে পারে না। পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় এবং পঞ্চ তন্মাত্রের ঊর্ধ্বে হচ্ছে মন, যা ষোড়শ তত্ত্ব। মনের ঊর্ধ্বে সপ্তদশ তত্ত্ব হচ্ছে আত্মা অথবা জীব স্বয়ং, যে অন্য যোলটির সহযোগিতায় একা জড় জগৎকে ভোগ করে। জীব সুখ, দুঃখ এবং সুখ-দুঃখের মিশ্রণ- এই তিন প্রকার পরিস্তিতি উপভোগ করে। সূক্ষ্ম শরীর পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্র এবং মন- এই ষোলটি কলা-সমন্বিত। এই সূক্ষ্ম দেহটি গুণত্রয়ের প্রভাব সমন্বিত। তা দুর্নিবার বাসনাময় এবং তাই তা জীবনে মনুষ্য, পশু, দেবতা ইত্যাদি বিভিন্ন দেহে দেহান্তরিত করায়। জীব যখন দেবতার দেহ প্রাপ্ত হয়, তখন সে অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দিত হয়। সে যখন মনুষ্য-শরীর প্রাপ্ত হয়, তখন সে সর্বদাই শোক করে এবং যখন সে পশু শরীর প্রাপ্ত হয়, তখন সে সর্বদা ভয়ভীত থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, সে সর্ব অবস্থাতেই দুঃখী। তার এই দুঃখদায়ক অবস্থাকে বলা হয় সংসৃতি বা জড় জগতে এক দেহ থেকে আর এক দেহে দেহান্তরিত হওয়া। মূর্খ জীব তার মন এবং ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে না পেরে, তা ইচ্ছা না থাকলেও গুণের প্রভাব অনুসারে কার্য করতে বাধ্য হয়। তার অবস্থা ঠিক একটি রেশম-গুটিপোকার মতো, যে তার মুখনিঃসৃত লালা দিয়ে কোষণ নির্মাণ করে তাতে আবদ্ধ হয় এবং তখন সে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। জীবও তেমনই তার নিজের কর্মজালে আবদ্ধ হয়ে উদ্ধারের পথ খুঁজে পায় না। এইভাবে সে সর্বদা মোহাচ্ছন্ন থাকে এবং বার বার তার মৃত্যু হয়। কোন জীবই কর্ম না করে ক্ষণকালও থাকতে পারে না। প্রকৃতির তিন গুণ অনুসারে সে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী কোন বিশেষভাবে কর্ম করতে বাধ্য হয়। জীবের পাপ এবং পুণ্য কর্মসমূহ ফলোন্মুখ হলে তাকে বলা হয় অদৃষ্ট। সেই অদৃষ্টই জীবের জন্মের মূল কারণ। তার প্রবল কর্ম-বাসনার ফলে জীব কোন বিশেষ পরিবারে পিতৃসদৃশ অথবা মাতৃসদৃশ দেহ প্রাপ্ত হয়। তার বাসনা অনুসারে তার স্থূল এবং সূক্ষ্ম দেহ সৃষ্টি হয়। জড়া প্রকৃতির সংসর্গের ফলে জীবের এই বিপর্যয় বা স্বরূপ-বিস্মৃতি হয়, কিন্তু মনুষ্য-জীবন লাভ করার পর সে যদি ভগবান অথবা ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ করার শিক্ষা লাভ করে, তা হলে সে তার সেই পরিস্থিতিকে পরাভূত করতে পারে।”
“অজামিল নামক ব্রাহ্মণ প্রথমে বৈদিক জ্ঞান সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, সৎ স্বভাব, সদাচার এবং সদ্‌গুণের আলয়, ব্রতনিষ্ঠ, কোমলচিত্ত এবং জিতেন্দ্রিয় ছিলেন। অধিকন্তু তিনি সত্যবাদী, মন্ত্রজ্ঞ এবং অত্যন্ত পবিত্র ছিলেন। অজামিল তাঁর শ্রীগুরুদেব, অগ্নিদেব, অতিথি ও বৃদ্ধদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান ছিলেন। তিনি বস্তুতই নিরহঙ্কার, উন্নতচেতা, সর্বভূতের হিতকারী সুহৃৎ এবং সদাচরণ-সম্পন্ন ছিলেন। তিনি কখনও অনর্থক বাক্যালাপ করতেন না এবং কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন না। সেই ব্রাহ্মণ অজামিল এক সময় তাঁর পিতার আদেশে ফল, ফুল, সমিৎ এবং কুশ ঘাস সংগ্রহ করার জন্য বনে গিয়েছিলেন। গৃহে প্রত্যাবর্তনের সময়, তিনি পথে এক অত্যন্ত কামার্ত শূদ্রকে লজ্জা পরিত্যাগ করে এক বেশ্যাকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করতে দেখেন। সেই শূদ্রটি তার আনন্দ প্রকাশ করে হাসছিল এবং গান গাইছিল যেন সেটিই হচ্ছে যথাযথ আচরণ। সেই শূদ্র এবং বেশ্যা উভয়েই সুরাপানে উন্মত্ত ছিল। সুরাপানের ফলে সেই বেশ্যার চোখ ঘূর্ণিত হচ্ছিল এবং তার বসন শিথিল হয়েছিল। এই রকম অবস্থায় অজামিল তাদের দর্শন করেছিলেন। শূদ্রটি হরিদ্রালিপ্ত বাহুর দ্বারা সেই বেশ্যাটিকে আলিঙ্গন করছিল। তা দেখে অজামিলের সুপ্ত কামবাসনা উদ্দীপ্ত হয়েছিল এবং বিমোহিত হয়ে তিনি তখন কামের বশীভূত হয়েছিলেন। তিনি তখন স্ত্রীদর্শন পর্যন্ত না করার শাস্ত্রনির্দেশ যথাসাধ্য স্মরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই জ্ঞান এবং তাঁর বুদ্ধির দ্বারা তিনি নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু হৃদয়ে মদন বেগের প্রভাবে তিনি তাঁর মনকে সংযত করতে পারলেন না। রাহু যেভাবে চন্দ্র এবং সূর্যকে গ্রাস করে, সেভাবেই সেই ব্রাহ্মণ অজামিল গ্রহগ্রস্ত হওয়ার ফলে তাঁর বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিলেন। সর্বদা সেই বেশ্যার চিন্তায় মগ্ন থাকার ফলে অচিরেই তাঁর অধঃপতন হয়েছিল এবং তিনি তাকে তাঁর গৃহে দাসীরূপে রেখেছিলেন এবং ব্রাহ্মণোচিত সমস্ত আচার-আচরণ পরিত্যাগ করেছিলেন। এইভাবে অজামিল সেই বেশ্যাকে নানা উপহার দিয়ে সন্তুষ্ট করার জন্য তাঁর পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ ব্যয় করতে থাকেন। সেই বেশ্যার সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য তিনি তাঁর সমস্ত ব্রাহ্মণোচিত কার্যকলাপ পরিত্যাগ করেন। অজামিলের বুদ্ধি বেশ্যার কামপূর্ণ দৃষ্টির দ্বারা বিদ্ধ হওয়ার ফলে, তিনি তাঁর অতি সুন্দরী নবযৌবনা, সৎ ব্রাহ্মণ কুলোদ্ভবা পত্নীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হওয়া সত্ত্বেও, বেশ্যার সঙ্গ প্রভাবে তিনি তাঁর সমস্ত বুদ্ধি হারিয়ে এক দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছিলেন এবং সেই বেশ্যার পুত্র-কন্যা সমন্বিত পরিবার প্রতিপালন করতে ধন উপার্জন করার জন্য ন্যায্য এবং অন্যায্য উপায় অবলম্বন করতেন। এই ব্রাহ্মণ এইভাবে শাস্ত্রবিধি উল্লঙ্ঘন করে, যথেচ্ছাচারে প্রবৃত্ত হয়ে এবং বেশ্যার তৈরী ভোজন আহার করে দীর্ঘকাল যাপন করেছিলেন। তার ফলে তাঁর জীবন অত্যন্ত পাপময় হয়েছিল এবং তিনি অপবিত্র ও অন্যায় কর্মে আসক্ত হয়েছিলেন। এই অজামিল কোন প্রায়শ্চিত্ত করেননি। অতএব আমরা তাঁকে তাঁর পাপ কর্মের দণ্ডভোগের জন্য যমরাজের কাছে নিয়ে যাব। সেখানে তাঁর পাপকর্ম অনুসারে দণ্ডভোগ করে তিনি শুদ্ধ হবেন।”

Leave a Reply

November 2025
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Blog Stats

  • 140,963 hits