শ্রীল শুকদেব গোস্বামী পরীক্ষিৎকে বললেন- “হে রাজন্, পাতাললোকের ৩০,০০০ যোজন নীচে ভগবানের আরেক অবতার রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন অনন্ত বা সঙ্কর্ষণ নামক ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অংশ। তিনি সর্বদাই বিশুদ্ধ সত্ত্বময়, কিন্তু যেহেতু তিনি তমোগুণের অবতার শ্রীরুদ্রের দ্বারা পূজিত হন, তাই তাঁকে কখনও কখনও তামসী বলা হয়। ভগবান অনন্তদেব জড়া প্রকৃতির তমোগুণের এবং বদ্ধ জীবের অহংকারের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা। বদ্ধ জীব যখন মনে করে, ‘আমি ভোক্তা এবং এই জগৎ আমার ভোগের জন্য’, এই ধারণা সঙ্কর্ষণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এইভাবে বদ্ধ জীব নিজেকে পরমেশ্বর ভগবান বলে মনে করে।”
“এই ব্রহ্মাণ্ডটি সহস্র ফণা সমন্বিত ভগবান অনন্তদেবের একটি ফণায় অবস্থান করে একটি সর্ষের দানার মতো প্রতীয়মান হয়। প্রলয়ের সময়ে অনন্তদেব যখন সমগ্র সৃষ্টি সংহার করতে ইচ্ছা করেন, তখন ক্রোধবশত তাঁর ভ্রকুটি কুটিল ভ্রূযুগলের মধ্য থেকে ত্রিশূলধারী ত্রিলোচন একাদশ রুদ্ররূপী সঙ্কর্ষণ নামক রুদ্র উত্থিত হন। তিনি সমগ্র সৃষ্টি সংহার করার জন্য আবির্ভূত হন। ভগবান সঙ্কর্ষণের শ্রীপাদপদ্মের অরুণবর্ণ স্বচ্ছ নখরূপ মণিমণ্ডল দর্পণরূপে প্রতিভাত হয়। শ্রেষ্ঠ ভক্তগণ-সহ নাগপতিরা যখন ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে ভগবান সঙ্কর্ষণের প্রতি তাঁদের প্রণতি নিবেদন করেন, তখন তাঁরা তাঁর পদনখে তাঁদের সুন্দর মুখমন্ডল প্রতিবিম্বিত হতে দর্শন করে অত্যন্ত আনন্দিত হন। তাঁদের গণ্ডদেশ অতি উজ্বল কর্ণকুণ্ডলের দ্বারা অলঙ্কৃত হওয়ায় তাঁদের মুখমণ্ডল অপূর্ব শোভা ধারণ করে। ভগবান অনন্তদেবের সুন্দর সুদীর্ঘ বাহু সম্পূর্ণরূপে চিন্ময় এবং তা মনোহর বলয় বিভূষিত। তাঁর বর্ণ উজ্জ্বল শুভ্র হওয়ার ফলে সেগুলিকে রজত স্তম্ভের মতো মনে হয়। সুন্দরী নাগরাজকন্যারা যখন ভগবানের মঙ্গলময় আশীর্বাদ লাভের আশায় তাঁর বাহুতে অগুরু, চন্দন ও কুমকুম পঙ্ক অনুলেপন করেন, তখন তাঁর শ্রীহস্তের সংস্পর্শে তাঁদের হৃদয় কামাবেশে উন্মথিত হয়ে ওঠে। তাঁদের মনের ভাব বুঝেতে পেরে ভগবান তখন কৃপাপূর্ণ মধুর হাস্য সহকারে সেই রাজকন্যাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং তাঁদের মনের বাসনা তাঁর কাছে প্রকাশ পেয়ে গেছে বলে বুঝতে পেরে তাঁরা তখন লজ্জিত হন। তখন তাঁরা মধুর হাস্য সহকারে মদ-বিঘূর্ণিত অরুণ বর্ণ, ভক্তপ্রেমে প্রসন্ন ভগবানের সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভগবান সঙ্কর্ষণ অনন্ত গুণের সমুদ্র, তাই তঁর নাম অনন্তদেব। তিনি পরমেশ্বর ভগবান থেকে অভিন্ন। এই জড় জগতের সমস্ত জীবের মঙ্গল সাধনের জন্য তিনি অসহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ করে তাঁর ধামে বিরাজ করছেন।”
“দেবতা, অসুর, উরগ (সর্পদেবতা), সিদ্ধ, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর এবং মুনিগণ নিরন্তর ভগবানের বন্দনা করছেন। ভগবানকে যেন মদভরে বিহ্বল বলে মনে হচ্ছে এবং তাঁর পূর্ণ বিকশিত পুষ্পসদৃশ নেত্র মদভরে ঘূর্ণায়মান। তিনি তাঁর পার্ষদ দেব যূথপতিদের তাঁর শ্রীমুখ-নিঃসৃত মধুর বাণীর দ্বারা আনন্দিত করছেন। তাঁর পরনে নীল বসন, কর্ণে এক কুণ্ডল, পৃষ্ঠদেশে হল এবং তাঁর বাহুযুগল অত্যন্ত সুগঠিত ও সুন্দর। তাঁর অঙ্গকান্তি দেবরাজ ইন্দ্রের ঐরাবতের মতো শুভ্র, তাঁর কোমরে স্বর্ণময়ী মেখলা এবং গলদেশে বৈজয়ন্তী মালা, তাতে যে নব নব তুলসী মঞ্জরী গ্রথিত রয়েছে, তার কান্তি কখনও ম্লান হয় না। তার মধুর সৌরভে মত্ত হয়ে মৌমাছিরা অত্যন্ত মধুর স্বরে গুঞ্জন করছে এবং তার ফলে তা আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। এইভাবে ভগবান তাঁর উদার লীলা-বিলাস করছেন।”
“জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে যাঁরা ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী, তাঁরা যদি গুরু-পরম্পরার ধারায় সদ্গুরুর শ্রীমুখ থেকে অনন্তদেবের মহিমা শ্রবণ করেন এবং নিরন্তর সঙ্কর্ষণের ধ্যান করেন, ভগবান তাঁদের অন্তরের অন্তস্তলে প্রবেশ করে সমস্ত জড় কলুষ দূর করেন এবং অনাদি কাল ধরে সকাম কর্মের মাধ্যমে জড় জগতের উপর আধিপত্য করার বাসনারূপ হৃদয়গ্রন্থি ছেদন করেন। ব্রহ্মার পুত্র নারদ মুনি সর্বদা তাঁর পিতার সভায় তুম্বুরু নামক বাদ্যযন্ত্র (অথবা গন্ধর্ব) সহ স্বরচিত শ্লোকের দ্বারা তাঁর মহিমা কীর্তন করেন। পরমেশ্বর ভগবান তাঁর দৃষ্টিপাতের দ্বারা জড়া প্রকৃতির গুণগুলিকে বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি এবং পালন কার্যের কারণ-স্বরূপ সক্রিয় করেন। সেই পরম আত্মা অনন্ত এবং অনাদি। তিনি এক হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বহুরূপে প্রকাশিত করেছেন। তাঁর তত্ত্ব মানুষ কিভাবে অবগত হতে পারে? সূক্ষ্ম এবং স্থূল জগৎ ভগবানের মধ্যে বিরাজমান। তাঁর ভক্তদের প্রতি অহৈতুকী কৃপাবশত তিনি তাঁর বিভিন্ন রূপ প্রকাশ করেন, যা সর্বতোভাবে চিন্ময়। পরমেশ্বর ভগবান পরম উদার এবং তিনি সমস্ত যোগ-ঐশ্বর্য সমন্বিত। তাঁর ভক্তদের মন জয় করার জন্য এবং তাঁদের হৃদয়ে আনন্দ দান করার জন্য তিনি বিভিন্ন অবতারে প্রকাশিত হয়ে বিভিন্ন লীলা-বিলাস করেন। সদ্্গুরুর শ্রীমুখ থেকে ভগবানের পবিত্র নাম শ্রবণ করে কেউ যদি অকস্মাৎ তা কীর্তন করেন, অথবা আর্ত কিংবা পতিত ব্যক্তিও যদি পরিহাসচ্ছলে সেই নাম একবার উচ্চারণ করেন, তা হলে সেই ব্যক্তি নিজে তো সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হনই, উপরন্তু তাঁর সান্নিধ্য মাত্র অন্যের পাপরাশিও বিনাশ করতে সমর্থ হন। অতএব জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি কেন ভগবান শেষের নাম কীর্তন করবেন না? তাঁকে ছাড়া তিনি আর কার আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন?”
“ভগবান যেহেতু অনন্ত, তাই কেউই তঁর শক্তি অনুমান করতে পারে না। বিশাল গিরি-পর্বত, নদী, সমুদ্র, গাছপালা এবং জীবজন্তু সমন্বিত এই ব্রহ্মাণ্ড ঠিক একটি অণুর মতো তাঁর সহস্র ফণার একটিতে ন্যস্ত রয়েছে। সহস্র জিহ্বা লাভ করেও তাঁর প্রভাব কে-ই বা বর্ণনা করতে পারেন? মহা শক্তিশালী ভগবান অনন্তদেবের গুণ এবং মহিমার অন্ত নেই। বস্তুতপক্ষে তাঁর শক্তি অন্তহীন। সর্বতোভাবে স্বতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি সব কিছুর আশ্রয়। রসাতলের মূলদেশে অবস্থান করে তিনি অনায়াসে ব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করে রয়েছেন।”
“হে রাজন্, আমি যেভাবে আমার শ্রীগুরুদেবের কাছ থেকে শ্রবণ করেছি, সেই অনুসারে আপনার কাছে এই সমস্ত বিষয়ে বর্ণনা করলাম। কর্মীদের কর্ম অনুসারে এই সমস্ত গতি নির্মিত হয়। সকাম ব্যক্তিরা বিভিন্ন লোকে বিভিন্ন গতি প্রাপ্ত হয়। হে রাজন্, জীবেরা সাধারণত তাদের বাসনা ও কর্মফল অনুসারে কিভাবে আচরণ করে এবং উচ্চ ও নিম্ন লোকে বিভিন্ন প্রকার শরীর প্রাপ্ত হয়, সেই কথা বর্ণনা করলাম। এই সম্পেির্ক আপনি আমার কাছে প্রশ্ন করেছিলেন এবং মহাজনদের শ্রীমুখে আমি যা শ্রবণ করেছি, সেই অনুসারে আমি তা বর্ণনা করলাম। এখন আমি আর কি বলব বলুন?”
পঞ্চবিংশতি অধ্যায়- ভগবান অনন্তদেবের মহিমা
05 Nov 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা